মাটির তিলক

 

প্রতি ভোরবেলা মাঠে যায় সুকুমার। ফুলের পরাগমিলনের জন্য এ হল আদর্শ সময়। এছাড়াও জমিতে নানা কাজ থাকে। আর কাজ না থাকলে সে চুপ করে এক জায়গায় বসে থাকে। ভোরের মাঠ দেখে। এ তার অভ্যেস। এই মধ্যবয়সেও সে তার সেই অভ্যেস থেকে বিচ্যুত হয়নি। আর সেই অভ্যেসের বশেই দেখেছিল চটিপরা একদল উড়ন্ত পুলিশ। তারা মাথার উপর একঝাঁক ফড়িং এর মতো, সে যেখানে যায়, তার সঙ্গেই যায়। তার সঙ্গেই ফেরত আসে। দশ বছরের মেয়ের সাথে সুকুমার যখন খেলা করে, তখন তারা শূন্য থেকে খিলখিলিয়ে হাসে আর গান গায়।

এমনই এক ভোরবেলা একদল লোককে দেখল সে। নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, যুবক-যুবতী, শিশু-কিশোর মিলিয়ে জনা ত্রিশ। সুকুমার অবাক। এতগুলো লোক, এই ভোরে যাবে কোথায়? এসেছেই বা কোথা থেকে? সে অন্যদিনের মত প্রকৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে লোকগুলিকে দেখতে থাকল। দলটার বেশভূষা দেখে সে একটু থমকাল। প্রত্যেকের পোশাক তাকিয়ে দেখার মতো। মাঝে মাঝে গ্রাম থেকে দূরে স্থানীয় শহরের উপকণ্ঠে বানজারারা আসে। তারা গ্রামের ভেতর যাদুবিদ্যা প্রয়োগ করে, ছোটোখাটো শিকার করে, জড়িবুটি দেয়। সুকুমার পায়ে পায়ে এগিয়ে চলল দলটার দিকে। কাছাকাছি গিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, ই তোমরা কারা? এখানে কী করছ?

উত্তরটা তারা ছুড়ে দিল না। দলের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যাক্তিটি কাছে এগিয়ে এসে বিনীতভাবে বলল, মরা একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। ভোরের আলো ফুটলেই চলে যাব

যাবে কোথায়?

মরা স্বর্গর খোঁজে চলেছি

স্বর্গ!

হ্যাঁ। এদিকের পৃথিবীটা নরক হয়ে গেছে। আমরা তাই নতুন এক স্বর্গর দিকে চলেছি

সে স্বর্গ কোথায় বিমূঢ় সুকুমার প্রশ্নটা করেই ফেলল।

লোকটা শান্তস্বরে জানাল, জ্ঞে, আমরা সেটাই খুঁজছি

মি তোমাদের কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। যদ্দূর জানি এই পৃথিবী থেকে কেবলমাত্র একজনই জীবিত অবস্থায় স্বর্গ গেছিলেন। তিনি মহাভারতের যুধিষ্ঠির। এখন শুনছি তোমরা স্বর্গর খোঁজে চলেছ। তোমরা সকলেই কী জীবিত অবস্থায় স্বর্গবাসী হতে চাও?

সলে আমরা যেখানে দলবদ্ধ হয়ে বাস করছিলাম, সেটা আর আমাদের নেই। আমরা শোচনীয়ভাবে পরাস্ত হয়েছি। আমাদের দলে দুই শত লোক ছিল। বেশ কিছু মানুষ আমাদের বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর দলে নাম লিখিয়েছে। বাকিদের কচুকাটা করা হয়। আর আমরা এই কয়জন মাত্র প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছি

কোথায় থাকতে তোমরা?

খান থেকে পঁচিশ ক্রোশ উত্তর-পূর্বে

গ্রামের নাম কি?

মাদের গোষ্ঠীর নাম শিনোম

গোষ্ঠী! মানে?

মরা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে বাস করি। যে জায়গাটা পছন্দ হয়, সেখানেই ঘাঁটি গেড়ে তুলি। যেমন এখন নিজেদের এলাকা ছাড়ে নতুন এলাকার সন্ধানে চলেছি                                                                         

সুকুমারের বিস্ময় উত্তরোত্তর বাড়ছিল। আদতে এরা কারা? বৃদ্ধটি নাম বলেছে শংকর। মাথায় লম্বা এক ফালি হলুদ কাপড় পাগড়ি করে বাঁধা। গায়ে চিত্র বিচিত্র বিচিত্র পোশাক। এরা কী যাযাবর কোনো গোষ্ঠী?

