হে সোম

 

অমৃতের খোঁজে প্রথমে তাঁদের জ্যেষ্ঠরা এসেছিলেন অশ্বপৃষ্ঠে, মরা জ্যোৎস্নার ভিতর হাই তুলতে তুলতে ঘুমিয়ে পড়েন তাঁরা। তাঁদের সন্ধানে আসা দেবতাদের কাছে আমি শুনি, জ্যেষ্ঠদের শেষবার দেখা গেছে আমাদের উঠোনে। অশ্বের পিঠের উপর লুটিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন তাঁরা, অশ্বগুলি নদী পেরিয়ে এসে এত বড় উঠোন দেখে, মায়াবী চাঁদের জ্যোৎস্নায় তাজ্জব বনে গিয়ে সেই একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে লাগল। তারপর তারা জ্যেষ্ঠদের কোথায় নিয়ে গিয়ে পৌঁছল, তার কোন খবর নেই। যে নদীর ধারে আমাদের বাড়ি, সেই নদী পেরিয়ে দেবতারা আমাদের বাড়িতে আসেন, আমি জানি। দেবতারা নদীর ওপারের ওই বন্ধুর জমি বেয়ে নদী পেরিয়ে কেন আমাদের উঠোনে এসে হারিয়ে গেলেন, সে খবর আমাদের জানা নেই। পথশ্রমে ক্লান্ত দেবতারা আমাদের দুয়ারে রাখা মাটির কলসী উপুড় করে জল খান, পরনের কাপড়ের খুঁটে মুখ মুছে বলেন, আঃ, কি শান্তি!

দেবতারা আসেন জ্যেষ্ঠদের খোঁজে। মেদুর চাঁদের আলোর মায়ায় জ্যেষ্ঠদের অশ্বেরা সেই যে ঘুরপাক খেতে থাকল, তাতে জ্যেষ্ঠরা ঘুমের আরও অতলে তলিয়ে যান। তারপর থেকে তাঁদের আর কোন খোঁজ মেলেনি। আমাদের উঠোন থেকে তাঁরা গেলেন কোথায়?

তাঁদের এই উধাও হয়ে যাবার পিছনে অনেকগুলি কারণের কথা বলা হয়। প্রথম ও জোরালো কারণ যেটা, অদিব্য পিতৃগণ তাঁদের হরণ করে নিয়ে গেছেন। আবার বলা হয়ে থাকে, অসুরেরা তাঁদের বহন করে নিয়ে গেছে অসূর্যলোকে। আর যেহেতু সেখানে কোন সূর্য নেই, তাই জ্যেষ্ঠরা এখনও ঘুমান। কনিষ্ঠ দেবতারা তাঁদের  খুঁজে যান। খুঁজতে খুঁজতে আমাদের উঠোনে। অনেক ভেবে সিধান্ত নেওয়া হয়, জ্যেষ্ঠদের খুঁজে বের করতেই হবে। কারণ একমাত্র তাঁদের কাছেই আছে অমৃতের সন্ধান। এ জন্য এই গ্রামের সারা পথ তন্ন তন্ন করে খুঁজতে হবে। দেবতারা বলেন, র যেহেতু আমরা সমস্ত পথঘাট চিনি না, এই কাজে তুমি আমাদের সাহায্য করবে। বিনিময়ে তুমি অমৃতের ভাগ পাবে

মৃত! আহা! আমি অমর হয়ে যাব

দেবতারা হাসলেন বললেন, না, এবার চলো। জ্যেষ্ঠদের খুঁজে বের করতে হবে। তাঁদের কাছেই রাখা আছে সেই অমৃতের ভান্ড

আমি দেবতাদের সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় পা দিই। সবে চাঁদ মধ্যগগণে উঠেছে। বাতাসে ঠান্ডার অল্প টান। সরু রাস্তা, পরপর গাছ; পাশ ফেরার জায়গা নেই। তবুও দ্রুত অনুসন্ধান শেষে দেবতারা দেখেন, আমি সর্বদাই তাঁদের অগ্রবর্তী, প্রথম পুরুষ। এ পর্যন্ত দেবতারাই যাবতীয় কথা বলেছেন, আমি চুপ থেকেছি। এ এক বহুমাত্রিক সৃষ্টিলোক। সেখানে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত, মানুষ-দেবতা, কায়াময় শব্দ-বাক্যহীন আমি; তবুও মনে হয় এই পৃথিবী সম্পূর্ণ পরাবাস্তব নয়।

এসময় এক জলাশয়ে স্নানরতা তিনজন নগ্নিকা নারীকে জল থেকে তুলে ধর্ষণ করেন দেবতারা। আমি তীব্র প্রতিবাদ করে বলি, এ আপনারা কী করছেন, লজ্জা করে না আপনাদের, আপনারা না দেবতা!  দেবতারা জবাব দেন, লজ্জার কি আছে, আমরা যে দেবতাশাসক। আর কে না জানে শাসককে সব মানায়। তুমি কোন ঝামেলা কোরো না যুবক, ঐ গাছের আড়ালে শান্ত হয়ে বোসো।

যে ছোট নদীর ধারে আমাদের বাড়ি, সেই নদীখানাই এঁকেবেকে ঘিরেছে আমাদের গ্রাম। আমাদের একটুকরো মাটির ঘর-দোর-উঠোন। আমরা বাড়িতে দেবতাদের স্তব করতাম এই রূপঃ হে দেবগণ, আমরা যেন সর্বদাই কল্যাণকর বাক্য শুনি, হে যজনীয় দেবগণ, আমরা যেন সর্বদাই কল্যাণকর বস্তু দেখি, আমরা যেন সুস্থ দৃঢ শরীর লাভ করে তোমাদের স্তুতি করতে পারি।

কিন্তু সেই জায়গাটা কোথায় যেখানে সময়কে গিলে ফেলেছেন জ্যেষ্ঠরা? তাই এ সময় সময়হীন; সময় এখানে উপচে পড়ে সময়হীন এক নিশ্চল পাত্র থেকে।  

