মৈত্রেয়র গমন পথ

 

তিনজন দেবতা একসময় আকাশ থেকে নেমে এলেন। দেখলেই বোঝা যায় তাঁরা খুব লাজুক প্রকৃতির দেবতা। গায়ের রঙ দুধের মত ধপধপে সাদা। মুখটা বড়, চ্যাপ্টা নাক চ্যাপ্টা। চওড়া কপাল। মাথায় খুব অল্প চুল পেতে আঁচড়ানো। পরনে সাদা ধুতি ও সাদা ফতুয়া। তাঁরা এতটাই লাজুক যে আমাদের কাছে আসতেই চাইছিলেন না। কেবল পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। ঋষি মহারাজ ওঁদেরকে জোর করে আমাদের কাছে পাঠালেন। তাঁকে আমি বলেছিলাম, ই স্থান ছেড়ে আমি ঘরে ফিরতে চাই, পথ বলে দিন শুনে তিনি ধ্যানস্ত হলেন। মিনিট তিনেক পর চক্ষু খুলে আমাকে বললে, না আপনি এখন যে মার্গে আছেন, সেখান থেকে কীভাবে বাড়িতে ফিরবেন, তা আমি জানি না। অপেক্ষা করুন। ভগবান এখানে আসবেন। তিনিই পথ বলে দেবেন। ততদিন পর্যন্ত এখানে অপেক্ষা করতে হবে। তিন দেবতা এখন বেড়াতে গেছেন। তাঁরা ফিরলেই খবর পাবেন

সেই মত দেবতারা ফিরলে তিনি আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরা এসেই বলতে থাকলেন, ই মন্দিরটি আমাদের নয়। কালভৈরব কৃপা করে আমাদের এই মন্দিরে বসবাসের অনুমতি দিয়েছেন। মন্দিরের কড়িকাঠে আমরা বাদুড় হয়ে বাস করি

পনারা গেছিলেন কতদূর?

প্রথম দেবতা: আসলে এখন এত গরম যে পাথর সব সময় তেতে থাকে। আমরা মন্দির থেকে বেরুতেই পারি না। রোদ পড়লে আমরা একটু উড়তে বেরুই। কেবল উড়েই আমরা বেড়াই না। আমরা গ্রাম খুঁজতে বেরুই। বৈদিক যুগে আমাদের খুব চল ছিল। লোকে মান্য করত। মন্দির গড়ে দিত। সে সময় আমাদের অবস্থাও ভাল ছিল। কিন্তু পরে আমাদের অবস্থা এমন পরে যায় যে লোকে আমাদের কথা ভুলে যায়। বিশেষত গৌতম বুদ্ধ আর্বিভূত হবার পর থেকেই আমাদের এই প্রান্তিক অবস্থা।

দ্বিতীয় দেবতা: যদিও আর বুদ্ধের চল নেই, কিন্তু তবুও আমরা সেই হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে পারিনি। তাই ওড়ার ছলে আমরা এক এক গ্রামে যাই, নিজেদের পরিচয় দিই। তাদেরকে আমাদের পূজা শুরুর কথা বলি। তেমনই একটি গ্রামে আমরা গেছিলাম। সেই গ্রামটি বসিয়েছিলেন এক রূপসী নারী। তার নাম রূপাঞ্জনা। প্রথমদিকে সেই নারী সে গ্রামে একাই বাস করতেন। পরে পরে তার রূপের টানে আরও মানুষ এসে হাজির হয়। একদিন ঘুরতে ঘুরতে আমরা সেখানে হাজির হই। আমরা হিসেব করে দেখি, যদি এই সুন্দরী নারীটিকে হাত করতে পারি, আমাদের পূজা পেতে অসুবিধা হবে না। কিন্তু সেই গ্রামটি ধ্বংস হয়ে যায় যখন রূপাঞ্জনা নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।

স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। এই রূপাঞ্জনার প্রেমে আমি একদিন নিজের আত্মীয় স্বজনদের না অনুমতি নিয়ে চলে এসেছিলাম। ইচ্ছে ছিল, ওর সঙ্গে বসবাস করব। একই সঙ্গে, একই গ্রামে একই জীবন যাপন করব। সেখানে বসবাসও শুরু করেছিলাম। রূপাঞ্জনা নিরুদ্দেশ হলে তাকে খুঁজতে অন্যদের সঙ্গে আমিও বেরিয়ে পড়ি। ক্রমে এক এক জন করে নানা পথে ভাগ হয়ে গেল। আমি এমন স্থানে এসে পরলাম যে, সেখানে আর কেউ নেই। আমি একা পথ হাঁটি। তখন দেখা হয়, এক আত্মার সঙ্গে।

