প্রণব দত্তর অনুগল্প

 

পলাশ ও কিশোরকুমার

কিশোরকুমারের গান ভাবতে ভাবতে পাগল হয়ে গেল ছেলেটা। তার কলেজ জীবনে একবার হাতের শিরা কেটে রক্ত মাখিয়ে সে চিঠি পাঠিয়েছিল কিশোরকে। সে চিঠি শিল্পী পেয়েছিলেন কিনা জানা যায় না। এখন কিশোর অবসেসড পলাশের জীবনের খাঁই গান। কোই লওটা দে মেরে বিতে হুয়ে দিন বা  বো শাম এক অজীব থি, এসব মহার্ঘ্য গানের ঘোরে থাকে সে। নানান ঠেকের আড্ডাবাজরা পলাশকে তাতায়। আর পলাশ শিল্পীর প্রতিটা ফাংশনের সন-তারিখ বলে তাঁকে অনুসরণ করে। জীবনের সব ক্ষেত্রে অসফল হয়ে সে এখন জাতব্যাবসায় ঢুকেছে। সন্ধ্যায় সেলুন বন্ধ করে সে এসে বসে স্টেশনের বেঞ্চে। নির্জন প্ল্যাটফর্মে বসে গান করে সে। চাঁদের নীল জ্যোৎস্না ধুয়ে দেয় চরাচর। পলাশের গলায় বিষাদ ঝরে পড়ে। তার গান একমাত্র শোনে ভবঘুরে সবিতা। কবে থেকে সে এই স্টেশন প্ল্যাটফর্মে আছে তার মনে নেই। সংসার, পরিবারের কথা মনে নেই। শুধু একটা ক্ষীণ স্মৃতি আছে যে, সে গান ভালোবাসত। পাগলি সবিতাই এখন পলাশের একমাত্র শ্রোতা, মগ্ন শ্রোতা। পলাশ গান শুরু করলে সবিতা একটু এগিয়ে এসে কৃষ্ণচূড়া গাছে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে। গানপাগল পলাশ, সুরের স্মৃতিতাড়িত সবিতা, এই নীল জ্যোৎস্নাময় রাত্রি আর প্ল্যাটফর্মের ওপাশের নির্জন গাছপালার রহস্যময় শিল্যুয়েট মিলেমিশে এক সুরের আবহ তৈরি হয়। যেখানে উপহাস নেই, অপমান নেই, কেবল এক অপসৃয়মান সুরসরণি নির্মিত হতে থাকে।

 

রাত্রির ঘুমন্ত বিহঙ্গের ডানা

সন্ধ্যা ছ-টা থেকে সাতটা পর্যন্ত চঞ্চল ভরদ্বাজ তার ঘুগনির দোকান বন্ধ রাখে। গোটা নগরের কাকেরা উড়তে উড়তে এসে জমা হয় এই বটগাছে। গাছের নীচেই চঞ্চলের দোকান। ওনাদের এ্যাঁর ভয়েতে ব্যাবসা বন্ধ রাখতেই হয়। এই ঘণ্টাখানেক চঞ্চল পাখিদের রাত্রিযাপনের প্রস্তুতি দেখে। কাকেরা ডাল পালটায়, যথেচ্ছ ডাকে। তাদের সায়ন্তনী চিৎকারে ম ম হয়ে ওঠে চতুর্দিক। একসময় চঞ্চলের ছোটোবেলায় দেখা ত্রিনাথের মেলার কথা মনে পড়ে। আসরের মূল গায়েন ছিল নীতিশ ব্যাপারি। হয়তো রঘু দাশের বাড়িতে একশো গ্রাম তেলের মানত। প্রদীপে তেল শেষ না-হওয়া পর্যন্ত মেলা ভাঙবে না। কালো বিড়াল কালো বিড়ালকে পোষে পাড়ায় বা চিন্তারাম দারোগাবাবুর জামিন দিল কই এ রকম কত গান ভাসছে রাত্রির হাওয়ায়। মেলার দর্শকরা এই গভীর রাতে সকলেই প্রায় ঘুমে কাদা। তখন নীতিশের গান শুনত রাতের নক্ষত্র, নিঃশব্দ বাতাবিলেবু গাছ। নীতিশই বলেছিল, বাবা, রাত এক মহা ডানার বিহঙ্গ। উড়ছে জ্যোৎস্না, কুয়াশা ছিঁড়ে ছিঁড়ে। কোথায় যাবে জানে না। লক্ষ লক্ষ প্রাণ প্রজাতি তার সওয়ার। এক পাগল ড্রাইভারের বাসের যাত্রী তারা ডাল পালটাতে পালটাতে কাকেরা একসময় গাছের ডালপাতার আড়ালে ঘুমিয়ে পড়ে। তখন ঘুমন্ত পাখিদের নীচে দাঁড়িয়ে চঞ্চল হাটখোলার বারবনিতা, মালখোর খরিদ্দারদের ঘুগনি দেয়। কারণ চঞ্চল জানে, এই যে এত ইচ্ছাপাগল মানুষ, তাদের একমাত্র আশ্রয় ঘুম। ঘুমন্ত পাখিদের ডানার ছায়ায় রাত্রিও ঘুমোনোর আয়োজন করে।

