নিউটোনিয়ান পিরিতি

 

দার্শনিকের নাম দিয়ে যদি প্লেটনিক লাভ চালু হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের বৈজ্ঞানিক নিউটনকে সামনে রেখে উপরোক্ত নামকরণ কী দোষ করল? ওঁর প্রতিষ্ঠিত নিয়মানুসারে এভ্রি অ্যাকশন হ্যাজ অ্যান অপোজিট অ্যান ইক্যুয়াল রিয়্যাকশন অবশ্যই সত্য বলে স্বীকৃত, বহু শতাব্দী ধরে। বস আমাকে ঘৃণা করলে আমার ভিতরেও তার প্রতি জ্বালার সৃষ্টি খুব স্বাভাবিক। তাই যদি হয় তাহলে সেটা সর্বদা লাগু হয় না কেন? খড়গপুর লোকালে উলটো সিটে বসা তন্বী সুন্দরীকে যদি আমার প্রথম দর্শনেই ভালো লেগে গিয়ে থাকে, দৃষ্টিবিনিময় ও মৃদু অপ্রস্তুত হাসি যদি ক্রমশ এমন আবিষ্ট করে দিতে থাকে যেন ট্রেনটি খড়গপুর আইআইটিতে না থেমে খড়গডামলা চলে গেলেও আমার কোন ক্ষতি হবে না বলে মনে হয়, তবে তার মনেও কি গুঞ্জন জাগবে না? হায় কপাল, আইনস্টাইনের আপেক্ষিক গুরুত্ব অনুযায়ী আড়াই ঘণ্টার যাত্রা কেমন দশ মিনিটেই পার হয়ে গেল, কোনো সাড়া মিলল না! মেচেদার চপ আর সাঁকরাইলের খুড়িতে চা খাওয়ার প্ল্যান ফ্লপ।

অতএব, আমার মতে প্রেমের সংকেত বা সিগন্যাল পাঠাবার যন্ত্র আবিষ্কার করাটা অতি প্রয়োজনীয়। জানান দিতে হবে আর জবাব পেতে হবে। প্রেম একবারই এসে ছিল নীরবে, আর চলবে না গুরু। মোড অফ অপারেশন, ভাইব্রেশন, পালস রেট, টেম্পারেচার রাইজ, কোয়ান্টাম অব ডিস্টার্বেন্স ইত্যাদির মাপকাঠি সমন্বয়ে একটি ছোট্ট পকেট মেশিন ছেলেদের বুকপকেটে ও মেয়েদের চোলি কি পিছে ফিট করে রাখতে হবে। অ্যালার্ম বেল বা আলোর সঙ্কেত সম্বলিত মেশিনটি ঠিক জানিয়ে দেবে নিউটোনিয়ান প্রতিক্রিয়ার ফলে উনিও আপনার প্রেমে গদগদ কিনা এবং কতখানি। কিন্তু বিপদ হল এই যে, এই খুড়োর কলে যদি ভুলবশত সাড়া না পাওয়া যায়, এক পার্টি আরেক পার্টিকে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারে, গলা চেপে ধরে, নিজেকে ফ্যান থেকে ঝুলিয়ে দেয়, তখন কিন্তু নিউটনের হাইপোথিসিসকে সকলে ধিক্কার দেবে। অর্থাৎ সঠিক সংকেত জরুরি, কিন্তু মেশিনের ওপর ভরসা করে নয়, আজগুবি রীতিতে।

