ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

অর্কদীপ্ত এসে ডাকছিলমুমুমুমু কোনো সাড়া না-পেয়ে অর্কদীপ্ত আবার ডাকল। চৈত্র মাসের বেলা আটটা। রোদ্দুর চড়চড় করে উঠছে। মুমু অনেক ভোরে ওঠে। মুমুদের বাড়িটাতে বাহুল্য কিছু নেইকিন্তু আলগা সৌন্দর্য রয়েছে। দরজা-জানালায় নেটের কাজ করা সাদা পর্দা। সামান্য ময়লা হলে মুমু কেচে দেয়। আজ মনে হল পরদাগুলোতে কেমন মলিন ভাব এসেছে। তখনই অর্কদীপ্তর মনে হল মুমুর কি শরীর অনেক বেশি খারাপ হয়েছেসে হয়তো বিছানা থেকে উঠতেই পারেনি। চৈত্র মাসের বাতাসে মিষ্টি একটা গন্ধ থাকে। অর্কদীপ্ত তাও টের পেল। দেওয়ালে টাঙানো কাঠের জিশুমূর্তিকে নিজের মতো করে প্রণাম করল সে। পাশেই মা মেরির ছবি। রোদ আরও তীব্র হল। কচুরি নিয়ে এসেছিল শালপাতার ঠোঙায় করে আর ফ্লাস্কে চা। সঙ্গে কিছু মাটির ভাঁড়। এইসব শালপাতামাটির ভাঁড় খুব প্রিয় মুমুর। আবার ডাকল অর্কদীপ্তমুমুমুমু। বারান্দায় এসেও দাঁড়াল। টবে বেড়ে ওঠা গোলাপ গাছে কুঁড়ি এসেছে। এইসময় বারান্দায় মুমু এল। স্নানসিক্ত মাথা থেকে জল ঝরে পড়ছে। চোখের তলায় এখনও জলকণা আটকে রয়েছে। অর্কদীপ্তকে দেখে মুমুর মুখে হাসি ফুটল। ঘর থেকে চেয়ার নিয়ে এসে সে বললবারান্দায় বসবে!

অর্কদীপ্ত বললশালপাতার ঠোঙায় কচুরি এনেছি। ঠান্ডা হয়ে যাবে। ফ্লাস্কে চা এনেছিসঙ্গে মাটির ভাঁড়

মুমু উত্তর দিল বারান্দা থেকে ঘরে যেতে যেতেচুলটা বেঁধে আসছি

খুব তাড়াতাড়ি চুল বেঁধেদুটো ডিম আর একটা চেয়ার টানতে টানতে বারান্দায় নিয়ে এল মুমু। চমৎকার মিষ্টি সুবাস ওর গা থেকে উঠে আসছে। মুমু আজকে মাথার মাঝখানে সিঁথি করে দু পাশে দুটো বিনুনি ঝুলিয়েছে। পাতলা চুলও চমৎকার পরিপাটি করে বেঁধেছে। আজকে মুমু শাড়ির বদলে স্কার্ট পড়েছে। পুরোনো সময়ের ফ্রেমে বাঁধা মুমুর একটা ছবি বরাবরই অর্কদীপ্তর কাছে রয়েছে । আজ নতুন করে সেটা ফিরে এল যেন। কচুরি আর চা খেয়ে মুমুর তৃপ্তি হল। সে হঠাৎ বললকটা উপাসনা সংগীত শুনবে?

অর্কদীপ্ত ঘাড় এলিয়ে সম্মতি দিল।

কিন্তু তোমাকে অর্গান বাজাতে হবে

মি তোমাদের উপাসনার সুর কী করে জানব?

মুমু তখন বললচ্ছা ঠিক আছে। তুমি কিন্তু লক্ষ্মী ছেলের মতো শুনবে। দুষ্টুমি করবে না

মুমু অর্গানের রিডে আঙুল রেখে সুরটা মনে করার চেষ্টা করল। তারপর সামান্য গাইতেই খুব হাঁপিয়ে উঠল। সুর খুব চড়া গলায় তুলতে পারল না সে। হঠাৎ মুমুর গায়ে একটু হাত রাখল অর্কদীপ্ত।

তোমার তো জ্বর রয়েছে গায়ে। এর মধ্যে স্নান করলে!

জ্বরে তো স্নান করতে হয়। আধুনিক চিকিৎসায় এরকমটাই বলে

চুপ করে রইল অর্কদীপ্ত। তার রাগ হয়েছে। বুঝতে পেরে মুমু বললমি কি তবে একটু শুয়ে পড়বশোয়ার ঘরে যাবে তুমি?

বাধ্য ছাত্রের মতো ঘাড় নাড়ল অর্কদীপ্ত।

খুব সুন্দর সাদা ধবধবে একটা চাদর পাতা রয়েছে। মুমু যেন জানত এ ঘরে অর্কদীপ্ত আসবে। বিছানার পাশেই পড়ার টেবিল রয়েছে। ছেলেবেলায় এখানে বসে ওরা দুজনে অঙ্ক করত।

জ্বর কত উঠেছিলতুমি দেখেছিলে?

