ভগৎ-এর ‘ভূত’

 

দ্বিতীয় পর্ব

অ্যা স্পেক্টর ইজ হন্টিং দ্য রুলিং ক্লাসেস…1

১৯০৭পাঞ্জাবের অবস্থা তখন টালমাটাললর্ড কার্জনের কথা মতোন সবে সবে বাংলাকে করা হয়ে গেছে ভাগ, আবার তারওপর উদ্ভব হয়েছে নতুন আরেকটি নিয়মের: পাঞ্জাব কলোনাইজেশন অ্যাক্টএই নিন্দনীয় অ্যাক্টের মাধ্যমে পাঞ্জাবের ক্যানাল কলোনির কৃষকদের জমির অধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করে ফেলা হলো

পূর্ব পাঞ্জাবের বহু কৃষক পশ্চিম পাঞ্জাবের ক্যানাল কলোনিগুলোর (এখানে চাষের জমিতে নতুন তৈরী হওয়া খালের মাধ্যমে জলসেচের ব্যবস্থা ছিল) উর্বর জমিতে চাষ করবার আশায় নিজের ঘরদোর ছেড়ে এসে হাজির হয়েছেন এবং বসতি গড়েছেনজলন্ধরের খাটকার কালানে নিজের পৈতৃক ভিটে ছেড়ে পশ্চিম পাঞ্জাবে এসে থিতু হয়েছিলেন মহারাজা রঞ্জিত সিংয়ের সেনাপ্রধান সর্দার ফতে সিংয়ের নাতি সর্দার অর্জন সিংএই সর্দার অর্জন সিং ছিলেন একজন বড়োমাপের আর্য সমাজবাদী মানুষ এবং একজন মস্ত জমিদারবস্তাপচা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ‘ঐতিহ্য‘-এর নামে চলে আসা কুসংস্কার এবং জাতপাতের তৈরী করা বিভেদ নিয়ে তাঁর ছিল ঘোর আপত্তিএছাড়া তিনি ছিলেন কংগ্রেসের সদস্য.অর্জন সিংয়ের তিন পুত্র কিষান সিং, অজিত সিং এবং স্বর্ণ সিং

এই পাঞ্জাব কলোনাইজেশন অ্যাক্ট-এর বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠলো কৃষকেরাতাঁদের মুখে ফুটে উঠলো প্রতিবাদের ভাষা, বেজে উঠলো বঙ্কে দয়ালের লেখা পাগড়ি সম্ভাল যাট্টা সুর, যে সুর বলে উঠলো,ওহে কৃষক, ঘুরে দাঁড়াও, তোমার জমি তোমার কাছেই রেখে দাও, সেটাকে লুঠ হতে দিও না!

এই কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেন অর্জন সিংয়ের তিন ছেলেইঅজিত সিং লালা লাজপত রায় এবং সুফী অম্বা প্রসাদের সঙ্গে মিলে তৈরী করলেন ভারতমাতা সমাজ, যার প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে উঠলো কৃষক শ্রেণিকে শোষণ এবং নিপীড়ণের বন্ধন থেকে মুক্ত করা!

২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯০৭১০৫ নম্বর চক, বঙ্গা গ্রাম, লয়ালপুর জেলাব্রিটিশ বিরোধী কার্যলাপের কারণে জেলে বন্দি থাকা .কিষান সিং, অজিত সিং এবং স্বর্ণ সিংকে একসঙ্গে মুক্তি দেওয়া হলোআর ঘটনাক্রমে সেদিনকেই কিষান সিংয়ের স্ত্রী বিদ্যাবতীর কোলে জন্ম নেয় একটি ছেলেছেলেটির নাম দেওয়া হয় ভাগানওয়ালা, অর্থাৎ ভাগ্যবান‘, যেটা পরে ঘুরে ফিরে হয়ে ওঠে ভগৎ, ভগৎ সিং!7a0c0c83cc43ea37aac0374390866ac6

ছোটকাকা স্বর্ণ সিং জেলে থাকাকালীন টিউবারকুলোসিসে আক্রান্ত হন, আর তাই মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন বাদেই মাত্র ২৩ বছর বয়েসে তিনি মারা যানআরেক কাকা বিপ্লবী অজিত সিংকে ১৯০৯ সালে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়, ভগৎ সিংয়ের বয়েস তখন মাত্র

