কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাত

 

কথাটা এল পিছন দিকে থেকে। ভূমধ্যসাগরের তটে দাঁড়িয়ে থাকাআলেকজান্ডার পিছন ফিরে তাকালেন। সবে আয়লানের দেহ তিনি তুলে নিয়েছেন। সামুদ্রিক বাতাসে তাদের প্রত্যেকের বসন উড়ছে। এসময় কে কথাটা বলল, তা দেখার জন্য আলেকজান্ডার ঘুরলেন। দেখলেন এক অপরূপা সুন্দরীকে। ভুরু তুলে বললেন, কে তুমি?

মি জলপরি, মহারাজ

লপরি? মানে?

ই সমুদ্রের নিচে আমার অবস্থান। কেবল আমি নয়, সঙ্গে আরও কয়েকজন, মিলিতভাবে আশিজন

লের নিচে বাস কর কেন?

কসময় উপরেই থাকতাম। আপনার জ্বর হলে আমাদের হাল খারাপ হয়ে যায়। আপনার আশিজন অনুচর আপনাকে ছেড়ে স্বদেশে ফিরে যায়, পরে থাকি আমরা

হ্যাঁ, জ্বর! আলেকজান্ডার এবার উদাসীন হয়ে যান। বলেন, ই জ্বরের ঘোরেই আমি মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকাতে ভুলে যাই। যে লাল নক্ষত্রের আশার দিন কাটাচ্ছি, তা যদি এই সময় খসে পড়ে তো বিপদ! জ্বর যে আমার সারে না

পনি এখনও জ্বরে ভোগেন, সম্রাট আলেকজান্ডার?

রে কে আলেকজান্ডার? আমি কোন আলেকজান্ডার নই

বে আপনি কে?

মি এক মাঝি। নৌকা বাই। সেটা অবশ্যি আমার না। সমুদ্রে কাত হয়ে পড়েছিল। তার মালিক কে আমি জানি না। কিন্তু সেটি এখান আমার

বে আপনার পরিচয়

মি গল্প বলি

কার গল্প?

খানের কথা। মাঠ-ঘাট-অরণ্যর কাহিনি

খন এক নাগাসাধুর কথা বলছিলেন, সে আপনাকে লাল তারার সন্ধান দিয়েছে

ই নাগাসাধু বলে আমার এক বন্ধুর নাম পুরু

কে পুরু?

মি জানি না। হয়ত একসময় আমি পুরুকে চিনতাম। সারাজীবনে একটা মানুষের সঙ্গে কত জনেরই পরিচয় ঘটে। সে তেমনই কেউ একজন হয়ে থাকবে। দারিযূস বলছিল, আমাকে আমার মনে নেই সম্রাট? আপনি যেমন ভাঙ্গা নৌকায় বসে থাকেন, তেমনি আমিও এতবড় পারস্য সাম্রাজ্যের লাগাম ধরে থাকি, নইলে সে সমুদ্রের অতলে তলিয়ে যাবে। একটা দেশ ধরে রাখা কি সহজ কথা!

নৌকা থেকে নেমে কী এখনও হাঁটেন মহারাজ?

তা হাঁটি বই কি! আনাতোলি, ব্যাবিলন, মেসোপটেমিয়াসব পার হই আবার ফিরে আসি

র আপনার যে আশিজন অনুচর

কেউ নেই, আমি একা। কেবল জানি আকাশের যে ছায়াপথ, সেখানে দশহাজার কোটি নক্ষত্র রয়েছে। তারা যে কোন সময় রক্তবর্ণ ধারণ করবে আর নেমে আসবে

মরা আপনার সেই আশিজন ঘনিষ্ঠ অনুচরের স্ত্রী মহারাজ। আপনি যখন ব্যাবিলনেই থেকে গেলেন, জ্বর আর সারল না; তারা আমাদের ছেড়ে  যায়। আমরা ভাবতাম ম্যাসিডনের মানুষেরা ভাল। আধুনিক তাদের চিন্তাভাবনা। তাদের গুরুর নাম আরিস্টটল। যখন তারা আমাদের ছেড়ে যায়, আমরা মানসিক ভাবে খুব ভেঙ্গে পড়েছিলাম। এখন আমরা সেই আশিজন আপনার স্ত্রী

তা কি করে হয়?