একটুকু ছোঁয়ার দিন গত হয়েছে। জোরালো, বলিষ্ঠ, পরিস্কার সংকেত চাই: হ্যাঁ কি না। টু বি অর নট টু বি-র দ্বিধাগ্রস্ত হাবভাব চলবে না। রফির গজলে শোনা গেল: কহিঁ বেখয়াল হো কর ইয়ুহি ছু লিয়া কিসিনে/ কই খাব দেখ ডালে, ইহা মেই বেখুদি নে নেহাতই অসাবধানতার বশে উনি ছুঁয়ে ফেলেছিলেন আমায়, ব্যাস আমি সেই পরশ সম্বল করে অনেক স্বপ্ন ইত্যাদি। এই ধরণের দিবাস্বপ্নের দিন যেমন গত হয়েছে তেমনই টমাস কার্লাইলের বিখ্যাত দ্য আর্ট অব লেটার রাইটিং-এর ভঙ্গিতে বা কালিদাসের মেঘদূত-এর প্রথায় চিঠি চালাচালির দিনও শেষ। দু-পিঠের লং প্লেয়িং রেকর্ডে জগন্ময়ের চিঠিতুমি আজ কত দূরে? প্রেমিকা-নায়িকা মারা যাওয়ার পরও আবার চিঠি কিরে? জবাব পাবি কোন মেল-? তার থেকে পরবর্তী ক্যান্ডিডেট খুঁজে নে। সময়াভাব, তাই পার্ট টাইম পার্টনার যথেষ্ট! স্মৃতি তুমি বেদনা নিয়ে আর কেঁদোনা গো, রাশভারী পঙ্কজকে দেখো তাঁর বিখ্যাত হিন্দি গীত-এ কেমন গর্জে উঠলেন অতীতের নীল বিকেলের চুম্বনের অভূতপূর্ব স্মৃতি রোমন্থনের কথায়হোঁঠো কা পেয়্যালা-র কাণ্ডকারখানায়। চুম্বনের মাধ্যমে যে অনুভুতি সেটাকে না হয় বৈজ্ঞানিক সংকেত হিসেবে ধরা যায় এবং তাকে পজিটিভ প্রতিক্রিয়ায় পরিণত করে, মাপজোক করে নেওয়া যায়। শেষমেষ হয়তো কোনো অনুকূল ফলাফল তৈরি হলেও হতে পারে। কিন্তু রুবি রায়কে প্রতিদিন বাস থেকে কেবল নামতে দেখলেই যে একতরফা শিহরণ, জাগরণ, অনুররণ, সেটাকে তো আর সংকেতের পর্যায়ে ফেলে মাপা যাবে না। সুতরাং মিষ্টি হাসির দুষ্টুমিতে যে সাড়া দেওয়া যেত, সেটা এখানে অনুপস্থিত। নিউটন আউট!

মন খারাপ করবেন না। অনেক সময় নিউটনকে একেবারে জাগ্রত পাওয়া যায়। যেমনটি আমি বহু দুঃখে দেখেছিলাম ঢিল খেয়ে। সবে লেক গার্ডেন্সের বাড়িতে এসে উঠেছি আমি আর আমার সদ্য বিধবা মা। মেজদার স্বল্প মাইনেতে রসা রোডের বাড়ি পোষাচ্ছিল না। খড়গপুরের হস্টেল থেকে বেশ উড়ু উড়ু মন নিয়ে গ্রীষ্মের ছুটি কাটানোর মানসিকতায় প্রস্তুত হয়ে এসেছি। নতুন পাড়ায় কে কোথায় থাকে না থাকে, তার সার্ভে নিতান্তই জরুরি বৈকি! এর চটজলদি উপায় হল ছাদে (মধ্যবিত্ত বাঙালির রোম্যান্টিকতার কেন্দ্রস্থল) নাক-কান-চোখ সদা সজাগ রেখে আপাতদৃষ্টিতে নেহাতই উদাসীনভাবে পায়চারি করা। কেল্লা ফতে! একেবারে সামনের ছাদেই উনি হাজির। চোখাচোখি, ঠোঁটের ডগায় অল্প হাসি (নবীনকে আমন্ত্রণ!), উৎসুক হাবভাব আর মিনিটকয়েকের উৎসুক চলাফেরা। কে তুমি নন্দিনী গেয়ে ওঠার আগেই ম্যাজিক বিদায়। পরের দিন বিকেলেও তাই, তার পরেওশুধু আমার মনে আলোড়ন তুলে, নিজের একরাশ কালো চুলে ঢেউ তুলে ওর এই অনিচ্ছুক (?) গায়েব হয়ে যাওয়াটা যখন রুটিন হয়ে উঠল, তখন অগত্যা ঢিল। আমার অপরিপক্ক হাতে লেখা শায়রি কাগজের মোড়কে মুড়ে সেটিকে ওর ছাদে ছুড়ে ফেলা।

ব্যাস! আর যায় কোথায়! নিউটনের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিতে পরপর ঢিল পড়তে থাকল আমাদের ছাদে। শুষ্ক, অনাবৃত, জোরালো ঢিল। পালাপালারঞ্জনা আমি আর আসব নামা বেচারা বেগুন ভাজা ছেড়ে দৌড়ে এলেন, হ্যাঁ রে, ও বাবুল, ইঁটপাটকেল পড়ছে কেন রে?

সুতরাং বুঝতেই পারছেন ভয় হয় মনে, পাছে অযতনে, মনে মনে কেহ ব্যাথা পায় গোকী জানি পরাণ কী যে চায় বলে গুরুদেব কেন আকুল হয়ে ছিলেন! সংশয় থেকেই যাচ্ছে, ইঁটপাটকেল না দুষ্টুমিষ্টি হাসি? এ নিরন্তর সংশয় আর পারিনে বুঝিতে। শেক্সপিয়রের টু বি অর নট টু বি থেকে আর ডি বর্মনের যাব কি যাব না অবধি এ সংশয় অব্যাহত। আপনি আর আমি তো কোন ছাড় মশাই! তাই বোধকরি নিজেকে কেমন একটা বিলিয়ে দেওয়ার প্রয়াসে শ্যামলের সুরে সন্ধ্যা গেয়ে উঠলেন, হয়তো কিছুই নাহি পাব, তবুও তোমায় আমি দূর হতে ভালোবেসে যাবআ মোলো যা, কম্ম সেরেছে! দূর হতে ভালোবেসে যাওয়া কি অলুক্ষুণে কথা গো, বল দিকিনি! তাই পই পই করে বলি মেয়েটার একটা হিল্লে করো তো।