ছোটবেলা থেকেই ভগৎ চোখের সামনে দেখছিলেন সাম্রাজ্যবাদের কবলে তাঁর দেশটা কিভাবে শোষিত হয়ে চলেছে ক্রমাগতশোনা যায়, মাত্র বছর বয়েসে ভগৎ সিং নাকি একবার বিখ্যাত কংগ্রেস কর্মী মেহতা আনন্দ কিশোরকে বলেছিলেনমাঠে রাইফেল পুঁতে বিশাল এক রাইফেলগাছ তৈরী করে ব্রিটিশদের এই দেশ থেকে ভাগিয়ে দেব!

কিষান সিং, তাঁর বাবার মতোই, ছিলেন কংগ্রেসের সদস্যযদিও তাঁর বাড়িতে মহান বিপ্লবীদের আনাগোনা ছিল নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপারআসলে ভগৎ সিংয়ের বাবা অনেক দিন ধরেই নানান বিপ্লবী কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত, তাঁর তাই অগাধ অভিজ্ঞতাতিনি বিখ্যাত গদর পার্টিকে পয়সা দিয়ে সাহায্য করতেন এবং সমর্থনও করতেনভাই অজিত সিংও গদর পার্টির সাথে বেশ ভালোভাবেই যুক্ত ছিলেনবিখ্যাত গদর বিপ্লবী শহীদ কর্তার সিং সারাভার পদধূলিও বঙ্গে গ্রামের ১০৫ নম্বর চকে পড়েছিল, তখন ভগৎ সিং খুবই ছোট, কিন্তু পরে পূর্ণবিকশিত ভগৎ সিংয়ের জীবনের একমাত্র আদর্শ হয়ে ওঠেন তরুণ শহীদ কর্তার সিং সারাভা

১৯১৯ভগৎ সিংয়ের বয়েস ১২ঘটে যায় সেই ভয়ঙ্কর জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডস্কুল থেকে বাড়ি না ফিরে ছোট্ট ভগৎ পৌঁছে যান সেই জায়গায়একটা শিশিতে ভর্তি করে নিয়ে আসেন জালিয়ানওয়ালাবাগের রক্তমাখা মাটিপরে ভগৎ সিং বলেছিলেন যে, এই মাটিতে শিখ, হিন্দু, মুসলিম, সবার রক্ত মিশে আছে!

আবার যখন ১৪ বছরের ভগৎ সিং লাহোরের ড্যাভ হাই স্কুলের পড়ুয়া, তখন সে তাঁর দাদুকে এসে রেল কর্মচারীদের ধর্মঘটের তোড়জোড় সম্বন্ধে জানানআরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা, যা কিনা ভগৎ সিংয়ের মনে বেশ প্রভাব বিস্তার করেছিল, তা হলো ১৯২১ সালে ব্রিটিশদের থেকে সাহায্য নিয়ে যখন মহান্ত নারায়ন দাস একশ পঞ্চাশ জনের মতো নিরস্ত্র শিখকে হত্যা করে নানকানা সাহিবের গুরুদ্বারেএই জঘন্য ঘটনার প্রতিবাদে ভগৎ সিং অন্যদের মতন কালো পাগড়ি পরিধান করেনএই বিশেষ হত্যাকান্ডটি ঘটানোর কারণ খানিকটা ধর্মীয়, আবার অনেকটাই রাজনৈতিকএই মহান্ত নারায়ণ দাস ছিলেন এক ভীষণ দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষগুরু নানকদেবজির জন্মস্থানে প্রতিষ্ঠিত নানকানা সাহিবের গুরুদ্বারের চত্বর এবং তার সাথে লাগোয়া এক বিশাল জমি অসৎ এবং অনৈতিক কাজে অপব্যবহার করা শুরু করেছিল এই অসাধু মহান্তশিখেরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করবার কারণে মহান্ত নৃশংসভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটান গুলি-বন্দুক আর কেরোসিনের সাহায্যে! ধর্মের জিগির তুলে, ধর্মকে ব্যবহার করে এরকম ব্যবসা করবার মানসিকতা তাহলে বহুদিনের!