কীভাবে আলাদা হয়ে গেলে তোমরা?

সুমালির নির্দয় ব্যবহারে। সে আমাকে হত্যা করতে চায়। আমি গোষ্ঠীপতি, আমাকেই! অথচ দেখ, আমিই ওকে দলে এনেছিলাম। নইলে ও অনাথ ছিল। এর দোরে তার দোরে ঘুরে বেড়াত। ওকে নানা নিয়মকানুন শিখিয়ে উপযুক্ত করেছি। ওর মধ্যে গোষ্ঠীপতি হবার ক্ষমতা আছে। কিন্তু সে তার বন্ধুদের কুপরামর্শে আর স্থির থাকতে পারছে না। আমাদের ঈশ্বর বলেন, অলস মস্তিষ্ক কুচিন্তার সহজ শিকার। হে, মানুষ, প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হোয়ো না। কিন্তু  সে কি এ সব শুনল? জুয়া খেলা পাপ, সে বন্ধুদের সঙ্গে তাই খেলা শুরু করল। পরিশ্রমলব্ধ সম্পদ ভোগ করার কথা যে ঈশ্বর নিজমুখে বলে থাকেন, তা সে মানল না। বরং আমি সে কথা বারবার বলি বলে,  আমাকে হত্যা করতে চায়! নিজে নেতা হয়ে বসতে চায়। সে তাই লড়াই শুরু করে জমি নিয়ে। গোপনে গোপনে একটা ছোটো উপগোষ্ঠী করে নিয়েছে। তারাই সব উর্বর জমি দখল করে নিচ্ছিল। যারা সেখানে কৃষিকাজ করছিল, তাদের বাধা দিচ্ছিল। আমার কানে খবরটা আসলে আমি ওকে ডেকে সতর্ক করে দিই। কিছুদিন পর আমার বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করে বসে

মিতে সে কি একাই ফসল ফলাবে?

সেখানে আর্যদের সাহায্যে ধাতুর তৈরি অস্ত্রের কারখানা গড়ে তুলতে চায়। এতে প্রচুর মুনাফা

বে চাষ হবে কোথায়?

না হবার কী আছে? আবাদি জমি তো আশেপাশে কম পড়ে নেই

কিন্তু তারজন্য তো সময় অনেক লাগবে

তাতে সে পরোয়া করে না। বর্তমান চাষজমিগুলির কাছাকাছি নদী আছে। সেখানে আমরা যব, গমের চাষ করি। সম্প্রতি আমরা ধান্যের চাষও শুরু করেছিলাম। এছাড়াও শূকর, বৃষ, মেষ, মহিষ চারণের জন্য উপযুক্ত জমি ছিল আমাদের। ফলে কারখানায় যা উতপন্ন হবে খুব সহজেই আগত আর্যদের কাছে তা পাঠিয়ে পয়সা কামাতে পারবে। বাকি জমিতে বাইরে থেকে শিখে আসা সোমলতার চাষ করবে। শুনেছি সেটা একাধারে ঐষধ, আবার মদ্যও। পাশে একটা ভালো লোক রাখেনি যে তাকে সুস্থ বুদ্ধি দেবে। পোড়ামাটির ফলকে ওর জন্য স্তবগাথা লেখা হচ্ছে। আর্যদের থেকে আনা ঘোড়ায় চেপে একদল লোক তার প্রচার করছে। ওর বিরুদ্ধাচারণ করায় আমাদের দলের সাতজন লোককে ও গোপনে খুন করে নদীর ধারে পুঁতে দেয়!

গোষ্ঠীর কয়েকজন ডুকরে উঠল। বাচ্চারাও সভয়ে কেঁদে ফেলল। সুকুমার অসহায় বোধ করল। শংকর বলতে থাকল, বে ও পার পাবে না। আমাদের দেবতা স্বয়ং শিব ওকে শাস্তি দেবেন। ও ক্ষয়রোগে মারা যাবে। পেট পচে যাবে। মাথার চুল উঠে যাবে। আমরা শান্তিতেই বাস করছিলাম। সুমালি আর্যদলে ভিড়ে যায়। সেখানে প্রচুর সুন্দরী মেয়ে ছিল, তাদেরই টানে। একবছর পর যখন সে ফিরে আসে, তখন থেকেই এমন সব বদবুদ্ধি নিয়ে সে খেলা করতে থাকে