তখন আমার মনে হয়, এরা এতটাই দুর্নীতি পরায়ণ, নির্লজ্জ ও উচ্ছৃংখল যে, কোন কিছুকেই তোয়াক্কা করে না। জ্যেষ্ঠরা এদের এই অশান্ত, নীতিহীন, ভ্রষ্ট রূপ দেখে অশ্বপৃষ্ঠে অনেক দূরে চলে গেছেন, তা মনুষ্য কোন ছার, দেবতাদেরও অগম। আমরা নিশ্চয় এদের নয়, জ্যেষ্ঠদের স্তব করতাম। এইসব মানুষেরা কিভাবে দেবতার তকমা পায় ভেবে আশ্চর্য হতে হয়। আর এদের কাছে যেহেতু কোন অশ্ব নেই, তাই পদব্রজেই খোঁজ করতে হয়। যদি অমৃতের ভান্ড এদের হস্তগত হয়, তাহলে এদের লোভ কত সীমাহীন হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।      

দেবতারা নারীদের সেখানেই ফেলে রেখে সামনের দিকে চলতে শুরু করে। নদীর একপ্রান্তে গিয়ে আমরা দাঁড়িয়ে পড়ি। সেখানে পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে সারসার অশ্ব। চিকন কালো তাদের গায়ের রঙ, মখমলের মত কেশর। দেবতারা তাদের দেখে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললে, এই হট, আমরা এগোব। সামনে আমাদের জ্যেষ্ঠরা আছেন।

অশ্বেরা চুপ। তাদের মধ্যে নড়ার কোন লক্ষণই দেখা গেল না। দেবতারা ক্ষিপ্ত হয়ে বললে, র্বাচীনের দল, এত সাহস তোদের, আমাদের পথ রোধ করিস! নেহাত আমাদের মন প্রফুল্ল আছে, তাই তোদের কিছু করছি না। রাস্তা ছাড়!

ঘোড়ারা বলে, পনারা যেতে পারবেন না। এ স্থান দেবতাদের অগম্য

রে আমরা দেবতা, আমাদের অগম বলে কিছু নেই। সমস্ত ভূমির উপর আমাদের অধিকার। সরে যা

অশ্বেরা পরস্পরের মুখ চাওয়াচায়ি করল। তারপর বিনাবাক্য ব্যয় রাস্তা ছেড়ে দিল। সেই সরু ফাঁক গলে দেবতাদের নিয়ে আমি প্রবেশ করলাম যে স্থান দেবতাদের অগম, সেখানে! এখানে মনুষ্যেরও প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাই কী আমাকে ওরা এক অশ্বে পরিণত করেছিল? নাকি ওদের সম্মিলিত ও উল্লসিত সেই ধর্ষণ-ব্যবহারের তীব্য প্রতিবাদ করেছিলাম বলেই আমার এই শাস্তি? ফলস্বরূপ খচ্চর নামক এক চতুষ্পদ যন্তু হয়ে আমার এই অগমস্থানে প্রবেশ।

তিন দেবতা এতটা যাত্রাপথে খুবই নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছে আমার সঙ্গে। একত্রে পৃষ্ঠদেশে বসে যথেচ্ছ পদাঘাত করেছে তলপেটে। পেট টাটিয়ে একাকার হয়ে আছে। দেবতারা যে এতটা খারাপ হতে পারে তা আমার কোন ধারণাই ছিল না। ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি দেবতাদের মাহাত্মের কথা। তবে কি সেই দেবতা হলেন জ্যেষ্ঠরা?

পথ চলতে চলতে, অসহ্য কিরণ তাপে একসময় তেষ্টায় বুক ফেটে গেছে আমার। পিঠের ভার অসহ্য মনে হয়েছে। তখন যে অরণ্য পার হচ্ছিলাম, এক সরস লতা মুখেরা আগায় এসে যাওয়ায় তা সম্পূর্ণ তুলে গলাধঃকরণ করি। সে যে কী অপূর্ব ক্ষরণ তা বলে বোঝানো যাবে না। তাতে আমি বেশ শক্তি পাই ও চলতে শুরু করি।  কিন্তু কোথায় সেই জ্যেষ্ঠরা? পুরো চরাচরে মৃত চাঁদের আলো; নিজেদের দিকে তাকালে অশরীরী বলে ভ্রম হয়। সেখানে ভূমি বলে কিছু নেই, যা আছে সে হল ভূমির গড়ণে অনন্ত আলো। বৃক্ষেরা, আলোক নির্মিত। দেবতাদের অগম্যস্থান বলেই কি জ্যেষ্ঠরা এত নিশ্চিত্বে এখনও ঘুমিয়ে। তাহলে অমৃতের কী হল?  

ক্রমে ক্রমে আলোয় চোখ সয়ে গেল। দেবতারা তখন মন্ত্রোচারণ করতে লাগলেন একযোগে। ধীরে ধীরে ফুটে উঠলেন অশ্বপৃষ্ঠে নিদ্রিত সেই জ্যেষ্ঠরা। এত দীর্ঘ বছর যে ঘুমিয়ে রয়েছেন তাঁরা, সেই অবস্থাতেই তবে নিয়তি তাঁদের অগমস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছে যাতে এই অধঃস্থন দেবতারা তাঁদের বিরক্ত করতে না পারে?

এদিকে দেবতারা আর ধৈর্য রাখতে পারছেন না। তাঁদের মন্ত্রের জোরেই হোক, অগমস্থানের মাহ্যাত্মেই হোক, আমি খচ্চররূপ থেকে পূর্ব দেহ ফিরে পেলাম। জ্যেষ্ঠরা দৃশ্যমান হলেন বটে কিন্তু জাগলেন না। সেই একইভাবে নিদ্রিত তাঁরা। অশ্বেরা তাঁদের নিয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে চলেছে ইচ্ছেমতন, কখনও স্থির হয়ে যাচ্ছে। দেবতাদের সমস্ত মন্ত্র শেষ হয়ে গেল কিন্তু জ্যেষ্ঠরা সেই পূর্বাবস্থাতেই রইলেন। অমৃতের আশায় দেবতার সমগ্র অগম্ভূমি চষে ফেললেন, কিন্তু কোথাও অমৃতের ভান্ড নজরে এল না। দেবতারা রগান্বিত হয়ে ভুমিতে আঘাত করলেন। আলোর স্তর কম্পিত হল বটে, জ্যেষ্ঠরা চোখ মেলার কোন লক্ষণই দেখালেন না। দেবতারা মন্ত্রর পরিবর্তে চিৎকার করলেন, অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করলেন, কিন্তু জ্যেষ্ঠরা চক্ষু উন্মীলন না।  দেবতারা তখন আমাকে বললেন, যা গিয়ে ছুঁয়ে আয়। ঠেলা মেরে দেখ দিকি, ঘাটের মড়াগুলি ওঠে কি না।

চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। জানি না জ্যেষ্ঠরা আমাকে দেখে কি বলবে। জানি না এবার ভষ্ম হয়ে যেতে হবে কি না। দেবতারা বললে, কিরে, যা। মালগুলোকে তোল! ওদের ঘুমের ঘোর কাটেনি কেন এখনও? অমৃতের ভান্ডই বা কোথায়? ভান্ডটা যদি খুঁজে পেতুম, ওদের আর জাগানোর দরকার পড়ত না। চুপিচুপি নিয়ে সরে পড়লেই হোত। ওরা তো অমর হয়ে গেছে, আমরাও হয়ে যেতুম, কাউকে কোন ভয় থাকত না। নাকি যা যোগাড় করেছিল, নিজেরাই সব সাবড়ে দিল! আর তাতে এত নেশা হয়ে গেছে যে ঘোর কাটপছেই না।

আমি চুপ।

 দি না যাস তো এবার শকুন করে দেব, গরু খাবি। যা   

বাধ্য হয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। এক এক করে ছুঁয়ে দিইজ্যেষ্ঠরা নাড়া পেয়ে চোখ মেলতে থাকলেন ধীর লয়ে। আমি ভয় পেয়ে তাঁদের অশ্বের সামনে উবু হয়ে বসে পড়ি। ক্রমে জ্যেষ্ঠরা অশ্বের উপর সোজা হয়ে বসেন। আজানু লম্বিত বাহু, গায়ে রঙ্গিন জোব্বা, দীর্ঘ জটা সম্পূর্ণ কেশ লুটিয়ে আছে পৃষ্ঠদেশে, কন্ঠের সামনে দিয়ে এসে বক্ষদেশে। তাঁদের তীক্ষ্ণ নাসিকা, উজ্জ্বল দুই চক্ষু, দৃঢ অধর। আমি নতজানু হয়ে অশ্বের ফাঁক দিয়ে তাঁদের দিকে তাকাই আর ভাবি, তবে কী এঁরাই আমার পূর্বপুরুষ?

যখন সোজাসুজি চোখে মেলে তাকান, রোষানল সোজা গিয়ে পড়ে সামনে অপেক্ষমান তিন দেবতার উপর। বজ্রকঠিন স্বরে বলেন, মাদের জাগালে কে!   

প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে দেবতারা বলে, মরা অমৃতের অধিকার চাই

মৃত! বলে জ্যেষ্ঠরা একে অপরকে দেখেন। বলেন, তোদের এখানে প্রবেশাধিকার কে দিল? জানিস না, এটা দেবতাদের অগমস্থান?

জানি। আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে এক মনুষ্য

নুষ্য! কই সে? হত্যা করেছিস তাকে?

না। সে আপনাদের অশ্বের সম্মুখে বসে পড়েছে আপনাদের ভয়ে

আর আত্মগোপন করে থাকা সমীচীন নয় ভেবে আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াই।

কে তুই? জ্যেষ্ঠরা চিৎকার করে ওঠেন।

আমি জোড়হাতে কম্পিত স্বরে বলি, মি আপনাদের উত্তমপুরুষ

জেষ্ঠ্যরা সেই কথাকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে বললেন, খানে কী চাই তোর?

দেবতারা আমাকে জোর করে ধরে এনেছে। শুধু তাই নয়, আসার সময় ওরা ধর্ষণও করেছে

টে! এত বড় অনাচার!

পনারা এর বিচার করুণ, জ্যেষ্ঠরা

জ্যেষ্ঠরা বললেন, মরা যখন স্বগ থেকে চলে আসি অমৃতের খোঁজে, তোরা আসবি না বলে নিজেদের আমাদের দেহ থেকে পৃথক করে নিলি। বলেছিলি, দেবতাদের অমৃতের দরকার নেই, আমরা যেহেতু বৃদ্ধ হয়েছি, তাই আমাদের দরকার অমৃত। আর এখন এসেছিস অমৃতের ভাগ চাইতে?

পনারা কি অমৃত পেয়েছেন?

না।

কোথায় কোথায় অনুসন্ধান করেছেন?

পৃথিবীর সর্বত্র। তবু পাইনি। আমরা সোমের নিরন্তর স্তব করে যাই, আকাশে-বাতাসে-অন্তঃরীক্ষে; এই বলে যেঃ হে সোম, তুমিই বর্ষণকারী, সূর্যের দ্বারা সূর্য রশ্মির মত ঔজ্জ্বল্যযুক্ত তোমাকে আহ্বান করি। আমরা এতদিন জানতাম, এই স্তবেই সোম খুশি হয়ে ক্ষরিত হবেন আর আমরা অমৃত পান করতে পারব। কিন্তু কিছুতেই আর সোম নির্গত হন না, ফলে এত পথশ্রম ও পরিশ্রম হয় আমাদের, আমরা ঘুমিয়েই পড়ি। এখনো আমাদের ক্লান্তি যায়নি।  তাই এত হাই ওঠে এখনো

তাহলে এতগুলি বছর আপনারা কেবল ঘুমিয়েই কাটালেন! অথচ আমরা জানি আপনারা ভান্ড হস্তগত করেছেন

র তোরা সেটা বিনা পরিশ্রমে ভক্ষণ করবি, এই মতলব? বাঃ

কে?  জ্যেষ্ঠরা যা লাভ করেন, কনিষ্ঠদের তাতে কি ভাগ থাকে না?

না, থাকে না। যে কোন জিনিস লাভ করতে হলে পরিশ্রম করতে হয়। আর তোরা? চিরকাল ঘাড়ে বসে খেয়ে এলি। একজন মনুষ্যকেও অনুগামী করতে পারলি না, কেবল ভুয়ো স্তোত্রবাক্য দিয়ে ভরিয়ে দিয়ে গেলি। এই যে মনুষ্যকে এনেছিস, একেও কত কষ্ট দিয়েছিস, ভাব

টা আমাদের অধিকার। এতটুকু না পীড়া দিলে আমরা আর কিসের শাসক

জ্যেষ্ঠরা তখন অগম সীমান্তের পাহারাদার অশ্বদের ডাকলেন। কৈফিয়ত তলব করলেন আমাদের ঢুকতে দেবার প্রসঙ্গে। অশ্বরা বিনীতভাবে জানাল, তাদের কিছুই করার ছিল না, কারণ তারা দেখেছে আমাকে সোম পান করতে। আর তাই যে অমৃত পান করে, তাকে কি করে তারা আটকে রাখতে পারে?

