ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

বাবা, এখন কিন্তু নন ফিকশনের বাজার রয়েছে। তুমি এসব ভাবনাগুলো প্রতিদিন লিখতে পার

কী নাম দেব?

টুকরো সংলাপ অর্কদীপ্ত চটপট উত্তর দিল।

কে ছাপবে?

বিদেশ থেকে ফিরে এসে আমি ছাপব। মাকে বলেছি আমি লাতিন আমেরিকা যাচ্ছি

চমকে উঠলেন অনুজ।

কী বলল তোর মা?

শীর্বাদ করল। বলল, তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস

হ্যাঁ বাবা, আমরা অপেক্ষায় থাকব

অনুজের কণ্ঠে অদ্ভুত গাঢ়তা। পৃথিবীর এপার থেকে ওপারে চলেছে ছেলে। মানচিত্রটা মনে মনে বোঝার চেষ্টা করলেন তিনি।

কিছুক্ষণ পর আবার অর্কদীপ্তর ফোন। অনুচ্চ স্বরে বললেন তিনি, কিছু বলবি আবার? তোর টাকা পয়সা আছে তো?আমার কাছ থেকে কিছুই তো নিলি না!

ছে বাবা। সে রকম হলে তোমার কাছে চাইব। ফ্লাইটের দেরী আছে। নিজের দেশ ছেড়ে যাচ্ছি তো, কেমন যেন লাগছে অর্কদীপ্তর গলা কাঁপছিল।

ফিরে আয় তবে। অ্যাসাইনমেন্ট বাতিল করে দে

না বাবা। নিজের দেশকে তো তেমন করে জানা হল না

মিই বা কতটুকু জানিদীর্ঘশ্বাস পড়ল অনুজের।

হঠাৎ অর্কদীপ্ত বলল, বাবা, আমাদের দেশে কখনও বিপ্লব হয়েছে?

স্বাধীনতা সংগ্রামকে তো বিপ্লবই বলে

সে তো মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধির অহিংস বিপ্লব

সেই বিপ্লব অনেক কঠিন। ভালোবাসা দিয়ে মানুষকে জয় করা

র কোন বিপ্লব হয়নি?

কেন হবে না? মাস্টারদা সূর্য সেন, ভগৎ সিং, ক্ষুদিরাম, বিনয়-বাদল-দীনেশ, সুভাষচন্দ্র বসু—-অগণিত বিপ্লবীর রক্তে স্বাধীনতা এসেছিল

অর্কদীপ্ত এবার বলল, ত্তরের দশকে তবে কী হয়েছিল?

থমকে যান অনুজ। তখন তাঁর বয়স ছয়-সাত। বাবা রুমাল বের করে হাতে দিয়ে বলছেন, বুবুন চোখে চেপে ধরে থাক মৃণাল সেনের সেই কোলকাতা। কিন্তু উত্তর দেওয়ার সময় ছেলেকে বললেন, টা অতি-বিপ্লব

চিনের চেয়্যারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান—এসব স্লোগান ছিল?

ভিতরে ভিতরে রক্তাক্ত হচ্ছেন অনুজ। মুখে বললেন, সব তুমি জানলে কী করে?

তিহাসই তো বাবা

অনুজ এবার বললেন, সব নিয়ে ভাববে না। দিকশূন্য রাজনীতির বলি হয়েছিল সেদিনের অসংখ্য যুবক যুবতী

ছেলেকে এরকম একটা উত্তর দেওয়ার পরেও অনুজের মনে হোল এই বিধান ভাঙবে বলেই অর্কদীপ্ত চলেছে গৃহযুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত দেশগুলি দেখতে।