এই বলে সিক্ত চোখে সেই বৃদ্ধ জোড় হাত করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে, দা সর্বত্র বিরাজমান তন্দ্রা নিদ্রাহীন সদা সজাগ প্রতিনিয়ত করুণাবর্ষণকারী সর্বশক্তিমান, হে প্রভু! আমরা শুধু তোমারই মহিমা স্মরণ করি। তোমারই জয়গান গাই। প্রভু হে! আমাদের সর্বোত্তম আত্মিকপথে আলোকিত পথে পরিচালনা করো। আমাদের হিংস্র শ্বাপদ হতে রক্ষা করো। পথে আমাদের ধূর্ত দস্যু হতে রক্ষা করো। আমাদের নতুন গোচারণ ভূমির সন্ধান দাও। আমাদের ভ্রমণের পথ সুগম করে দাও। আমরা যেন সবরকম সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকে অনুধাবণ করতে পারি

 

সুকুমারই কি ভাল আছে? এদিকে যাদের বড়ো রাস্তার ধারে জমি আছে, লাল চোখের কড়কানিতে তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে অনেকেই। বছর দুই আগে বিভূতি লাহার জমিতে একটা কারখানা হয়েছে। ডালডার। এত দূষণ যে,  পাশের নালাটার যে জলে সারা বছর চাষ হোত, এখন বিষাক্ত হয়ে গেছে। ওই জলেই স্নান করে মাথার সব চুল উঠে যাচ্ছে। গা খসখসে হয়ে যাচ্ছে। খানিক দূরেই সুকুমারের জমি। সে জানে খুব বেশিদিন আর এটাকে সে ধরে রাখতে পারবে না। জমি হাঙ্গরেরা লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চারিদিকে। সেদিন আর বেশিদিন নয় যখন তাকে জমি ছেড়ে দিতে হবে বাজারদরের চেয়ে কম দামে।

সব শুনে চুপ করে রইল শংকর। ব্যাথিত মুখে বলল, পুরানো যে সব জাতি, কৌম ছিল, তা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের মতো আরও অনেক গোষ্ঠী ব্যাক্তিসর্বস্ব হয়ে পড়ছে। আমাদের দেবতা শিব। কিন্তু সুমালি ইন্দ্রের পূজা শুরু করেছে। কিন্তু আমরা এমন নই। আমাদের দলের সবার মতপ্রকাশে স্বাধীনতা আছে। কেউ নিজের মতো অন্যের ওপর চাপায় না। কিন্তু তবু অনেক ছোটো ছোটো দলে ভাগ হয়ে যাচ্ছে আমাদের গোষ্ঠীগুলো। যে সততা আমাদের মূলধন ছিল, তা থেকে আমরা সরে এসেছি। এখন তোমাদের এদিকেও দেখি তেমন ব্যাপার। আমাদের লড়াই তবু আমরা সবাই মিলে লড়ছি। কিন্তু তুমি তো দেখি একা!

ড়ার হিম্মত আমার নেই। এ হল এক অসম লড়াই। এমন জোরালো পুঁজিবাদের সঙ্গে কোন কথা চলে না। কোনো প্রতিবাদ তাই হয় না। কলকাতার মানুষ কেবল মিছিল করে হেঁটে যায় হাতে মোমবাতি নিয়ে। আর আমরা সেই বধ্যভূমিতে নতজানু থাকি

শংকর দৃঢ গলায় বলল, যারা দখল নিল সব, তাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করে না?

প্রতিবাদের ভাষা ওরা জানে না

প্রতিবাদের তো কোনো ভাষা নেই! কেউ যদি চুপ করে রাজপথের একপাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘন্টা, সেটাও কিন্তু প্রতিবাদেরই এক ভাষা

রিবগুর্বোরা, চাষিরা কি প্রতিবাদের কথা বলতে পারে? পারে না। জানেই না! চাষির কথা চলে মাটি-ঘাস-ফসলের সঙ্গে; নদীর জল আর ভোরের শিশিরের সঙ্গে। গরিবেরা অন্নের সাথে কথা কয়। যে সব স্বার্থলোভী ইঁদুরের মতো মানুষেরা তাদের ভিটের আনাচ কানাচ দিয়ে ঘোরাফেরা করে, তাদের সঙ্গে কথা বলার কায়দা ওরা জানে না

কিন্তু স্বপ্ন? সেটা কি তারা দেখতে পারে?

