ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

অর্কদীপ্ত ভেনেজুয়েলায় ঢোকার আগে বাবাকে আরেকবার মেসেজ করল।

দিল্লিতে চিত্তরঞ্জন পার্কে যে ঘরটায় ছিলাম সেটা অনেকটা আমাদের চুঁচুড়ার চার্চ লেনের মতন। দিল্লিতে চিত্তরঞ্জন পার্ককেই বাঙালী টোলা বলে। আমি উঠেছিলাম কালী মন্দিরের ধর্মশালায়। তোমাকে বললে হয়ত বঙ্গ ভবনে থাকতে পারতাম। কিন্তু ইচ্ছে করেই নিজেকে কষ্ট দিলাম। আমার একটাই স্বপ্ন ছিল জীবনে—বিশ্বভ্রমণ। মধ্যবিত্ত বাঙালী স্বপ্ন দেখে কিন্তু স্থির লক্ষ না থাকায় সে ছুঁতে পারে না। ফলে ডিপ্রেশন। উচ্চবিত্তরা তেমন স্বপ্ন দেখে না বা ওদের স্বপ্ন অনেকটাই আলাদা। ফলে ওদের স্বপ্ন বা লক্ষ, কোনোটাই আমাদের কাছে পৌঁছায় না। নিম্নবিত্ত স্বপ্ন দেখে না কারণ প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রামে সে রাশিকৃত সাদা, গরম ভাত বা রুটি ছাড়া অন্য কিছু দেখতে পায় না। বাবা, আমি স্বপ্ন দেখতাম সমস্ত পৃথিবী ঘুরে বেড়াব। তোমরা বলতে, আগে চাকরি কর তারপর ওসব হবে। মুমু মারা গেল। যদি বেঁচেও থাকত, আমার লক্ষ বদলাত না। পৃথিবীকে দেখার লক্ষে আমার প্রথম পছন্দ ছিল লাতিন আমেরিকা—পাবলো নেরুদার দেশ, মার্কেজের দেশ। শুধু নেরুদা বা মার্কেজ কেন, ফুটবল শিল্পীদের দেশ। ওদের সিনেমার কথা এখনও আমি জানি না। তবে জানব। মুমু আর মাই মিলে একবার ভেবেছিলাম যদি আমরা কোনোদিন অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের অলৌকিক জলজান নিয়ে সিনেমা করি তবে বনি হবে লাতিন আমেরিকার কোন মেয়ে। তোমাকে তো আসল কথাটা জানাতে ভুলে গেলাম। একটা কালো সাদা রঙের পাখির কথা। দিল্লিতে চিত্তরঞ্জন পার্কে যে ঘরটায় আমি থাকতাম তাঁর জানলার ধারে ছিল একটা জামরুল গাছ। বিকেলের আলো ফুরিয়ে এলে, সেই জামরুল গাছে সেই কালো সাদা রঙের পাখিটা আসত। আসলে ওর লেজটা ছিল সাদা। পাখিটার নাম আমি জানি না। খুব সুন্দর গলা ওর। কখনও মনে হবে যেন পিয়ানোর রিডে অনেকগুলো সুর বেজে উঠল একই সঙ্গে। তখন কিন্তু ও আসত না। অন্ধকার গাঢ় হলে আমার বিছানার জানালার রডে এসে বসত। ঘুমঘুম চোখে মনে হত ও যেন আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। চোখ খুললেই উড়ে যাবে। আমি অনেক সময় মটকা মেরে পড়ে থাকতাম। মনে হত এই বুঝি ও এসেছে। প্রত্যেকবারই মিলে যেত। বিকেলটা ছিল ওর আড্ডা মারার কাল। আর রাতে আমি ঘুমিয়ে পড়লে, আমাকে দেখত লুকিয়ে লুকিয়ে। চোখ খুললেই উড়ে যেত দুষ্টু পাখি।এবার ভেনেজুয়েলা খুলে বসেছি। বৃষ্টি হচ্ছিল বাইরে। সঙ্গে পুবের হাওয়া। যত ওপরে ওঠা যায়, হাওয়ার বেগ বাড়তে থাকে। জীবন অনেক রহস্যই খোলে না। সাদা কালো সেই পাখিটার মত উড়ে যায়, পালিয়ে যায়।

 

বড়বাবুর হুকুম না মেনে অনাথবন্ধু ভাণ্ডারী গভীর রাতে কুসুমের লক আপে আসলেন। মোটা কম্বল দেওয়া হয়েছে। পরিচ্ছন্ন কুঁজো। অনাথবন্ধু বরাবরই কঙ্কেশন আদায় করতে দক্ষ। ওঁর মনে যে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে তা কিছুতেই যাচ্ছে না। একমাত্র কুসুমের স্বীকারোক্তি ছাড়া খুনের পক্ষে কোন প্রমাণ নেই। যে অস্ত্র দিয়ে খুন হয়েছে, তার ফিঙ্গার প্রিন্ট একটা ঝাপসা তথ্য দিচ্ছে যার থেকে কুসুম যে খুন করেছে এমন অকাট্য প্রমাণ উঠে আসছে না। কুসুম কাউকে বাঁচাতে চাইছে এবং সে ওই বাউল ছোকরাটা—সন্দেহের কাল কেউটে আবার ছোবল মারছে অনাথবন্ধু ভাণ্ডারীকে।

তাঁকে দেখে কুসুম তেমন কিছু বিচলিত হল না। বরং অবাক হলেন তিনিই। তবে ছোবলটা মারার জন্য তিনি আর কোন ভণিতা করলেন না।

খুনটা কে করেছিল কুসুম রানি?

মি খুব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর এল।

তুই করস নাই গর্জে উঠলেন অনাথবন্ধু ভাণ্ডারী।

মার পাপের বোঝ অন্যেরে দুমু ক্যান?

রছে ওই বাউল ছোঁড়া। তোর সঙ্গে আশনাই আছিল ওর। খুনটা ওই করছে

মিছা কথা। পিরিতি থাকিলে কুসুম পাপ গোপন করত না

তোর ফাঁসি হতে পারে। এ জীবন বড় মধুর রে কুসুম। বাউলটার কারণে নিজের যৌবন নষ্ট করিস না

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য।)

 
 
top