তো যাই হোক, সেই সময়ে ভগৎ সিং গুরুমুখী লিপি ভালোভাবেই শিখে ফেলেছিলেনআগেই বলেছি, ভগৎ সিংয়ের দাদু অর্জন সিং ছিলেন আর্যসমাজবাদি, আবার শিখও বটেনাতিকে সংস্কৃত ভাষাটি শেখাবার তাঁর তাই প্রবল ইচ্ছে ছিল, ভগৎ সিং শিখেওছিলেনএছাড়া ভগৎ সিং আয়ত্তে এনেছিলেন উর্দু, হিন্দি এবং অনেক কষ্টের পরে ইংরিজি ভাষাটাকেও

ভগৎ সিং যে এলাকাটায় বাস করতেন, তাতে এমন বহুভাষিকতা খুবই স্বাভাবিকএই অঞ্চলটিকে ভাষাতাত্ত্বিকরা হুপ‘ (হিন্দি-উর্দু-পাঞ্জাবি) এলাকা বলে থাকেনএই তিনটি ভাষার ঘর ভেঙেছে, তিনটি ভাষাকে আলাদা করেছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবিশেষত, হিন্দি এবং উর্দুর বিভাজন ধর্মের ভিত্তিতে কৃত্তিমভাবে করা হয়েছেপরবর্তীকালে, ভগৎ সিংপাঞ্জাবের ভাষা লিপির সমস্যালেখাটিতে নিয়ে আলোচনা করেছিলেন

১৯২১-১৯২২ভগৎ সিং তখন বিপ্লবীদের জীবনী লিখতে শুরু করেছেন কির্তি পত্রিকায়ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে গান্ধিজির ডাকে দেশজুড়ে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনএই অহিংস আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন স্বয়ং ভগৎ সিংযদিও চৌরিচৌরার ঘটনার (১৯২২) পরে এই আন্দোলনের ব্যর্থতা দেখে ভগৎ সিং ভীষণই আঘাত পেয়েছিলেনগান্ধিজির ওপরে গজিয়ে ওঠা সমস্ত বিশ্বাস তখনি মিশিয়ে গিয়েছিলো ধুলোয়! অসহযোগ আন্দোলনের কারণে সরকার চালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্ত দরজা হয়ে গেলো বন্ধতাই ভগৎ সিংকে বাধ্য হয়েই নবম শ্রেণি পাস করে যাওয়ার পর লাহোরের ড্যাভ হাই স্কুল ছেড়ে পনেরো বছর বয়েসে লালা লাজপত রায়ের স্থাপন করা লাহোরের ন্যাশানাল কলেজে ভর্তি হতে হয়এই কলেজ ভগৎ সিংয়ের জীবনে একটা উল্লেখযোগ্য মোড় এনে দেয়ক্লাসরুমে কম, দ্বারকাদাস পাঠাগারে দিনের প্রায় সমস্ত সময় কাঠিয়ে যেতে থাকলেন আমাদের ভগৎ সিংটেক্সটবুক- মনোযোগ কম দিয়ে তিনি সমস্ত মনটাকে ঢেলে দিলেন নানান বিষয়ের নানান বই পড়বার কাজেবইই হয়ে উঠলো ভগৎ সিংয়ের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান-প্রাণপাগলের মতন গিলতে থাকলেন একেকটা বই আর সেসব দেখে থতমত খেয়ে গেলেন লাইব্রেরিয়ান রাজারাম শাস্ত্রী মশাই! আর ঠিক এখান থেকেই ভগৎ সিংয়ের জীবনে একটা বড়ো পরিবর্তন আসেমুছে যেতে শুরু করে সমস্ত (কু)সংস্কার, ভ্রান্তি এবং চোখের সামনে আসতে শুরু করে এক নতুন সমাজের কাঠামো! ভগৎ সিংয়ের মনে নতুন রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে

এই ন্যাশানাল কলেজেই ভগৎ সিংয়ের সাথে আলাপ হয় তাঁর ভবিষ্যতের অনেক সহযোদ্ধা: সুখদেব, ভগবতীচরণ ভোরা, যশপাল এবং অন্যদের সঙ্গে। ন্যাশানাল কলেজের শিক্ষক জয়চন্দ্র বিদ্যালঙ্কার ভগৎ সিংকে পছন্দ করতেন এবং পরে ভগৎ সিংকে কানপুরে পৌঁছে প্রতাপ প্রেসে কাজ জোটাতে তিনিই সাহায্য করেন

