চেঙ্গিস খানের পৃথিবী

 

১.

ঘোড়ায় চেপে ওই যে চোখের সামনে দিয়ে ছুটে গেল চেঙ্গিস খান। মোঙ্গোলিয়ার এমন তেজি টাট্টু ঘোড়া নিয়ে সে যে ভারত অভিযানে আসবে – সে কথা জানত না সুমন। চেঙ্গিস খানের পিছনে কয়েকশত অশ্বারোহী। তারা যেমন অত্যাচারী, তেমনি দুর্দান্ত। তাদের একটু দূরে দাঁড় করিয়ে রেখে বৃদ্ধ চেঙ্গিস খান বললে, ‘একবার এসো না আমার দেশ মোঙ্গোলিয়ায়!’

সকালের সময়টা সুমনের কাটে মন্টুদার চায়ের দোকানে। পাড়াতে দোকান। আর মন্টুদা পাড়ারই ছেলে। সেই কবে থেকে দোকান দিয়ে রেখেছে মন্টুদা। আরও বিশদে বললে, দোকানটা আসলে মন্টুদার বাবার। তাঁর বয়স হয়ে যাওয়ায় এখন মন্টুদাই দোকান চালায়। একসময় এই মন্টুদা তার হিরো ছিল। অল্প বয়সে যেমন একজন রোল মডেল থাকে, তেমনি। খেলাধুলোয় তখন চৌখস ছিল মন্টুদা। লোকের বিপদে-আপদে মন্টুদা সবসময় সবার আগে। তা এহেন মন্টুদার দোকানে কে না আসে। কী না কথা হয়। সেই সব আলোচনায় সুমন কখনও অংশ নেয়, আবার কখনও চুপ করে থাকে। চা খায়, সিগারেট নেয়। আবার কোনোদিন কিছুই ছোঁয় না। তখন চুপচাপ বসে না-থেকে সে চলে যায় জলার ধারে। জলা মানে বিস্তীর্ণ ফাঁকা জমি, জলাভূমি, হোগলার বন, মেদুর আকাশ আর গোচারণ-ভূমি। কতরকম পশু-পাখি আর বন্য জন্তুর আবাসস্থল। সচরাচর কেউ পা দেয় না এদিকে। কিছু মাতাল, নেশা-ভাঙ করা লোক আর ভবঘুরেদের আবাস। সেখানেই দলবল নিয়ে এসে থামে চেঙ্গিস খান। তেজি ঘোড়ারা সেই জলাভূমির কচি কচি তাজা ঘাস খায়। জল পান করে। চেঙ্গিস খানের সঙ্গীরা তখন গা এলিয়ে দেয়। ঘাসের বিছানায় তারা গা ভাসিয়ে দেয়। পোশাক খুলে গায়ে ঠান্ডা বাতাস লাগায়। তারাও শীতল জল পান করে। একজন বলে, ‘এখানে থেকে গেলে হত না, চেঙ্গিস বাবা?’

চেঙ্গিস এখন বৃদ্ধ। থুতনির দাড়ির যে স্টাইল সেই যুবা বয়স থেকে আছে, এখন তাতে পাক ধরেছে। দিনদিন কেমন যেন উদাসীন হয়ে যাচ্ছে সে। আগের যে তেজ ছিল, তাতে অভিজ্ঞতার প্রলেপ পড়েছে। চেঙ্গিস শান্ত স্বরে বলে, ‘কী বলিস? থেকে যাবি?’

‘তাছাড়া আবার কী? এত খাদ্য-পানীয়-সুন্দরী নারী এখানে থাকব নাতো কোথায় থাকব?’

‘আমরা বেরিয়েছি দেশ জয়ের আশায়। এই দেখেই মজে গেলি তোরা? এত কষ্ট কেবল এই জন্য! ওরে সে সব সমরখন্দের লোক করবে, আমরা নয়। আমার ছেলে যেবির সেনাপতিত্বে আমার বাহিনী সমরখন্দ আক্রমণ করে তা ছারখার করে দেয়। আসলে এর জন্য একটা পরিকল্পনা লাগে। সেটা আমি তোদের শিখিয়ে দেব। এই ভাবেই গোটা পৃথিবী পদানত করেছি আমরা। এবার ফিরতি পথে সিল্ক রোড ছেড়ে আমরা বাংলাদেশে প্রবেশ করলাম। এখানেও জয় করব, সবকিছু ভাগ করে নেব, তা নয়, এই রোগে ভরা মাটি-জলে থিতু হবার মতলব। কেন রে?’

