ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

একবার অর্কদীপ্তকে জিজ্ঞেস করেছিলেন অনুজ, তোর মা এতো টিভি সিরিয়াল দেখে কেন?

মা শুধু না বাবা, প্রায় সমস্ত মেয়েরাই দেখে

অর্কদীপ্তর উত্তরে অনুজ কারণ জানতে চেয়েছিলেন।

সে বলেছিল, বাবা, মেয়েরা খুব বাস্তববাদী হয়। আর সিরিয়ালগুলো হচ্ছে রিয়্যাল লাইফের রেপ্লিকা। শ্বাশুড়ি-বউয়ের ঝগড়া, স্বামী-স্ত্রীর মান-অভিমান ইত্যাদি

অনুজ তখন বলেছিলেন, তোদের প্রজন্ম কী ভালোবাসে?

সোস্যাল নেটওয়ার্কিং ফেসবুক মানে এফবি। কম্পিউটারতো আসলে যন্ত্র। মানুষকে যন্ত্রই বানিয়ে দেয়। আমার বন্ধুরা কম্পিউটার ছাড়া জীবন ভাবতেই পারে না

র তুই?

ছেলের উত্তরের জন্য আধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিলেন অনুজ।

মি নতুন দেশ, নতুন জনপদ দেখতে ভালোবাসি

কোথায় আছে অর্কদীপ্ত? দিল্লি আছে এখনও? না কি লাতিন আমেরিকার কোনো দেশে? চিলি, পেরু, উরুগুয়ে বা কলম্বিয়া?

তারপর অনুজ জিজ্ঞেস করেছিলেন, মি কী ভালোবাসি বলে তোর মনে হয়?

অর্কদীপ্ত হেসে বলেছিল, তুমি রিয়্যালিটি থেকে পালাতে চাও কিন্তু পারছ না। মা তোমাকে রিয়্যালিটির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রেখেছে। তবে তোমার হাতে একটা ক্যাল্ডিওস্কোপ রয়েছে। তুমি ওটা ঘুরিয়ে রিয়্যালিটির বিভিন্ন রঙ দেখে চলেছ

র্থাৎ ম্যাজিক রিয়্যালিটি? অনুজ বলেছিলেন।

তুমি সেই সময়কে ইটার্নিটি দিয়ে বসে আছ

ভুল সেটা?

ভাবে বলা যায় না

অর্কদীপ্ত বলেছিল মুমুর মৃত্যু ওকে এক গভীর জীবন জিজ্ঞাসার দিকে ঠেলে দিয়েছে। অনুজদের বন্ধুদের মধ্যে সন্দীপ কবিতা লিখত। ওর প্রথম কবিতার বইয়ের নাম কিছুতেই মনে পড়বে না এখন। তবে শব্দ থেকে গরল বা মুক্ত বার হচ্ছে—এ রকম একটা নাম ছিল। চটি বই, সস্তার কারনে হলদে পাতা, ষোল পাতাযাকে কিনা এক ফর্মা বলা হয় প্রেসের ভাষায়।তখন অনুজ সবে ভূমি বিভাগে চাকরি পেয়েছে। সন্দীপ বেকার। বাংলা ভাষা নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ করেছে। প্রদীপ চক্রবর্তী, ওদের কমন ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু সন্দীপকে সাহায্য করেছিল আর্থিকভাবে। একই সঙ্গে প্রদীপ কড়া কথা শুনিয়েছিল। এসব কবিতার বই কেউ পড়ে না। এর চেয়ে সন্দীপ কার্ল মার্ক্সের সারপ্লাস লেবার নিয়ে কিছু লিখতে পারত। লেখক বিশেষ করে সচরাচর প্রতিবাদ করতে পারে না। ভয়ে কুঁকড়ে থাকে তবে মনে মনে নিশ্চয়ই গুমরে মরে। সন্দীপ প্রদীপের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর আরও কিছু টাকার দরকার ছিল। তাই অনুজের কাছে এসেছিল। অনুজ তখন কল্যাণীতে ট্রেনিং শেষ করে ট্রানজিট লিভে রয়েছে। কয়েকদিন পরেই উত্তরবঙ্গে চলে যাবে। অনুজ টাকা দিয়ে সন্দীপের পিঠে হাত রেখে বলেছিল, বেরুলে পাঠিয়ে দিস এক কপি। আমার বিশ্বাস তোর কবিতা অনেকের ভালো লাগবে সন্দীপ পাঠিয়েছিল কবিতার বইয়ের এক কপি। উৎসর্গে অনুজের নাম। সঙ্গে কোনো পত্রিকায় সদ্য বের হওয়া রিভ্যুয়ের এক কপি।

জীবনের একটা সময়ে যখন প্রগলভতা বলে কিছু থাকে না, তখন নারী মানেই মা আর যুবক মানেই নিজের সন্তান, এরকম একটা প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়। কিন্তু মুহূর্তেই অনুজ সক্রিয় হয়ে উঠলেন মোবাইল স্ক্রিনে অর্কদীপ্তের নম্বর দেখে।

 

বাবা, কী করছ?