রাজনৈতিক প্রচারমাধ্যম হিসেবে এবারে ভগৎ সিং এবার তাঁর সাথীরা নাটকের মঞ্চটাকে বেছে নিলেনকলেজে থাকাকালীন তাঁরা একটা ন্যাশানাল ড্রামাটিক ক্লাব তৈরী করেনএই ক্লাবের মোদ্দা উদ্দেশ্য ছিল দর্শককে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সচেতন করে তোলাভগৎ সিং ভালো অভিনয় করতেন, ভালো গানও গাইতে পারতেনসরোজিনী নাইডু নিজে ভগৎ সিংয়ের অভিনয় দেখে পরে প্রশংসা করেছিলেন!

১৯২৩ সালে এফএ পরীক্ষায় পাশ করবার পরে ভগৎ সিংকে কলেজ ছাড়তে হয়কেন? ক্রমশ বিপ্লবী মানসিকতা তৈরী হয়ে উঠছিলো তরুণ ভগৎ সিংয়ের মনের মধ্যে, আর সেটা দেখে বাড়ির লোকজন বেশ দুশ্চিন্তায় পরে গিয়েছিলেনতাঁরা তো আর অজিত সিং, স্বর্ণ সিংয়ের উদাহরণগুলো ভুলে যাননি! তাই তাঁরা চাইছিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভগৎ সিংয়ের বিয়ে দিয়ে দিতে

এখানে বলে রাখা দরকার, সেই ছোটোবেলা থেকেই ভগৎ সিংয়ের সঙ্গে তাঁর দুই চাচি হার্নাম কউর (অজিত সিংয়ের স্ত্রী) এবং হুকম কউর (স্বর্ণ সিংয়ের স্ত্রী)-এর ছিল ভীষণ ভালো সম্পর্কএর মধ্যে হার্নাম চাচির সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল আরো মধুর, আরো ঘনিষ্ঠবড়চাচির দুঃখ, কষ্ট, ভগৎ সিংকে সেই প্রথম থেকেই ভীষণ দুঃখ দিতোভগৎ সিং প্রানপনে চাইতো তাঁর কাকার মতন হয়ে উঠতেকিন্তু চাচির বেদনা দেখে ভগৎ সিং স্থির করে নিয়েছিলেন যে কোনোদিনও বিয়ে করবেন নাতিনি চাইবেন না আরেকজন হার্নাম কউরকে শুধুশুধু কষ্ট দিতেছোটবেলায় চাচির কান্নাভরা মুখটার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট ভগৎ সিং শপথ করেছিলেন যে বন্দুক দেখিয়ে ব্রিটিশদের দেশ থেকে দূর করে দিয়ে নির্বাসিত কাকা অজিত সিংকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন! সেই সময়েই ভগৎ সিংয়ের মনে অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বীজ বপন হয়ে গেছিলো, সাম্রাজ্যবাদের কবলে ভারতবর্ষের অত্যাচারিত শ্রমিক, কৃষক এবং অন্যান্য সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের হাল দেখে ভগৎ সিংয়ের মনের ভেতরকার সিংহটা গর্জে উঠেছিল এবং সে গর্জন আজো থামেনি!bhagat aunt mother granny

ভগৎ সিং যেমনটি ভেবেছিলেন, ঠিক তেমনটিই করলেনতাঁর বিয়ে দেওয়ার সাধ্য স্বয়ং কিষান সিংয়েরও ছিল না! ১৯২৩ সালের অগাস্ট-সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ বাড়ি ছাড়েন ভগৎ, বাবার উদ্দেশ্যে লিখে রেখে দিয়ে যান একটা চিঠি, সেটা ছোট করলে এইরকম দাঁড়ায়: আমার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য লড়াইকোনোরকম বৈষয়িক সুখ আমাকে প্রভাবিত করতে পারবে নাআমার পৈতের সময় আমার দাদু আমাকে দেশের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছিলেনতাই আমি আমার ব্যক্তিগত সুখ ছেড়ে দেশের সেবা করতে চললাম

