অন্তঃপুরের মসীকথা

 

পলাশীর যুদ্ধে মধ্য যুগের অবসান হয়। মুৎসুদ্দি, মুন্সী, বেনিয়ান ও দেওয়ান—এরাই তখন ইংরেজদের কাছাকাছি ছিলেন। প্রাচীন সংস্কার এবং অন্ধ বিশ্বাসই ছিল এঁদের একমাত্র আশ্রয়। চারিদিকে ধর্মের নামে আত্মনিগ্রহ, আচার ও অনুষ্ঠানের ব্যাপকতা ছিল লক্ষ্যণীয়: বৈধব্য, অন্তর্জলি, নরবলি, গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন, নারী বিক্রয়, পতিতা বৃত্তি, কৌলিন্য প্রথা, বহুবিবাহ, বাল্য বিবাহ, দাস-দাসী বিক্রয়, সতীদাহ প্রভৃতি সামাজিক ব্যধি সমাজকে শেষ করে দিচ্ছিল। এই রকমই একটি সময়ে রাজা রামমোহন রায়ের আবির্ভাব।

বাঙলাদেশে যথার্থ নবযুগ আরম্ভ হইয়াছে রামমোহনের কলিকাতায় আবির্ভাবের পর (১৮১৩)। ১৮১৫ সালে তিনি আত্মীয় সভা স্থাপন করেন। ডেভিড হেয়ারের সঙ্গে এই সময়ই তাঁর পরিচয় ঘটে এবং পরবর্তীকালে তা ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হয়। গঠন এবং সংস্কারমূলক কাজে তিনি পাশে পেয়েছিলেন এই ডেভিড হেয়ারকে। পৌত্তলিকাবাদের বিরুদ্ধাচারণে এবং সতীদাহ প্রথা রদে ডেভিড হেয়ার সর্বতোভাবে রামমোহন রায়ের পাশে থেকেছিলেন।

আত্মিক দিক থেকে রামমোহন রায় ছিলেন সেই যুগের নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃত। বহু ভাষায় পারদর্শী রামমোহন উপলব্ধি করেছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষার অনিবার্য গুরুত্বকে। তিনি বুঝেছিলেন ভারতবর্ষে ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন করতে না পারলে কোন উন্নতিই সম্ভব হবে না। এই ক্ষেত্রে ডেভিড হেয়ার এবং লর্ড ম্যাকলের অবদানও বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ভারতবর্ষের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড আর্মহার্স্টকে ১৮২৩ সালে রামমোহন রায় একটি চিঠি লেখেন যেখানে তিনি ভারতবর্ষে ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরপ করেন। তৎকালীন ভারতবর্ষে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন সম্পর্কিত স্পষ্ট দুটি মতবাদ ছিল। একটি ছিল সংস্কৃত ও পার্শী শিক্ষার পক্ষে, অন্যটি ইংরেজির। হিন্দু কলেজ স্থাপিত হওয়ার সময়ে রামমোহন রায় কমিটির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, গোঁড়া হিন্দুদের আপত্তি বুঝে তিনি নিজেই সেই কমিটি থেকে সরে এসেছিলেন। ১৮৩০ সালে ডফ সাহেব ভারতবর্ষে আসেন এবং রামমোহন রায়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হওয়ার পর তিনি একটি ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব দেন। সেই প্রস্তাব রামমোহন সাদরে গ্রহণ করেন এবং ব্রাহ্ম সমাজের জন্য সংরক্ষিত ঘর থেকে তিনি একটি ঘরও স্কুলটির জন্য প্রদান করেন। সেখানে বাইবেল পড়ানো নিয়ে সমস্যা হলে রামমোহন রায় ছাত্রদের বলেন যে, বাইবেল পড়লেই খ্রিস্টান হয় না, কোরান পড়লেই মুসলমান হয় না। আমি বাইবেল পড়েও খ্রিস্টান নই।