মনটাই তো হয়ে এসেছে মহারাজ। অনুচর না থাকলে আমরা তার মালিকের অধীন। আমাদের সকলের সঙ্গেই আপনাকে যৌনসংগম করতে হবে মহারাজ

সম্ভব! আমি অসুস্থ, আমার জ্বর!

মাকেও চিনতে পারছেন না মহারাজ? যে আশিজন অনুচরের সঙ্গে আপনিও এক নারীকে বিবাহ করেছিলেন, আমি সেই মহারাজ

কিন্তু আমার জ্বর?

তা যে সেরে গেছে মহারাজ।

কি করে সারল?

মৃতদের গায়ে উত্তাপ থাকে না

ই যে রয়েছে, ছুঁয়ে দেখ

আর কিছুই নয় মহারাজ। দীর্ঘদিন আপনার দেহ মধুর ভান্ডে চুবিয়ে রাখা হয়েছিল। এ হল তারই উষ্ণতা

কিন্তু তুমি এখানে কেন?

মিই আয়লান কে জল থেকে তুলে এনেছি মহারাজ। আইএসদের অত্যাচারে কত মানুষ যে দেশ ছেড়ে সমুদ্রের ওপারে পাড়ি দিচ্ছে তার ঠিক নেই। জলে ছিটকে পড়া সেইসব দেহদের আমরাই সমুদ্রের পাড়ে ফিরিয়ে দিয়ে থাকি। আয়লানের ক্ষেত্রে বহুদিন পর জল ছেড়ে আমরা পাড়ে উঠেছিলাম। ওকে বালির উপর কাত করে শিয়ে রাখছি, তখন দেখি আপনি। প্রথমে ভাবলাম কোনো জীবিত মানুষ। পরে দেখি, না। এ আপনি। কতদিন পর যে আপনাকে দেখলাম, মনেই করতে পারছি না। অথচ মজা দেখুন, আপনি এই কাছাকাছিই নৌকা বান

ই মৃত্যুর, হত্যার কোন প্রতিকার নেই?

কিছু মানুষ এদের মদত দেয়, ফলে এদের নিকেষ করা যাচ্ছে না। আপনি যদি যুদ্ধে না নামলে, কি যে হাল হবে পৃথিবীর, তা আমরা ভাবতেই পারি না

যুদ্ধ! আমাকে যুদ্ধ করতে হবে?

সারাজীবন তো আপনি তাই করে এসেছেন মহারাজ

! যুদ্ধের নামে আমার মনে পড়ে হাজার হাজার হাতির কথা। যারা সারা যুদ্ধক্ষেত্রর আকাশে উড়তে থাকে

মরা কখনও হাতি দেখিনি মহারাজ

ঠিক। অগ্রহায়ণ মাসে পাতার বাঁশি বাজে। একটু গরম, একটু শীত, পাখি ওড়ে, বক ডাকে, ধান কাটা হয়। আঃ, সে গন্ধ যদি তুমি নিতে জলপরি! ধান কাটা হয়ে গেলে মাঠের নিস্তেজ রোদে নাচ হবে। শুরু হবে হেমন্তের নরম উৎসব। হাতে হাত ধরে ধরে গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে অঘ্রাণের মিঠে রোদে মানুষের গায়ের বাড়তি উত্তাপ কমে যাবে। পাকা ধানের গন্ধে মন প্রাণ ভরে যাবে সবার। এই অঘ্রাণই হল আসল সময় কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাত দেখার

রকই এক চাঁদের দিনে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি চাঁদকে আড়াল করে উড়ছে এক মানুষ! এই বিশাল তার দুই ডানা। সে চিৎকার করে বলল, আমি তোমার শিক্ষাগুরু আলেকজান্ডার। বারো বছর বয়স থেকে ষোলো বছর বয়স অবধি তুমি আমার কাছে পাঠ নিয়েছ। কিন্তু আমি তোমায় কিছুই শেখাতে পারিনি, তা সে আমায় যতই গুণগান কর না কেন। আইএসদের মত তুমিও নারীকে রাস্তার ধারে দাঁড় করিয়ে বিক্রি করেছ। মানুষকে শান্তি দাওনি। তাকে ছুটিয়ে মেরেছ, হত্যা করেছ নির্মমভাবে। তুমি আলেকজান্ডার, তুমি গ্রেট। অনেক অন্যায় তুমি করেছিলে, তা স্বীকার করে নাও

তারপর?