বাড়ি ছাড়বার পর তিনি ছয় মাস কাটান কানপুর, দিল্লি এবং আলিগড়েকখনো কাজ করতেন গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থীর প্রতাপপ্রেসের সাংবাদিক হিসেবে, আবার কখনো কাজ করতেন ন্যাশানাল স্কুলের হেডমাস্টার হয়ে, কখনো বাড়ি বাড়ি কাগজ বিলি করে এছাড়া করতেন বন্যাত্রানের কাজওকানপুরে আলাপ হয় তাঁর ভবিষ্যতের সহযোদ্ধা শিব ভর্মা, অজয় ঘোষ, জয়দেব কাপুর, বটুকেশ্বর দত্তদের সঙ্গেস্থির করেন বিপ্লবী দল হিন্দুস্তান রিপাবলিকান এসোসিয়েশন বা এইচআরএ-র সাথে যুক্ত হবেন

তিনি যুক্ত হলেন ১৯২৩ শেষের দিক বা ১৯২৪ একদম প্রথম দিকেএইচআরএ- প্রতিষ্ঠাতা শচীন্দ্রনাথ সান্যালের সঙ্গে আগেই পরিচয় হয়েছিল লাহোরেযুক্ত হওয়ার পর আলাপ হয় রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাকুল্লাহ খান, রোশান সিং, রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী এবং অন্যদের সঙ্গেএক বছরের মধ্যেই, ১৯২৫ সালের অগস্ট ঘটে যায় অস্ত্রশস্ত্র কেনবার কারণে কাকোরির টাকা বোঝাই ট্রেন ডাকাতি যার নেতৃত্ব দেন একটু আগে উল্লিখিত চার ব্যক্তি: বিসমিল, আসফাকুল্লাহ, রোশান সিং এবং রাজেন লাহিড়ীছিলেন চন্দ্রশেখর আজাদও

চুলচেরা তল্লাশি চালিয়ে গ্রেফতার করা হলো চার বিপ্লবীকেইশুধুমাত্র আজাদকে ব্রিটিশরা কোনোভাবেই ধরতে পারলেন না! ১৭ এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯২৭ সালে চারজনকেই পরপর ফাঁসি দিয়ে দেওয়া হয়ভগৎ সিং এবং তাঁর সাথীরা অনেকভাবে চেষ্টা করেও তাঁদের বাঁচিয়ে আনতে পারেননি

ততদিনে ভগৎ সিংয়ের উদ্যোগে এবং তাঁর প্রিয় সাথী সুখদেবের সাহায্যে তৈরী করা হয় এইচআরএ- পাঞ্জাব ইউনিটবলা বাহুল্য, ভগৎ সিং তখন সক্রিয় বিপ্লবী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেছেন

এইসব ঘটনার মাঝে ১৯২৪র প্রথম দিকে ভগৎ সিং বাড়ি ফেরেন ঠাকুমা জয় কউরের অসুস্থতার কথা শুনে যদিও সেই বছরের এপ্রিল মাসেই তাঁকে আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে হয় গুরুদ্বার যাইতো আন্দোলনে সংযুক্ত প্রায় পাঁচশোর মতন সত্যাগ্রহীকে তাঁর বাড়িতে বসিয়ে খাওয়ার খাওয়ানোর কারণেসেই আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে তিনি বেরোন ১৯২৫র ডিসেম্বরেআন্ডারগ্রাউন্ডের বেশিরভাগ সময়টাই তিনি সম্ভবত কাটিয়েছিলেন দিল্লিতে এবং উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জায়গায়। 

