ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

মেয়েটার বয়স তখন নয়। ক্লাস ফোর-এ পড়ছে। স্বামী গোবিন্দ দাসের কাছে এসেছিল রণ মাঝি। রণ মাঝির বেশ কয়েকটা ট্রলার রয়েছে। পাকা বাড়ি, ফ্রিজ, টিভি—সব রয়েছে। সেই রণ মাঝি চায়ে চুমুক দিতে দিতে দাওয়ায় বসে বলল, বিয়া দিবা না গোবিন্দ, মাইয়ার?

কুসুমের চোখ দুটো জ্বলে উঠেছিল। সে চায় মেয়েটা আরও পড়াশুনা করুক।

গোবিন্দ রণ মাঝির কথার উত্তর দেয় না। চুপ করে থাকে।

আবার বলে রণ মাঝি, তুমার মাইয়ার বিয়ের বাজারে দাম আছে

রণ মাঝির বয়স তিরিশের কোটায়। স্বভাব চরিত্র মন্দ নয়। তার ওপর টেঁয়া আছে। তবুও গোবিন্দ ঘরের ভিতরে কুসুমের দিকে তাকায়। টের পায় তার বউ রেগে রয়েছে।

গাও জ্বালাইনা কথা কয় তুমার রণ মাঝি

গোবিন্দ বলে, ণ মাঝির টেঁয়া আছে বিস্তর। তুমার মায়ারে রাজরানি কইর‍্যা রাখব

গর্জে ওঠে কুসুম, মায়ারে আঁই অহন বিয়া দিব না

মাইয়ালোক চুপ মাইর‍্যা থাক। তুমার মুখে মায়ে মধু দিছিল আঁতুড়ে?

বিষ দিছিল

গোসা হইলে মারুম কুসুম। তহন মুখের বাক্য খইর পারা ফুটব না

কুসুম জানত এরপর রণ মাঝির সামনেই মারধর শুরু করবে গোবিন্দ। তবে সেদিন আর বেশি দূর এগোয়নি গোবিন্দ। রণ মাঝিও উঠে চলে গেছিল।

তুমারে কইছিলাম না এবারে পোলা হইব আমাগো! বাবু জন্মাবার পর কুসুম বলেছিল গোবিন্দকে।

গোবিন্দ ছেলে মুখ দেখে খুশি হয়েছিল। কিন্তু সে কখনও কুসুমের প্রশংসা করত না। তাই সে বলেছিল, পোলা তো হইছে, খাওয়ামু ক্যামনে?

হন তো কইছিলাম। হুনছিলা?

তুর কি আশনাই কম আছিল? তুই কইছিলা না ক্যামনে ফিরবা মাঝি! ঘরত থাইক্যা যাও

আঁই কইছিলাম কাল বিয়ানে যাও। পূবের বাতাস দিছিল খুবই

 

কুঁজো থেকে টিনের গ্লাসে জল গড়িয়ে খেল কুসুম। কাল আদালতে জজ সাহেব রায় দেবেন। ফাঁসি না হলেও যাবজ্জীবন। দফা ৩০২, হিন্দি সিনেমায় যেমন বলে। সত্যিই কান্না পাচ্ছিল কুসুমের, নিজের জীবনটার দিকে ফিরে তাকিয়ে। আদালতে নিজের পক্ষে কিছুই বলেনি কুসুম। মৃগাংক উকিল, বৈরাগ্য পাখিরা সবাই ব্যর্থ হয়েছে। সরকার পক্ষের উকিল বার বার বলেছেন কথাটা,মহামান্য হুজুর, আসামী অনুতাপের আগুনে দগ্ধ হচ্ছে। ওর কিছু বলার নেই। বিশ্বজিত বাউল কাঁদছিল। ছেলে, মেয়ে দুজন কিছু যেন বুঝতে পেরেছে। বাবু খুব কাঁদছিল। সে মাকে ছাড়া থাকতে চাইছে না। কুসুম নিথর হয়ে বসে ছিল। ওদের সামনে একটুও কাঁদেনি। জজ সাহেব কয়েকবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তোমার কি কিছু বলার আছে? নিশ্চুপ ছিল কুসুম। চোখ দুটো দিয়ে এক ফোঁটা জলও পড়েনি। আদালতে গেলে কুসুম অন্যরকম হয়ে যায়। বরং থানা অনেক ভালো। সেখানে অনেকে তাকে ইতিমধ্যে দিদি বলেও ডেকেছে। কখনও কখনও ওদের চা টিফিন করে দিয়েছে। শ্রীনিবাস কনস্টেবল কথামৃত শুনিয়েছে প্রায়ই। কত সহজ গল্প! অথচ মনে হয় হৃদয়ের কালির যেন মোচন হয়ে যাচ্ছে।

(ক্রমশ…)

 
 
top