মি কিছু বুঝলাম না। আমি কে, কেন, কোথা থেকে এসেছি, তার কোন হিসেবই আমার কাছ নেই। আমিও চিৎকার করে সেই উড়ন্ত মানুষ, যে নিজেকে আরিস্টটল বলে দাবি করছিল, তাকে বললাম, দেখো হে বাপু, তুমি যেই হও না কেন, তোমাকে আমি চিনি না। আমার কোন গুরু নেই। কষ্মিনকালে ছিল বলেও মনে পড়ে না। আমি এক ভাঙ্গা নৌকার মাঝি। আজিয়ান সাগর বেয়ে ওপারে যাবার চেষ্টা চালাই। বুঝতাম না, আমি যাদের সন্ধ্যের পর গল্প বলি, তারা আসলে অন্য মানুষের দলে ভীড়ে থাকা কিছু মানুষের আত্মা। জলের নিচে তাদের দেহের বাস। এবার কথা হবে যাওয়া নিয়ে। ওপারে কেন যেতে চাই, সে কথা যদি বল, উত্তরে আমি বলব, তার কোন কিছুই আমার পরিস্কার নয়। কারণ আমি এমনি এমনি এই সাগর পেরুতে চাই। এক ভারতীয় সাধুই আমাকে এমন বুদ্ধি দেয়

খন আরিস্টটল কী বললেন?

তিনি আর কী বলবেন, তাঁকে দাবড়ে যিনি চুপ করিয়ে দিলেন তাঁর নাম জিউস। হ্যাঁ, আরিস্টটল এর মত এই নামটাও আমি সেদিন প্রথম শুনলাম। তিনি বললেন, তুমি আলেকজান্ডার, আমার পুত্র, মনে পড়ে? দিলীপ তোমার বাবা হতে পারেন, কিন্তু আসলে আমার ঊরসে তোমার জন্ম। তোমার মায়ের নাম অলিফিয়া। তোমার মায়ের সঙ্গে পিতার যখন বিবাহ হয়, তখনই তিনি গর্ভবতী হন কারণ তাঁর গর্ভে আমি বজ্রপাত ঘটিয়েছিলাম। তাঁর যোনিদ্বার বন্ধ করে দিই সিংহের ছাপ যুক্ত সিলমোহর দিয়ে। আমি কিন্তু এসব কিছুই বিশ্বাস করিনি আয়লান। কারণ আমি হাতি দেখেছি, তা দেখে আমার মনে হয়েছে, সে বড় অদ্ভুত যন্তু! ভারতীয়রা অতি অদ্ভূতভাবে তাদের বশ করে। যুদ্ধে কাজে লাগায়। আমি এক একদিন দেখি আমার চারপাশ অজস্র হাতিতে ভরে যাচ্ছে। পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে এক নদী। তার ধারে বনের ভেতর গাছে গাছে ঝুলছে বানরদের দল

রা কী করবে?

যুদ্ধ

যুদ্ধ! কার বিরুদ্ধে?

ইএসদের বিরুদ্ধে। কতশিশুকে ওরা নির্মম ভাবে হত্যা করেছে, কারণ তাদের জন্ম ইয়াজিদি ঘরে। নারীকে হাটে বিক্রি করে দিচ্ছে। সব নিজের চক্ষে দেখা আমার। নৌকাতে বসেই সব দেখি। তাদের পলায়নের দৃশ্যও দেখা যায়। তারা বিড়বিড় করে একটি দেশের নাম বলে। সে হল গ্রিস!

য়লানরা প্রথমে গ্রিসে যেতে চেষ্ঠা করে। কারণ সেখানে সবাই যাচ্ছে। গ্রীসে যাচ্ছে কারণ সেখানে গণতন্ত্র আছে

মার খুব চেনা লাগে নামটা। কিন্তু বুঝতে পারি না, সেটা কোনদিকে। তখন আমি হাতিদের দেখি। হাতির দল মাটি ভেদ করে শূণ্যে উঠতে চায়। আর সেই হাতির দলের গোদা হাতির পিঠে বসে আছে এক নাগা সাধু। তার এক হাতে যাদুদন্ড, অন্যহাতে সাপ। সে আমাকে এক আশ্চর্য গল্প বলে। সে গল্পের নায়ক অগ্রহায়ণ নামে এক মাস। সেই মাসে মাঠে মাঠে ধান কাটা হয়

সে কি রকম?