১৯২৬ সাল চলে আসেকম. রামচন্দ্র এবং ভগবতীচরণ ভোরার সঙ্গে মিলে ভগৎ সিং ইতালির ম্যাৎসিনি গ্যারিবল্ডির ইয়ং ইতালির ছাঁচে তৈরী করেন এক নতুন প্রতিষ্ঠান: নওজোয়ান ভারত সভাভগৎ সিংয়েরই উদ্যোগে পাশাপাশি তৈরী হয় আরো কিছু গণসংগঠন: লাহোর স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, বাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন এবং বাল ভারত সভানওজোয়ান ভারত সভার মোদ্দা উদ্দেশ্যগুলো ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং অবশ্যই সাম্প্রদায়িকতার অবসানবিপ্লবীদের ছবি দেখাতে তাঁদের কাহিনি শোনাতে এই সভা গ্রামে গ্রামে পৌঁছে যেত ম্যাজিক লণ্ঠন সঙ্গে নিয়ে! গণজাগরণ এবং গণআন্দোলনের ভাবনায় এবং পথে হাঁটতে থাকলো এই সভা

১৯২৬র শেষের দিকব্রিটিশ শাসক শ্রেণি কাছে তখন ভগৎ সিং ক্রমেই তাঁর এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হয়ে উঠছিলেন এক বিপদজনক বিপ্লবীতাই তারা ঠিক করে যে করে হোক এই ছেলেটাকে গ্রেফতার করতে হবেতারা একটা ছুতো খুঁজছিলনিজেদের লোক দিয়ে লাহোরের এক দশেরা মেলার মধ্যে তারা বোমা ফেলায় কিন্তু তারপরে রটানো হয় কাণ্ড নাকি ভগৎ সিংয়ের! ২৯ মে, ১৯২৭ সালজীবনে প্রথমবার গ্রেফতার হন ভগৎ সিংছাড়া পান জুলাইছাড়া পান তাঁর বাবা কিষান সিং ষাট হাজার টাকার বন্ড সই করবার পর53a1b1a1-9f2a-47f2-9f75-ea7dbfdbd717

প্রচুর পড়াশোনা করে ফেলবার কারণে এবং বেশ কিছু কম্যুনিস্ট বিপ্লবীর সাথে আগে থাকতেই যোগাযোগ থাকবার দরুন ভগৎ সিং তখন একজন মার্কসবাদীতাই ঠিক করলেন এবারে লড়াইটাকে নতুন করে নতুন রুপে শুরু করবেনতাঁদের দল এইচআরএ-কে একটা সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেন ১৯২৮ সালের - সেপ্টেম্বর, ফিরোজ শাহ কোটলা দুর্গের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়েসেদিন হাজির ছিলেন অনেক বিপ্লবীসবাই একজোট হয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিলেনভগৎ সিংয়ের কথা মতোন হিন্দুস্তান রিপাবলিকান এসোসিয়েশন হয়ে গেলো হিন্দুস্তান স্যোসালিস্ট রিপাবলিকান এসোসিয়েশন বা এইচএসআরএ। লক্ষ্য,সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে শ্রমিক-কৃষক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাসাথে তৈরী হয় তার সামরিক বাহিনী, হিন্দুস্তান স্যোসালিস্ট রিপাবলিকান আর্মি। এই সিদ্ধান্তে পূর্ণ সমর্থন জানালেন পণ্ডিতজি (চন্দ্রশেখর আজাদ)। ততদিনে কির্তি, মাতয়ালা, মহারথী, এবং চাঁদ পত্রিকায় ভগৎ সিংয়ের বেশ কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে নানান ছদ্মনামে, যেমন—বলবন্ত, বিদ্রোহী, রণজিৎ, এমনকি একজন পাঞ্জাবি যুবক নামেও। 

মুজাফফর আহমেদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় থাকা সত্ত্বেও ভগৎ সিং সিপিআই-এর সঙ্গে তখন কেন যে যুক্ত হননি তা সঠিক জানা নেইআসলে ভগৎ সিং নিজের মতন করে এইচএসআরএ-কে একটা ম্যুনিস্ট সংগঠনের ছাঁচে গড়ে তুলতে চাইছিলেনতাছাড়া সিপিআই তখন সবে সবে তৈরী হতে শুরু করেছে, তাই হয়তো তিনি যুক্ত হননি

এইচএসআরএ কোনো ধর্ম মানে না, কোনো ধর্মের সাথে নেই তার কোনোরকম যোগাযোগতাই সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নাস্তিকবা নিরীশ্বরবাদী ভগৎ সিং কামিয়ে ফেলেন তাঁর চুল-দাড়ি

হঠাৎই দেশে আবির্ভাব হয় সাইমন কমিশনেপুরো দেশ ছিল এর বিরুদ্ধেএই কমিশনে ছিল না কোনো ভারতীয় সদস্য, কিন্তু এই কমিশন দেশে এসেই ছিলো নিজেদের মতো আরো কয়েকটা সাংবিধানিক সংশোধন করবার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই দেশে থেকে শাসন করাকালীন ভারতীয়দের থেকে মতামত নেওয়ার তারা কোনোদিন কোনো প্রয়োজনও বোধ করেনি!

