ভগৎ-এর ‘ভূত’

 

প্রথম পর্ব

A spectre is haunting the ruling classes …

সাল ২০১৫মাস অক্টোবরআমার বয়েস সাড়ে চোদ্দঠিক তখনই আমার হাতে একটা চটি বই এসে পৌঁছলোবইটার নাম যতটা না খেয়াল করলাম, তার থেকেও বেশি খেয়াল করলাম লেখকের নামটাবইটা হলো হোয়াই আই অ্যাম অ্যান এথেইস্ট, লেখকের নাম লেখা ছিল শহীদ-এ আজম ভগৎ সিংএই নামটার সঙ্গে আগেই খানিকটা পরিচিতি ছিল, যেমনটা ছিল সূর্য সেন আর ক্ষুদিরামের নামের সঙ্গে, তবে লোকটা যে আসলে কে ছিল, আসলে সে কী ভাবতো বা আদতে সে কী করেছিল, সে বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান আমার একেবারেই ছিল নাবিপ্লবী আন্দোলনের ব্যাপারে কোনওদিনই আমি খুব একটা উৎসাহিত ছিলাম নাতবে যে সময়টাতে বইটা হাতে পাই, সেই সময়টাতে সবেসবে আমার মনের মধ্যে একটা বিপ্লব ঘটে গেসলো। দ্য কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো

রিয়াজিনভের ভূমিকা সহ গোটা ম্যানিফেস্টোটা পড়ে ফেললামআগে এই বইটার কথা অনেকের মুখে অনেকবার শুনেছি, ব্যাপার হলো যে আগে আমি বইটা পড়বার চেষ্টাও করেছি, কিন্তু পারিনিকারণ আমার সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি ইত্যাদি একেবারেই ভাল লাগত না। তারওপর পারিপার্শ্বিক পরিবেশে মার্কসের নামে যা বদনাম, নিন্দে এবং গালিগালাজ শুনেছি, যে আমার মনেও একটা সামান্য বিতৃষ্ণা জন্ম নিয়েছিলতবে মনের মধ্যে খানিকটা জমা কৌতুহল হয়তো ছিলইএই কৌতুহলটাকেই চাগাড় দিয়ে তোলে আমার এনসিইআরটি-র ক্লাস নাইনের ইতিহাসের পাঠ্যবইসেখানে সমাজবাদী চিন্তার বিবর্তন নিয়ে চ্যাপ্টারটায় মার্কস এবং এঙ্গেলসকে নিয়ে একটা ছোট্ট অংশ ছিল সেখান থেকেই আমি ওঁদের সম্বন্ধে প্রথম ধারণা তৈরি করতে শুরু করিএরপরে ম্যানিফেস্টো পড়ি এবং মাথার মধ্যে কয়েকটা বিষয় সারাক্ষন ঘুরপাক খেতে শুরু করেমনে হতে শুরু করে যে এইরকম একটা পথে না গিয়ে কোনো উপায় নেই! (যদিও জানি আমার সঙ্গে পুঁজির হাওয়ায় ভেসে যাওয়া মানুষেরা একমত হবেন না)

বইটা (হোয়াই আই অ্যাম অ্যান এথেইস্ট)আমি প্রায় এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলিনাস্তিক্যের ডিফেন্সে ভগৎ সিংয়ের যুক্তিগুলো বেশ প্রভাবিত করে আমার নাস্তিক সত্তাকে। নাস্তিক সত্তা? হ্যাঁ, তখন আমি অলরেডি নাস্তিক/নিরীশ্বরবাদী হয়ে গেছি বার্ট্রান্ড রাসেল এবং স্টিফেন হকিংয়ের সাহায্যেভগৎ সিংয়ের গায়ে কাঁটা দেওয়া কথাগুলো আমার মনকে অনেক শক্তিপ্রদান করলো। তবে তখনো কিন্তু আমার ভগৎ সিংয়ের কাজকর্ম সম্পর্কে তেমন কোনো জ্ঞানই ছিল না।