ঋষি মহারাজ যোগ ব্যায়াম করা শুরু করেছেন। তাঁর শ্বাসের উত্থান পতনের শব্দ পাচ্ছি। তাঁর কাছে আত্মাটা এসেছিল, সে আবার কবে জন্ম নিতে পারে, সেই কথা জানতে। আর তার কথায় ঋষি মহারাজের কাছে আমি এসেছিলাম এই কারণে যে, আমি ফিরে যেতে চাই। এখানে কোন মানুষ বাস করে না। পাহাড়ি স্থানে যা সব বাসস্থান আছে, সে সব হল আত্মাদের ঘরবাড়ি। তাদের মধ্যে এই আত্মাটা এখানে বাস করে। সে পুনঃজন্মর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

বললাম, রূপাঞ্জনা গেছে কোথায়?

তৃতীয় দেবতা: জানি না। তাকে আমরাও অনেক খুঁজেছি। পাইনি। তবে তার মত নারী যে পৃথিবীতে থাকতে পারে, তা আমাদের ধারণাই ছিল না। আগে আমরা অপ্সরীদের সম্ভোগ করতাম। কিন্তু তাদের চাহিদা প্রচুর। আমাদের পুজোপাঠ বন্ধ হয়ে যেতে তাদের চাহিদা মত উপঢোকন দিতে না পারায় তারা আর আমাদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করত না। সেই থেকে আমরা নারীহীন জীবনে কাতর হয়ে যাচ্ছিলাম। একদিন আমাদের যৌন উত্তেজনা এতই বৃদ্ধি পায় যে, আমরা নিজেরাই নিজেদের ব্যবহার করতে শুরু করি। এ সময় রূপাঞ্জনাকে আমরা আবিস্কার করি। একদিন প্রস্তাব দিতেই সে আমাদের সঙ্গে যৌনজীবন যাপন করে। তাকে আমরা তিনভাগে ভাগ করে নিই। তার তিনটি রূপ আছে। রূপাঞ্জনা, রূপজান, সহজসুন্দরী। সেই এক নারীকে তিন করে সম্ভোগে মাতি। আমাদের মনে এতদিনের যে তৃষ্ণা জমে ছিল, তা এই সাতদিনে দূর হয়ে যায়। তারপরই সে আত্মগোপন করে পরে শুনি সে নাকি এক মৃগীর রূপ ধারণ করেছে। সে কোন এক বনের ভেতর প্রতীক্ষা করছে গৌতম বুদ্ধের।

আমি বলি, তিনি আসছেন কিসে?

প্রথম দেবতা: এক ফকিরের নৌকায়। বামিয়ান তো এক নদীর নাম। সেই নদী বেয়ে ভেলায় তাকে নিয়ে আসছে এক মাদারি ফকির। পাতলা চেহেরার সে ফকিরের এক বুক কাঁচাপাকা দাড়ি, ঢুলুঢুলু চোখ, মুখে স্মিত হাসি। সে বুদ্ধকে নিয়ে আসবে মোগলমারী। সেখানে যেতে হলে এই পথ দিয়েই যেতে হবে। সেই ফকিরের নাম লাদেন ফকির।

আমি পিছনের দিকে তাকালাম। সাধুজী ব্যায়াম করতে করতে কখন যে স্থির হয়ে গেছেন তা আমরা কেউই খেয়াল করিনি। আমরা যখন দেখলাম, তিনি সলভাসন রত। সেই অবস্থাতেই তিনি বহুক্ষন স্থির। আমরা তাকাতেই তিনি উঠে দ্রুত ঘুরে গিয়ে তিনি চললেন পাহাড়ের শেষ মাথায়। কী হল ভেবে আমরাও পিছু পিছু গেলাম। মহারাজও কিছু বললেন না। তিনি কী কারণে ঝাঁপ দিতে চাইছেন?