না। মুমু বলল। হঠাৎ মুমুর চোখ জলে ভরে উঠল।

অর্কদীপ্ত বললকী হল আবার?

তুমি কবে ব্যাঙ্গালোরে যাবে?

যাব না ভাবছি। তোমার বাবার চাকরি ছেড়ে দেব ভাবছি

কথাটা শুনে খুব খুশি হল মুমু। বাইরে গাছের পাতা ঝরে পড়ার শব্দ হচ্ছে। ফিঙে পাখি ডেকে উঠল। কোকিলও ডাকল। অর্কদীপ্ত একটা বই বার করে মুমুকে দেখাল। বাংলায় লেখা বাইবেল।

তুন করে পড়ছি

খুব খুশি হল মুমু। প্রভু যিশু কাউকে কষ্ট দেন না। তিনি সব কষ্ট নিজের কাছে টেনে নেন। আজকের জ্বরে মুমুর খুব আরাম হচ্ছে। সামান্য কাঁপুনি আসছে বলে সে চাদর গায়ে টেনে নিল। তার খুব ইচ্ছে করছিল অর্কদীপ্ত যদি তাকে জোর করে জাপটে ধরে। মুখে কিছুতেই সে এ কথা বলতে পারবে না। এই পৃথিবী খুব সুন্দর লাগছে এখন। বড়ো মায়া হচ্ছেবেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে। অর্কদীপ্ত জানে থার্মোমিটার কোথায় আছে। মুমুর এরকম জ্বর প্রায়ই আসত। মুমুর মায়েরও আসত। তারপরেই জ্বর হতে হতে মানুষ যখন কৃশ হয়ে যায়আরও সাদা আরও পবিত্র হয়ে যায়তখন সেই রোগের নাম হয় ব্লাড ক্যান্সার।

মুখটা খোলোজিভের তলায় দেব অর্কদীপ্ত বলল মুমুকে।

বাধ্য মেয়ের মতো মুখ খুলল মুমু। জ্বর বেশি উঠল না। একশো।

কী দেখলে তোআমার বেশি জ্বর নেই

ম্লান হাসল অর্কদীপ্ত। মুমু খুব শ্লথ পৃথিবীতে বাস করতে ভালোবাসে। অর্কদীপ্ত জানে এই পৃথিবী মুমুর মতন নয়। গতি আর গতির নতুন দুনিয়া। কেউ কারুর জন্য থেমে থাকবে না। সবাই ছুটছে কিন্তু মুমু স্থির। কবে থেকে সে একা একা এই বাড়িতে পড়ে রয়েছে। এমন তো হতে পারেস্থানান্তরে মুমু বেঁচে যেতে পারে। অর্কদীপ্তর কোনো কথা মনে এলে বেশিক্ষণ গোপন রাখতে পারে না। সে বলেই ফেললতোমাকে নিয়েই ব্যাঙ্গালোর যাব

বাবার কাছে আমি যাব না খুব কঠিন গলায় বলল মুমু।

ব্যাঙ্গালোর শহর বেশ সুন্দর। টেকনোসিটি। আমি না-হয় অন্য চাকরি নেব। তাহলে যাবে তো?

প্রসঙ্গ পালটে মুমু বললতুমি এরোপ্লেনের ছায়া পড়তে দেখেছ মাটিতে?

খুব উঁচুতে থাকলে ছায়া পড়বে কী করে?

কিন্তু ছায়া তো পড়েআমরা দেখতে পাই না

পাজামা পড়ে এসেছে অর্কদীপ্তসঙ্গে পাঞ্জাবি। দুটো চড়াই পাখি হুট করে উড়ে এসে মুমুদের বারান্দার গ্রিলে বসল। চড়াই পাখি তেমন একটা দেখা যায় না। মোবাইল টাওয়ার যত্রতত্র বেড়ে যাওয়ায়ওদের প্রজাতি প্রায় লুপ্ত হতে চলেছে। মুমুর কাছে এরকম অনেক কিছু দেখা যায়  সচরাচর বাইরের দুনিয়ায় যাদের দেখা মেলে না। খাটের পাশে ছোট্ট একটা টেবিলচা গাছের গুঁড়ি দিয়ে বানানো। উঠে বসে টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা হলুদ রঙের পেন বার করল মুমু। হাতে দিয়ে বললতোমার জন্মদিনের উপহার। এর চেয়ে বেশি কিছু দিতে পারলাম না

বেশ দামি পেন। তার চেয়েও দামি মুমুর ভালোবাসার ছোঁয়া রয়েছে বলে।

বাবা আর আমার জন্মদিন একই মাসে। বাবার ১৯ মার্চ আর আমার ২৪। দুজনেই চৈত্রের জাতক বলেই মুমু খুব হাসল।

তো হাসছ কেন?

লব না

কে?

অর্কদীপ্ত একটুকুতেই ক্ষেপে যায় এবং সবচেয়ে রাগ করে যখন মুমু কারণটা বলে না। বলবে না তো বলবে না। এই দিক থেকে খুব জেদি মেয়ে। নিজের ইচ্ছে হলে তবে ভাঙবে রহস্য।

তুমি কিন্তু খুব মোটা হয়ে যাচ্ছ

বাবা তো আরও মোটা হয়ে গেছে। প্রায় নব্বই কেজি। হাইট তো সেই পাঁচ ফুট পাঁচ

তুমি বুঝি খুব লম্বা!