তারপর সুমনের দিকে ফিরে বললে, ‘খুব আয়েশি হয়ে গেছে এরা। না খেটেই হাতের কাছে পেলে এই বিপদ হয়। আচ্ছা সুমন, তোমাদের কোনো রাজা নেই? তার লোকবল নেই? আমরা তোমাদের দেশে লুটপাট চালালাম। তেমন বাধা পেলাম না। এরপর আরো অনেক জাত আসবে, তৈমুর আসবে তোমাদের লুট করে নিতে। তোমরা কি নিজেদের লুন্ঠিত দেখতে ভালবাস?’

‘তা কেন? আগে যা সব হয়ে গেছে তা গেছে। এবার? এখন দেশ স্বাধীন। কেউ আর চোখ তুলে দেখতে সাহস পাবে না।’

হা হা করে হাসল চেঙ্গিস খান। তার সামনের একটি দাঁত ভাঙা। ছোটোছোটো চোখের অনেকটা উপরে যে একটুখানি ভুরু, তাতে পাক ধরেছে। তাকে এক সন্ন্যাসীর মতো লাগে। বললে, ‘তুমি খুব ছেলেমানুষ, সুমন। তোমার বয়স বেড়েছে, মন তেমন বাড়েনি। এখন আর বিদেশি শক্তি আমাদের মতো আক্রমণ করে না। তারা বণিকের ছদ্মবেশ ধরে। সেই বেশে তারা রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাইরে থেকেই তারা সরকার ভাঙে, গড়ে, বিপ্লব আনে আবার বিদ্রোহী তৈরী করে। তাদের ব্যবসা বাড়ে। এই পদ্ধতিটা কারা শিখিয়েছিল জানো? ব্রিটিশরা।’

‘আমায় একটা ঘোড়া দিতে পার?’

‘আবার হা হা করে হাসল চেঙ্গিস খান।’

‘হাসছ যে? দেবে না?’

‘না বললুম কখন?’

‘তবে হাসছ যে! সুমন কেন জানি রেগে উঠল।’

‘বেশ বেশ আর হাসব না। তোমার মতো বয়সেই কত যুদ্ধে গেছি জান? ষোলো বছর বয়সে আমি প্রথম বিবাহ করি। আর তুমি? একটি মাত্র নারীর চক্করে পড়েই ফৌত হয়ে গেলে! নারীকে সামলানোর অনেক কায়দা আছে, সুমন। তুমি সে সব জান না, বুঝতে পারছি। আর তুমি সেই দুগ্ধপোষ্য বালক রয়ে গেলে! আর কেবল তোমাকেই বা বলি কেন, গোটা ভারতের মানুষই তাই। কোনোদিনই লড়তে জানে না। হরপ্পার লোকেরা হারল ইরানীয় আর্যদের কাছে। কত জাত এল – শক হূণ পাঠান মোগল। এক দেহে তারা লীন হল, এটা বলতে মজা লাগলেও কোনোবারই তোমরা কোনো খেলাতেই জিততে পারেনি, এটাই সত্যি। তোমরা কেবল মরতে পার। কী হবে এ জাতের? যাক গে! তোমাদের দেশের মানুষকে আমি কচুকাটা করলেও তোমাকে আমার ভাল লেগেছে। তাই একটি ঘোড়া তুমি উপহার পাবে। কিন্তু নিয়ে কী করবে?’

‘পেয়ারাতলায় বেঁধে রাখব। একটা ঘোড়া থাকা মানে কত সম্মানের তা তুমি যদি জানতে!’

‘আমাকে এ সব চিনিয়ে কী হবে বলো তো, সুমন? আমি যে উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ, সেখানে নিত্য খুনোখুনি, হানাহানি লেগেই ছিল। নিজেদের ভেতর সব কামড়াকামড়ি করে মরে। তা সেই সব ছোট ছোট দলকে গোষ্ঠীবদ্ধ করলাম। তারপর তো বাইরে পা দিলাম। যুদ্ধে জিতলে কত সম্মান তা জানো? তখন তুমি বীর। কত রাজারা কত ভেট পাঠায়!’

চেঙ্গিস থামল। তারপর আবার বলতে থাকল, ‘আমি জানি অশ্বপৃষ্ঠে দেশ জয় করা যায়, কিন্তু শাসন করা যায় না। আমি এখানে থাকব না। আমি এদেশের শাসনভার দিয়ে যাব তোমার হাতে। এই ঘোড়ায় চেপে তুমি তার দেখভাল করবে। পেয়ারাতলায় তো বাচ্চারা ঘোড়া বাঁধে, সুমন। এই নাও, আমার অতি প্রিয় টাট্টু ঘোড়া। ওর একটা নাম আছে। আবং। সেটা আমার দেওয়া। তুমি তোমার পছন্দ মতো একটা নাম ওকে দিয়ে দিয়ো।’

‘আবার কবে দেখা হবে তবে?’