কিন্তু না। তিনি সে সব কিছুই করলেন না। পরণের একমাত্র কৌপিনটা খুলে ফেলে দিলেন। দুহাতে চেপে ধরলেন লিঙ্গ। তাঁর বির্যপাত হতে দেখলাম। আলোকজ্জ্বল সেই বীর্য সোজা গিয়ে পরল খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর জলে। সঙ্গে সঙ্গেই পাহাড় জুড়ে এক প্রবল কম্পন শুরু হল। কিছুদিন আগেই এই এলাকায় এক ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়ে গেছে। দশহাজার মানুষ মারা গেছে তাতে। প্রবল প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে সেই ভূমিকম্প মানুষের তৈরী কিনা তাই নিয়ে। আমরা ভীত হলাম। সত্যি যদি আবার ভূমিকম্প হয় তো বাঁচার কোন রাস্তা থাকবে না।

দেখি তিন দেবতা পাথরের উপর উপুড় হলেন। আমিও তাদের অনুসরণ করলাম। তাঁরা ফিসফিস করে বললেন, য় পেও না। কিছু হবে না। মহারাজ আমাদের কথাবার্তা শুনে ফেলেছেন। তাঁর দেহ তাই উত্তেজিত হয়েছে

আমিও চুপিচুপি বললাম, ত কাঁপছে যে? মনে হচ্ছে গোটা পাহাড়টাই ধ্বসে যাবে

প্রথম দেবতা: দেখলে না সাধুজী বীর্যপাত করলেন। নদীর সঙ্গে তার মিলন হল। এমন মিলন ঘটলে পরক্ষণেই এক রূপসীর জন্ম হয়। এটাই নিয়ম। কম্পন থামলে আমরা যাব পাহাড়ের নিচে। গিয়ে দেখব এক সুন্দরী রূপসী কন্যা নদীর ধারে পাথরের উপর বসে আছে।

দ্বিতীয় দেবতা: তার দিকে তুমি হাত বাড়াবে না

আমি বললাম, সে না হয় হাত বাড়ালাম না। কিন্তু তাকে ছেড়েই বা দেব না তোমাদের হাতে, সেটাই তো বুঝলাম না

তৃতীয় দেবতা: কারণ আমরা দেবতা। এমন ভোগের অধিকার আমাদের আছে। আমাদের দেবসমাজে স্বীর্কিত। তুমি জান না, দেবরাজ ইন্দ্রের নারী গমনের কাহিনি? অহল্যার কথা শোননি? এক সামান্য মানুষ হয়ে দেবতার কাম্য বস্তুতে তুমি হাত দিতে চাও কোন সাহসে?

ঋষি যখন পাথরে পদাঘাত করলেন, তখন কম্পন থামল। অমনি তিন দেবতা চুপিসাড়ে মানুষের হাড় দিয়ে তৈরী সেই সিঁড়ি বেয়ে খুব দ্রুত নামতে থাকল। এই সিঁড়ি বেয়েই আমি উঠেছিলাম পাহাড়ের চুড়োয়। আত্মাটা আমাকে নিয়ে এসেছিল। সে তার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে তার আত্মাগ্রামে ফিরে গেছে। আমি যেতে পারিনি। আর এখন দেবতাদের পাল্লায় পরে নিচে নামতে হচ্ছে। তাদের আমি এতটা গুরুত্ব দিতাম না, যদি না ঋষি বলতেন, এই দেবতারাই আমাকে ফেরার পথ দেখাতে পারেন, অন্য কেউ নয়।

মাটিতে নেমে তারা তিনজন নদীর ধারে পৌঁছে গেল। আমি তাদের পিছনে। দেখি পাহাড়ী নদীটা বইছে না আর। জল স্থির। বাতাস বন্ধ। আকাশের কোনে দু একটি তারা দেখা গেলেও তারা কেমন যেন মেদুর। একটা মেঘ সেই নদীর বুকে স্থির হয়ে গেল।

প্রথম দেবতা: এমন হবার তো কথা নয়। তবে কি সুন্দরী নারীকে অন্য কেউ হরণ করে নিয়ে গেল?

আমি এবার বললাম, নিশ্চয় কোন কামুক দেবতা?

দ্বিতীয় দেবতা: ইন্দ্রের কথা বলছ? সে মনে হয় না এত তাড়াতাড়ি খবর পাবে।

তৃতীয় দেবতা: তাহলে সেই কন্যা গেল কই?