রা যদি সত্যিকারের স্বপ্ন দেখতে পারত, তাহলে হয়তো ওদের মুখে ভাষা আসত। এমনকী ওরা উড়ন্ত চটিপরা পুলিশকেও দেখে না! আমি যখন ওদের নিয়ে কথা বলি ওদেরই মাঝে, তখন ওরা আগ্রহ ভরে শোনে। একা আমি বলি, ওরা শোনে, কেবলই শোনে। এখন বলা ছেড়ে দিয়েছি। কেবল দেখে যাই মোমবাতির মিছিল  

সুকুমার তাকিয়ে দেখল, সাদা কুয়াশার ভেতর দুটি অপূর্ব মেয়ে ঘুরে ঘুরে নেচে চলেছে। এরা উপজাতি সম্প্রদায়ের দুই সেরা সুন্দরী। শংকর গোষ্ঠীর দুই যুবক তাদের ভাগিয়ে এনেছে। কুয়াশার ভেতর ওদের দেখে সুকুমারের মনে হচ্ছিল, দুই পরি নেচে চলেছে।

সুকুমার বলল, প্রতিবাদ করতে ভয় পায়                                                                                 

য় নিয়ে তো বাঁচা মুশকিল। এই জন্যি কি তুমি কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝে উপর দিকে তাকাচ্ছিলে? উপর থেকে কেউ ভয় দেখাচ্ছে তোমায়? কে ? কী আছে উপরে?

টি পরা পুলিশ! শান্তিরক্ষক! তারা শূন্যে হাত ধরাধরি করে চক্রাকারে ঘোরে; কখনও হাততালি দিয়ে গান করতে করতে ঘোরে

মি খানিক আগেই তাদের গুনগুন করতে দেখলাম বটে। প্রথমে যে ভয় পাইনি তা নয়। কারণ অনেকে বলে আর্যরা আমাদের চেয়ে অনেক ভালো যাদু জানে। কিন্তু তারা পুলিশ ছিল? তারা এভাবেই এলাকার শান্তিরক্ষা করে?

য় পাওয়াটা আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। তোমাদের মতন করে বাঁচার কথা আমরা কল্পনাও করতে পারি না!

মাদের যা আছে তা হল অসগ। আমরা যে স্থানের লক্ষ্যে চলেছি তার পরিচিতি কিছুটা পেয়েছি অন্য এক গোষ্ঠীর কাছ থেকে। সে হল এক পাহাড়ের কথা। আগে সেখানে হিমবাহ ছিল। ফলে সে পাহাড় ছিল দুর্লঙ্ঘ্য। কিন্তু এখন খবর হল যে, সেই পাহাড় ডিঙ্গানো যায়।  অগস্ত্য গোষ্ঠীর লোকজন  এই পর্বতশ্রেণির মধ্যে এক সুপ্ত গিরিপথের সন্ধান পেয়েছে। আমার সঙ্গে যেমন সুমালি গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব, তেমনই বিশ্বামিত্রের সঙ্গে অগস্ত্যর ঝামেলা। তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বরফ গলে যাচ্ছে। আর সেই পথ দিয়ে স্বগের পথে পাড়ি দিচ্ছে অগস্ত্য গোষ্ঠী। তুমি কি আমাদের সাথে যেতে চাওঠিক যেমন ভূমি তুমি পছন্দ কর, যেমন গোষ্ঠীতে বাস করার কথা ভাব, তোমার সেই স্বপ্নের কোনো জগত নেই, সুকুমার?

ছে তো, আছে খুবই উৎফুল্ল হয়ে বলে ওঠে সে। যেন এতক্ষণ পর কথা বলার একটা মনোমতো বিষয় পেয়েছে। বলে, দেখি। কিন্তু তুমি যেমন বলছ, তেমনি না। তফাত আছে

মায় কী বলা যায়?