ভগৎ সিং তাঁর সাথীরা লালা লাজপত রায়জিকে আর্জি জানালেন এই কমিশনের বিরুদ্ধে লাহোরে নওজোয়ান ভারত সভার প্রতিবাদী মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যএর আগে ভগৎ সিং লালাজীর সাম্প্রদায়িক মনোভাবের সমালোচনা করায় তিনি বেশ খেপে ছিলেনকিন্তু শেষবধি তিনি রাজি হনভগৎ সিং চেয়েছিলেন যে লালা লাজপত রায়ের মতন বড়মাপের এবং সম্মানীয় জাতীয় নেতা যদি কমিশনের বিরুদ্ধে গলা তোলেন, আর যদি নওজোয়ান ভারত সভা তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে সে প্রতিবাদে সামিল হয়তবে তো আর কথাই নেই! একটা দারুন শুরুর পরিকল্পনা করেন আমাদের ভবিষ্যৎ শহীদ--আজম

৩০ অক্টোবর, ১৯২৮লাহোর স্টেশনে এসে পৌঁছয় সাইমন কমিশনপৌঁছতেই সামনে অজস্র মানুষের ঢল তাদের চোখকে ট্যারা করে দেয়তাদের সামনে অনেক মানুষ হাতে কালো পতাকা ধরে লালা লাজপত রায়ের সঙ্গে গলা মিলিয়ে চিৎকার করে উঠছে, ‘সাইমন, গো ব্যাক।‘ সাইমন বাপাস যাও! সাইমন ফিরে যাও!

এতো বড়মাপের একটা প্রতিবাদ দেখে স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা থতমত খেয়ে যায়ব্রিটিশ পুলিশ পাল্টা আক্রমণ করেজে এ স্কট,সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশের আদেশমতোন তাঁর ডেপুটি, জে পি সন্ডার্স আন্দাগুন্দা লাঠি চালাতে শুরু করে লালাজির উপরেঅসুস্থ লালাজি ভয়ানক চোট পান

আহত লালাজি এক সমাবেশ ডাকেনসেখানে তিনি একটা অসামান্য কথা বলেন, আমার গায়ে মারা প্রত্যেকটা লাঠির ঘা হবে ব্রিটিশ শাসনের কফিনের শেষ পেরেক

১৭ নভেম্বর, ১৯২৮ সালস্কটের আদেশে সন্ডার্সের নৃশংস লাঠির ঘা ডেকে আনলো লালা লাজপত রায়ের মৃত্যু

এতো বড়ো একটা জাতীয় অপমানের বিরুদ্ধে কেউ উল্লেখযোগ্য কোনোরকম পদক্ষেপ নিলো নাচিত্তরঞ্জন দাসের স্ত্রী, বাসন্তী দেবী, রেগে গিয়ে বলে উঠলেন: দেশের যুবকেরা কি ঘুমোচ্ছে নাকি? এতো বড়ো একটা জাতীয় স্তরের অপমানের তারা কি প্রতিশোধ নেবে না? তারা কি মারা গেছে? না, দেশের যুবকেরা ঘুমিয়ে পড়েনিহিন্দুস্তান সোসালিষ্ট রিপাব্লিকান এসোসিয়েশন ঠিক করলো এই অপমানের বদলা নেবে স্কটকে খুন করার মাধ্যমে ছাড়া আর উপায় ছিলোনাতখন এটা হয়ে উঠেছিল একটা আবশ্যিকতামনুষ্যত্বের পূজারী ভগৎ সিং এবং তাঁর সাথীরা তাই বাধ্য হলেন খুনের পরিকল্পনা করতে