কিন্তু জল বইছে না কেন? কেন স্থির হয়ে আছে এই পাহাড়ি নদী? আমি যেই জল ছুঁই অমনি সে ফেটে যায়। জলের উপরিস্তরে যে পুরু প্রলেপ পরেছিল, সেটা প্রবল শব্দে ফেটে ছিটকে বেরিয়ে আসে এক জলহরিণ। পরে তার পিছনে একটা তারও পিছনেকয়েক লক্ষ হরিণ! একের পর একটা জল হরিণ, তাদের ফসফরাস মাখানো গায়ে সন্ধ্যার অন্ধকার দূরীভূত হল। দেবতারা মুখ ব্যাদান করে বললেন, ছ্যা, শেষে কিনা ঋষি এতগুলি হরিণ জন্ম দিলেন! ভাবা যায় না। মুনি ঋষিদের তপস্যার বল এখন কত কমে গেছে! তাঁরা আর সুন্দরীর জন্ম দিতে পারছেন না।

আমি বোকার মত তাদেরকে বললাম, ই তোমরা কারা?

প্রথম হরিণ: কেন? দেখছ না, আমরা হরিণ? আমরা এখানে এসেছি ভগবানের সাহচর্য পেতে। তিনি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এখানে এসে উপস্থিত হবেন।

আমি বললাম, কে তোমাদের ভগবান?

দ্বিতীয় হরিণ: কেন? বুদ্ধ। তিনি আসছেন বামিয়ান থেকে। সেই বামিয়ান নদী, যা গিয়ে মিশেছে আমুদরিয়ায়। হিন্দুকুশ পর্বতমালার এক ঢালে এই আমুদরিয়া এবং সিন্ধুনদের মাঝে এক প্রাচীন জনপদনাম, বামিয়ান।

তৃতীয় হরিণ: এখানে একটা সম্মেলন হবে। কেন বুদ্ধর ধর্ম মুছে গেল এদেশ থেকে, তাই নিয়েই এক আলোচনা। মহাসাংঘিকদের সঙ্গে স্থবিরবাদীদের মিলন। আমরা, সকল হরিণেরা সংসারী। তাই আমরা মহাসাংঘিকদের প্রতিনিধি। সেখানে আপনারা স্থবিরবাদী।

আমি জানতে চাইলাম, কোথায় হবে তোমাদের সেই আলোচনা?

প্রথম হরিণ: ওই বনের ভেতর।

দ্বিতীয় হরিণ: ওখানে এখন সাজোসাজো রব। ওখানেই আছে রূপাঞ্জনা নামে এক নারী। বারনারী। এখন প্রব্রজ্যা নিয়েছেন। তিনিই সব একা হাতে সামলাচ্ছেন। সঙ্গে আছে সুজাতা। তিনি সকল আমন্ত্রিতদের পরমান্ন প্রস্তুত করে খাওয়াবেন।

তৃতীয় হরিণ: কিন্তু তুমি কে? কী করছ এই পাহাড়ের দেশে। তুমিও চলো, শপথ নেবে।

মি, কিসের শপ?

প্রথম হরিণ: জীব হত্যা করবে না।

দ্বিতীয় হরিণ: সৎ মার্গে জীবন চালাবে।

তৃতীয় হরিণ: মিথ্যে বলবে না।

আমি উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে উঠি, গালভরা এইসব কথা বলে আপনারা খুব বাহাদুরি দেখাচ্ছেন না? মিথ্যে বলব না বললেই কী বলা যায়? তাহলে জগত চলবে কী করে? জগত কি সত্যি কথায় চলে? যে সত্য বলে, রাজশক্তি তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করে আপনারা জানেন না? তাদের রক্ষার জন্য আপনারা কি করেছেন? কতটা সময় দিয়েছেন? কেবল ঠান্ডাঘরে বসে এমন সব ভাবের কথা আউড়ে চলেছেন। এটা জেনে রাখুন, যে যত মিথ্যে বলে, সে সবচেয়ে বেশি সত্য বলে। আমার কথা বিশ্বাস না হয়, এই দেবতাদের জিগাসা করে দেখুন। আপনারা বলেন, দুঃখ নিরোধ সম্ভব। আমি তা বলি না। দুঃখ নিরোধ সম্ভব নয়, কেন মানুষ এমন এক জীব যে দুঃখ পেতে চায়, দুঃখ তাকে উজ্জীবীত করে রাখে। মানুষ দুঃখ কে জিইয়ে রাখতে ভালভাসে, কারণ তার যে ফল পাকে, সেটা মিষ্ট। দুঃখের নিরোধ এক অলীক কল্পনা মাত্র। সৎ বা অসত, শাশ্বত বা অশাশ্বত কোন মতবাদই চরম নয়। কোন বিচক্ষণ ব্যাক্তি কখনই চরম মত ব্যক্ত করেন না, যা আপনারা করেছেন।