ক কালো নদীর পাড়ে আমি দাঁড়িয়ে। আমার দু-হাতে ধরা একটুকরো ভূমি। কর্ষিত, উর্বর জমি সেটা। তাতে সবুজ ঘাস, ঘাসফুল। নদীটি আমার চেনা নয়, সামনে যাবার কোনো পথ নেই, তবু আমি সেই স্বপ্নের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকি নদীর পাড়ে। আমার গন্তব্য কোথায়? কিছুই ভাবতে পারি না। তারপর দেখি নদীর জলে কালো একটি বিন্দু। সেটা এগিয়ে আসছে আমার দিকে। খানিক পর সেটা স্পষ্ট হল। একটা নৌকা। তাতে আমার পূর্বপুরুষরা। তাঁরা পাড়ে এসে আমার কাছে থেকে সেই ঊর্বর ভূমিখণ্ড চেয়ে নিলেন। তাঁরা আবার নৌকায় ফিরে গেলে নৌকা চলতে শুরু করল। আমি চিৎকার করে বলি, আমাকে নাও! আমাকে ফেলে যাচ্ছ কেন?তাঁরা কোন উত্তর করলেন না। নৌকা চলে গেল। মাথার উপর পাক খেতে লাগল একদল চটিপরা পুলিশ!

তুমি প্রথম কবে দেখলে এই পুলিশদের?

খন দেখলাম একদল লোক আমার জমির আশেপাশে ঘুরঘুর করছে, ডালডার জলে বিষাক্ত হচ্ছে আশেপাশের ভূমি, তখন থেকেই তারা আমার মাথার উপর পাক খায়   

কিন্তু তাতে এদেরকে এত ভয় পাবার কী আছে?

য় লাগবেই। যেখানেই জমি দখল হয়, সেখানেই এরা

ক্রমে সহজ এক সত্য আবিষ্কার করে সুকুমার। এই যে সব নিজের কথা না বলতে পারা মানুষের ঝাঁক, রাজা বদলায়, মানুষ কিন্তু থেকে যায় নিজের জায়গায়। ফলত শুরু হয় নিজের সঙ্গে যুদ্ধ। ভোরবেলা মাঠে নিয়ে যেত বাবা, কেমন ঝুলে রয়েছে আকাশ, এমন করেই বা মাটি স্থির; ওই দেখ, খোকা, মাটির আত্মা, এই সব। তবুও যখন মেঘ চলে, মনে হয় মাটিই বুঝি চলমান। এই মাটিতেই একদিন ধরিত্রীমাতার দর্শণ পেয়েছিলেন বাবা। বলতেন, খন নিজেকে একা মনে হবে, যখন মনে হবে, কেউ পাশে নেই, সর্বদা পরাজয়, তখন মাটির কাছে আসবি। মাটির গায়ে মুখ রেখে বর্ষার জলের মতো কাঁদবি

এসব কথার মানে তখন বোঝেনি সুকুমার। বয়স হয়নি বোঝার। কত কথা বলে যেত বাবা। নদীর জল, আকাশবাতাস, মাটি নিয়ে কথা হত কেবল। ফিরে আসার সময় মাটিকে গড় করে, কপালে মাটির তিলক কেটে ফিরত। আর কী আশ্চর্য! একটা আচ্ছন্নভাব ঘিরে ধরে তাকে। পৃথিবীর এক আলাদা অবয়ব, সেই যে বাবা বলত, পৃথিবীর একটা আলাদা রকম গন্ধ আছে। ঘরের ভেতর ঢুকে থাকলে যেমন সংসার সংসার গন্ধ বেরোয়, এখানে তেমন হল মাটির গন্ধ

আর কী আশ্চর্য, সে নৌকাটাকে ছুঁয়ে ফেলে। তাতে কোনো লোক নেই। খালের জলে দোলে। সুকুমার ভাবে, এটা নিশ্চয় স্বপ্ন নয়, সে ভাবছে। হ্যাঁ, সে ভাবতেই পারে এক ভাসমান নৌকার কথা। কিন্তু তার সেই পূর্বপুরুষেরাই বা কোথায়? নৌকায় চেপে বসল সুকুমার। নৌকা চলতে থাকল। দু-পাশের কেমন যেন শান্তির দৃশ্যপট। পাখিদের গান। নীল আকাশ। নানা পাতার গাছ। তেমনি এক গাছের নীচে ধরিত্রী মাতা দাঁড়িয়ে। হাতে সেই ভূমিখণ্ড। সুকুমার হাত বাড়াল, টি আমাকে দাও, মা। যত্ন করে রেখে দেব