শুনেই জ্যেষ্ঠরা আমাকে ঘিরে চক্রাকারে পাক খেতে লাগলেন। কয়েকটি চক্র শেষ করে তাঁরা বললেন, তুমিই সেই যে সোম-অমৃত পান করেছ! তুমি ধন্য হে যুবক! তাই তোমাকে দেখে সরে গেছে অগম্যস্থানের রক্ষক ওই তেজি অশ্বের দল। কিন্তু সেই অমৃত তুমি পেলে কোথায়? কেমন করে তা পান করলে? সোমের স্বাদ, কেমন স্বাদ সে অমৃতের? সেই করে আমরা এই এক বিন্দু সোমের জন্য স্বগের পথ ছেড়ে বেরিয়েছি, আজও ফিরতে পারলাম না! এক উপজাতি সর্দারের থেকে আমরা কয়েকটি ঘোড়া চেয়ে নিই; যা আমাদের দূর পথের সফরকে নিকট করেছে। প্রথম প্রথম আমরা মনুষ্য গৃহে আথিত্য নিয়েছি, পরে যখন একেবারে মনুষ্যবর্জিত এলাকায় প্রবেশ করলাম, তখন মনুষ্যেত্বর প্রাণীরা আমাদের দেখভাল করত। কিন্তু সোমের খবর কেউ দিতে পারে না। আমরা ক্রমে হতাশ হয়ে পড়ি। ক্রমে আমাদের নিদ্রা ঘিরে ধরে, আমরা অশ্ব পৃষ্ঠেই নিদ্রা যাই। অশ্বেরা আমাদের নিয়ে আসে এক অগমস্থানে, তখন সেই অশ্বেরাই এক থেকে বহু হয়ে, হয়ে ওঠে আমাদের রক্ষক। আমরা এতদিনের সাধনায় যা পারলাম না, তুমি যুবক, কী করে তা পারলেতুমি কি ছদ্মবেশী ইন্দ্র? যে সোমে ইন্দ্রের অধিকার ছিল কেবল, তা তুমি যখন পান করেছ, হে যুবক, এটা প্রতীয়মান, তুমি সাধারণ কেউ নও; তুমি অনন্য সাধারণ। আমরা শুনেছি আমাদের পূর্বতন জ্যেষ্ঠরা এই রস ঋষিদের সঙ্গে একত্রে বসে পান করতেন। ফলত তাঁরা দীর্ঘ জীবন, যৌনক্ষমতা লাভ করেন। নইলে অপ্সরাদের সঙ্গে ওভাবে ওই বয়সেও যৌনচর্চায় মাততে পারতেন না। আর এই নচ্ছার দেবতারা তোমার স্বরূপ বুঝতে না পেরে অহেতুক তোমাকে পীড়া দিয়েছে, ধিক এদের!

কিন্তু জ্যেষ্ঠরা, দেবতারা বলতে শুরু করলেন, ই লোকটা মিথ্যেবাদী, অহংকারী এবং অতীব ভন্ড। এর সঙ্গে আমাদের যা চুক্তি হয়েছিল, সেটা এ মানেনি। কথা ছিল, ও আমাদের অমৃত খুঁজতে সাহায্য করবে, বিনিময়ে ওকে আমরা অমৃতের  ভাগ দেব। কিন্তু ও তা করে নি। সবটুকু অমৃতের একাই পান করেছে। এবং আমাদের অমৃতের স্বরূপও বলেনি। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, ও এক সাধারণ পাণীয় পান করছে। ওকে শাস্তি প্রদান করুন, জ্যেষ্ঠরা

তোরা অর্বাচীন! গর্জে উঠলেন জ্যেষ্ঠরা। তোরাই মিথ্যে বলেছিস, তাই ধিক্কার তোদেরই পাবার কথা। তোরা কি বললি? ওকে অমৃতের ভাগ দিবি। একবারও কি কথা হয়েছিল, ও দেবে? তোমরা তো এই ধারণাই করে নিয়েছিলি, অমৃত যদি খুঁজে পেতে হয়, সেটা একমাত্র তোমাদের পক্ষেই সম্ভব, কোন মনুষ্যের পক্ষেই তা সম্ভব নয়। কিন্তু সেটা যে হতে পারে, তা ও করে দেখাল। বল তো, এখন ও দেবতার মর্যাদা পাবে না কেন? কেনই বা ওর থেকে আমরা শিক্ষা নেব না? আয়, বিদ্বেষ সরিয়ে আমরা ওর কাছে নতজানু হই

ই বলে জ্যেষ্ঠরা আমার স্তব করতে হাঁটু গেড়ে বসলেন, হে যুবক, তুমি বায়ুর মত সবত্রগামী, বেগবান, মেঘের প্রতি ধাবমান, বলের দ্বরা শত্রু নিহন্তাআমি তখন মনে করছি সেই সোম পানের কথা। আহা সোম! সে যে কি শক্তিদায়ক ও বলশালী পানীয়, তা মুখে বলে প্রকাশ করা যায় না। আমি সোম পান শেষ করতেই আকাশে মেঘের আনাগোনা শুরু হল এবং অনতি বিলম্বে বৃষরাশি নেমে এল ধরার বুকে। কর্মের দ্বারা জলযুক্ত, কর্মের দ্বরা পূজ্য এই সোম। আমি তৃষিত মৃগের মত সেই সোম পান করেছিলাম।

তাঁদের পিছনে সেই বমন উদ্রেককারী কাঁচুমাচু মুখের তিন দেবতা। আমি বিণীতভাবে বললাম, তে পারে আমি সেই ব্যাক্তি যে সোম পান করেছে, কিন্তু এটাও সত্যি, আপনারা আমার পূর্বপুরুষ। তাই হে জ্যেষ্ঠরা, আপনাদের এই স্তব বন্ধ করুন, আমার খুবই অস্বস্তি হচ্ছে।    