তৎকালীন সমাজে নারীদের নিয়ে যে চিন্তা ভাবনার প্রচলন ছিল রামমোহন রায় ঠিক তার উলটো পথে হাঁটলেন। তিনিই প্রথম বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা করলেন—সর্বশাস্ত্রতে এবং সর্বজাতিতে নিষিদ্ধ যে আত্মঘাত তাঁহার অন্যথা করিতে পারেন যাঁহাদের শাস্ত্রে শ্রদ্ধা নাই এবং যাঁহারা স্ত্রীলোকেদের আত্মঘাতে উৎসাহ করিয়া থাকেন। তাঁর নারীদের প্রতি সহমর্মিতার জন্য মিস এইকিন তাঁর সম্পর্কে বলেছেন দ্য ফ্রেইন্ড অ্যান্ড চ্যাম্পিয়ন অব উইমেন। সেকালে সংস্কৃত ভাষা ও শাস্ত্র অধ্যয়নে নারী এবং শুদ্রের কোন অধিকার ছিল না। তিনি সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদ করে সেই সমস্যার সমাধান করলেন। তিনি তাঁর উইলে বলে গিয়েছিলেন যে তাঁর বংশধরেরা এক পত্নী থাকাকালীন আবার বিবাহ করলে সম্পত্তির ভাগ থেকে তাদের বঞ্চিত করা হবে।

১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জুলাই লর্ড উইলিয়াম বেংন্টিক গর্ভনর জেনারেল হয়ে ভারতে আসেন। তিনি সমাজ সংস্কারে উৎসাহী ছিলেন। রামমোহন রায় যুক্তি দিয়ে তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে কোন হিন্দু বিধবা নারী নিজের ইচ্ছায় সতী হয় না। বরং তাকে বলপূর্বক স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় উঠিয়ে দেওয়া হয়। আবার অনেক সময় বিধবা নারীটির শোকের সুযোগ নিয়ে বা তাকে মাদকাচ্ছন্ন করেও স্বামীর সঙ্গে সহমরণে ঠেলে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, কেউ যাতে বিধবা রমণীর চিৎকার শুনতে না পায় তাই সহমরণের সময় ঢাক, ঢোল, কাঁসা ইত্যাদি সশব্দে বাজানো হয়। বেংন্টিক অবশেষে ১৮২৯-র ৪ ডিসেম্বর সতীদাহ প্রথা আইনত নিষিদ্ধ করেন। এই আইন প্রণয়নের সাথে সাথেই রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ রামমোহন রায় এবং সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফেটে পড়ল—সতীদাহ প্রথা নিবারণকারী আইন রদ করতেই হবে। তারা সমাচার চন্দ্রিকা নামে একটি পত্রিকায় প্রচার করতে শুরু করলেন যে রামমোহন রায়ই সতীদাহ প্রথা নিবারণকারী আইনের মূল সমর্থক। তিনিই লর্ড উইলিয়াম বেংন্টিককে ভুল পথে চালনা করেছেন। তিনি জন্মসূত্রে হিন্দু হতে পারেন, কিন্তু তিনি হিন্দু সমাজের কেঊ নন। ১৮৩০-র ১৪ জানুয়ারি রাধাকান্ত দেব, রামগোপাল মল্লিক, নিমাইচাঁদ শিরোমণি, ভবানীচরণ মিত্র প্রমুখ ব্যক্তিরা বেংন্টিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সতীদাহ প্রথা নিবারণকারী আইনের বিরুদ্ধে তাঁদের সুস্পষ্ট অবস্থান জানিয়ে আসলেন।

সমাচার চন্দ্রিকা, বঙ্গদূত এবং সম্বাদ তিমির—এই পত্রিকাগুলি সেই সময় রাধাকান্ত দেবের সমর্থক ছিল। রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর, কালীনাথ রায় প্রমুখরা লর্ড উইলিয়াম বেংন্টিককে অভিনন্দন জ্ঞাপন করে কোলকাতার টাউন হলে যে দিন তাঁকে সংবর্ধনা দেন ঠিক তার পরের দিন কোলকাতার ধনী ও প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে রাধাকান্ত দেবের সভাপতিত্বে একটি ধর্মসভা আয়োজিত হয়। সেখানে রামমোহন রায় ও তাঁর অনুগামীদের সমাজচ্যুত করার শপথ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এত কিছু করেও হিন্দু রক্ষণশীলরা কোন প্রভাব সরকারের ওপর ফেলতে পারেনি। দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে চলা সহমরণ সমর্থকদের আবেদনকে অগ্রাহ্য করে প্রিভি কাউন্সিলের একটি সভায় সরকার সতীদাহ প্রথা নিবারণকারী আইনকেই বলবত রাখেন।

(ক্রমশ…) 

 
 
top