ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

বৈশাখ পড়তে না পড়তেই সেই আগুনের ব্যপ্তি আরও বাড়ল। বন ছাড়িয়ে মাঠে। আবার মাঠ ছাড়িয়ে বনে। কোথাও কোনো ঘর-বাড়ি নেই, লোকালয় দেখা যায় না। তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে। নাইট ডিউটির কনস্টেবেলের ডাকে ঘুম ভাঙল কুসুমের। অনেক রাত এখন।

দচলন আউরত, বড়োবাবু বুলিয়েছে তোকে

স্বপ্নের সঙ্গে একটা সাদৃশ্য, তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে। বড়োবাবুর কাছে এল কুসুম। রক্তাক্ত চোখ, মাঝ-বয়সি। স্থূল চেহারা।

খুনটা করলি কেন, তাও আবার নিজের স্বামীকে?

জল চাইল কুসুম। বড়োবাবু কনস্টেবেলকে জল দিতে বললেন। সংক্ষেপে বলল কুসুম তার কাহিনি। খুব নিঃস্পৃহ ছিল সেই বলার ভঙ্গি। ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠল দারোগা অবিনাশ প্রধান। এমনিতে সাহসি, বেপরোয়া, দক্ষএমন সব বিশেষণ তার ক্ষেত্রে কখনও প্রয়োগ হয় না। কালকেই কোর্টে চালান করতে হবে মেয়েটাকে। রুটিনমাফিক রিপোর্টও তাকে কোর্টে দাখিল করতে হবে।

 

মেলা অফিসে ঢুকতেই অনুজ দেখলেন যুবক বিডিও, ম্যাজিস্ট্রেটদের মধ্যমণি হয়ে বসে রয়েছেন রাহুল মজুমদার সাহেব। উনি যখন মহকুমা শাসক, তখনই এই দ্বীপাঞ্চলে নতুন এসেছিলেন অনুজ। কয়েকমাস ওঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সাহিত্যরসিক, মজাদার কিন্তু একইসঙ্গে খুব কাজের মানুষ। অনুজ ঢুকতেই বললেন, সুন, বিডিও সাহেব। কেমন লাগছে দখিনা বাতাস আর দখিনের মানুষ?

ম্লান হাসলেন অনুজ। যে মেয়েটি স্বামীকে খুন করেছে লট এইটে, মেলার শুরুতে সে এসেছিল স্বামীকে নিয়ে সাগরপাড়ি দেওয়ার পাস নিতে। কয়েকবার অফিসেও এসেছে। সলজ্জ ভঙ্গিতে অনুজের কাছে সরকারি জিআর যাকে বলে রিলিফ প্রার্থনা করেছে। অনেকে অবশ্য বলত মুখরা। কিন্তু এইভাবে খুন করা! বারবার মনে পড়ছে অনুজের আর তখনই মনে হচ্ছে হাইকোর্টের সেই বিখ্যাত বাবুর উক্তি, দখিনা হাওয়া ভালো কিন্তু দখিনের মানুষ ভালো নয়। 

রাহুল সাহেব অনুজের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন, বিডিও সাহেব, এই চাকরিটা হচ্ছে একটা অতিকায় পাইথন। আর আমরা সব হরিণ শাবক। ধীরে ধীরে গিলে ফেলছে আমাদের। বেরুনোর কোনো উপায় নেই। 

অনুজ বললেন, কিন্তু স্যার, এই আমলাগাছিতে আমি তো বুড়ো শালিখ। উড়ে পালিয়ে যাওয়ার মন্ত্র জানি

হ্যাঁ, সাহেব, ওটা থাকা ভাল। জীবনের রস সেরকমটা হলে কখনও শুকিয়ে যাবে না। রাহুল সাহেব আবার বললেন, চাকরি ছাড়া অবসর সময়ে কী করেন? অবশ্য এই চাকরিতে অবসর নেই

ময় পেলে সামান্য ফুলের বাগান করি। ফ্লাক্স ডায়ান্থাসের চাড়া জোগাড় করেছি

বাপ রে! সে তো পাহাড়ি দেশে পাওয়া যায়

অনুজ হাসলেন, তারপর বললেন, স্যা, দার্জিলিং থেকে আনিয়েছি

খানকার ক্লাইমেটে বাঁচাতে পারবেন?

চেষ্টা করছি, স্যার

রাহুল সাহেব এবার নিজের গল্পে এলেন। একবার তরুণ আধিকারিকদের দিকে তাকিয়ে নিলেন। সকলেই খুব উৎসুক শুনতে। এতক্ষণ অনুজের আলাপপর্বে রসভঙ্গ হয়েছিল।

মি তখন লালগড়ে। সল্টলেক থেকে লালগড়, অবস্থা যে বেশ করুণ তা তো বুঝতেই পারছেন

বাইরের থেকে কয়েকটা ঝরা পাতা উড়ে এসে ক্যাম্পের টেবিলে পড়ল। কফি, স্ন্যাক্স চলে এসেছে। ইরিগেশনের ইঞ্জিনিয়ার কৌশিকবাবুর ব্যবস্থাপনায় আড্ডা চলছে।

লালগড়ে আমার সময় কী করে কাটত জানেন

টেবিলটা সুন্দর করে সাজানো। ফুলদানি, একটা ইউরোপীয় রেনেসাঁর তৈলচিত্রের প্রিন্ট আর কয়েকটা মার্বেল পাথর অবিন্যস্ত সৌন্দর্যে সাজানো রয়েছে। পরিচ্ছন্ন পর্দাও লাগানো রয়েছে। হাওয়ায় পর্দাগুলি দুলছিল আর ভেসে আসছিল চমৎকার ফুলের সুবাস। 

অনুজ কৌশিকবাবুকে জিগ্যেস না করে পারলেন না, ছাতিম ফুলের গন্ধ মনে হচ্ছে? কিন্তু ছাতিম গাছে ফুল আসে তো বর্ষার সময়!