সে যত এগোয়, ধরিত্রীমাতা তত পেছোতে থাকে। তা দেখে চটি পরা পুলিশেরা শূনয়ে উঠে হাততালি দেয়, গোল হয়ে ঘুরতে থাকে। সে ক্রমে হতাশ হতে থাকে। দেখে নৌকা তাকে নিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে। নামিয়ে দিচ্ছে সেই পূর্বতন পাড়ে।

এই ভোর মুহূর্তে সুকুমারের মনে হয়, এদের জীবনই ঠিক। আনন্দভূমির খোঁজে তারা সর্বক্ষণ চক্কর দিয়ে চলেছে। দৈহিক ক্লেশ তাদের চলার পথে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। শিব তাদের আরাধ্য। বৃদ্ধ শংকর তাকে চুপিচুপি বলে, মৃত্যুর পর আমিও পূজা পাব। আমাকে শিবের এক অবতার হিসেবে দেখবে। শিব ছিলেন আমাদের বহু পূর্বতন গোষ্ঠীপতি। দলের নিয়ম হল, যে গোষ্ঠীপতি সুষ্ঠভাবে দল পরিচালনা করে, সে শিবের সঙ্গে মিশে যায় এই বলে সে তৃপ্তির হাসি হাসল।  

 

তুমি এক কাজ করতে পাশংকর বলল। মাদের এক অলৌকিক শক্তি আছে। আমাদের ঈশ্বর শিব সেই অলৌকিক ক্ষমতা দিয়েছেন। তুমি তোমার মনটা আমাকে দিয়ে দাও। তুমি সব ছেড়ে আমাদের সঙ্গে যেতে পারবে না। যারা আমাদের সঙ্গে চলে আসতে চায়নি, সুমালি তাদের ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। এখন তারা গৃহহীন। তবুও সেই মাটির মায়া তারা ত্যাগ দিতে অপারগ। তাদের এক মেয়ে, নাম তাপসন্নিকা; সুমালির দলের লোকেরা ধর্ষণ করেপুড়িয়ে দিয়েছে; যাতে সেই প্রতিবাদী মেয়ের থেকে আর কোনো প্রতিবাদী জন্মাতে না পারে। তবুও তারা ঘরদোরের মায়া ত্যাগ দিতে পারেনি। মাটির মোহ বড়ো সাংঘাতিক!

সে বলে চলে,  জন্য বলি, তোমার পলায়নপর মনটিকে আমাকে দিয়ে দাও আমার এই ঈশ্বরের ঝোলায়। তারপর আমাদের সঙ্গে সেই মন ঘুরুক না স্বর্গের খোঁজে। তুমি যে ধরনের মাটি চাও, সেখানেই বসতি গড়ে তুলব আমরা। তুমি গাছ লাগাও, ফল পাও, পাখিরা আসুক, ঝর্না আপন মনে বয়ে চলুক নদীর পথে। মন চলে যায় আকাশে, পাতালে সাগরে পাহাড়ে। মনকে নিয়ে আসো নিজেরই অন্তরে। যেন তা থাকে তোমারই নিয়ন্ত্রণে। স্রষ্টার প্রেমের অমিয়ধারা প্রবাহিত হোক আমাদের অন্তরে, আমাদের শিরায় শিরায়। তাহলে আমরা সকল প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারব প্রশান্ত প্রত্যয়ে

আহা, সোনার বাংলা! ঞ্জান হওয়া ইস্তক এই কথাই শুনে আসছে সে। জমি আগলে রাখার জন্য কত কৃষক প্রাণ দিচ্ছে, আত্মহত্যা করছে, অত্যাচারিত হচ্ছে, চটি পরা পুলিশেরা তাদের গুলি করে মারে কুকুরের মতন! তারা সকলে গণধর্ষণের শিকার হয় বহিরাগতের হাতে! রাজা তখন বেহালা বাজায়। তারপর? যখন রাজা যায়, রাজা আসে, সব শান্ত হয়ে আসে, পাখি ডাকে; সেই পুরাতন শবেরা চায় স্বর্গের ভূমি, রাজা তখন পাশ ফিরে শোয়। তখন চটি পরা পুলিশেরা পড়ে থাকা বেহালা তুলে নেয়।

নিজের দিকে তাকিয়ে সুকুমার দেখল, হ্যাঁ, সে এবার তার পলায়নপর মনটিকে দিতে পারে এই গোষ্ঠীপতির হাতে। একটা এমন মন তার ভেতর আছে, যেন এই প্রথম সে তাকে চিনতে পারল! সে বলল, ই নাও আমার মন। এইবার?