একবার পড়বার পর বইটাকে আমি সোজা তাকে তুলে রেখে দিএর বেশ কিছুদিন পরে, আমি রং দে বাসন্তী নামের একটি ছবি দেখিতখন আমার মনের মধ্যে গভীরভাবে হন্ট করছে কম্যুনিজমের ভূততাই একটা এইরকম ধরণের নামওলা হিন্দি সিনেমা দেখবার আমার তেমন ইচ্ছা হয়নিতবুও পুরোটা দেখলাম এবং চমকে গেলামভগৎ সিং এবং তার সঙ্গীসাথীরা পুরো সিনেমাটিতে বিচরণ করে বেরিয়েছে! শুধু তাই নয়, সিনেমার প্রথম দৃশ্যে মৃত্যুর পূর্বে ভগৎ সিংয়ের হাতে লেনিনের বইয়ের দৃশ্যটা দেখে আমি নড়েচড়ে বসিঠিক এখান থেকেই আমার মনে ভগৎ সিংয়ের ভূত ‘হন্টকরা শুরু করে এবং সে ভূত আমার মনে আজো গেঁড়ে বসে রয়েছে, আর তাতে আমি সত্যি খুব খুশি! ওনার মতো একজন এতো অল্পবয়সী যুবক যে কোনোদিন এই ভারতে জন্ম নিয়ে এতো কিছু করে গেছেন, এতো কিছু ভেবে গেছেন, এবং এতো কিছু প্রেডিক্ট করে গেছেন,তা ভাবলেও আশ্চর্য হতে হয়

এরপরে আরেকটা সিনেমা খুঁজে বের করে দেখতে শুরু করিএই সিনেমাটি আরও বিখ্যাতভগৎ সিংয়ের জীবন ও ভাবনার উপরে তৈরী ছবিদ্য লেজেন্ড অব ভগৎ সিং এবং দেখে একেবারে হতচকিত হয়ে যাইহয়ে যাই ভগৎ সিংয়ের পাগল ভক্তমনে পড়ে যায় মাস দেড়েক আগে পড়ে ফেলা হোয়াই আই অ্যাম অ্যান এথেইস্ট বইটার কথাআর তৎক্ষণাৎ উপরে উঠে এসে তাক থেকে বইটাকে আবারো খুঁজে বের করি। ইন্ট্রোডাকশনটা পড়তে শুরু করিলেখকের নাম বিপান চন্দ্রএখন এই মার্কসবাদী ঐতিহাসিক সম্বন্ধে নাহয় অনেক কিছু জানি, তখন তেমন কিছুই জানতাম না। ‘ইন্ট্রোডাকশন’-এ বিপান চন্দ্র সোজাসুজি এক অনন্য ভগৎ সিংকে হাজির করেনমার্কসবাদী বিপ্লবীআদ্যন্ত নাস্তিকপ্রচুর পড়তো সে

এরপরে দেখি ওই ছোট্ট বইটাতে ‘হোয়াই আই অ্যাম অ্যান এথেইস্ট’ ছাড়াও শহীদ--আজমের আরো একটা লেখা রয়েছেসেটার নাম ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য ড্রিমল্যান্ড এই লেখাটা সত্যিই আপ্লুত হয়ে পড়ে ফেলিলেখাটি আজ আমার কাছে ভগৎ সিংয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজকারণ এই লেখাটায় তাঁর যুদ্ধ, জেলখানা, শাস্তি, বড়োলোক-গরিব ইত্যাদির নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা আছেভবিষ্যৎ সমাজে এইসব প্রতিষ্ঠান এবং শ্রেণির কী দশা হবে, তা নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেনআলোচনাটা উপভোগযোগ্য এবং আজকের সামাজিক, অর্থনৈতিক জীবনে সমানভাবে প্রযোজ্য। (আশ্চর্য্য ব্যাপার, বহু পরে এইসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন মিশেল ফুকো।) এরপর থেকেই আমি ভগৎ সিংয়ের কথা সবাই বলবার প্রয়োজনটা হাড়েহাড়ে বোধ করতে শুরু করিমানে এক ধরণের অ্যাজিটপ্রপ শুরু করি

কে ছিল এই ভগৎ সিং এবং আজ তাঁর কি প্রয়োজন? কী ছিল তাঁর মতাদর্শ? তিনি লড়েছিলেন এবং মারা গেছিলেন কিসের জন্যবলা হয়ে থাকে যে: ‘Gandhi was the sun of nationalism around which all the planets of the Indian National Congress revolved, Bhagat Singh was a star that pursued an orbit of its own।’ অর্থাৎ কিনা গান্ধী হলেন জাতীয়তাবাদের সূর্য যাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সব গ্রহগুলো ঘুরপাক খেতআর ভগৎ সিং হলেন একটা তারাযিনি কিনা নিজস্ব একটা কক্ষপথ ধরে ঘুরতেন