ধান এক আশ্চর্য ফসল। সেটাই ভারতীয়দের প্রধান খাদ্য

র কি আছে সেখানে?

গ্রহায়ণ মাসে শূণ্যে কুয়াশা জমা হয়!

বা।ভারি সুন্দর একটি নাম তো। সেই মাসটিকে এখানে আনা যায় না?

এর উত্তর ভারতীয় সাধু দিতে পারবে

বে চলো না কেন, আমরা সেখানে যাই!

না।

কে?

সেখানে হাতি আছে

তাতে কী হল?

মি হাতিকে ভয় পাই। মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি এক পাল হাতি আমাকে তাড়া করছে। আমি দৌড়তে দৌড়তে সরে যাচ্ছি একপাশে, হাতিরা চলে যাচ্ছে এশিয়া মাইনরের শেষ প্রান্তে। একদা নৌকা থেকে নেমে বেখেয়ালে সেখানে এক লাঠির আগায় পতাকা পুঁতে দিয়েছিলাম আমি। চিৎকার করে বলেছিলাম, এ ভূমি আজ থেকে আমার। আমিই এখানের সর্বেস্ববা। হাতিরা পাশ দিয়ে নেমে যায় জলের ভেতর। তাই তুমি, হে আয়লান কুর্দি, যখন যখন রবারের নৌকা থেকে ভূমধ্যসাগরের জলে ছিটকে পড়লে, আমি ভাবলাম যদি হাতির পায়ের চাপে পিষে যায়, কি হবে? তাই নৌকা ছেড়ে আমিও নেমে আসি

আয়লান বলল, তুমি নৌকা চালাও। আর কি কর?

ল্প বলি

কী গল্প?

ল্পের কী আর শেষ আছে? কতশত গল্প লুকিয়ে আছে, গল্পের জন্ম হচ্ছে মাটিতে তার আর ঠিক কি। আমাদের এই পৃথিবীই ত গল্পের ঝুলি। বড় আজীব ভাবে আমরা ভালোবাসতে চাই। বাঁচতে চাই। তাই ধর্মকে গল্পের আধারে রাখি। জীবনকেও রাখি। অনেক মানুষ আমার গল্প শুনতে আসে। এশীয়, সুমেরীয়। কত! সকলের দেশের ঠিকানা আমি জানি না।গল্প বলা শেষ হলে দেখি আলো বাঁক খেয়ে নেমে আসছে মাটিতে

বাঃ। তারার আলো? আমার মা দেখত। দেখাবে আমায়?

নিশ্চয় দেখাব

তুমিও কি আইএসের ভয়ে ভাঙ্গা নৌকায় লুকিয়ে আছ?

না আয়লান। আমি অপেক্ষা করে আছি এক লাল তারার। ওই নৌকায় শুয়ে সন্ধে হলেই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি

তুমি বুঝি তারা খসা দেখতে ভালোবাস?

তা নয়। ঐ লাল তারার ধুলো গায়ে মাখলে আমার জ্বর সেরে যাবে

ক নাগা সাধু আমায় বলেছেন, যখন কোন বয়স্ক তারা আমি দেখতে পাব, এই ধর না কেন তার বয়স হবে ১৪ গিজ্ঞা বছর। মানে বুঝলে? ১৪*১০৯ বছর। তখন এক মহা বিস্ফোরণ ঘটবে।  নক্ষত্রের ভেতরের হাইড্রোজেন ফুরিয়ে গেলে তার বাইরের অংশের হাইড্রোজেন পুড়বে, তখন সে বিরাট গোলাকার এক লাল তারা হবে।একসময় সেটা ছোট হয়ে যাবে। তার ভর চন্দ্রশেখরের ভরসীমাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাই বামন নক্ষত্র হয়ে সে থাকতে পারবে না। ছোট হয়ে একবারে নিউট্রন নক্ষত্র হয়ে দাঁড়াবে। নক্ষত্রের বাইরের গ্যাস একটা বিরাট ধাক্কা খেয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়বে। তারাটা ভেঙ্গে যাবে তখন

তারপর?