‘সে তুমি আমায় ডাকলেই আমি চলে আসব।’

ঘোড়াটা হাতে পেয়ে তাকে নিয়ে যে কী করবে ভেবে পায় না সুমন। শেষে ঠিক করলে, এমন তেজি আর বদমেজাজি ঘোড়াকে টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তার নেই। বরং বাঁধা থাক এই গাছের সঙ্গে। পরে মন্টুদার চায়ের দোকানে গিয়ে মন্টুদাকে ডেকে আনলেই হল। মন্টু জানে না চেঙ্গিস খানের কথা। সে যে একজন ইতিহাস থেকে উঠে আসা চরিত্র, সে বিষয়ে কোনো ধারণাই নেই মন্টুর। সুমন যখন বলে চেঙ্গিস খানের কথা, সে অবাক হয়ে বলে, ‘মালটা কে? বাজারের নতুন পাগল?’

আমাকে পাগল ভাব তুমি? সুমন গম্ভীর হয়ে বলে।’

‘আহা, চটিস কেন? সে কে, কী করে বলবি তো। সেই থেকে খালি কপচাচ্ছিস, যুদ্ধ করে, মোঙ্গলিয়ায় বাড়ি। সেটা নাকি আবার বিদেশ! কোনদিকে মোঙ্গলিয়া? সেখান থেকে একটা লোক যুদ্ধ করতে এল ঘোড়ায় চেপে, কেবল তুই জানলি, কাকপক্ষীতে টের পেল না, এ কেমনভাবে হয়?’

‘বিশ্বাস না হয়, আমার সঙ্গে চলো। চেঙ্গিস খানের একটা ঘোড়া আমি উপহার হিসেবে পেয়েছি। সেটা গাছে বাঁধা আছে। চলো নিয়ে আসি।’

‘চল দেখি, বলে পাড়ার দোকানদার কাম লোকাল ছেলে মন্টুদা তার পিছু পিছু চলল। মাথার উপর গোল চাঁদ দেখা যাচ্ছে। তবে দিনের আলো আছে এখনও। তাতেই পথঘাট চিনে নেওয়া যায়।’

জলায় এসে মন্টু বলে,’কই রে?’

সুমন অনেক খুঁজল। কিন্তু দেখা মিলল না। সন্ধের অন্ধকারের সুযোগে তবে কি ঘোড়াটা পালাল? শক্ত বাঁধন দিয়েছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেটা খুব একটা শক্ত ছিল না। অমন তেজি পাহাড়ি ঘোড়া, সাধারণ বাঙালি তার বাঁধন দিতে পারবে কেন! সে নিচু গলায় বলল, ‘চলে গেছে!’

‘বাঁধন দিয়েছিলি যে?’

‘খুলে পালিয়েছে। খুব তেজি ঘোড়া। আসলে হয়েছে কি, সারা বিশ্ব জয় করে চেঙ্গিস যখন দেশে ফিরলে, তখন তার জন্য অপেক্ষা করছিল যুদ্ধ। স্থানীয় শত্রুদের সঙ্গে। সেই যুদ্ধে চেঙ্গিস ঘোড়া থেকে পড়ে মারা যায়। হাঁটুতে খুব বড়ো একটা চোট পেয়েছিল। সেটাই মৃত্যুর কারণ হল।’

‘তাতে কী?’

‘মানে?’

‘এই গল্প আমায় শোনাস কেন?’

‘আরে ওর সেই বজ্জাত ঘোড়াটির জন্যই তো চেঙ্গিস খানের এই পতন। একবার ভেবে দেখ মন্টুদা, এত বড় বড় যুদ্ধ করেছে সে, কিন্তু শেষে হল কি, সেই ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়েই মরতে হল। ভাবো একবার!’

‘তো?’

‘তোমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে না?’

‘কই না তো!’

‘তুমি আনন্দ পাচ্ছ না? নাচতে ইচ্ছে করছে না?’

‘কীসের জন্য নাচব, বল আমায়।’

‘আসলে সেটা চেঙ্গিসের প্রিয় ঘোড়া ছিল না। তাকে সরিয়ে এই ঘোড়াটা দেওয়া হয়েছিল। মনে হয় এটা একটা চাল। চেঙ্গিসকে মারার চাল। সেই পাগল ঘোড়াটাই তাকে আছাড় করে ফেলল।’

‘তাতে আমার কী করার আছে বল?’