র বাকি রইল মিথ্যে আচরণ। যখন পাড়ার ছেলেরা, যারা রাজশক্তির ভরে রাজার দলে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিল, তারা ভগবানের স্মরণে আসতে চাইলেন কিছু সুরাহা হবে বলে; তিনি তখন কি বললেন, ওদের নিলে চলবে না। রাজ্য রক্ষা হবে না। একইভাবে, যারা রাজার লেঠেলবাহিনী দ্বারা অত্যাচারিত, তারা চাইল, কিন্তু তাতেও তিনি বাধ সাধলেন। কেন? রাজশক্তির ভয়ে। তাদের তুষ্ট রাখার জন্য। বিনিময়ে কী পেলেন? অবাধ প্রচারের সুযোগ। এইভাবে রাজশক্তির পরোক্ষে সুবিধা নিয়ে বুদ্ধ কি একটুও মিথ্যাচার করেননি? যিনি একদা ঘোষণা করেছিলেন সাধারণ মানুষকে রক্ষা করবেন, তিনি শেষ পর্যন্ত শাসকের সঙ্গে রফা করে ফেললেন!

প্রথম হরিণ: তোমার নাম কী?

আমি জানালাম, ই মুহূর্তে আমার কোন নাম নেই। আর নামের কোন প্রয়োজনও নেই। নাম ছাড়া আমি দিব্যি আছি

দ্বিতীয় হরিণ: তুমি কোথা বাস কর?

ই মুহুর্তে আমার কোন বসবাসে স্থান নেই। আগে যেখানে থাকতাম স্ত্রী-পুত্র-পরিজন সহিত, তাদের ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি কতদিন হয়ে গেল। কোন এক নদীর ধারে আমার ঘর ছিল। হতে পারে সে নদীর নাম রোহিনী বা কুশি বা ঘিয়া। সে যাই হোক, নদী তো নদীই। তার নাম না থাকলেও চলে

তৃতীয় হরিণ: তুমি কতদিন ঘর ছেড়েছ?

আমি বললাম, তার কোন হিসেব নেই। যে কারণে ছেড়েছিলাম, সেটিই আমার চেয়ে অনেক দূরে সরে গেছে। যার জন্য ঘর ছাড়া, তাকে না পেয়ে মনে অনেক দুঃখ জন্মেছিল। মনে হত, এমন সত্যিকারের দুঃখ আর নেই। এমন করে যে কেউ কোন দুঃখের কারণ হতে পারে, তাও আমার জানা নেই। পরে পরে মনে হতে থাকল, এই যে আমি দুঃখ পাচ্ছি, মন থেকে এই যে বিশাল পরিমান দুঃখ উৎপত্তি হচ্ছে তার একটি হেতু আছে। আরও অবাক হলাম যখন অনুভব করলাম, সেই দুঃখ বদলে যাচ্ছে শ্রদ্ধায়। তখনই ঠিক করি ঘরে ফিরে যাব। এবার আমার সময় হয়েছে

প্রথম হরিণ: এবার আমরা বুঝেছি, তুমিই সেই। এই যে সব কিছুই তুমি ভুলে গেছ বা অস্বীকার করছ, তা বহুজন হিতায়, আর এটাই শূণ্যতা। তাই তোমারই সন্ধানে বুদ্ধ আসছেন। তিনি জানেন, তুমি হলে সেই তৃতীয় বুদ্ধ, যাকে নবম শতাব্দীতে হানাদার বাহিনির ভয়ে শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধরা মাটির নিচে পুঁতে ফেলে। ধ্বংসের সময় পার হয়ে গেলে বুদ্ধ ভক্ত মানুষেরা যখন সেই মাটি খোঁড়ে, সেখানে কোন মূর্তি ছিল না। তাঁরা জেনেছিলেন, প্রবল অত্যাচারের কাল কেটে গেলে, সেই তৃতীয় বুদ্ধকে জাগিয়ে তুলবে মানুষের হাহাকার, নিস্ফল ক্রন্দন! তখন এক ফকির আসবেন, যিনি তৃতীয় বুদ্ধকে জাগাবার মন্ত্র জানবেন। তিনি লাদেন ফকির। তিনিই সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরবেন তৃতীয় বুদ্ধের আগমণের পথ। আমরা বুঝতে পারছি, গান্ধার দেশ থেকে সেই মূর্তি মাটির তলদেশে চারিত হতে হতে এখানে এসেছে। প্রাণ পেয়েছে তোমার মধ্যে। হে চির প্রণম্য অগ্নি, তোমাকে প্রণাম। আমরা যাতে শত বসন্ত জীবন যাপন করতে পারি, তা তুমি দেখ।

