অন্তঃপুরের মসীকথা

 

নারীমুক্তি আন্দোলনের ফলে নারীদের দ্বৈত সত্তার প্রকাশ ঘটেছিল। একদিকে সে বিশ্বগত, অন্যদিকে ব্যক্তিগত। যখন সে বিশ্বগত, তখন সে সকলের সঙ্গী। কিন্তু যখন সে ব্যক্তিগত, তখন তার সুখ, দুঃখ, ভালোলাগা, যন্ত্রণা, তার সবকিছুই একান্তভাবেই তার ব্যক্তিগত। নারীদের ব্যক্তিসত্তা জাগরণের পিছনে অবশ্যই সমকালের প্রভাব ছিল। সাহিত্যে প্রেমের আবির্ভাব ঘটল। ধর্মীয় শৃঙ্খলা যত আলগা হতে থাকল, সমাজে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বৃদ্ধি পেল। আঠেরো শতকের নবজাগরণ যদি বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের ফল হয়, তাহলে রোমান্টিক আন্দোলন হৃদয়কে গুরুত্ব দেওয়ার আন্দোলন ছিল। 

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কেশবচন্দ্র সেনের ব্রাহ্মধর্মের প্রসারের ফলে মানুষের চেতনায় রিভাইভ্যাল অব ফিলিং একটা চলছিল। সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমান গুরুত্ব পায়। কিন্তু সমাজ বা পরিবারের ক্ষেত্রে সেই গুরুত্ব নারীরা পাচ্ছিল না। প্রমীলা, সূর্যমুখী, কুন্দনন্দিনী ও রোহিনীদের চরিত্রগুলো সাহিত্যে জ্বলজ্বল করলেও, বাস্তব জীবনে তাঁদের কোনো ঠাঁই ছিল না। উল্লেখ্য, ইউরোপে ততদিনে সামাজিক আন্দোলন ঘটে গিয়েছে। সেখানে পুরুষদের পাশে নারীরা সমাদৃত। নারীর নিজের প্রয়োজনেই যে নারীশিক্ষা প্রসারের দরকার, ইউরোপ তা অনেক আগেই বুঝে গিয়েছিল। তাই নারীশিক্ষা প্রসারের সপক্ষে কলম ধরেছিলেন সেখানকার লেখকরা। ভারতীয় সমাজে, বিশেষ করে বাঙালি সমাজে, নারীদের অবস্থান পরিবর্তন হতে থাকে এই সময় থেকেই।

মার্থা সৌদামিনী সিংহ রচনা করলেন নারী চরিত। সময়টা ১৮৬৫ সাল। বইটির বিষয় ছিল পাশ্চাত্যের কৃতি মহিলাদের জীবনী এবং এটি লেখাই হয়েছিল সেই সময়কার ছাত্র-ছাত্রীদের কথা মাথায় রেখে। রেভারেন্ড টমাস টিম্পসনের ব্রিটিশ ফিমেল বায়োগ্রাফি এবং টমাস গিবনের মেমোয়ার্স অব এমিনেন্ট পায়াস উইমেন বইদুটি থেকে মার্থা তাঁর লেখার মূল প্রেরণা পান। এই বইটিই প্রথম বাংলায় লেখা পাঠ্যবই। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন জেমস লঙকে।

ছেলেবেলা থেকেই সুরবালা ঘোষ কবিতা লিখতেন। সেকালের খ্যাতনামা অধ্যাপক রিচার্ডসনের প্রিয় ছাত্র নীলমণিদের তৃতীয় সন্তান ছিলেন সুরবালা ঘোষ। মা ছিলেন বিখ্যাত লেখক এবং সমাজ সংস্কারক কিশোরীচাঁদ মিত্রের একমাত্র কন্যা কুমুদিনী। এখান থেকেই বোঝা যায় সুরবালা ঘোষ পারিবারিক আবহে কী পেয়েছিলেন। আঠেরো বছর বয়সে তাঁর বিবাহ হয় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা ছাত্র অতুলচন্দ্র ঘোষের সাথে এবং শ্বশুরমশাই ছিলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ যিনি হিন্দু পেট্রিয়ট এবং বেঙ্গলী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সম্পাদক। এই পরিবেশে তিনি তাঁর বিদ্যাচর্চাকে আরও শানিত করেছিলেন। তাঁর পুত্র মন্মথনাথ ঘোষ বলেছেন, মাতৃদেবীর কবিতানুশীলনে পিতৃদেব যথেষ্ট উৎসাহ দিতেন। অনেক সময় একই বিষয় অবলম্বন করিয়া উভয়ে কবিতা লিখিতেন। কখনও একজন লিখিতেন অপরে তাহার উত্তর দিতেন, কখনও কোনও সংস্কৃত বা ইংরাজী কবিতা অবলম্বন করিয়া উভয়ে বাঙ্গালা কবিতায় তাহার রূপ দিতে চেষ্টা করিতেন। পিতৃদেবের মুখে শুনিয়াছি শব্দসম্পদে, ভাবের ঐশ্বর্যে ও ছন্দের সাবলীল গতিতে মাতৃদেবী অপরাজেয়া ছিলেন। মন্মথনাথ ঘোষ তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর মায়ের লেখা কবিতাগুলো একত্র করে মধুরা প্রকাশ করেন। এই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, বাল্যকালাবধি আমার পরমাধ্যা মাতৃদেবীর কবিতা রচনা অভ্যাস ছিল এবং এই অভ্যাস তিনি শেষপর্যন্ত রাখিয়াছিলেন। নারী স্বভাবসুলভ সংকোচবশতঃ তিনি জীবিতকালে তাঁহার রচনাগুলি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করিতে দেন নাই। … তাঁহার স্মৃতি জাগরুক রাখিবার উদ্দেশ্যে গাথাগুলি এখানে সংগৃহীত ও পুস্তকাকারে নিবদ্ধ হইল। তৎকালীন যুগে নারীশিক্ষা প্রসারে এই বইটির গুরুত্ব অপরিসীম।

(সমাপ্ত) 

 
 
top