এই সময় কৌশিকবাবুর অ্যাসিস্ট্যান্ট নির্মলবাবু এগিয়ে এলেন।

ই ছাতিম গাছটায় সারা বছর ফুল আসে আর এরকম চমৎকার গন্ধ পাওয়া যায়

জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ছাতিম গাছটা। অকালেও সাদা ফুলে ছেয়ে রয়েছে।

রাহুল সাহেব মন্তব্য করলেন, প্রকৃতির অনেক কিছুই আনপ্রেডিক্টটেবল

এই সময়ে আরও একজন তরুণ আধিকারিক, যিনি রাহুল সাহেবের গল্প শোনার জন্য অস্থির হয়ে রয়েছেন, বললেন, লালগড়, স্যার

কফিতে চুমুক দিলেন, কয়েকটা কাজুও তুলে নিলেন। লালগড়ে অবসর সময়ে যাত্রা দেখতাম। যেতাম বলে সব জায়গায় প্রধান অতিথি

একজন টিপ্পনি কেটে বললেন, ভালোই লাগত, বলুন, স্যার?

ভালো-মন্দের ব্যাপার নয়। ওটাই ছিল একমাত্র বিনোদন। অনেক সময় ঝড়-বৃষ্টিতে যাত্রা বন্ধ হয়ে যেত। তখন তো করুণ অবস্থা

তার মানে, স্যার? অনুজ বললেন।

রের দিন সেই বন্ধ হওয়া যাত্রা আবার প্রথম থেকে শুরু হবে। বিডিও প্রধান অতিথি

সকলেই হাসতে থাকলেন। রাহুল সাহেবও মুচকি মুচকি হাসছেন। অনুরোধ করতে হল না, নিজেই শুরু করলেন, মার অফিসের বড়োবাবু ছিলেন একজন যাত্রাশিল্পী। ওঁর কথাবার্তায় সেই রাজকীয় সুর সবসময় থাকত। একবার অডিট চলছে কিন্তু বড়োবাবুর মন উড়ু উড়ু। কিছু যেন বলতে চান

এই সময়ে দমকা বাতাস এসে অস্থায়ী তাঁবু কিছুটা এলোমেলো করে গেল। আলো বেশ নিস্তেজ হয়ে এসেছিল। গা-সওয়া শীতের ভাব ছিল, দমকা হাওয়ায় সামান্য হলেও শীতের প্রকোপ বেড়ে গেল। গঙ্গাসাগরের সঙ্গে কলকাতা বা তার পার্শ্ববর্তী হুগলির মতন জেলার জলবায়ুর এক বিশেষ পার্থক্য আছে। গঙ্গাসাগরের মেলার সময় থেকে বসন্তের আবহাওয়া চলে আসে। মকর সংক্রান্তির ভোরে অবশ্য বেশ ঠাণ্ডা  এবং গাঢ় কুয়াশা থাকে। কিন্তু তারপর মূল পর্ব মিটে গিয়ে যখন ভাটার পর্ব আসে শীত কেটে গিয়ে বসন্ত ক্রমশ বিরাজমান হতে থাকে।

কৌশিকবাবু মজুমদার সাহেবকে বললেন, স্যা, লিকার চা খাবেন? দার্জিলিং থেকে কেনা। 

গল্পের তোড়ে রয়েছেন রাহুল সাহেব। অন্য সময় হলে এই দার্জিলিং টি নিয়েও মজার কিছু বলতেন।

ড়োবাবুর উচাটন মন লক্ষ করে আমি বললাম, কনফিডেনশিয়াল কোনো কথা আছেবড়োবাবু তখন ফিসফিস করে বললেন, স্যার, ফ্যামিলি এসেছে বলে আমি অফিসের কাজে ডুবে গেলাম

রাহুল সাহেব আরও কয়েকটা কাজু নিলেন। তারপর বললেন, ড়োবাবুর কাজে মন নেই। উচাটন ভাবটা বিকেলের দিকে আরও বেড়ে গেল। অফিস থেকে বেরুবার জন্য বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। শেষমেশ আমিই বললাম, অডিটরদের বলে আপনি চলে যান। ফ্যামিলি যখন এসেছে তাড়াতাড়ি চলে যান। 

স্যার, আপনি যাবেন না? আপনাকে নিয়ে যাব বলেই তো অপেক্ষা করছি

রাহুল সাহেব বলে চললেন, মি বড়োবাবুর কথায় খুব বিরক্ত হলাম। ওঁর ফ্যামিলি আসবে তো আমার কী! তখন সরকারি অফিসে কম্পিউটার সবে ঢুকেছে। আমাদের হাতেখড়ি পর্ব চলছে। পলাশ বলে স্থানীয় একটি ছেলেকে রেখেছিলাম। সে কম্পিউটারের কাজ করত। সেই পলাশই বড়োবাবুর কথার ধাঁধাঁর জট খুলল।

স্যার, বড়োবাবু অন্য কথা বলছেন

কী?

সেই সময় বিডিওদের ঘাড়ে এতো প্রকল্প ছিল না। সন্ধের পর খানিকটা খোশগল্প করা যেত।

স্যার, বড়োবাবু যাত্রাপালার ভাড়া করা ফিমেলদের কথা বলছেনআজ শেষ রিহার্সাল

রাহুল মজুমদারের উপস্থাপনার গুণে সকলেই হাসিতে ফেটে পড়লেন। 

(ক্রমশ…)

 
 
top