বাংলা সাহিত্যের নারীবাদী পাঠ : প্রথম পর্যায়-ইতিহাসমালা-র মেয়েরা

 

সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে মেয়েদের নিয়ে ভাবনা-চিন্তার প্রথম শুরু সেই আপ্তবাক্য দিয়ে, ‘আপনা মাসে হরিণা বইরি’ হরিণীর নিজের মাংসই তার শত্রু। বলা বাহূল্য চর্যাপদের কবির সেই অনুভব আজও ভীষণ সত্যি। উত্তর-আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে আজও নারী শরীরই যে তার শত্রু সেই কাহিনি উঠে আসে শিল্প সাহিত্যের সবরকম মাধ্যমে। তবু বলতেই হয়, আজও বাংলা সাহিত্যে নারীপ্রধান সাহিত্য খুবই কম। নারী তার নিজের কথা বলছে, তার সমস্ত ভালোলাগা, ভালোবাসার অন্তরালে লুকিয়ে রাখা সুখ-দুঃখ, কষ্ট বলছে নিজের ভাষায় তার উদাহরণ নিশ্চয়ই আছে, পরিমাণে কম। আশাপূর্ণা দেবী, মহাশ্বেতা দেবী, কবিতা সিংহ বা এই সময়কার কতিপয় লেখককে বাদ দিলে মেয়েদের কথা প্রতিফলিত হচ্ছে এমন সংখ্যা কম। তবে এ সমস্তই হয়ত লিখিত সাহিত্যের ক্ষেত্রেই বেশি সত্যি। মৌখিক সাহিত্য সোজাসুজি কথা বলে অনেক বেশি, আর মৌখিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে আরও বেশি সত্যিটা হল তার বেশিরভাগ অংশই কথিত হয়, উচ্চারিত হয় মেয়েদেরই মুখে। ফলে সেখানে মেয়েদের নিজস্ব স্বর শোনার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। তাই বাংলা সাহিত্যের নারীবাদী পাঠ শীর্ষক যে আলোচনার চেষ্টা আমরা করছি তা লৌকিক সাহিত্য দিয়েই হওয়া উচিত।

আসলে বাংলা সাহিত্য পাঠ-এ মেয়েদের নিয়ে চর্চা যেমন অবহেলিত, তেমনই অনাদৃত লোকসাহিত্য। হয়তো এই দুই-এর মধ্যে একটা অন্যরকম যোগাযোগ আছে বলেই এই অনাদর। অথচ বাংলা লৌকিক জগতের মেয়েরা বহুদিন ধরে বলে আসছে তাদের নিজের কথা তাদের গানে, গল্পে, পাঠে। সেখানে কোনো আধুনিকতার পাঠ তাদের আলাদা করে নিতে হয়নি। তারা তাদের মনের কথা বলেছে সহজ করে। যদিও প্রশ্ন থেকেই যায়, সেই মনের কথাতেও কি পুরুষতন্ত্রের প্রভাব পড়ছে না? বাঙালি মেয়েরা কি আদৌ নিজেদের কথা নিজেরা ভাবতে পেরেছে কোনোদিন?

ইতিহাসমালা প্রসঙ্গে এতগুলো কথা বলার এটাই কারণ, এই বইটি একই সঙ্গে একাধিক দিক থেকে গুরুত্ব তৈরি করেছে বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে। প্রথমত, এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম লোককথা সংগ্রহ । শুধু তাই নয়, আমরা দাবি করতেই পারি, এটি পৃথিবীর প্রথম লোককথা সংগ্রহ। প্রচলিত তথ্য বলে, ১৮১২-তে প্রকাশিত জার্মান ভাষায় লেখা গ্রিম ভাইদের বইটিই পৃথিবীর প্রথম রূপকথা সংগ্রহ। কিন্তু আমরা এই তথ্যটা ভুলে যাই যে, ১৮১২-তে ইতিহাসমালা যখন প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল, তখন আগুন লেগে গুদামের সমস্ত বইই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে বইটির অস্তিত্ব প্রায় হারিয়ে যায়। পরবর্তীকালে ফাদার দ্যতিয়েন যখন বইটি সম্পাদনা করেন, তখন তিনি এই সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন :

