অন্তঃপুরের মসীকথা

 

কুসংস্কারের জালে নারীদের জীবন ওষ্ঠাগত, শোষণ এবং বঞ্চনার আঘাতে নারী জীবন জর্জরিত, হৃদয় বেদনাহত। বাইরের পরপুরুষের সামনে নিজের মুখ দেখানোও পাপ। তাই একহাত ঘোমটার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখে, হাতে শাখা-পলা, সিঁদুরের চওড়া রেখা, শরীরে ভারী গয়নার শিকল পরিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হত যে নারী শৃঙ্খলিত। পুরুষের সেবা করা, সন্তান উৎপাদন এবং প্রতিপালন করা—এই হচ্ছে নারীর ধর্ম। এর বাইরে তার কোন জগত নেই এবং থাকতে পারে না। সমাজে নারীর মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি তখন অলীক কল্পনা মাত্র।

নারীমুক্তি আন্দোলন মেয়েদের মধ্যে সেই চেতনা জাগ্রত করল। পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব সম্পাদন করেও মেয়েরা কলম ধরল। সমাজের সমস্ত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জোরাল ভাষায় প্রতিবাদ জানাল তাদের লেখার মাধ্যমে। মানুষের ভিতরের ব্রহ্মশক্তিই মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে, খুঁজে নেয় আলোর পথের ঠিকানা। একটা ঘরের সবকটি জানালা বন্ধ রেখে, শুধু একটি জানালা খোলা রেখে একটা চারাগাছকে যদি ওই ঘরে রাখা হয়, তাহলে দেখা যাবে চারাগাছের কচি ডালপালাগুলো যে জানালা খোলা, যেখান থেকে আলো বাতাসের আনাগোনা, সেই দিকেই তার ডালপালা বিস্তার করেছে।

এমন একজন লেখিকা হলেন পাবনা জেলার বামাসুন্দরী দেবী। কৈলাসবাসিনী দেবীর ভাষায়: বামাসুন্দরী আমাদিগের পথ প্রদর্শকারূপে এই বঙ্গভূমিতে অবতীর্ণ হইয়া আমার মনকে উত্তেজিত করিলেনতাহার অনুকম্পা প্রাপ্ত না হইলে আমার এই হাঁড়ি বেড়ি ধরা হাত কখনই লেখনী ধারণ করিতে ইচ্ছুক হইত না। কথাগুলোর মাধ্যমে বোঝা যায় কৈলাসসুন্দরী বামাসুন্দরী দেবীর নির্দেশিত পথকেই অনুসরণ করে সাহিত্য জগতে নিজেকে মেলে ধরেছিলেন। লেখাই যে মুক্তির অন্যতম পথ তা বামাসুন্দরী দেবীর সঙ্গে কৈলাসবাসিনী দেবীও বুঝেছিলেন। হিন্দু মহিলাগণের হীনাবস্থা গ্রন্থের ভূমিকায় কৈলাসবাসিনী দেবী লিখেছিলেন, কতদিনে এই বঙ্গদেশে জ্ঞানসূর্য উদয় হইয়া অজ্ঞান অন্ধকার নষ্ট করিবে? হে বঙ্গবাসিনী ভগিনীগণ, কতদিন তোমরা সর্বগুণাকৃত হইয়া এই বঙ্গমাতাকে শোভিত করিবে?

মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার পরেও মেয়েরা ছেলেদের সমান শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। পরিবর্তন হয়নি মেয়েদের সম্পর্কে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও। কেন মেয়েদের উন্নতি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিল, কেন তাদেরকে পুরুষদের সমান শিক্ষিত এবং সমকক্ষ হয়ে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছিল, এই বিষয়ে বামাসুন্দরী দেবী গভীর আলোকপাত করেছেন তাঁর কী কী কুসংস্কার তিরোহিত হইলে এ দেশের শ্রীবৃদ্ধি হইতে পারে (১৮৬১) বইটিতে। নারী শিক্ষার প্রসার ও সমাজ সেবা ছিল তাঁর জীবনের মূল আদর্শ। এবং সেই কাজে তিনি যে শুধু বাধা পেয়েছেন তাই নয়, তাঁকে নিগৃহীতও হতে হয়েছে। কিন্তু তাঁকে দমিয়ে রাখা যায়নি। তাঁর লেখার মাধ্যমে তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে মুক্তি কেউ কাউকে দেয় না, মুক্তি অর্জন করে নিতে হয়।

বামাসুন্দরীর সমকালীন ছিলেন হরকুমারী দেবী, রাখালমনি গুপ্ত এবং দয়াময়ী দেবী। হরকুমারী দেবীর বিদ্যাদারিদ্রজননী (১৮৬১), রাখালমনি গুপ্তের কবিতা মঞ্জরী (১৮৬৫) এবং দয়াময়ী দেবীর পতিব্রতা ধর্ম (১৮৬৮) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হরকুমারী দেবী বিদ্যাদারিদ্রজননী গ্রন্থে লিখছেন:

পঞ্চমীতে যেই দ্রব্য না করে ভক্ষণ।

তার আদ্যবর্ণ অগ্রে করিয়া ভক্ষ।।

কর্কট মিথুন রাশে হয় যেই নাম।

রচয়িত্রী সেই দেবী কালীঘাটে ধাম।

দয়াময়ী দেবীর পতিব্রতা ধর্ম বইটিতে মেয়েদের স্বামী সেবাই যে জীবনের ব্রত, সে কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। স্বামীকে দেবতাজ্ঞানে পূজা করার যে শাস্ত্রীয় বচনটি আছে, তার উপরেই দয়াময়ী দেবী গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রচলিত হিন্দু ধর্মের যে রক্ষণশীল দিকটি রয়েছে, তাকে তিনি সাধুবাদ জানিয়েছেন, সমর্থন করেছেন।

(ক্রমশ…)

 
 
top