ক্ষত্রের ভেতরের গ্যাস তখন প্রায় সেকেন্ডে দশ হাজার কিলোমিটার বেগে আছড়ে পড়বে সমুদ্রের বুকে। নাগা সাধু বলে, সেই নক্ষত্র আছড়ে পরবে ভূমধ্যসাগরের ঢেউ প্লাবিত উপকূল আর পাহাড়ে। গ্রীষ্মের দীর্ঘতম সময়ের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে সেখানে নেমে আসে আগুনের রাত। সেই চূড়ান্ত মুহূর্তে কায়াহীন ঈশ্বরকে মাটি করে দিয়ে নেমে আসে আদিম পৃথিবীর দেবপুত্র। মানুষ তাকে ধন্যবাদ দেন, কারণ তিনি মন করিয়ে দেন কঠিন দিন আসছে। এই আগুন পবিত্র করে, ছাই স্বাস্থ্য উদ্ধার করে, আরোগ্য দেয়। ছেলে মেয়ে যুবক ভুবতি অনেকেই লাফ দেন আগুনের উপর দিয়ে। তিনবার এই লাফ দিতে পারলে আমি মুক্ত আমার জ্বর থেকে

তা না হয় হল রাজন। যুদ্ধ অনেকেই করে, কিন্তু রাজা একজনই। রাজা কি সকলে হতে পারে ? আইএসরা পৃথিবী ধবংস করতে চায়। তাদের নিশ্চিহ্ন করুন আপনি। ওরা প্রাচীন সব মন্দির, নগর, সৌধ্য গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, যে সব স্থাপত্যের পূজারি ছিলেন আপনি, সে গুলির কোন চিহ্ন রাখছে না। আপনার কী কিছুই মনে নেই? ম্যাসিডন?

খুব চেনা নাম

পিতা ফিলিপের কথা?

হাঃ।

গুরু আরিস্টটল?

কিছুই মনে নেই আমার। তবে এক বাজপাখি নিযেকে আরিস্টটল বলে দাবি করে অনেকদিন ধরে, সেই আমাকে প্রথম বলে, এই হানাহানি একমাত্র তুমিই থামাতে পার আলেকজান্ডার। আইএসদের অত্যাচার থেকে পৃথিবীকে একমাত্র তুমিই রক্ষা করতে পার। ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দাও শয়তানের শিরদাঁড়া

বে! এবার তো হাতে অস্ত্র নেবার সময়

মার কেবল মনে পড়ে এক ভারতীয় যাদুকরের কথা। সে আমার এক কঠিন রোগ সারিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু জ্বর? এই যে থেকে থেকে আমার গা গরম হয়, পা ভারি হয়ে আসে, মাথা ঘোরে, দূর্বলতা অনুভব করি, চোখ জ্বলে; এই জ্বর আমার যাচ্ছে না জলপরি। জ্বরের খবর পেয়ে এক ভারতীয় নাগা সাধু হাতির পিঠে চেপে আসে আমার কাছে। তারা এই অতবড় প্রাণীটাকে যুদ্ধে কাজের লাগায়! হাতি দেখে কেন জানি ভয় পায় আমার

মরা বুঝি না আলেকজান্ডার দি গ্রেট, পৃথিবীবাসীর এই এলাকার উপর এত রাগ কেন। আর কেবল বাইরের মানুষ কেন, এখানের মানুষেরই হাজার দোষ। আপনি ম্যাসিডন পেরিয়ে একের পর এক দেশ দখল করে নিলেন। খুব কি দরকার ছিল? গোটা ইউরোপ পরেছিল তো। এশীয় লোকেদের নির্মম ভাবে হত্যা না করলে চলছিল না? যে বন্ধু যুদ্ধে একদা আপনার প্রাণ বাঁচিয়েছিল, তাকে নিজেই হত্যা করলেন। তবু আপনি বীর কেননা আপনি ঈশ্বরের সন্তান

বার, আমরাই; আনাতোলি, মেসোপটেমিয়া, মিশির, ব্যাবিলন, কন্সটান্টিনোপল, বাইজেনটাইন, অটোমানরা কেবল নিজেদের ভেতর হানাহানি ও রক্তপাত ঘটিয়ে চলেছি। নিরন্তর যুদ্ধ। কেবল যেন ঘটনার ঘনঘটা ঘটানোর জন্য এই মাটির জন্ম। পৃথিবীর আর কোথাও কেন এমনটি হয় না বলতে পার? এখনো ভরা হাটে নারী ও শিশু বিক্রি চলছে

সলে কী জান সুন্দরি, এতক্ষণ পর আলেকজান্ডার মুখ খুললেন। বললেন, খানের মাটি জ্বরে আক্রান্ত। এখানের সমস্ত মানুষ গায়ে মনে জ্বর নিয়ে বাস করে। তাদের হলুদ চোখ, লাল চুল। মাথা উত্তপ্ত। তাই তারা নিলিপ্তভাবে মানুষ খুন করতে পারে

বার মনে পড়ছে, রাজা?