জ্যেষ্ঠরা আমার আর্তিতে কর্ণপাত করলেন না। মন্ত্রপাঠ সমানে চলতে থাকত। আমাকে দেবতার আসনে বসান জ্যেষ্ঠদের আমি দেখতে থাকি। তাঁদের মন্ত্র উচ্চারণে, মন্ত্রের ক্রিয়ায় আমি অবাক হয়ে যাই। দেখি যে, জ্যেষ্ঠরা বৃহৎ হচ্ছেন। তাঁদের উচ্চতা বেড়ে যেতে থাকে। পরে নিজের দিকে তাকিয়ে আমার ভুল ভাঙ্গে। আসলে ওঁরা নিজেদের উচ্চতা বাড়াচ্ছেন না, মন্ত্রের ফলে উচ্চতা কমে যাচ্ছে আমার। আমি নিজে ছোট হয়ে যাচ্ছি! উচ্চতা কমতে কমতে ধূলিকণার সঙ্গে মিশে যাবার উপক্রম! ওদিকে পিছনের দেবতারা তখন গলে গিয়ে মিশে যাচ্ছেন হলুদ আলোর সঙ্গে। জ্যেষ্ঠরা তাঁদের দিকে ফিরেও তাকালেন না। আমাকে ধারণ করার জন্য তাঁরা এক প্রাচীন কমন্ডলু পেতে দিলেন। আমাকে কমন্ডলুতে ভরে নিয়ে জ্যেষ্ঠরা অশ্ব পৃষ্ঠে আরোহণ করেন। আমার সামনে বাঁচার আর কোন পথ খোলা ছিল না। আমি প্রবেশ করলাম সেই গভীর জলের নীরবতায়। জলের দিকে তাকিয়ে দেখি সেখানে আশ্চর্যজনকভাবে জমে সোমরস! জেষ্ঠ্যরা জানেন না! এঁরা দেখছি অতীব অলস। দীর্ঘদিন ধরে শাসন ক্ষমতায় থাকতে থাকতে এতটাই অলস হয়ে গেছেন যে, কমন্ডলুতে অমৃত সঞ্চয় হয়ে আছে, দেখেননি। অনর্থক বাইরে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। আমি সেই রস পান করতে থাকি একটু একটু করে।  আর অবাক হয়ে লক্ষ করি, আমার দেহ আবার স্বাভাবিক হয়ে আসছে, আমি উচ্চতা ফিরে পাচ্ছি।

আমি কমন্ডলুর ভেতর থেকে নিজেকে জানান দিলে তাঁরা অশ্ব থামান। আমি কমন্ডলু থেকে লাফ দিয়ে নিন্মে অবতরণ করি। জ্যেষ্ঠরা আমার জন্য আলোক থেকে এক অশ্ব আহরণ করেন। আমি সেই অশ্ব পৃষ্ঠে আরোহন করি। অশ্ব চলতে শুরু করে। আমি তাঁদের পূর্বপুরুষ, তবুও তাঁদের আচরণ আমার কাছে পীড়াদায়ক। আমি জানি না জ্যেষ্ঠরা আমাকে কোথা নিয়ে যাচ্ছেন। আর কিভাবেই বা সোমের গুণকীর্তন করে কাব্য লেখা হবে।

এইভাবে কত সহস্র মুহূর্ত আমরা যে অশ্বপৃষ্ঠে কাটালাম, তা কোন হিসেব নেই। এখানে সর্বক্ষণ আলোক মাথা, আলোর প্রবাহ চলে। ক্রমে অশ্বের মন্দ্রাক্রান্ত্রা ছন্দে চলনে আমার ঢুলুনি আসে, ঘন ঘন হাই ওঠে, আমার প্রবল এক ঘুম পায় ও বুঝতে পারি আমি লুটিয়ে পড়ছি।

অশ্ব সেই স্থানে এসে দাঁড়ায়, যেখানে দেবতারা কোন এক মাহেন্দ্রক্ষণে ধর্ষণ করেছিল জলবালাদের। অনন্ত কুয়াশার পর সেটা স্থাপিত হয়ে আছে, স্ফটিক স্বচ্ছ জল; জলবালারা এখনো নগ্ন, তারা সেই জলের নিচে কেলি করে।  জ্যেষ্ঠরা  অশ্ব পৃষ্ঠ থেকে অবতরণ করেন। করজোড়ে জলের প্রান্তদেশে দাঁড়িয়ে বলেন, পনারা জলতল ছেড়ে উপরে আসুন হে জলবালারা। এখন আপনাদের অমৃতের ভাষ্য রচনা করতে হবে

জলবালারা জলের নিচ থেকেই উত্তর করে, যাঁরা বলছেন আমাদের ভাষ্য লেখার কথা, তাঁদের পরিচয় কী?

মরা জ্যেষ্ঠরা। আপনারা দয়া করে উঠে আসন, আপনারা ছাড়া এই অমৃতের ভাষ্য লেখা অসম্ভব

কিন্তু আমরা তো অমৃত কখনো দেখিনি

ই যে যুবক আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, ও জানে। ও পান করেছে অমৃত। ও আপনাদের বলে দেবে

কিন্তু ভূপৃষ্ঠে আমাদের নিরাপত্তা কে দেবে?

ই যুবক। আপনাদের ওপর যখন অন্যায় হয়, এই তখন প্রতিবাদ করেছিল। তাই ওর নাম বরুণ বিশ্বাস

জ্যেষ্ঠদের এই আশ্বাসে আমার হাই ওঠা বন্ধ হয়ে গেল। আমি অশ্ব থেকে নেমে দাঁড়ালাম। আমার আয়তন ক্ষুদ্র বলে হয়ত জলবালারা আমাকে দেখতে পাচ্ছে না, তাই বলে আমি তো আর মিথ্যে হয়ে যাইনি। কিন্তু আমার নাম তো বরুণ বিশ্বাস নয়! কোন জন্মেই তা ছিল না। আমি বরাবরই দেব অনুগামী হিসেবে পরিচিত ছিলাম। কারণ যখন যে পরিবেশে আমি জন্মেছি, সবক্ষেত্রেই ঈশ্বরের প্রতি এক অপার টান ছিল আমার। আর তাই বার বার দেবতারা আসে আমাদের বাড়ীতে পঞ্চব্যঞ্জন রান্না করেন, আমাদের আকাশের দরজা খুলে তাঁরা ছড়িয়ে দেন পঞ্চশস্য আর গব্যগৃত। কিন্তু এখানে তো তেমন নয়। এ কি তবে আমার অন্য জন্ম, অন্য পরিগ্রহ?