আমি অবাক হয়ে বললাম, কিন্তু আমি কিভাবে বুদ্ধ হতে পারি? আমি সাধারণ মানুষ। আপনারা ঞ্জানী। আপনাদের প্রণামই বা কিভাবে নেব আর আর্শিবাদই বা করব কিভাবে? শূন্যতা নিয়েও আপনারা যা যা বলে গেলেন, সে সব বিষয়েও আমার কোন ধারণাই নেই। জীবনে যা যা চেয়েছিলাম, তার কিছুই পাইনি। না কোন ভালো চাকরি না কোন সুন্দরী নারী। এই সবের পিছনে নিরন্তর ছুটতে ছুটতে আমি এই উপলব্ধিতে শেষ অবধি পৌঁছেছি যে, কোনকিছুতেই হতাশ হবার নেই। কারণ একই স্থানে ছায়া ও রোদের সমাবেশ হয় না। আত্মত্যাগ এবং কোন কিছুই পাবার আশা না করাই হচ্ছে ভালো থাকার সহজপাঠ

দ্বিতীয় হরিণ: আপনি ঠিকই বলেছেন। যিনি পরম সত্যকে উপলব্ধি করেছেন, তিনিই বুদ্ধ। শূণ্যতা আর করুণার মিশেলেই বোধিলাভ সম্ভব। এই যে শূণ্যতাকে আপনি উপলব্ধি করেছেন তার সঙ্গে বিবিধ বিষয় ভাগ করে নিচ্ছেন, আবিস্কার করছেন দুঃখময় নয়, জগত আসলে মিথ্যাময়; এটিই বুদ্ধত্বের আলোকে পরম সত্য বলে বিবেচিত। আপনি যেটি গলা তুলে বলতে পারছেন, সেটা কেউ পারে না বলেই আপনি বুদ্ধ। সবচেয়ে বড় কথা, আপনি এই প্রশ্নের উত্তরে মৌনভাব নিতে পারতেন। সেই ফাঁক দিয়ে নানা দুর্নিতীর প্রবেশ সম্ভব ছিল। কিন্তু আপনি তা করেননি। আপনি সেটাই করেছেন, যেটা আপনার মন বলে দিয়েছে আপনাকে। একটু পরেই উঠবে বুদ্ধচাঁদ। তখন সেই আলোয় পথ চিনে আমরা যাত্রা শুরু করব। আপনার আছে বুদ্ধমন। বুদ্ধচাঁদ আর বুদ্ধমনের আলোতে পৃথিবী হয়ে উঠবে আলোকিত। যাকে ভরসা করে, যাতে স্থিত হতে পারলে জীবনের ঘন অন্ধকার ভেদ করে উপস্থিত হবে বৌদ্ধিকপূর্ণিমা। হিংসা, লোভ, হত্যা, ধ্বংস, পরধর্মসহিষ্ণুনতা থেকে পৃথিবী মুক্ত হবে একদিন, এই বিশ্বাস নিয়েই আমাদের এগোতে হবে।

আকাশে ছিটকে উঠল চাঁদ। সে ছিল পাহাড়ের ওপারে। তাতে আমাদের চোখ যাবার কথা নয়। যখন উপরে উঠল পাহাড়ের মাথা ছাড়িয়ে, তখন চরাচর আলোকিত হল। যে তিনটি হরিণ আমার সাথে কথা বলছিল, তাদের বাইরেও যে শতশত হরিণ দাঁড়িয়ে আছে, তা দেখতে পালাম। আমার মনে পরে গেল সেই কম্পনের কথা। লক্ষ লক্ষ পরমানু বোমার সমান শক্তি মাটির নিচে লুক্কায়িত আছে। যে কোন সময় ভূ গর্ভের নানা কারণে বারে বারে বা একই সঙ্গে বিস্ফোরিত হয়ে বিভিন্ন টেকনিক প্লেটকে ধাক্কা মেরে উপরে উঠে আসতে পারে। আর তা ঘটতে পারে ভারতীয় ও ইউরেশিয় প্লেটের সংযোগ স্থলে।