কিছু ভেসে আসে, কিছু আসে না। ব্যাবিলনে অনেক লোক কলেরায় মারা যাচ্ছে, এটা আমি কেবল মনে করতে পারি আর যুদ্ধ? সেই বা করলাম কবে? এই যে দলে দলে মানুষ এক দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পালাচ্ছে, আমি প্রথমে ভেবেছিলাম কলেরার ভয়ে। পরে দেখি তা নয়। আমার খুব ইচ্ছে করে এদের বসিয়ে পাত পেড়ে খাওয়াই। একটা বড় ভোজ এদের উপহার দিই

ভোজটা তবে এখনই দিচ্ছেন না কেন মহারাজ?

চোখের সামনে যেন তারা খসা দেখছি। তা আসলে নয়। কেননা আমার সামনে সাঁ করে নেমে আসেন জিউস। এই বড় দুই ডানা। জিউস চিকার করে বলেন, এটা কোন নক্ষত্র নয় আলেকজান্ডার, ওটাকে ধরার চেষ্টা কর না। ওটা তোমাকে ধ্বংস করে দেবে

আরিস্টটল বলেন, টা হল ফসফসরাস মাখানো বোমা যা আকাশ থেকে নিক্ষিপ্ত হয়। ফসফরাসের কারণেই এত আলো। যেখানে পড়ে, আগুন ধরে যায়। সে আগুন সহজে নেভে না। এই বোমা নিক্ষেপ কিন্তু নিষিদ্ধ আলেকজান্ডার

র একটা কথাও বিশ্বাস কর না আলেকজান্ডার। ও জানেই না যুদ্ধের কোন নিয়ম হয় না। পারি আর মারি যে কোন কৌশলে, এটাই আসল নীতি। ও আসলে আমার পোষা এক বাজপাখি যে আরিস্টিটলের ছদ্মবেশ নিয়েছে। ওর বাড়বাড়ন্ত এখন এতটাই যে নিজেকে ঈশ্বর বলে প্রমান করতে চায়। তাই ওর এত ছটফটানি। ওকে যখন পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত করে দেব, তখন বুঝবে কত ধানে কত চাল!

তখন পালটা দিল অরিস্টটল। বলল, তোমার হাতে আমি লন্ঠন ধরিয়ে ছাড়ব হে জিউস। বিলুপ্তির কথা বোলো না, কারণ তুমি এখন নিজেই বিলুপ্ত। পৃথিবীতে আর কোথাও পূজা পাও না তুমি। যতই দেবরাজ হও না কেন তোমার জায়গা দখল করেছে এক মেষপালক। আর এখন আলেকজান্ডারের কাছে নিজেকে জাহির করতে এসেছ? চাঁদকে আড়াল করে রাতের পর রাত তুমি উড়ে চলেছ

বাজে বোকো না হে বাজপাখি। আমার ঊরসে কত দেবতা, যোদ্ধার জন্ম হয়েছে জানো? তারা যে কতশত তার কোন হিসেব আমার কাছে নেই। আলেকেজান্ডার যাই নিষ্ঠুরতা দেখাক, তা ছিল রাজনীতির অঙ্গ । ওর মধ্যে যা গণতন্ত্রে ছিল তা এখনকার শাসকের মধ্যেও নেই। একদল শয়তানের অনুচর, যারা নিজেদের আইএস মনে করে থাকে, তারা কি নির্মমতার সঙ্গে ও নিষ্ঠুরভাবে নির্বিচারে নিরপরাধ মানুষদের খুন করে চলেছে। নারী শিশু বৃদ্ধ কেউ বাদ নেই