একাধিক গল্প একাধিক কারণে আপত্তিকর বিবেচিত হওয়াতে কোনো নীতিবাগিশের আদেশে বোধহয় বইগুলো ইচ্ছে করেই ভস্মীভূত করা হয়েছে…

আর এই সংক্ষিপ্ত তথ্যের মধ্যেই হয়তো একটা বড়ো সত্য লুকিয়ে আছে – বাংলাদেশের তৎকালীন সমাজব্যবস্থার সত্যিকারের ছবিটা। আর আমাদের আলোচ্য মেয়েদের অবস্থান সম্পর্কেও একটা চিত্র পাওয়ার সম্ভাবনা হয়।

কেমন ছিল ইতিহাসমালা-র মেয়েরা? আমরা দেখি এই গ্রন্থের বহু গল্পই নারীকেন্দ্রিক। যদিও এর বহু গল্পই কোনো বিদেশি বা সংস্কৃত গল্পের অনুবাদ। আবার বেশ কিছু গল্পই মৌলিক। তবে যখনই কোনও লিখিত গল্প মৌখিকতা প্রাপ্ত হয়, তখনই তো তার স্বাভাবিক লিখিত শর্ত থেকে সে বেরিয়ে আসে। ঠিক যেমনটা ঘটে বিপরীত ক্ষেত্রে। মৌখিক কাহিনি লিখিত হয়ে উঠলে সেও তার কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য থেকে বেরিয়ে আসে। অর্থাৎ লিখিত এবং মৌখিক কাহিনি সর্বদাই তার লেনদেন করে থাকে। আর তাই-ই ইতিহাসমালা-র সব কাহিনিই যেহেতূ শ্রুত এবং তারপরে সংকলিত, তাই আমরা এর সব কাহিনিকেই লোককথা হিসেবেই ধরে নিচ্ছি। অনুমান করা হয়, উইলিয়াম কেরি নিজে, তাঁর পুত্র ফেলিক্স কেরি, রামরাম বসু প্রমুখরা এই গল্পগুলো আশপাশ থেকে শুনেই সংগ্রহ করেছিলেন। তাই আমাদের কাছে এই সবগুলোই মৌখিক সাহিত্য, যদিও এই সাবধানবাণী আমাদের মনে রাখতেই হবে :

The written version of an oral tale always freezes the message, the form, the style and the language format.