১৭ ডিসেম্বর, ১৯২৮লালাজির মৃত্যুর ঠিক একমাস পরে, বিকেল ৪টে নাগাদ, লাহোরের পুলিশ হেডকোয়াটারের সামনে রাজগুরু এবং ভগৎ সিংয়ের গুলিতে খুন হলেন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ জে পি সন্ডার্স। সঙ্গে ছিলেন চন্দ্রশেখর আজাদ এবং জয়গোপালভুলবশত স্কটকে না মারা গেলেও, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির আরেক প্রতিনিধিকে খুন করে ফেলে লালাজির নৃশংস হত্যার বদলা নেওয়া হলো

খুনের পরদিন লাহোরের রাস্তার দেয়ালগুলো ছেয়ে গেলো এইচএসআরএ- পোস্টারে পোস্টারে! তাতে বড়ো বড়ো করে লেখা ছিল,সন্ডার্সের মৃত্যু—লালাজীর খুনের প্রতিশোধPoster

এই ঘটনার পরে নাটকীয় ফরম্যাটে ২০শে ডিসেম্বর নাগাদ লাহোর স্টেশন থেকে ছদ্মবেশে পালিয়ে কলকাতায় এসে গা ঢাকা দেন ভগৎ সিং আর তাঁর সাথীরা ভগবতীচরণ ভোরার স্ত্রী দুর্গাবতী দেবী বা দূর্গা ভাবি ও তাঁদের ছোট্ট ছেলে শচীর সাহায্য ছাড়া এই দুর্ধর্ষ পলায়ন কার্যটা ভগৎ সিং হয়তো সমাপন করতে পারতেন না! নিজের জীবনের, এমনকি তাঁর বাচ্চার জীবনের, কথা না ভেবেই ভগৎ সিং, রাজগুরুদের সাথ দিয়েছিলেন দূর্গা ভাবি তাঁর সাহায্য সত্যিই অকল্পনীয় যখন কলকাতায় পৌঁছন ভগৎ সিং. তখন সেখানে কংগ্রেসের অধিবেশন চলছে।  

ভগৎ সিং জানতেন যে এই খুনের কারণে তাঁর শেষবধি ফাঁসিই হবেতাই তিনি ঠিক করলেন যে তাঁর জীবনের বাকি অল্প সময়টাতে ভারতবর্ষের জনগণকে জাগানোর জন্য আরো কিছু বিপ্লবী কাজকর্ম করে যাবেনতাই কলকাতায় পৌঁছে অনুশীলন সমিতির বিপ্লবীদের সঙ্গে তিনি দেখা করেনদেখা করেন আরো বেশ কিছু বাঙালি বিপ্লবীর সঙ্গেতাঁরা ভগৎ সিংয়ের পথের সঙ্গে ঠিক সহমত হতে পারেন নাবোমা কিরকম করে তৈরী করতে হয় তা শেখবার জন্য ভগৎ সিং দেখা করেন যুবক রসায়নবিদ যতীন্দ্রনাথ দাসের সঙ্গেতিনি ভগৎ সিংয়ের প্রস্তাবে রাজি হন

ভগৎ সিং স্থির করে নিয়েছিলেন যে কখনোই কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলানো যাবেনা কারণ কংগ্রেস আর তার মহাত্মা সমাজের আমূল পরিবর্তনের বিরোধীতারা যেটা চায় সেটা হলো শুধু গদিসেই জন্যই ভগৎ সিং বারবার বলতেন যে কংগ্রেসের পথে চলতে থাকলে সাদা সাহেবরা তো চলে যাবে, কিন্তু কালো সাহেবরা তার জায়গায় এসে বসে যাবেএতে শেষমেশ সাহেবত্বটা থেকেই যাবে!

তখন ভগৎ সিংয়ের উদ্দেশ্য ছিল এমন কিছু করা যার মাধ্যমে তিনি সর্বসমক্ষে এসে তাঁদের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং চিন্তাধারাকে তুলে ধরতে পারবেন এবং শেষঅব্দি তাঁর জীবন ভারতবর্ষের বিপ্লবী আন্দোলনের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে দিয়ে যাবেনপুরোটাই তিনি মনে মনে ছকে ফেলেছিলেনএবার কাজগুলো করবার জন্য দরকার ছিল সঠিক পরিবেশ।

(ক্রমশ…)

 
 
top