আমার মনোভাব বুঝে জ্যেষ্ঠরা আমাকে প্রবোধ দেন, হে যুবক, আমরা তোমায় অসন্মান করিনি। এদের উপর যখন অত্যাচার হয়, একমাত্র তুমিই প্রতিবাদ করেছিলে, পরিণাম স্বরূপ তোমায় খচ্চর হতে হয়। আর সকলেই এটা জানে সমস্ত প্রতিবাদীর নাম বরুণ বিশ্বাস। তুমি প্রতিবাদী, তাই তুমিও বরুণ 

নারীরা জলতল থেকে উঠে আসে। তাঁদের শরীরে আগ্নেয় মহিমা। স্তনের ভাস্কর্যে শতদল উন্মোচিত হয় এই আলোকে। বৃষ্টিভেজা হাস্নুহানার গন্ধ মুছে গিয়ে বাতাস আবিল হয়ে ওঠে চমৎকার নারীগন্ধে। তাদের জন্য তিনটি অশ্ব বাতাস থেকে নামিয়ে আনলেন জ্যেষ্ঠরা। আমরা একসঙ্গে চলতে শুরু করি সেই বনভূমির দিকে যেখানে অশ্বরূপে আমি সোম পান করি। সুউচ্চ লতা থেকে ক্ষরিত সেই সোম, যাকে আমি চিনতাম সাধারণ এক পাণীয়রূপে, যা আকাশ বাতাস ফাটিয়ে ঝরে পড়েছিল আমার মুখ গহ্বরে, যে তৃষ্ণা নেমেছিল সমগ্র বক্ষ জুড়ে, আমি প্রানপণে পান করে নিলাম।  

আমরা একত্রে সকলে চলতে শুরু করি সোমলতা অভিযানে। সকলেই নীরব। নির্জনতার এই স্বরহীন দ্যুলোকে মাথার উপর আলোকের স্তর ফাটে; পূর্ণিমার চাঁদ, মায়াবী সেই আলোকের আমরা স্নান সেরে গমণরত। এসময় দেখি, আমার পার্শ্বে আরও কিছু অশ্বারোহীর উপস্থিতি। এরা কারা? এদের কাউকেই চিনি না। এরা এল কেন? কি-ই বা চায়? কিন্তু ক্রমান্বয়ে তাঁদের সংখ্যা বৃদ্ধি আমাকে কেন জানি ভীত করে তুলল। বাকিদের কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। আরও কিছু পথ এগোলে আমি বুঝলাম, এদের থেকে আমার ভয় পাবার কিছু নেই। এরা সকলেই অমৃতের প্রত্যাশী।

অরণ্যের মধ্যে আমরা অবশেষে প্রবেশ করি। যে স্থানে আমি জল বা লতার রস ভেবে যা পান করেছিলাম, তা যে সোম ছিলঅমৃত, তা জানলাম অনেক পরে। এখন সেই লতার খোঁজে আমরা দলবেঁধে এসেছি, সকলে মিলে অনুসন্ধান শুরু করেছি, কিন্তু মিলছে কই? সোমলতা কেমন দেখতে তা  জ্যেষ্ঠরা চেনেন, বাকি কেউ চেনে না। আমিও যে চিনি তা নয়। তেষ্টার সময় একটা লতা ক্রমশ গলে গলে আমার মুখে চলে আসছে ফোয়ারার মত, আমি পানে আত্মহারা, কে আর লতার চেহেরা দেখে তখন। ফলে আমিও জ্যেষ্ঠদের অনুকরণ করে খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু ফল মিলল না। সকলেই হতোদ্যম হয়ে বসে পড়ল। জ্যেষ্ঠরা সেখানে দাঁড়িয়ে স্তব করতে লাগলেন, হে সোম, যে আনন্দ বরনীয়, যা দেবগণকে মত্ত করে এবং অন্ধকার নাশ করে সেই অন্ন্রূপ আনন্দরস ধারণ করে ক্ষরিত হও। 

কিন্তু কিছুই হল না। বাতাস যেমন প্রবাহিত হচ্ছিল, তেমনই হতে লাগল। বৃক্ষের পত্র, শাখা যেমন দুলছিল, তেমনই দুলতে লাগল।  বনের মধ্যে বসবাসকারী বন্যরা দূর থেকে আমাদের লক্ষ করতে থাকল। গোটা অরণ্য জুড়ে একটা যেন ছমছমে পরিস্থিতি। তাঁরা দ্বিতীয়বার স্তব করতে লাগলেন, হে সোম, তুমি দেবাভিলাষী হয়ে পবিত্র বেগে ক্ষরিত হও

কিন্তু এবারেও কোন ফল হল না। না কোন সোমলতা মাটি ফুঁড়ে উঠে এল, না কোন সোমরস দ্যুলোক থেকে ক্ষরিত হতে লাগল। এতদিন দেবতারা তবে কী করছিলেন, সেটাই এই অবস্থায় আমাকে বারেবারে ভাবাতে লাগল। ওঁনাদের শেষ দেখা যায় আমাদের উঠোনে, যেখানে অশ্বপৃষ্ঠে বসে তাঁরা হাই তুলতে থাকেন ক্রমাগ্রত। তারপর থেকে এতদিন যে তাঁরা নিঁখোজ ছিলেন, কোথাও খোঁজ মিলল না, যাও মিলল, সেখানেও তাঁরা গভীর ঘুমে। এতদিন তাঁরা অমৃতের জন্য কোন চেষ্টাই করেননি। কেবল অলসের মতো ঘুমিয়ে গেছেন। আর এখন আমাকে নিয়ে এসেছেন সমস্যার সমাধান করার জন্য। জলবালাদের বহন কররেভছেন কাব্য রচনার জন্য। আর সবক্ষত্রেই নাম হবে তাঁদের। কিন্তু মূল যে উপলক্ষ্য, সে সোম বা অমৃতের হলটা কি

নিজেদের মধ্যে গভীর আলোচনার পর তাঁরা আমাকে বললেন, বার যে তোমাকে আত্মহত্যা করতে হবে যুবক

কে! কী কারণে?