ইবার এই মন নিয়ে আমি চলা শুরু করব। অবশেষে আমরা খুঁজে পেলাম তেমন এক স্থান, যা আমরা খুঁজছিলাম। সেখানে কোনো অশান্তি নেই। সেখানের মানুষেরা প্রকৃতির সঙ্গে বাস করে। তাহলেও আমরা এক স্থানে গিয়ে আটকে গেলাম। তখন আকাশ থেকে জ্যোর্তিময় সব ঋষিরা নেমে এলেন। আমাদের পথ দেখাতে লাগলেন তাঁরা। তুমি কি দেখতে পাচ্ছ সেই ভবিষ্যতের পথ?

কী আশ্চর্য! স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সুকুমার। কাঁচা মাটির উঁচুনিচু রাস্তা ধরে সে এগিয়ে চলেছে। চারিদিকে সবুজ হয়ে আছে। গাছে গাছে পাখি উড়ছে। বাতাসে মিষ্ট গন্ধ। এইভাবে এক অবাক করা অনুভূতির ভেতর ঢুকে যেতে লাগল সুকুমার।

শংকর বলে, বার স্বর্গীয় জ্যোতি ও আনন্দ উপলব্ধির প্রতীক ওম স্থাপিত হোক তোমার হ্রদয়ে অনন্তকালের জন্য। হে নেতা! হে পুরোধা! ঈশ্বরের গুণাবলিতে গুণান্বিত হও। দাসে পরিণত হোয়ো না। তোমার গোষ্ঠীপতি যদি তোমাদের ভুল পথে চালনা করে, তাহলে সেই গোষ্ঠীপতিকে রাখার দরকার কী? তাই হে নেতা! হে পুরোধা! পাহাড়ের মতো দৃঢ় ও সাহসী হও। কর্তব্য পালনে সবসময় অবিচল থাকো। হে চটিপরা পুলিশের দল, তোমরা এই নবীন নেতার মস্তকে পুষ্পবর্ষণ কর

একটু একটু করে আলো আসতে থাকে। ক্রমে কুয়াশার প্রলেপ কেটে গিয়ে প্রকট হয়ে উঠবে সূর্য। তার আগেই শংকর গোষ্ঠীর সবাই একত্র হয়েছে। যারা পরির মত নাচছিল, সেই মেয়েরাও শান্ত হয়ে দলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে। শংকর বললে, বার আমরা যাই। সুমালির বাহিনি আমাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে। এখন দূরে চলে না গেলে বিপদ। এই দেখো আমাদের দেবতা শিবের মূর্তি। পাথরের। এঁর কাছে প্রারথনা কর, যেন আমাদের মন্সকামনা সফল হয়। হে প্রভু, আমাদের সর্বোত্তম সম্পদ দান করো, দান করো কালজয়ী মন, আত্মিক সুষমা, অনন্ত যৌবন, আলোকজ্জ্বল রূপ আর মধুর বচন

তারপর হাঁটু গেড়ে বসে গোটা দলটা জোড়হাত করে আকাশের দিকে মুখ তুলে প্রার্থনা করতে লাগল : হে বরুণ, আমাদের উপরের পাশ খুলে দাও, নীচের পাশ খুলে দাও। হে আদিত্য, অমৃতস্বাদের জন্য আমরা প্রমাদরহিত তোমার কর্মে নিযুক্ত থাকব। হে সোম, তোমার ক্ষরণের দ্বারা কৃত যে জল আমরা সংগ্রহ করি, তা যেন চিরকালই করতে পারি। মিত্র, বরুণ, অদিতি, সিন্ধু, পৃথিবী এবং দ্যুলোক আমাদের পূজা গ্রহণ  করুন। হে পূষণ, আমরা তোমার সাহায্য প্রার্থনা করি। তুমি আমাদের পূর্বপুরুষদের যেরূপ পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছ, আমাদেরও সেরূপ নিয়ে চলো। হে চটি পরা ঈশ্বর, তোমরা আমাদের নিরাপত্তা দাও

এই সময় যদি কেউ মাঠে থাকে, দেখবে, হাঁটু গেড়ে বসে জোড় হাতে সূর্যস্তব করছে সুকুমার। যখন দিনের প্রথম আলো তার মুখে পড়বে, সে কপালে টেনে নেবে মাটির তিলক।

 
 
top