Tales: Oral and Written/Komal Kothari

Narrative A Seminar/Sahitya Academy

ফাদার দ্যতিয়েন ইতিহাসমালা-র ভূমিকায় দেখিয়েছেন, প্রায় ত্রিশটিরও বেশি গল্প নারীপ্রধান। সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীদের নিয়ে সে-সব গল্প। সেখানে আছেন রানি, রাজকন্যা, বণিকপত্নী, ব্রাহ্মণ নারী, কৃষকপত্নী, দেওয়ানের স্ত্রী থেকে আরম্ভ করে লাবণ্যবতী বেশ্যা, অসতী, কলহপ্রিয়া প্রমুখরা। এছাড়াও আছেন লহনা, খুল্লনা প্রমুখরাও। ৩২নং গল্পটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটা ভয়ানক ভূমিকা পালন করে বলে আমার মনে হয়। কোনো এক দেশের রানির সঙ্গে সেই দেশের মন্ত্রীর প্রেম। তারা দুজনে দেশ ছেড়ে পালানোর পরিকল্পনা করে। রানি রাজাকে খুন করে এসে দেখে মন্ত্রী সাপের কামড়ে মারা গেছে। ফলে রানি অন্য দেশে গিয়ে বেশ্যাধর্ম নেয়। পরবর্তীকালে রানির পুত্র রাজা হয় এবং দেশবিদেশের বেশ্যাগমন করে। এইভাবে সে নিজের মায়ের সঙ্গেও গমন করে। গল্পের বাকি অংশটা বাহুল্য। বা বলা যেতে পারে জানা। রানি নিজের কর্মফলের ফলে পাগল হয়ে যায়। কিন্তু আমরা ইদিপাস কমপ্লেক্স-এর এই দেশি কাহিনিকে কেন আলোকিত করিনি? এর পিছনেও কি মৌখিক সাহিত্যের প্রতি আমাদের অবজ্ঞা আর আমাদের আরোপিত নীতিবাদী সমাজের প্রতি আস্থা? গল্পটির শেষে রানির পরিণতি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা আছে রানির কুকর্মের ফল। যদিও একবারও মন্ত্রী বা রাজপুত্র, যে নিজের মায়ের সঙ্গে অভিগমন করল, তাদের কর্মফল নিয়ে কোনো কথা বলা হয়নি। ঠিক একইভাবে ৬নং গল্পটিতে দেখান হয়েছে রথকারের স্ত্রী স্বামীর অনুপস্থিতিতে উপপতির সঙ্গে সময় কাটায়। স্বামী ফিরে আসলে উপপতির অনুরোধে স্বামীকে হত্যা করে। অবশ্য এই গল্পটিতে কোনও নীতিবাক্য বর্ষিত হয়নি। কিন্তু নারীর কুকর্মের কাহিনিতেই এটি শেষ হয়। আবার দুই সতিনের উল্লেখযোগ্য কাহিনি ১১২নং গল্পটি। ধনপতি সদাগর লহনাকে বিবাহ করার পর কোনো সন্তান জন্মাল না দেখে খুল্লনাকে বিবাহ করেন। ফলত দুই সতিনে লড়াই, মারপিট চলতেই থাকে। আর এই জাতীয় সব গল্পগুলোই নারীর নানাবিধ কুকর্মে শেষ হয়। আমরা জানি, বাংলাদেশের রূপকথাগুলোতেও এমনটাই প্রচলন। রাজা একাধিক বিবাহ করেছেন অনায়াসে শুধু বড়ো রানির সন্তানহীনতার কারণে আর সুয়োরানিদের যাবতীয় ঈর্ষা নিন্দিত হয়েছে চিরকাল। কারণ স্বামীর বহুগামিতা স্বাভাবিক কারণেই তারা মেনে নিতে পারেনি বলে। (এ প্রসঙ্গ অন্যত্র আলোচিত হয়েছে : লোককথার মেয়েরা এবং অন্যান্য, ঈশা পাল)।

১৩৭নং গল্পে চোরেরা রানির দাসিকে ধর্ষণ করে সেই ছবি দেখতে পাই। আর ৫৬নং গল্পে দেখি সদাগর বাণিজ্য থেকে ফিরে কীভাবে নিজের যুবক পুত্রকে স্ত্রীর উপপতি ভেবে খুন করতে উদ্যত হয়। তবে বেশ কিছু গল্পে নারীর সেবা বা আত্মনিবেদন কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ৫৬নং গল্পটিতে রত্নাবতী নামক এক পতিপ্রাণা নারীর কথা বলা হয়েছে।

আর এ-সবের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে আছে বেশ কয়েকটি গল্প, যেগুলিতে বুদ্ধিমতী নারীর প্রসঙ্গ আলোচিত। ২১নং গল্পটিতে এক বণিককন্যার কথা আছে, যে রাজপুত্রকে বেশ কয়েকটি বুদ্ধিদীপ্ত সঙ্কেত পাঠায়, সেই সঙ্কেতের অর্থ বোঝার জন্য বুদ্ধিমান মন্ত্রীপুত্রের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। এই একই গল্পে এক ধোবানির উল্লেখও পাওয়া যায়, যার কথার নিহিত অর্থ রাজপুত্র বুঝতে পারেনা। ২২নং গল্পটিও এক গুণবতী মেয়ের, যদিও মেয়েটি প্রসঙ্গে প্রথমে বলা হয়েছে যে রাজকন্যা অতীব সুন্দরী, ‘তাহার সর্বাবয়ব সুন্দরের নিমিত্ত তাহার নাম সর্বাঙ্গসুন্দরী।’ পরে অবশ্য পুরো কাহিনিটিই রাজকন্যার বিদ্যা এবং বুদ্ধির পরিচয় বলা হয়েছে যা জ্ঞানী মন্ত্রীকেও নিরুত্তর করে দেয়।