ভগৎ সিং শহীদ হন মাত্র ২৩ বছর ৬ মাস বয়সেতাঁর সাহস, তাঁর আত্মবিশ্বাস, স্বাধীনতার প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতি, আদর্শগত দৃষ্টিকোণ এবং তাঁর মতো লড়াই করবার দুর্জয় শক্তি কত জনের ছিল ভারতবর্ষের দীর্ঘ স্বাধীনতা যুদ্ধে? তাই তো তিনি শুধু শহীদ নন, বরং তিনি শহীদ--আজম‘, অর্থাৎ, যিনি শহীদেরও শহীদ, অর্থাৎ তিনি হলেন শহীদের রাজা। এরকম একটা মানুষের সম্বন্ধে জানবার বাসনা থাকা খুবই স্বাভাবিকজীবনের এতো অল্প সময়ে, এতো ভয়ঙ্কর সব পরিস্থিতির মধ্যে, তিনি এতো সব কী করে অর্জন করলেন, যার জন্য, আজ ২০১৬ সালে বসে, তাঁর কথা বারংবার মনে পরে?

একবার ভগৎ সিংয়ের ছোট ভাই, কুলবির সিংয়ের নাতি অকালপ্রয়াত অভিতেজ ব্যক্তিগত আলাপে আমাকে বলেছিলেন, Shaheed-e-azam’s ideology and spirit are now more relevant than ever. In times when everyone is trying to paint Bhagat Singh with their own brush, it is very important for the true Bhagat Singh to be understood.’ অর্থাৎ যখন যে যার ইচ্ছে মতো ভগৎ সিংকে যথাযথ করে নিতে চাইছে, তখন সত্যিকারের ভগৎ সিংকে জানবার প্রয়োজনটা জরুরি হয়ে ওঠেএটা অবশ্যই একটা কারণ। কিছু উগ্র-জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিবাদী ডানপন্থী শক্তি তাঁকে বানিয়ে ফেলছে হিন্দুত্ববাদী, নয়তো তাঁকে বাজারে বিক্রি করবার পণ্য বানিয়ে ফেলা হচ্ছে! তাঁর ছবি ছাপা থাকছে টি-শার্ট, মাউসপ্যাড, এমনকি চায়ের কাপেও

তবে সত্যিকারের ভগৎ সিং ঠিক কীরকম ছিলেন? আর তাঁকে নিয়ে হটাৎ দেশজুড়ে এতো লাফালাফি কিসের? সত্যিকারের ভগৎ সিং সম্পর্কে দেশের অধিকাংশ মানুষ, এমনকি তাবড় তাবড় জ্ঞানীগুণীরাওপ্রায় কিছুই জানেন নাঅধিকাংশের কাছে তিনি শুধুমাত্র একজন ‘দেশপ্রেমিক, ‘শহীদ, ‘বিপ্লবী, যে কিনা হিংসায়বিশ্বাস করত আর ‘দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছিলো ব্যাস ওই টুকুই! কজন আর জানে তাঁর প্রকৃত আদর্শ? কতজন জানে তিনি ঠিক কী চেয়েছিলেন? কতজন জানে যে তিনি আদৌ তথাকথিত ও প্রচলিত হিংসায় একেবারেই বিশ্বাস করতেন না? কতজন আর জানে যে তিনি নেতিকৃত করেছিলেন ভূত-ভগবান, স্বর্গ-নরক ইত্যাদির অস্তিত্ব? কতজন আর জানে যে তিনি ছিলেন ভীষণ খোলা মনের এবং সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিওয়ালা মানুষ? কতজন আর জানে তিনি কিরকম একটা সমাজের জন্য তাঁর লড়াইটা চালিয়েছিলেন?

এইসব কথা নিয়েই আমরা আমাদের আলোচনা চালিয়ে যাবোদেখাতে চেষ্টা করবো ভগৎ সিংয়ের মূল ভাবনাগুলিকে, দেখাতে চাইবো তিনি ঠিক কী চেয়েছিলেন এবং তা কেন চেয়েছিলেন

তবে এখন যেটা বলা প্রয়োজন, সেটা হলো যে আজকের দিনে এই বিপ্লবী শহীদের প্রাসঙ্গীকতাটা ঠিক কোথায়?