 

হাড়কাটা গলির জাগ্রত শনিঠাকুর

প্যাকেটটা প্রথমে মেইন পূজারি মাধবের চেলা কালুয়া দেখেছিল। সে কথাটা মাধবের কানে দেয়। তারপর কানাঘুষো হতে হতে সারা গলিতে হুলুস্থূল কাণ্ড শুরু হল। পুজোর বাটায় কাঁচকলা, চাল, আলুর মধ্যে একটা তরতাজা কন্ডোমের প্যাকেট! হয়তো বস্তুটা পুজোর ডালায় অসতর্কভাবে এসে গিয়েছে। এই বিশেষ দিনটায় এ এলাকাটা উৎসবমুখর থাকে। গলির লাইনের মেয়েরা লাল শাড়ি পরে, ভেজা চুলে পুজোর নৈবেদ্য দিয়ে যায়। মাইকে অ্যানাউন্সমেন্ট হয় সাত নম্বরের গীতা দু কেজি চাল, চারটে কলা দিয়ে সাহায্য করেছে। তাকে ধন্যবাদ। একত্রিশ নম্বরের সাবিত্রী দশ টাকাইত্যাদি। এলাকাটা কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া। দালাল, ফড়ে, মজা করতে আসা খরিদ্দার, সকলেই অস্পষ্ট। মস্তানরা, যারা অন্য সময়ে গলি পাহারা দেয়, তারাও আজ ধর্মপ্রাণ। জাগ্রত থান বলে কথা। তারা মারমুখী হয়ে এসেছে। একসময় মাধব হাত তুলে দেয়। বলে, পুজো আমি করতে পারব না সকলের অনুরোধে প্রায়শ্চিত্তের জন্য কিছু টাকা চেয়ে আবার পুজোয় বসেছে। এ ঘটনায় লাইনের সব মেয়েদের মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। কার ভাগ্যে কী আছে কে জানে! এক ডাকসাইটে মাসি হাত নেড়ে বলল, মন অধর্ম দেখিনি বাপের জন্মেও! কালী যে একসময় কুখ্যাত মার্ডারার ছিল, সেও উত্তেজিত। তার নামে এখনও নানান কেস কোর্টে ঝুলে আছে। সে ফি সপ্তাহে তারাপীঠ মায়ের কাছে যায়। এই জাগ্রত থানে সে প্রতিবার হাজার টাকা চাঁদা দেয়।  পুজোর দিন নির্জলা উপবাস করে। সে এসে চিৎকার করল, শালিকে যে করেই হোক খুঁজে বের কর ছেলের দল এবার ঝাঁপিয়ে পড়ল, তারপর পুজোর ডালা ধরে ধরে উদ্ধার হল এ বাইশ নম্বরের মুন্নাবাই-এর কাজ। একটা বছর ত্রিশের শীর্ণকায় মেয়েকে টানতে টানতে হাজির করল ছেলের দল। ভয়ে মেয়েটার মুখ আমশি হয়ে গিয়েছে। সে ঝরঝর করে কাঁদছে আর সকলের কাছে ক্ষমা চাইছে। নানা রকম মন্তব্য উঠছে ভিড় থেকে। মাসিদের অনুরোধে কালীর রাগ আপাতত কিছুটা প্রশমিত হল। মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে সে ফরমান জারি করল, বার ছাড় পেলি কিন্তু আগামীবারের পুজোর সব খরচ তুই বৎসরভর গতর খাটিয়ে তুলবি, শালী!

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য।)

 
 
top