আমি বিস্মিত।

কথা তুমি বলতে পার না যুবক। আমরা জ্যেষ্ঠরা, যারা পৃথিবীর আদি শাসক, তাঁদের কথার অমান্য করতে নেই। তবুও তুমি যেহেতু যুক্তিবাদী, দেবসঙ্গ লাভ করেছ, তাই বলি, তোমাকে হত্যা না করলে সোম তোমার অন্তর থেকে নির্গত হবেন না। কারণ তুমি এটা নিশ্চয় বুঝেছ, কেবলমাত্র এই বনেই সোমলতা বেঁচেছিলেন। কিন্তু তাঁদের ক্ষরণের যে নির্দিষ্ট সময় আছে, সেই সময় তুমি এই স্থান দিয়ে পার হচ্ছিলে বলেই সেই অমৃতের স্বাদ তুমি পেয়েছ। আমরাও পার হয়েছি, কিন্তু  পান থেকে আমরা বঞ্চিত থেকেছি কারণ আমরা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম

হায়! গভীর ঘুম! আমি চিৎকার করে বলে উঠি, ই যে বারবার আপনারা ঘুমের দোহাই দিচ্ছেন, ঠিক করে বলুন তো, আপনারা কখনো অশ্ব থেকে নেমে সোম খুঁজেছিলেন? সেই থেকে সমানে কেবল নানা মিথ্যে কথা বলে যাচ্ছেন!

মাদের প্রতি তোমার এই উষ্মা ঠিক নয় যুবক। তুমি মনে রেখ, তুমি একজন প্রতিবাদী, তুমি বরুণ বিশ্বাস, তুমি বেশিক্ষণ জীবিত থাকতে পারবে না। প্রতিবাদীদের আয়ু সীমিত, গোটা পৃথিবী তাই জানে। তুমি না প্রাণ ত্যাগ করলে আমাদের উন্নতি সম্ভব নয়। তুমি সোম পান করেছ। সোম কেবলমাত্র শাসকের জন্য। মনুষ্য তা পান করতে পারে না। তাই তোমাকে হত্যা করা হলে তোমার দেহ থেকে যে অমৃত বার হবে, মাটিতে পরলে তা থেকে আবার নতুন সোমচারার জন্ম হবে। তুমি রাজি হয়ে যাও যুবক। অমর হবার এমন সুযোগ আর পাবে না তুমি। মহান দধিচীর কথা স্মরণ কর ও মৃত্যুর জন্ম প্রস্তুত হও।  

কিন্তু আমি তো আপনাদের উত্তরপুরুষ। সেই আমাকে হত্যা করতে আপনাদের হাত কাঁপবে না?

পৃথিবীর সকলেই আমাদের উত্তরপুরুষ। তোমাকে না হত্যা করলে আমাদের বিজয়গাথা সম্পূর্ণ করব কী করে? তারই জন্য তো জলবালাদের আনা। তারা তোমাকে নিয়ে গাথা লিখবে। যোগীর আত্মহননই কবির নৈর্ব্যক্তিকতা। আমরা তো জানি, তুমি কতখানি সত্যের নিকটতর। যিনি যতখানি নিজেকে সরিয়ে রাখতে জানেন, তিনিই ততখানি সত্যের নিষ্ঠ। আমরাই একেই বলি সামীপ্য। আর যে যত সমীপবর্তী, সে তত সাযুজ্য লাভ করে সত্যের। যোগী হবে বিষয়হীনতায় তন্ময়, জীবনধারণে উদাসীন। নির্বিষ শূণ্যই যোগীর বিষয়যার অপর নাম আত্মবিনষ্টি

জ্যেষ্ঠরা  বলতে থাকেন, মস্ত মানুষ জানবে শাসক বিরোধীশক্তি অসুরদের দ্বারা তুমি নিহত হয়েছ কারণ তুমি অমৃত বহন করছিলে কেবলমাত্র সাধারণ মানুষের জন্য। এক্ষেত্রে তুমি হয়ে উঠবে এক ঋষিপুরুষ। তোমার যে গৃহে দেবতারা আসছেন, তা হয়ে উঠবে এক আত্মদ্রষ্টা ঋষির আলয়। আমরা তোমার নামে এক নক্ষত্রকে চিহ্নিত করে দেব। ভেবে দেখ, তোমার এতদিনের এই সামান্য কেরানি জীবনে তুমি কি পেয়েছ মাথা নিচু করে বেঁচে থাকা ছাড়া? আমরা, জ্যেষ্ঠরা বলছি, তমার অমরত্বের কথা। সমস্ত শ্বেতপত্রে তোমার নাম লিপিবদ্ধ হবে

আমি চিৎকার করে উঠি, না। আমার দরকার নেই কোন অমরত্বের। আমি সাধারণ ছিলাম, সাধারণ হয়েই বাঁচতে চাই

জ্যেষ্ঠরা রাগত স্বরে বলেন, তুমি কী এতটুকুও বোঝো না, শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নেই? সমস্ত প্রতিবাদীর ভাষ্য একটাই, মৃত্যু 

মার কোন শাসক নেই, আমার কোন দেবতা নেইবলে পালটা চিৎকার করে উঠি। তখন দেখি সেই অরণ্যভূমি আর বৃক্ষে সজ্জিত নয়। প্রতিটি বৃক্ষের স্থলে দন্ডায়মান এক একজন প্রতিবাদী। সৌরভ চৌধুরী, বাপি দত্ত, তপন দত্ত।  জ্যেষ্ঠরা একযোগে প্রবল চিৎকার করলে অরণ্যর ভেতর তা যেন অনুরণিত হয় চড়াম চড়াম ঢাকের শব্দে। যেন জঙ্গলের কোন প্রাচীন অধিবাসী, যারা জ্যেষ্ঠদ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তারা নানা সাজে সজ্জিত হয়ে দৌড়ে আসছে আমাকে হত্যা করার অভিলাষে। তখন জ্যেষ্ঠরা তাঁদের ক্রোধ সম্মিলিত করে ছুঁড়ে দিলেন অরণ্যের মাথায়, ফট করে সেই ক্রোধ ফেটে গিয়ে সারা অরণ্য জ্বলে উঠল। পুড়ে যেতে থাকল যাবতীয় বৃক্ষেরা, আমার প্রশস্তি, আমার আর কোন বিজয় রইল না।  আমার মনে হল একদা এই ভাবে সেই সব শেয়ালেরা পুড়েছিল একদিন,  যারা প্রাক্তন এক অতি জেষ্ঠ্যর নিদ্রার ব্যাখাত ঘটিয়েছিল।