না। লজ্জা পেয়ে গেল অর্কদীপ্ত। তার ওজন ছেষট্টি কেজি। ফুটবল খেললে আবার এসব বাড়তি মেদ ঝরে যেত।

মুমু আবার হাসছিল। তারপর বললতো কচুরি খাওওজন তো বাড়বেই

বাঃযার জন্য চুরি করি সেই বলে চোর! শালপাতার ঠোঙায় খেতে চেয়েছিল কচুরি!

তুমি। তোমার লোভ দেখেই আমি হ্যাঁ বললাম

অর্কদীপ্ত হাসল। সে বুঝতে পারল দীপ্তি বা মুমু ইচ্ছে করেই ওর পিছনে লাগছে। লেগ পুলিং করছে।

তুমি কিন্তু বললে না এরোপ্লেনের সেই ছায়া সত্যি পড়ে কিনা

সব ভেবে কী হবে। পড়ে কিংবা পড়ে না

মার ছায়াও একদিন পড়বে না, যেদিন আমি পেত্নি হয়ে যাব

ব্যথা পেল অর্কদীপ্ত। তার চেয়েও বেশি কষ্ট পেল মুমু। সে বুঝতে পারছে তার জীবনের বেলা ফুরিয়ে এলএবার ছায়া প্রলম্বিত হতে হতে একদম নিঃশেষ হয়ে যাবে। মুমু খুব ক্লান্ত হয়ে উঠেছে। জ্বর বাড়ছেসে টের পেল। অনেক কথা বলে ফেলেছে আজকে। একসময় ঘুমোবার জন্য ঘরে চলে গেল মুমু।

 

বিকেলে সায়ন্তন এলসঙ্গে অর্কদীপ্ত।

অর্কদীপ্ত বায়না ধরল সকলে মিলে মেলায় যাবে। কলকাতা শহরকে দেখলে মনে হয় তাতে বুঝি কোন পুরু আস্তরণ জমাট বেঁধে রয়েছে। চন্দননগর শহর যেমন মনে হয় রাংতায় মোড়া মহার্ঘ উপহার আর ডাচদের নির্মিত চুঁচড়ো পুরোনো জোব চার্নকের কলকাতার জলছবি। গ্রামকে ধরেবেঁধে শহর করে দেওয়া হয়েছে। এখনও সেখানে জেলেপাড়ার সঙ বেরোয়গাজনের মেলা হয় প্রেমতলার মাঠে।

মুমু জানে অর্কদীপ্ত বায়না যখন ধরেছে যাওয়ারতাকে যেতেই হবে। শরীর খারাপ বললে মানবে না। সরু পাড়ওয়ালা সাদা শাড়ি পড়ল মুমু। সামান্য সাজলকিন্তু জ্বরের সেই মলিন ভাবটা মুখে লেগে রইল।

হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। অর্কদীপ্ত তাকে ফেলে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল। অর্কদীপ্ত এরকম। খুব ছটফটে। কর্মক্ষেত্রে সে খুব প্রো-অ্যাক্টিভ কিন্তু সৃজনকর্মের ক্ষেত্রে চটজলদি সবকিছু করে বলে শেষ অবধি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারে না। এখনও তার মাথায় নেই যে, মুমু অসুস্থ। সায়ন্তন বিপরীত স্বভাবের। একটু ধীরজ প্রকৃতির। গান ভালোবাসেগলাও চমৎকার সুরেলা। মেলায় বেশিক্ষণ থাকা হল না। একসময় মেলার ভিড়ে আলাদা হয়ে গিয়ে বসেও পড়ল মুমু। তখন অর্কদীপ্ত বুঝল ভুল হয়ে গিয়েছে।

 

পয়লা বৈশাখের দিন মুমু ভোরে উঠল আর স্নান করে নিল। মঞ্জুদি মুমুকে মাঝেমধ্যে এসে বাজাররান্না এসব করে দেয়। রান্না করলে মঞ্জুদি অনেকটাই বাড়ি নিয়ে যায়। এছাড়া আলাদা কিছু নেয় না। মিস্টার গোমেজের স্ত্রী মানে মুমুর বর্তমান মায়ের আপত্তি ছিল। কিন্তু সবটায় ওঁর কথা মেনে চলতে হবে কেন?  মুমু মেনে নেয় নি। মঞ্জুদিকে দিয়ে দুটো ফুলের মালা আনিয়েছিল। একটা মালা দিল মায়ের ফোটোতে আর একটা রবি ঠাকুরের ছবিতে। হোয়্যার দ্য হেড ইজ হেল্ড হাই…, মনে মনে গীতাঞ্জলি থেকে বলল মুমু। আর বললমনেরে আজ কহোরে ভালো মন্দ যাহাই আসুক সত্যেরে লও সহজে। আকাশ থেকে আগুন ঠিকরে পড়ছে।

(ক্রমশ…)

 
 
top