এখনকার ভারতবর্ষের অবস্থার দিকে একবার তাকানো যাককী দেখতে পাচ্ছি? ক্ষমতায় বসে থাকা আয়েশি ও পরজীবী সংখ্যালঘুর দ্বারা খেটে খাওয়া সংখাগরিষ্ঠর শোষণ, দমন, নিপীড়নব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা পোষিত কাঠামোটিও ছিল অনেকটা এরকমতাই জন্যই তো এই শাসক শ্রেণির সন্ত্রাসের কারণে এত মৃত্যু, এত অত্যাচার দেখে ভারতবর্ষের ইতিহাসের ভয়াবহ সময়টির কথা আবারো মনে পরে যায়সময়টা হলো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির কবলে পড়ে থাকা ভারতবর্ষমনে হয় না কি যে যেন আমরা আবার সেরকমই একটা সময়ে টিঁকে রয়েছি? ভগৎ সিং ঠিক একারণেই আবার ফিরে এসেছেনকারণ আজ যারা ক্ষমতায় রয়েছে, তারা যেভাবে ফ্যাসিবাদ, ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার মাধ্যমে খেটে খাওয়া মানুষের উপর শাসন/শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে মনে হয় যেন এরা নতুন লর্ড আরউইন, নতুন জেনারেল ডায়ার, নতুন লর্ড রিডিং!

ভগৎ সিং ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান দুটি স্রোতের একটির অন্যতম একজন প্রতিনিধিএই দুটির প্রথমটি হলো গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের আন্দোলন এবং দ্বিতীয়টি হলো ভগৎ সিং, সুভাষচন্দ্র বসু, পেরিয়ার এবং ড. আম্বেদকারদের পরিবর্তনকামী আন্দোলনআরেকটি স্রোত যদিও উপস্থিত ছিল, তবে তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা এবং অবদান নেই, বরং এই স্রোতটিকে প্রখ্যাত ভগৎ সিং বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক চমন লালের ভাষায় স্বাধীনতা আন্দোলন-বিরুদ্ধ বা অ্যান্টি ফ্রিডম মুভমেন্টবলে ডাকাই সবথেকে শ্রেয়স্রোতটির অন্যতম প্রতিনিধিরা হলো আরএসএস এবং মুসলিম লিগ জাতীয় সাম্প্রদায়িক শক্তিএরা ভারতবর্ষের অনেক ক্ষতি করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে

আমি কেন ভগৎ সিং, সুভাষচন্দ্র, আম্বেদকর, পেরিয়ারদের আলাদা করলাম? কারণ এঁরা তাঁদের পুরো জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছিলেন শোষক ব্যবস্থাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করেকংগ্রেসের আন্দোলনশেষবধি সাদা সাহেবদের গদি থেকে সরিয়ে কালো সাহেবদের গদিতে বসিয়ে দিল, তাতে ভারতবর্ষের হাজার হাজার শ্রমিক, কৃষক এবং অন্যান্য খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে কোনোরকম পরিবর্তনই এলোনা! তাঁদের অবস্থা ঠিক যেমনটি ছিল, তেমনটিই রয়ে গেলো উলটে আরো খারাপ হতে থাকলঠিক এই কারণেই ভগৎ সিং এবং তাঁর সাথীদের লড়াই এখন চলছে এবং চলবেবিপ্লবীদের কাজকর্মে হয়তো অনেক ভুলচুক থেকে থাকতে পারে, কিন্তু সেসব থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং লড়াইটাকে আর শক্তিশালী করে তুলতে হবে

তাই এখন, ভারতবর্ষের এই ভয়ঙ্কর অবস্থায় ভগৎ সিং, সুভাষচন্দ্র বসুদের মতন বিপ্লবীরা বারংবার ফিরে আসেন (শারীরিক বা -শারীরিকভাবে নয়, আদর্শগত দিক থেকে)তাঁরা ফিরে আসেন শোষক ও নিপীড়ক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইটা চালিয়ে যেতে, তাঁরা ফিরে আসেন একটা সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করবার আখাঙ্খা নিয়ে