মুদ্রের তীরে বসে দেখি ধূ ধূ মহভারতের যুদ্ধের মাঠ, হোমারের উপকূল আর অনন্ত এজিদ কান্তার। যেন মনে হয় ভারতবর্ষের ধানসিড়ি নদিটির পাশে শুয়েছিলাম কোন একদিন। নদীর চ্ছলচ্ছল শব্দে জেগে উঠে দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রাণের অন্ধকারে হলুদ হয়ে গেছে। ইঁদুর শীতের রাতের কুয়াশার মত সারা গায়ে খুদ মেখেছে। পুকুর পারে হাঁস সন্ধার আগে ঘরে ফেরে। কেউ যেন আমাকে বলে গেল, এই তো ভারতবর্ষের কথা মনে আছে আপনার এই ত সময় কিশোরীর চাল ধোয়া হাত স্পর্শর। মি বলি, তা জানি না। এসব শুনেছি সেই নাগাসাধুর মুখে, যে আমাকে এক লাল তারার গল্প বলে। মার এ জ্বর সারবে যখন তখন এক লাল নক্ষত্র নেমে আসবে। তার ছাই মেখেই আমার জ্বর ভালো হবে

দ্বন্দ্ব ছেড়ে বাজপাখি ও জিউস নেমে এসেছে মাটিতে। কারণ অঘ্রাণ মাসের গল্প। সে কোন মাস, যেখানে কিশোরী চাল ধোয়া হাত আলোকিত হয় জ্যোৎস্নায়। সেখানে হাঁস চলার পথ তৈরী হয়ে থাকে। সোনালি ডানার চিল ঘুরে ঘুরে ছুঁয়ে যায় নীলাভ রঙ। অঘ্রাণ মাসে নারীর চোখ হয়ে ওঠে পাখির নীড়ের মত।

র নারীর স্তন?জিউস প্রশ্ন করে।

রুণ শঙ্খের মত সুন্দর

র সেই কন্যা?

ঘ্রাণের কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাতের ঘ্রাণ নেবার জন্য আমারও মন আকুলি বিকুলি করে। আমরা বুঝেছি, যারা বহুদিন মাস ঋতু শেষ হয়ে গেলে, পৃথিবীর সেই কন্যা কাছে এসে অন্ধকারে নদীদের কথা বলে গেছে। আমরা বুঝেছি পথ ঘাট মাঠের ভিতরে আরো এক আলো আছে। যেখানে যুদ্ধ, সেখানেই সূর্য পৃথিবী কালপুরুষ অনন্ত আকাশ গ্রন্থি। সেই গ্রন্থির কেন্দ্রে বসে আছেন বামিয়ানের বুদ্ধ

আরিস্টটল বললেন, ত যদি সত্যি তবে যুদ্ধের কি হবে?

য়তানের দল নিকেশ হবে

কী করে?

ময়ের স্রোতে তারা গুঁড়িয়ে যাবে

বে আমরা এখন কী করব? আমার সমস্ত হৃদয় ঘৃণায় আক্রোশে বেদনায় ভরে গিয়েছে। আক্রান্ত এই পৃথিবী যেন কোটি কোটি শুয়োরের আর্তনাদে মেতে উঠেছে।উঃ, সহ্য করা যায় না!

আলেকজান্ডার বলেন, নেক অনেক দিন অন্ধকারের সারাৎসারে অনন্ত মৃত্যুর মত মিশে থেকে হঠাৎ এই ভোরের আলোর উচ্ছ্বাসে নিজেকে পৃথিবীর জীব বলে বুঝতে পেরেছি আবার। জাগবার কাল আছে, দরকার আছে ঘুমাবার। আমি এতদিন যে প্যাঁচাকে দেখেছি, কেন সে আমার সম্বিত ফেরাতে চেষ্টা করল নাদেয়ালে টাঙ্গানো সেই মলিন পৃথিবীর মানচিত্রের কথা মনে আসে। সে মানচিত্র বহু পুরাতন বছরের। তাতে আছে নানা ছবি। গোল চাকার মত বৃত্তের ভিতর বৃত্ত, তারপর এক একে ছোট হয়ে আসা, ঘন এবং ধূসর হতে থাকো, বালি কাগজের সঙ্গে একাত্ম্য আলেখ্যকাশী বিশ্বনাথ, জগন্নাথদেব, শ্রীদ্বারকা, মক্কার কালো পাথর, তাজমহল, দূরের আকাশের কোনা ঘেঁসে কোন উর্দু বাক্য, সংস্কৃতর ঝঙ্কার, মরুভূমির নিদ্রাহীনতাসব নিয়ে জাগরুক আমি এক লাল নক্ষত্রর আশায়। জলে হাত রাখি, বোঝা যায় এই জলে ঈশ্বর ছিলেন। জল নড়ে ওঠে, তারপর হাতের ভেতর; হাত বেয়ে সমস্ত শরীরে ছেয়ে যায় জলরেণু। মনে হয় কবে যেন বৃষ্টি হয়েছিল। মনে হয়, যুদ্ধ মানুষকে যে কিছুই দেয় না, তা আমি জ্বরের পর বুঝেছি। যে হেরে যায়, সে তবু পায় কিছু, কিন্তু জয়ীর হাতে কিছু থাকে না। তার নামে লুঠ হয়, হত্যা চলে, সে ভাবে এসব অনেক কিছু, আসলে তা নয়

