অন্তঃপুরের মসীকথা

 

নলিনীবালা দাসী

মাত্র ষোলো বছর বয়সে নলিনীবালা দাসী ইহজগতের মায়া কাটিয়েছিলেন। কিন্তু অল্প কয়েক বছরেই বাংলা কাব্য জগতে অসাধারণ প্রতিভার সাক্ষর তিনি রেখে গিয়েছিলেন। নলিনীবালার জন্ম কোলকাতায়, তাঁর মামাবাড়িতে। তাঁর মাতামহ ছিলেন নীলদর্পণ খ্যাত নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র। তাঁর পিতা ছিলেন লব্ধ প্রতিষ্ঠিত দার্শনিক ও সাহিত্যিক দেবেন্দ্রবিজয় বসু, হুগলি জেলার বলাগড় থানার অন্তর্ভুক্ত বক্সাগড় গ্রামের প্রসিদ্ধ বসু বংশের সন্তান। তাঁকে বিদ্যাসাগর মহাশয় বিশেষ স্নেহ করতেন। মূলতঃ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের উদ্যোগেই দেবেন্দ্রবিজয়ের সঙ্গে দীনবন্ধু মিত্রের কন্যা তমালিনীর শুভ পরিণয় হয়েছিল। নলিনীবালা ছিলেন তাঁদের প্রথম সন্তান। তিনি শুধু সুন্দরীই ছিলেন না, ছিলেন বিদুষীও। মাত্র বারো বছর বয়সেই তিনি রামায়ণ, মহাভারত ও সমসাময়িক সমস্ত বাংলা গ্রন্থ অধ্যয়ন করে তার বিষয়বস্তুর অন্তর্নিহিত অর্থ গ্রহণে সমর্থ হয়েছিলেন। দশ এগারো বছর বয়স থেকেই তাঁর কবিতা লেখার হাতেখড়ি হয়। তেরো বছর বয়সে তাঁর বিবাহ হয় হুগলি জেলার অন্তর্গত জয়পুর বাগুটিয়া গ্রামের আঠেরো বছরের যুবক সতীশচন্দ্র ঘোষের সঙ্গে। তিনি তখন কলেজের ছাত্র। দাম্পত্য জীবন পূর্ণতা পাওয়ার আগেই নলিনীবালা এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছিলেন। কিছুকাল পরে সতীশচন্দ্রও মারা যান।

তাঁর মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি যে অসংখ্য কবিতা রচনা করে গিয়েছিলেন তা পাঠকহৃদয়ে গভীর অনুভূতির ছাপ ফেলে। তিনি ছিলেন সুদূরের পিয়াসী। তাঁর কবিতার মধ্যে আত্মপ্রসারণের সুস্পষ্ট আভাষ পাওয়া যায়। অল্প বয়সেই তাঁর সুকুমারী প্রতিভা সবাইকে বিমুগ্ধ করেছিল। তাঁর মৃত্যুর পর, ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে, দীনবন্ধু মিত্রের পুত্র ললিতচন্দ্র মিত্র প্রকাশ করেন নলিনীবালার কবিতা সংকলন, নলিনী গাথা

নলিনী গাথা-য় কবিতার সংখ্যা ৭২টি। স্বপ্নসুন্দরী, আকাশ, অশ্রুজল, জীবনের খেলা, আঁধারে, বাঁশি, প্রভৃতি হচ্ছে উল্লেখযোগ্য কবিতা। কবিতাগুলির মধ্যে সেকালের সমাজজীবনের চিত্র পাওয়া যায়। বইটির শুরুতে বসন্তকুমারী দেবী নলিনীবালার মৃত্যু নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন:

কেনমা দুদিন তরে, এসে বেঁধে প্রীতি ডোরে

মায়াজালে বিজড়িয়ে ছিলে বাছা মোরে

নলিনী! সে কিরে শুধু কাদাবার তরে?

নলিনীবালার ভারতমাতা কবিতায় স্বদেশ বন্দনার কথাই বর্ণিত হয়েছে। ভারতমাতার রূপ বর্ণানায় তিনি বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন:

এলায়ে কুন্তল রাশি          অধরেতে আধ হাসি

রূপের বিজলী হেরে হাসিছে ধরণী,

কমনীয় কান্তি ছটা           মরি কি রূপের ঘটা

আনন্দে নাচি গো দেখে ও রূপের মোহিনী।।

কিরণ বসন গায়             মরি কিবা শোভা পায়

দাড়ায়ে ওই যে মাতা ভারতজননী;

সিন্দূরের বিন্দু ডালে        কমনীয় শোভা খেলে

ঝলসিছে জননীর কিবা তনুখানি!

(ক্রমশ…)

 
 
top