সমাজতান্ত্রিক সমাজ? অনেকেই হয়তো বলবেন, সেটা আবার কী? তাহলে একটু খোলসা করেই বলিএরকম একটা সমাজ গড়ে তোলবার জন্য আমাদের দরকার একটা অস্ত্রকেঅনেকে হয়তো অস্ত্রটির নাম শুনে নাক সিঁটকোবেনএই অস্ত্র হল মার্কসবাদ। কিন্তু মনে রাখতে হবে মার্কসবাদই এখন একমাত্র বেরোবার পথকারণ মার্কসবাদ লড়াই করে সমস্ত খেটে খাওয়া মানুষের মুক্তির জন্যমার্কসবাদ লড়াই করে সেই সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলবার জন্য, যেখানে থাকবে না কোনও রকম শোষণ, শাসন, নিপীড়নযেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধে, কোন বিশেষ শ্রেণির জন্য আলাদা করে কোনো সুযোগ-সুবিধে নেই, কারণ সে সমাজে না আছে রাষ্ট্র, না আছে শ্রেণিবিভেদ! সেরকম একটা সমাজে মানুষের জন্য দরকারি সমস্ত সম্পদ সমানভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভাগ-বাটোয়ারা করা থাকবে, যাতে সবাই তাদের দরকারমতো জরুরি সবকিছু পেতে পারেসেখানে সবাই কাজ করবে, কেউ হাত-পা-যন্ত্রপাতির সাহায্যে, আবার কেউ মস্তিষ্কের সাহায্যে তাদের মধ্যে থাকবে না কোন তফাৎ! কিন্তু সেখানে কেউ বসে বসে ভোগকরবে না, অন্যের শ্রম চুরি করে বেঁচে থাকবে নাএমন এক সমাজ যেখানে শ্রমশক্তির কেনা-বেচা হবে নাসেই সমাজটা হবে সবার: সমস্ত মানুষ, না-মানুষ, ফুল-ফল-গাছপালার

ভগৎ সিং এবং তাঁর সঙ্গীসাথীরাও ঠিক এরকমই একটা সমাজের কল্পনা করেছিলেনযে সমাজে কিছু মানুষ (সংখ্যালঘু) অনেক মানুষের (সংখ্যাগরিষ্ঠ) উদ্ভৃত্ব শ্রমের উপর কোনো কাজ না করেই বসে বসে খায়, সেই পুঁজিবাদী সমাজটাকে ধ্বংস করবার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লড়াই চালিয়েছিলেন তাঁরাযে সমাজে পুঁজি থাকে ওই সংখ্যালঘুর হাতে, সেই সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছিলেন তাঁরা

ভগৎ সিংয়ের ও তাঁর সাথীদের লড়াই তাই আজ চলছেআমেরিকা নামের ওই ভয়ানক নয়া-সাম্রাজ্যবাদী (পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বিকাশ!) শক্তির সারা পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবিস্তার; ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ এবং ডাব্লুটিও নামের তিনটে ভয়ঙ্কর পুঁজিবাদী কেন্দ্র আজ যেভাবে দরকারমতো নিয়ম তৈরি করছে, আবার দরকারমতো নিয়ম ভেঙে ফেলছে আর যেভাবে তারা গোটা পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তাতে ভগৎ সিং, চে গাভেরার মতন মানুষেরা আবারো আমাদের মনের মধ্যে ফিরে আসেন

ভগৎ সিং একবার বলেছিলেন, ব্যক্তিকে খতম করা যায়, তার আদর্শ কে খতম করা যায় নাবা মৃত্যুর পূর্বে চে গাভেরার কথাগুলোগুলি চালাও, ভীতুরামতুমি তো শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিকে মারতে পারবে!‘ কিন্তু তাঁর আদর্শ কে নয়! এই বাক্যগুলোই এখন শুধু আমাদের কানে যেন বেজে বেজে ওঠে, আর প্রতিবার আমাদের বলে ওঠে: শোষণ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও

তাই ঠিক আবারও, এইরকম একটা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের নতুন সমাজের জন্য লড়াই করা ছাড়া কোনো উপায় নেইগ্রামসি যেমন বলেছিলেন, পুরোনো মরছে আর নতুন কিছুও জন্মাতে পারছেনা‘ এখন ঠিক এরকমই একটা সময়

ভগৎ সিং এমন একজন মানুষ, যিনি ভারতবর্ষের বিপ্লবী আন্দোলনে মার্কসবাদী পথে সমাজতান্ত্রিক লড়াইয়ের দৃষ্টান্ত তৈ্রি করে দিয়ে যানপুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদের বর্বর রূপটাকে আমাদের সকলের, বিশেষত ভারতবর্ষের মানুষের সামনে নগ্ন করে দিয়ে যান তিনি

তবে ভগৎ সিং ঠিক কিভাবে এই বর্বরতাটাকে আমাদের সকলের সামনে নগ্ন রূপে হাজির করতে পারলেন? তিনি ঠিক কী করলেন এবং তা কী উদ্দেশ্য নিয়ে করলেন? কেনই বা তিনি অত কম বয়সে ফাঁসির মঞ্চে মৃত্যুবরণ করলেন?কী দরকার ছিল? তিনি তথাকথিত হিংসায় এবং অহিংসাতেও কেন বিশ্বাস করতেন না? কেনই বা তিনি হয়ে গেলেন নাস্তিক?

(ক্রমশ…)

 
 
top