অন্তঃপুরের মসীকথা

 

কৈলাসবাসিনী দেবী

১৮৪৭। কালীকৃষ্ণ মিত্র এবং প্যারীচরণ সরকার মহাশয়দ্বয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বারাসাতে একটি মেয়েদের বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল। যখন মেয়েদের লেখাপড়া শিখলে বিধবা হতে হয় বা জাত চলে যায় ইত্যাদি কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে সমাজে তাদের কোনঠাসা করে রাখা হয়েছিল, তখন মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় তৈরি করা আক্ষরিক অর্থেই ছিল এক দুঃসাহসিক কর্মযজ্ঞ। স্বাভাবিকভাবেই সেই সময়কার সমাজের মাথারা এই কর্মযজ্ঞকে ভালোভাবে মেনে নেয়নি। কালীকৃষ্ণ মিত্র, প্যারীচরণ সরকার এবং তাঁদের অনুগামীদের প্রত্যেককেই সমাজচ্যুত হতে হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের উৎসাহে কোনো ভাঁটা পড়েনি। কালীকৃষ্ণ মিত্রের ব্যবহারে আকৃষ্ট হয়ে বহু মানুষ তাঁদের মেয়েদের এই বিদ্যালয়ে পাঠাতে শুরু করেন। বিদ্যালয়টি সম্পর্কে শিক্ষা সংসদের রিপোর্টে লেখা হয়:

Female education—In connection with this subject the Council have much gratification in placing on record the fact that a Native Female School has been established at Barasat by certain educated and philanthropic gentleman of the district.

তখন শিক্ষা সংসদের সভাপতি ছিলেন ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন। অনেকে বলেন বেথুন বারাসাতের এই বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করতে এসেছিলেন এবং সেটি দেখে তাঁর মনে ইচ্ছা হয়েছিল যে, অনুরূপ একটি বিদ্যালয় তিনি কলকাতায় স্থাপন করবেন। সেই ইচ্ছাই বাস্তবায়িত হয় ১৮৪৯ সালের ৭ মে। বেথুন সাহেবের প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির প্রথম নাম ছিল ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল। পরে, ১৮৫১ সালে বেথুন সাহেবের মৃত্যুর পর, এটির নাম হয় বেথুন স্কুল।

ইংরেজি শিক্ষায় প্রথম প্রকাশ্য বিদ্যালয় হিন্দু কলেজ এবং নারী শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রথম প্রকাশ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বারাসাতের কালীকৃষ্ণ বালিকা বিদ্যালয় শিক্ষার ইতিহাসে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে। দৃষ্টান্তমূলকভাবে এই দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই স্থাপিত হয়েছিল বাঙালির উদ্যোগে। ঠিক এরকমই এক সামাজিক অবস্থার মধ্যে নারীর লাঞ্ছনা এবং নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন কৈলাসবাসিনী দেবী। আনুমানিক ১৮৩৭ সালে তাঁর জন্ম। স্বামী দুর্গাচরণ গুপ্তর কাছে তিনি লেখাপড়া শেখেন। তাঁর হিন্দু মহিলাগণের হীনাবস্থা (১৮৬৩) সেই সময়কার নারীমুক্তি আন্দোলনে সাড়া ফেলেছিল। মেয়েদের জন্য বেথুন স্কুল স্থাপন হওয়ার পরেও নারী শিক্ষার প্রসার তেমনভাবে হয়নি। মেয়েদের সম্পর্কে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও সেইভাবে বদল হয়নি। পুরুষদের জীবিকার সঙ্গে ছিল উপজীবিকা আর সেই উপজীবিকা হল কৌলিন্য প্রথা যা নারীকে বাধ্য করত ব্যাভিচারের পথে। অর্থনৈতিক কারণেই অল্পবয়সী বিধবা মহিলারা বাধ্য হতেন রূপজীবিকার পথ বেছে নিতে। কৈলাসবাসিনী দেবী তাঁর লেখায় এই প্রথার তীব্র সমালোচনা করলেন:

কী অজ্ঞানতার বিষয় ইহাদিগের পত্নীগণ ব্যাভিচারিণী হইলেও অপমান হয় না। পুত্রগণ জারজ হইলেও মানের হানি হয় না। কেবল শ্বশুরালয়ে গিয়া পূজা না পাইলেই অতিশয় মানের লাঘব হইয়া থাকে।

বহুবিবাহ, কৌলিন্য প্রথার বিরুদ্ধে এবং বিধবা বিবাহের পক্ষে সামাজিকভাবে আন্দোলন যতটা জোরালো হওয়া উচিত ছিল, তা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে, ঘুনপোকা তখনও সমাজের ভিতরে জমাটভাবে অবস্থান করছিল। পরিবর্তনের ধ্বজা উঠলেও, সমাজ তখনও গহীন অন্ধকারে। কৈলাসবাসিনী দেবী লিখলেন:

এই বঙ্গদেশ নানাপ্রকার অনিয়মে পরিপূর্ণ রহিয়াছে, পরিবর্তন করিতে হইলে তাহার সমুদয় পরিবর্তন করিতে হয়, নতুবা একের উপর টান পড়িলে অন্য আসিয়া উপস্থিত হয়, যেমন বিধবা বিবাহ প্রচলিত হইয়াছে, কিন্তু বাল্যবিবাহ উঠিল না, এবং বহুবিবাহ বন্ধ হওয়ার আইন প্রচলিত হইয়াছে কিন্তু কৌলিন্য মর্যাদাটি থাকিবে। বিধবা ও বহুবিবাহ ফলস্বরূপ, কিন্তু কৌলিন্য মর্যাদা ও বাল্যবিবাহ ফলস্বরূপ হইয়াছে, যেমন বৃক্ষ মত্তে কখনোই ফল একেবারে নষ্ট হয় না, তেমনি কৌলিন্য মর্যাদা ও বাল্যবিবাহ সত্তে কখনোই বৈধব্য যন্ত্রণা ও বহুবিবাহ নিবারণ করিতে পারিবে না, যেহেতু কারণ থাকিলে সে কার্য কখনোই একেবারে নিবারিত হয় না।

কৈলাসবাসিনী দেবী জোরালো ভাষায় বোঝালেন যে, কৌলিন্য যেমন নারীকে ব্যাভিচারিণী করে তেমনি বাল্যবিবাহও নারীকে বালবিধবা করে। তাঁর অন্য দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল হিন্দু অবলাকুলের বিদ্যাভ্যাস ও তাহার সমুন্নতি (১৮৬৫) এবং বিশ্বশোভা (১৮৬৭) ।

(ক্রমশ…)

 
 
top