প্রেম বিলিয়ে বেড়াবেন বৈকি! তবে সেটা হয়ে পড়বে নদের নিমাই মার্কা প্রেম, যার কোনো নিউটোনিয়ান প্রতিক্রিয়া আজ পর্যন্ত সমাজে দেখা যায়নি। তাহলে এই ঊনষট্টিতম স্বাধীনতা দিবসের পরেও চারপাশে এত প্রেমহীন কেষ্ট-বিষ্টু দেখা যেত না।

জীবে দয়া করে যেই জন বা যমুনাতীরে বাঁশির ডাকের প্রেম ঠিক ঠিক সাড়ার সংকেত পেয়েছে কি? মাদার শেখালেন শুধু ভিক্ষে নয়, প্রেমের মোড়কে ভিক্ষে দাও। কিন্তু মশাই, যদি অপাত্রে প্রেম দান করে অতি সন্তুষ্ট মনে ফিরে আসেন, সঠিক সংকেত কে-ই বা জানবে? তার চেয়ে চাইনিজ কনফুসিয়াসের মতে ক্ষুধার্ত মানুষের দিকে একদিন মাছ ছুঁড়ে দেওয়ার বদলে তাকে মাছ ধরতে শেখানো ভালো। এটা সারাজীবনের সমাধান।

এবার ভিক্ষের ঝুলি থেকে প্রেমের প্রগাঢ় বন্ধনে ফিরে আসা যাক। মান্নাদা কাতর হলেন, দুজনেই দুজনেতে মুগ্ধএরই নাম প্রেম। কিন্তু কে কতখানি মুগ্ধ বা কীসে মুগ্ধ তার মাপযন্ত্র না থাকাতে নিউটন ফেল। আপনি মরিয়া হয়ে বলবেন নিউটন মানুষের মন-প্রাণ নিয়ে মোটেই ফিজিক্স করতে চাননি। কিন্তু আমাদের স্যার জগদীশ তো প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে সজীব-নির্জীব সব মিলেমিশে একাকার।

সুতরাং এখন প্রেম, পরিণয় ইত্যাদি বলতে কেবল রয়ে যাচ্ছে কিছু ভাবাবেগ আর পাগলামি। হিরো ভেবে নিয়েছেন যে হিরোইন অবশ্যই তার বগলে, মাতোয়ারা হয়ে ডাকে সাড়া দেবে। বলিউডের দেবানন্দ যখন শচীনকত্তার সুরে হেমন্তর গলায় প্রেমিকাকে আবেদনে-অনুরোধে প্রায় দিশেহারা-ঘরছাড়া করে তুলেছেন (কানুর বাঁশির বদলে গিটার বাজিয়ে), ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনি ফির কাঁহা, সুনজা দিলকি দাস্তা…, তখন কে কার কোথায় মাপযন্ত্র! এ তো প্রাণের বেদনা, প্রাণের আবেগ। রক লিজেন্ড এলভিস প্রিসলের ইটস নাউ অর নেভার, বি মাইন টুনাইট, টুমরো উইল বি টুহ লেট এককালে বিশ্বজনকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, কেবল একটি নায়িকাকে নয়। মাপযন্ত্র কার বুকে ফিট করবেন? সংকেত আছে হৃদয়ের পরতে পরতে। 

অর্থাৎ, বিদ্যাবুদ্ধি দিয়ে যাচাই করার বদলে আপনাকে ফিরে যেতে হবে পিরিতি কাঁঠালের আঁঠা-র জগতে। ছটফট বন্ধ হলেই বুঝবেন যে ফেঁসেছেন। ওপর তরফের খবর দেবা ন জানন্তি। কেবল চোরা চাহনি আর হাসির ঝিলিকের ওপর ভরসা করে উত্তম-সুচিত্রামার্কা প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে আজকের বাঙালি আর সময় নষ্ট করে না। সে ইতিমধ্যে প্রতিক্রিয়ার প্রমাণস্বরূপ আরও বহু বুদ্ধিদীপ্ত এবং নির্ভুল পদ্ধতিতে হাত পাকিয়ে ফেলেছে। বাপ-মায়েরা নিশ্চিন্তে থাকুন। দেশের এত অগ্রগতির (?) পথে দু-চারটে এমন আত্মহত্যা বা বিবাহ বিচ্ছেদ বিনদাস চলতা হ্যায়। 

 
 
top