মাকোন্দো গ্রামে পাইপ আর ড্রামসহ আসত জিপসিরা। নতুন নতুন পসরা তারা সঙ্গে নিয়ে আসত। কখনও চুম্বক, কখনও কাঁচ, কখনও বা দূরবীন। তাদের নতুন পসরা নিয়ে সবচেয়ে বেশি কল্পনার জগতে ভেসে যেতেন হোসে আর্কারিয়ো বয়েনদিয়া। জিপসিদের মধ্যে মেলকিয়্যাজেসের সঙ্গে ছিল তাঁর এক আশ্চর্য বন্ধুত্ব। একবার অনেক বছর পর জিপসিরা এলো একদল যুবক-যুবতীদের নিয়ে। তারা কেউ স্প্যানিশ ভাষা জানত না। ওদের মধ্যে একজন আর্মেনিয়ান প্রৌঢ় ছিলেন যিনি একমাত্র স্প্যানিশ জানতেন। তাঁর কাছ থেকে বয়েনদিয়া জানলেন মেলকিয়্যাজেস সিঙ্গাপুরে কয়েকদিনের জ্বরে মারা গিয়েছেন। ওঁর মৃতদেহ সমুদ্রে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে। সেবার জিপসিদের দল সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল এক আশ্চর্য বস্তু। বয়েনদিয়া সেটিকে স্পর্শ করলেন। পৃথিবী গভীর রহস্যে ঘেরা। বয়েনদিয়া বারবার আশ্চর্য হয়েছেন, অভিভূত হয়েছেন। আকাশে উড়লেন অ্যারোপ্লেনে। খণ্ড খণ্ড মেঘেদের সংসার। কখনও মনে হচ্ছে মেঘেদের পাহাড়, আবার মনে হচ্ছে মেঘের সমুদ্র। তবে অর্কদীপ্তের কাছে সমস্ত দৃশ্যপটের মধ্যে একটাই কমন—মুমুর স্মৃতি। আকাশের খুব কাছাকাছি হয়ত আচমকা মুমুর সঙ্গে দেখা হলেও হতে পারে। বায়ুমার্গের ভ্রমণের যে ক্লান্তি তাকে বলে জেট ল্যাগ। এখনও অর্কদীপ্তের কাছে সে ক্লান্তি ছুঁয়ে যায়নি। নেট খুলে সে যতদূর সম্ভব লাতিন আমেরিকার মানচিত্র নিয়ে বসল। উরুগুয়ে লাতিন আমেরিকার সমৃদ্ধশালী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। উরুগুয়ের পশ্চিমে আর্জেন্টিনা এবং উত্তর-পূর্বে ব্রাজিল। আটল্যান্টিক মহাসাগর বয়ে চলেছে এর দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্বে। লাতিন আমেরিকার দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ উরুগুয়ে।

মুমু ছিল উরুগুয়ের অক্লান্ত ভক্ত। কোলকাতায় যখন নেহরু গোল্ড কাপ হয়েছিল, মুমু বা অর্কদীপ্ত কেউই তখন জন্মায়নি। বাবার মুখ থেকে অর্কদীপ্ত এঞ্জো ফ্যারানচেককোলির কথা অনেকবার শুনেছে। কিন্তু মুমু কী করে উরুগুয়ের সমর্থক হল সেটা মনে পড়তে এখন হাসি পেল অর্কদীপ্তর। মন্টেভিডেইয়ো উরুগুয়ের ক্যাপিটাল আর মুমুর প্রিয় ক্লাব মোহনবাগান। তিন ম-য়ের মিলনে মুমু হয়ে উঠেছিল ফুটবল বিশ্বকাপে উরুগুয়ের অন্ধ সমর্থক। ২০১০-র বিশ্বকাপে উরুগুয়ে সেমি ফাইনালে ওঠে। দিয়েগো ফোরলান সোনার বল পেয়েছিলেন।

যাই হোক, ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে পর্তুগিজরা উরুগুয়ের মাটিতে প্রথম পা রাখে ১৫১২ সালে। ১৫১৬ সালে আসে স্প্যানিশরা। রাজধানী মন্টেভিডেইয়ো স্থাপন করেছিল স্প্যানিশরা। বর্তমানে অনেক ছন্দ পতনের পর উরুগুয়েকে বলা যেতে পারে ডিমোক্র্যাটিক রিপাবলিক উইথ আ প্রেসিডেনশিয়্যাল সিস্টেম।

উরুগুয়ে সম্পর্কে একদম শেষ নোট নিল অর্কদীপ্ত—উরুগুয়ে নামের উৎস উরুগুয়ে নদী। এই নদীর নামের অর্থ রঙিন পাখিদের তটিনী। উরুগুয়ে স্বাধীনতা সেই অর্থে পেয়েছিল ১৮১১ থেকে ১৮১৮-র মধ্যে। স্পেন, পর্তুগাল, আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল—এই চার দেশের মধ্যে যুদ্ধে শেষমেশ স্বাধীনতা লাভ করে। যদিও বিদেশি আধিপত্য, সামরিক বাহিনির পদচারণায় উরুগুয়েতে কখনও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ছিল না। ১৯৮০-র নভেম্বরে সামরিক বাহিনি নতুন সংবিধান তৈরি করলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপর ১৯৮৪-তে সামরিক বাহিনি প্রস্তাব দেয়—রিটার্ন টু দ্য সিভিলিয়্যান রুল। জাতীয় নির্বাচন প্রথম হয় ১৯৮৪-তে। শেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ সালে হোসে মুজিকা প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। মুজিকা বামপন্থী এবং দেশে সামরিক শাসন চলাকালীন পনের বছর জেলে কাটিয়েছেন। উরুগুয়ে ডিমোক্র্যাটিক রিপাবলিক কিন্তু রাষ্ট্রপতিই হচ্ছেন সর্বময় কর্তা।

(ক্রমশ…)

 
 
top