জ্যেষ্ঠরা বলতে থাকলেন, ই অগ্নি তোমার প্রতিবাদী রোগ নিবারণ করুক। সকলের পালক অগ্নি একে সুকৃতিলোকে নিয়ে যাক। হে অগ্নি, তুমি যে পুরুষকে এখন দগ্ধ করবে, তাকে দাহজনিত উষ্ণতা পরিহার করে, তাকে আবার সুখি কর। হে নবীন যুবক, তুমি অচিরেই এক মৃত পুরুষে পরিণত হবে, প্রতিবাদী অবস্থায় তুমি যে অন্ন ভোজন করেছ, তা ছাড়া আর অন্য অন্ন ভোজনে তোমার প্রবৃতি না থাকুক। তুমি এই অরণ্যেই বাস করবে। এখন আর তোমার কোন কাজ নেই

আমি বুঝে যাই আর নয়, এবার পালাতে হবে আমাকে। কিন্তু দৌড়ে আমি কতটা যেতে পারব? দুপা এগোতেই অগ্নি আমাকে ধরে ফেলবেন। তখন মনের মধ্যে কেউ যেন বলে, এইভাবে তুমি জ্যেষ্ঠদের থেকে পালাতে পারবে না। ওই অগ্নি বিদ্যুতের বেয়ে গিয়ে তোমাকে পুড়িয়ে খাক করে দেবে। তুমি বেঁচে থাকবে প্রেত হয়ে, স্মৃতি হয়ে। বরং তুমি ঘুরে দাঁড়াও। কিন্তু ধাবমান অগ্নির রোষ থেকে বাঁচব কিভাবে?

তুমি স্তব কর। সোমের স্তব

জানি না আমি, কোনদিন করিনি

কমাত্র সোমই তোমাকে বাঁচাতে পারেন। তুমি যেভাবে দেবতার স্তব করতে, তেমনি স্তব শুরু কর। তোমার সমস্যার কথা জানিয়ে প্রার্থনা শুর করে দাও এখুনি

মনে পড়ল, আমার উঠোনে দাঁড়িয়ে আমি প্রার্থনা করতাম, হে ত্রায়মান দেবতারা, আমাদের দ্বিপদ মনুষ্যাদি ও চতুষ্পদ গবাদি পশুদের রক্ষা কর। হে সর্বজিত দেব, আমাদের রক্ষার জন্য দেবতাকে দাও

আমি করজোড়ে বলতে থাকলাম, হে অগ্নি, আমি কখনও মিথ্যাচার করিনি অথবা ব্যর্থ দেবতাদের বহন করিনি, তবে কেন আমার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছ? জ্যেষ্ঠরা যেন দ্রোহশীল রাক্ষসের মত, তারা যেন কখনও আমাদের পরাভূত না করে। হে সোম, আমি সামান্য মানুষ, সদ্ভাব ও শুদ্ধত্ত্বরূপ পরম ধনের সাথে মানুষোচিত পৌরুষ প্রার্থনা করছি। এখন প্রার্থনাকারী আমি অগ্নির পাশ থেকে মুক্ত হব। হে, সোম, তুমি সুষ্ঠরূপে ব্যাপ্ত সৎকর্মের পরিচালকদের অগ্রগামী। হে সোম, তোমার যে রস ভূমিতে পতিত হয়, গ্রাবচ্যুত হয়, অভিষবণ ফলক থেকে অথবা অধবর্যুর নিকট থেকে কিংবা পবিত্র পাত্র থেকে স্খলিত হয়, মনের সংকল্পিত সে রস স্বাহা মন্ত্রে আহুতি দিচ্ছি। হে সোম, দ্যুলোক ও ভূলোক থেকে হনন সাধণ আয়ূধ এই জ্যেষ্ঠদের বিনাশ কর। এরা নিজেই অসত হোকশূণ্য হোক

তখনই প্রবল বারি বর্ষণ আরম্ভ হল। জোড়হাত করে বলি, মি জানি হে দেব, বর্ষণই তোমার ব্রত। বর্ষণের দ্বারাই তুমি সকল ধর্মকে ধারণ কর

বেগবান রস্মিদের সঙ্গে নিয়ে যে ভাবে জলরাশি ঝাঁপিয়ে পড়ছে মাটিতে, তাতে দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে জ্যেষ্ঠরা। তারা মিশে যাচ্ছে মাটির সাথে, জলকনাদের সাথে। অমৃতপ্রিয় সকলেই বৃষ্টির রেণু হয়ে যাচ্ছে। সমগ্র বন জুড়ে যে দাবানল সৃষ্টি হয়েছিল, তা নির্বাপিত হয়ে এসেছে বৃষ্টির প্রবলতায়। আমি জানি, হে সোম, তুমি বর্ষণের জন্যই অভিষিক্ত। হে সোম, তুমি সর্ব জগতের ঈশ্বর।

আমি গৃহে ফিরে আসি। লতারা ঘিরে ধরেছে আমার আলয়। উঠোনে বড় বড় ঘাস জন্মে গেছে। আমি তাদেরকে সরিয়ে কোনক্রমে একটু জায়গা করে নিয়ে রাত্রে শয়ন করি। সেই লতারা; যাঁরা সূর্যকে দ্যুলোকে স্থাপন করেছেন, জলের জন্য মেঘকে বিশেষভাবে প্রেরণ করেছেন, কবিদের শব্দের দ্বারা শুদ্ধীকৃত সেই সব লতারা আসলে সোমলতা। ক্ষুধা-তৃষ্ণা পেলে আমি সেই সোম পান করি। আর পরিশুদ্ধ সোম দ্যুলোক থেকে রশ্মি নিয়ে দেবগণকে উৎপন্ন করেন। সেই উৎপন্ন দেবগণ সোমপানের জন্য আমার দুয়ারে এসে নত হন। আমি অনুমতি দিলে তবেই তাঁরা সোম পান করতে পারেন।

আমি যে তাঁদের জ্যেষ্ঠ। 

 
 
top