অর্থাৎ, ইতিহাসমালা-য় আমরা একইসঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি বা প্রকৃতির নারী পাই, যদিও তাদের মধ্যে বুদ্ধিমতী মেয়েরা সংখ্যায় নেহাতই কম। বেশিরভাগ মহিলাই দোষী। কেউ চরিত্রগতভাবে, কেউবা স্বভাবগতভাবে। চরিত্রহীন নারীরা যে কোনো পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের জন্যই নিন্দিত, যেন সেই সত্য ভুলে যাচ্ছেন গল্পকারেরা। প্রায় এই জাতীয় কোনো কাহিনিতেই পুরুষের নিন্দা করা হয়নি। যেন সমাজরক্ষার দায়িত্ব একা পালন করবেন মেয়েরা। আবার যে-ক্ষেত্রে দুই সতিন লড়াই করে, সেখানেও কোথাও পুরুষের বহুবিবাহের প্রতি একবারও আঙুল তোলা হয় না। স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহকে না মানতে পারা বা ঈর্ষান্বিত হওয়া পুরোপুরি মেয়েটির দোষ বলেই বিবেচিত হয়। আমরা ভুলে যাই কৌলিন্য প্রথার মতো কয়েকটি কুপ্রথাকে। এই প্রথাটি পুরোপুরিই ছিল কন্যাগত। কুলীন ছেলে যে-কোনো জাতে বিবাহ করতে পারবে, কিন্তু কুলীন মেয়েকে কুলীন ছেলের সঙ্গেই বিয়ে দিতে হবে। ফলে যা হওয়ার, তাই হয়েছিল :

সাধারণতঃ কুলীন ব্রাহ্মণ অগুনতি বিবাহ করত এবং স্ত্রীকে তার পিত্রালয়েই রেখে দিত। এরূপ প্রবাস–ভর্তৃক সমাজে কুলীন কন্যাগণ যে সব ক্ষেত্রেই সতী-সাবিত্রীর জীবন যাপন করত, সে কথা হলপ করে বলা যায় না।

(আঠার শতকের বাংলা ও বাঙালী – অতুল সুর, পৃ. ৮৫)

তাই বলা যেতে পারে আঠারো শতক জুড়েই ছিল এক ধরণের নীতিহীনতা, যার জন্য দায়ী হওয়া উচিত সামাজিক কুপ্রথাগুলোরই। অথচ যার ফল ভোগ করতে হয়েছে মেয়েদের এবং দায়িত্বও নিতে হয়েছে মেয়েদের।

এখানে আমরা বিক্ষিপ্ত কয়েকটি তথ্য দেখে নিতে পারি যা ইতিহাসমালা-র সংকলনের সময়কার নারীর অবস্থানের ছবিটি দিতে পারবে। স্ত্রীশিক্ষা কোনোদিন বাংলাদেশে প্রচলিত ছিল না শুধু নয়, তার বিপক্ষে ছিল বহুবিধ মত। মদনমোহন তর্কালংকার ‘স্ত্রী শিক্ষা’ প্রবন্ধে বলছেন :

শিক্ষা কর্মের উপযোগিনী যে সকল মানসিক শক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির আবশ্যক স্ত্রী জাতির তাহা নাই।

এবং :

স্ত্রী জাতির বিদ্যাশিক্ষার ব্যবহার এদেশে কখন ও নাই… অতএব লোকাচার বিরুদ্ধ…।

আরও আছে :

স্ত্রী জাতি বিদ্যাবতী হইলে স্বেচ্ছাচারিণী ও মুখরা হইবেক।

বিদ্যার অহংকারে মত্ত হইয়া গুরুজনকে অবজ্ঞা করিবেক।

(উৎস : সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ৩য় খণ্ড, সম্পা. বিনয় ঘোষ, ঊনবিংশ শতকের স্ত্রীশিক্ষার একটি ধারা—অন্তঃপুর শিক্ষা, বিনয়ভূষণ রায়)।