চাঁদের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের মাথা থেকে লাফিয়ে উঠল এক বিরাট পাখি। এই বড় তার দুই ডানা। মস্ত চঞ্চু। গলা থেকে বুক অবধি সাদা। পাখিটা আকাশে ছিটকে উঠে চিৎকার করল, এক বিকট চিৎকার। তাতে সমস্ত হরিণের চোখ তার দিকে ঘুরে গেল। তারা একযোগে চিৎকার করে উঠল, পিতা! পিতা! ভয় পেয়ে তিন দেবতা উঠে পরল গাছের মগডালে। আমি ভাবলাম, ঋষি মহারাজ যে বিরাট দর্শন এক পাখি হয়ে গেলেন এই রাতে, এখন তাঁর কী কাজ?

পাখিটি তীব্র গলায় বলে উঠল, গবান আসছেন!

শুনে হরিনের দল হই হই করে উঠল।

তোমরা বনের পথ চেন?

না পিতা

বে আমাকে অনুসরণ কর

র এই যুবক, তৃতীয় বুদ্ধ, তিনি কী করবেন?

নি অপেক্ষা করবেন

কার জন্য?

গবানের জন্য

সমস্ত হরিণেরা চলে গেলে তিনদেবতা নেমে এলেন। আমি বললাম, পনারা গেলেন না?

মাদের ভয় পায়

কিন্তু তাতে কি আপনাদের সমস্যার সমাধান হবে? বুদ্ধকে জিগাসা করে নিতে পারতেন, কীভাবে আবার হৃত সন্মান আপনারা ফেরত পাবেন

পনি আছেন, তাই আমরা গেলাম না

মি কী করতে পারি আপনাদের জন্য? আমি এক সাধারণ মানুষ

পনি পথ খুঁজে দেবেন

? কোন পথ? আমিই ফেরার পথ খুঁজছি, আপনারা সেটা জানেন

দেখুন, একটা সত্য কথা বলি। আমরা দেবতা হতে পারি, কিন্তু সবটা জানা আমাদের নেই। আমরা মিথ্যে বলেছিলাম। ভেবেছিলাম, বুদ্ধের সভায় নিয়ে যাব আপনাকে, তখন যা হবার হবে। কিন্তু তা তো হল না। বুদ্ধের সভায় আমরা অযাতিত ছিলাম। সামলে নেব ভেবেছিলাম, হল না। আসলে বুদ্ধ বিশ্বাস করেন, দেবতায় ভক্তি করা এক মারাত্মক ভুল। সে পথ তিনি ছাড়েননি এখনও। তিনিই প্রথম ঘোষণা করেন, মানবতার কথা। মানব প্রকৃতি দেশ কাল নিরপেক্ষ। তিনিই প্রথম বলেছিলেন, ঋষিবাক্য বলেই তাকে ধ্রুব সত্য বলে বিশ্বাস কোরো না। বুদ্ধি দিয়ে বিচার করো। সেই বৈদিক সময়ে বেদের বিরুদ্ধচারণ করা খুব সহজ ছিল না। আমরা সেভাবে তার প্রতিরোধ করতে পারিনি। পরিশ্রমবিমুখ সুখি জীবন ছিল আমাদের। আমরা চাইতাম, নিঃশর্ত আনুগত্য। বুদ্ধ আসতেই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হলাম আমরা। আমাদের ভীত ধ্বসে গেল

চাঁদ উঠে গেছে মাথার উপর। অনেক আলো এখানে। একটা শৈত্যের প্রবাহ শুরু হয়েছে। জানি না বুদ্ধ এখানে কবে নাগাদ এসে পৌঁছবেন। এখানে কতদিন থাকবেন। কেবল মোগলমারীই যাবেন না অন্য কোথাও, এই সব প্রশ্নের অসমাপ্ত জবাব রেখেই তিন দেবতাকে সঙ্গে নিয়ে আমি হাঁটতে থাকলাম এক নতুন বৈদিক বুদ্ধপথের খোঁজে।

 
 
top