হারাজ!

ল জলপরি

পনি এখনও আমাকে জলপরি বলে ডাকবেন?

চ্ছা, বল

মার খুব ইচ্ছে করছে ভারতবর্ষ দেখতে। সেখানের মাটিতে হাতি চলে, মাছরাঙ্গা ওড়ে। এমন এক শান্তির সন্ধানেই না পাড়ি দিচ্ছিল আয়লান। তবু কেন সকলে ঐ দেশকে হুংকার দেয়; তৈমুর, আটিলা আর আইএস। কেনই বা সে দেশ বারবার আক্রমণ করে বিদেশী শক্তি, কচুকাটা করে তাদের, এতকাল আমি তাই ভেবে এসেছি। শান্তির সে দেশ কেবল মার খায়, বারংবার লুন্ঠিত হয়। এখন বুঝেছি কেবল এই অঘ্রাণ মাসের জন্যই এই দেশের মানুষেরা বারংবার মাথা তুলে দাঁড়ায়। আমরা কি সে দেশে আবার যেতে পারি না? আমার আর কিছু চাই না। আমি পুকুরঘাটে নেমে চাল ধুয়ে নেব, হয়ে উঠব সেই কিশোরী, আমাকে ছুঁয়ে যাবে সাদা হাঁসের দল; মাথার উপর উড়বে সোনালি ডানার ঈগল; আমাদের পালিত সন্তান আয়লান আ আ চৈ চৈ করে তাদের চলার পথ দেখিয়ে দেবে। আর আপনি বসে বসে দেখবেন হিজলের জানালায় আলো আর বুলবুলি কিরকম খেলা করছে। জলের উজ্জ্বল পথ ছেড়ে দিয়ে, ধূসর স্বপ্নের দেশে গিয়ে, এই মন যদি তৃপ্তি পায়, পাক না। একটু না হয় পথশ্রমই হল

জিউস হাত তুলে বললে, মি কখনও অগ্রহায়ণ মাস দেখিনি

আরিস্টটল হাত তুলে বলল, মিও দেখিনি

জলপরি বলল, বে আমরা সকলেই সেখানে যাত্রা করি না কেন?

সকলেই তখন বলে, হ্যাঁ হ্যাঁ, বেশ হয়। বেশ হয়

আলেকজান্ডার বলে, কিন্তু আমরা যাব কিসে?

কে? সেই নাগা সাধু?

তার সেই হাতির পিঠে? সে যে বড় সাংঘাতিক জীব!

সেই ভারতীয় যাদুকরের কথা আপনি ভুলে গেলেন রাজা? যাদুতে কি না হয়

হাজার হাজার সেই হাতির দল আমার সামনে দিয়ে আকাশে লাফ দেয়। বুদবুদের মত তাদের বাতাসে ভেসে বেড়ান। সমুদ্রের ঢেউ এর ফেনার মত তাদের সংখ্যা। কি করে সামলাব তাদের?

সামলাবে আয়লান। কিরে আয়লান?

র আমার জ্বর?

তুমি ভারতবর্ষের পথের ধুলো মেখে নিও, সে ধুলোয় অনন্ত নক্ষত্রবীথি মিশে থাকে; তোমার জ্বর সেরে যাবেআরিস্টটল বলল।

আয়লান বলে, কিন্তু আমার পুতুলটা? তার কি হবে?

কি হয়েছে সে পুতুলের?

সে ছিল আমার পোঁটলায়

জলপরি বলল, আর এমন কী, জলের নিচ থেকে তুলে আনলেই হল। 

 
 
top