অর্থাৎ বাংলার মেয়েরা স্বভাবতই অশিক্ষার আলোতে বড়ো হয়েছেন তাঁদের স্বাভাবিক লোকাচার এবং বিচারবুদ্ধিকে নিয়ে। তাঁরা সমাজের অনুশাসনকে মেনে নিতে বাধ্য থেকেছেন দিনের পর দিন। আর নিজেদের কথায় তাঁরা নিজেদের মতো করেই প্রতিবাদ করেছেন তাঁদের বলা গল্পে, গানে। পরবর্তীকালে খ্রিস্টান মিশনারিরাই উদ্যোগ নিয়েছিলেন এখানকার মেয়েদের শিক্ষিত করে তুলতে। এ ব্যাপারে শ্রীরামপুর মিশনের হানা মার্শম্যানের নাম বিশেষ উল্লেখ্য। কিন্তু এখানকারই বিভিন্ন বাধায় তা সার্থক হয়ে ওঠেনি। ১৮৩০-এ হিন্দু কলেজের কিছু প্রাক্তন ছাত্র যেমন রাধানাথ শিকদার, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় প্রমুখরা Public Institution-এ মেয়েদের পড়ানোর কথা ভাবতে শুরু করেছেন। ১৮৪৭ এ প্যারীচরণ সরকার বারাসাতে মেয়েদের জন্য একটি ফ্রি স্কুল খোলেন। পরবর্তীকালে এর নাম হয় কালিকৃষ্ণ হাইস্কুল (সূত্র : উনিশ শতকের বাংলায় নারীশিক্ষা, সীমন্তী সেন)। আর বেথুন স্কুল হওয়ার পর মেয়েদের লেখাপড়া শেখাটা অনেকটা এগিয়ে চলে। যদিও বলাই বাহুল্য এই শিক্ষার বিষয়টা সমাজের Greater Tradition-এর অন্তর্গত মানুষদের জন্যই। Little Tradition সর্বদাই মুক্ত তার নিজের পরিধিতে। আর বাংলাদেশের আপামর নারীকুল কি আদৌ সমাজের উচ্চপর্যায়ভুক্ত হতে পেরেছিল? মেয়েদের শিক্ষা শুরু হওয়ারও বহুদিন পর পর্যন্ত এই প্রশ্ন অব্যাহত থেকে যায়। অষ্টাদশ শতকের প্রেক্ষাপটে হটি বিদ্যালংকার বা হটু বিদ্যালংকার নামক দু-এক জন পণ্ডিত নারী ছাড়া বাকিদের অন্ধকারময় জীবনের ছবি বহু জায়গায় পাওয়া যায় (দ্র. আঠারো শতকের বাংলা ও বাঙালী, ড. অতুল সুর)। তাই মেয়েরা তাদের নিজেদের আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ, প্রতিবাদও প্রকাশ করতে চেয়েছে তাদের নিজেদের কথায় – রূপকথায়, ব্রতকথায়। আর সমাজের পুরুষ নির্দেশিত যে নিয়ম তা সবসময় বজায় রাখার কোনো দায় তারা বোধ করেনি। এটাই লোকসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য। আর সেই জন্যই হয়ত ফাদার দ্যতিয়েনের মতো সম্পাদকদের মনে হয়েছে নীতিবাগীশ পণ্ডিতেরা সহ্য করতে পারেনি ইতিহাসমালা-র মত গ্রন্থটি। আর তাই-ই হয়তো আগুন লেগে পুড়ে যায় এর স্টক।

কিন্তু মেয়েরা নিজেদের কথাও কি নিজেরা স্পষ্টতই বলতে পেরেছিল তাদের গল্পগুলোয়? খুব স্পষ্ট কোনো প্রমাণ নেই উইলিয়াম কেরি বা তাঁর সঙ্গীরা মহিলা না পুরুষ, ঠিক কাদের থেকে গল্পগুলি সংগ্রহ করেছিলেন? মহিলারাই মূলত লোককথার ধারক বলে অনুমান করা যেতে পারে । বেশ কিছু মৌলিক গল্প তাঁদের বলা। অনূদিত গল্পগুলোর মধ্যে খুব বেশি করেই পুরুষ সমাজের প্রভাব দেখা যায়। আর প্রচলিত লোককথার ধরণকেও দেখা যায় নারীদেরই দোষী করার ফর্মূলাতে। সুয়োরানি-দুয়োরানির লড়াই ইত্যাদি ছাড়াও রাজার অকর্মা ছবি, এসমস্তই রাজা বা পুরুষটিকে বাদ দিয়ে মেয়েদের নিজেদের মধ্যে কলহ। তখনই আমাদের প্রশ্ন জাগে, তাহলে এই কাহিনিগুলি আসলে বলেছেন কারা? মেয়েরা কি তাহলে নিজেদের অগোচরে বলে চলেছেন পুরুষতন্ত্রের শেখানো কথাগুলোই? 

(ক্রমশ…)

 
 
top