 

উত্তরে স্নেহ ঝরে পড়ল অনুজের গলায়, সে বসে আগডুম বাগডুম ভাবছি। কিন্তু তুই এখন কোথায়?

 

দিল্লি এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে। ভিসা, পাসপোর্টের চেকিং শেষ হয়েছে। এখন ওড়ার অপেক্ষায়

 

য় করছে তোর?

 

য় ইংরেজি বলতে না পারা নিয়ে। ইয়েস, নো, ভেরি ওয়েল করে এখনও চলে যাচ্ছে। কিন্তু এরপর তেইশ ঘণ্টা বিমানে বসে থাকা। লাতিন আমেরিকানরা গোঁফ রাখতে ভালোবাসে। এইটুকুর বাইরে তো আমি কিছু জানি না। আচ্ছা বাবা, পালিয়ে আসব? এখন মনে হচ্ছে আমাদের চুঁচুড়া শহরটা কতো সুন্দর!

 

য় পাস না। প্রযুক্তির ভাষা এক। সেটা তো তোর জানা

 

মি কোথায় যাচ্ছি জানো?

 

কোথায়?

 

মেক্সিকো। তোমার নীলাদ্রিকে মনে আছে? ও আসবে আমাকে নিতে

 

সেই তোর হুগলী ব্রাঞ্চের বন্ধু?

 

হ্যাঁ, বাবা। নীলাদ্রি আমাকে একটা কথা বলেছে। কাস্টমস চেকিংয়ের সময় বলতে হবে, নো তেঙ্গো নাদা কিউ দেক্লারার। মানে, আই হ্যাভ নাথিং টু ডিক্লেয়ার

 

নুজ বললেন, মেক্সিকো মানে মায়া সভ্যতা। বুলফাইট হয়। বিশাল বিশাল টুপি পরে ঘোরে মানুষ যার নাম সমরেবো

 

বাঃ, তুনি তো অনেক কিছু জানো বাবা! আর পুরো শহরটাই নাকি আগ্নেয়গিরির লাভা থেকে তৈরি। প্রশান্ত মহাসাগরের জলও সেখানে উষ্ণ। অনেক মিনারেল স্প্রিং আছে মেক্সিকোতে। বাবা, মনে আছে তুমি, মা আর আমি ইডেনে নাইট রাইডার্সের ম্যাচ দেখতে গেছিলাম? সৌরভ তখন ক্যাপ্টেন। সেই মেক্সিকান ওয়েভ!

 

অনুজ জানেন তাঁর ছেলে যতই ধর্ম পরিবর্তন করতে চাক, সে আসলে মনে প্রাণে মফস্বলের এক বাঙালি যুবক। মাছ, ভাত, আলু পোস্ত আর ডাল তার প্রিয় খাদ্য। বিশ্বকাপের মেক্সিকোর ফুটবল দল ছাড়া অর্কদীপ্তের আর তেমন কিছু জানা নেই। ১৯৮৭তে বোধহয় মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ছিলেন মিগেল ডা লা মাড্রিড। এক সময় মেক্সিকোর ঋণের বোঝা ভারতের মতনই ছিল। আমাদের দেশের মতনই সেখানে ছিল নেগেটিভ অর্থনীতি। তারপর পর্যটন শিল্পের হাত ধরে মেক্সিকো উঠে দাঁড়াল।

 

বাবা, প্রিপারেশন ফর দ্য ওয়্যার ইজ দ্য বেস্ট গ্যারান্টি ফর পিস, বার্নাড শয়ের এই কথা তুমি বিশ্বাস করো?

 

ঠাৎ এই কথা মনে হচ্ছে কেন?

 

মেক্সিকো থেকে আমার জার্নি শুরু হলেও, আমি যাব পেরু, উরুগুয়ে, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা—-যুদ্ধ বিধ্বস্ত সব দেশ। ভারতবর্ষ প্রথম নিউক্লিয়ার টেস্ট করে বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন। মে ১২, ১৯৯৮। পোখরানে। অপারেশন শক্তি। এ পি জে আব্দুল কালামের নেতৃত্বে। প্রধানমন্ত্রী তখিওন অটল বিহারী বাজপেয়ি। তারপরে পাকিস্তান। কার্গিল যুদ্ধ। অপারেশন বিজয়। ভারতবর্ষ কিন্তু খুব সহজে এই পারমানবিক পরীক্ষা নিরিক্ষার দিকে যায়নি। জওহরলাল নেহরু, লালবাহাদুর শাস্ত্রী, ইন্দিরা গান্ধি, নরসিমা রাও এবং অবশেষে বাজপেয়ি সরকার। অর্থাৎ পরমানু বিজ্ঞানী হোমিও ভাবা সময় থেকে বিজ্ঞানীরা তৈরিই ছিলেন। কিন্তু প্রশাসনিক সবুজ সংকেত পেতে বহু বছর লেগেছে

(ক্রমশ…)

 
 
top