‘কিছুই না, তুমি এখন আমার সঙ্গে যাবে।

‘কোথায়?’

‘ঘোড়াটাকে খুঁজতে।’

‘এই চেঙ্গিস খানটা কে?’

‘সে এক মোঙ্গলীয় দস্যু। ইতিহাসে পড়নি?’

‘পড়লে কি আর চায়ের দোকান দিই, হতভাগা! অনেকক্ষণ তোর বেয়াদপি সহ্য করেছি। এবার চল্‌!’

টাট্টু ঘোড়াটা তাকে দিয়ে ক্লান্ত গলায় বলেছিল চেঙ্গিস, ‘নিজের ভেতর যে জন্তুটা আছে, তাকে বরাবর সেই এক ও অদ্বিতীয়ে বেঁধে রাখতে পারো? নিঃশ্বাসকে বেঁধে নিজেকে শিশুর মতো নরম করে তুলতে পারো? সকলকে বাঁচাও, কিন্তু তাকে অধিকার করতে চেয়ো না।’

সুমন বুঝল, সে একটু বেশি চেয়ে ফেলেছে। ঈশ্বর বা যার কাছেই কিছু চাও না কেন, তা নিজের জন্য চেয়ো না।

চেঙ্গিসের কাছে এই ভুলটাই করে ফেলেছে সে।

 

২.

চা শেষ করে সে একটা সিগারেট নেয়। টান শেষ করে আবার উঠে দাঁড়ায়। এখন একবার জলায় যাওয়া প্রয়োজন। সেখানে যদি চেঙ্গিস খান এসে থাকে তো একবার জিজ্ঞাসা করা যায় যে ঘোড়াটা ভ্যানিশ হয়ে গেল কী করে।

সুমন লেখাপড়া জানে। বি.কম.। তারপর সরকারি চাকুরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ওর বন্ধুরা সব টপাটপ লাগিয়ে দিল বিভিন্ন ফিল্ডে। কেউ ব্যাঙ্ক, কেউ এমএনসি, কেউ ভালো বেসরকারি সংস্থায়। কিন্তু সুমনের আর কিছু হল না। সে পারিপার্শিক থেকে ক্রমশ নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকল। বন্ধু-বান্ধব এলে দেখা করত না। এক প্রেমিকা ছিল তার। সুমনকে ক্রমাগত ব্যর্থ হতে দেখে সেও নিজেকে সরিয়ে নিল। ক্রমশ একা হয়ে যেতে থাকল সে। আরও একা। সুমন বাইরে বেরানো বন্ধ করে দিল। ওদের একটা দোকান আছে। ওষুধের। সেটাই ওর পরিবারের একমাত্র আয়ের রাস্তা। সুমনের বাবার ইচ্ছে ছিল, সুমনকে ফার্মাসি পড়াবে। সেটা আবার সুমনের ভালো লাগে না। এই নিয়ে ঝামেলা। দোকানেও আর সে বসতে চাইল না। দোকানদারি তার ভালো লাগে না। সে চিটফান্ডের দালালি ধরল।

তাদের এলাকায় তখন চিটফান্ডের রমরমা কারবার। হাজার হাজার বেকার ছেলে এই মানি মার্কেটের পথে নেমে পড়ছে। কোটি কোটি টাকা আসছে। যারা ব্যাঙ্কের নানা হ্যাপা ও কর্মচারীদের মেজাজ ও ঔদাসীন্যকে ভয় পেত, তারা এখানে টাকা লাগাতে লাগল। বাজারের সাধারণ ব্যবসায়ী, দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষ, রিকশা ভ্যান চালকেরা টাকা ফেলতে লাগল। কত কোটি টাকা যে এদিক ওদিক হতে থাকল তার কোনো হিসেব নেই। কিন্তু সেখানেও ফেল করল সুমন। বাজার থেকে সে তিন লাখ টাকা তুলেছিল। কিন্তু সেই কোম্পানি রাতারাতি লাটে ওঠায় বাজার থেকে যা তুলেছিল সে, সেই সমস্ত টাকা তার মাকে শোধ করতে হতে লাগল একটু একটু করে। আয় বলতে ওই একমাত্র দোকান। খুব চাপ খেয়ে গেল সুমন। মানসিক অসুস্থতা কাটিয়ে সে যখন স্বাভাবিক হচ্ছে, তখনই এল এই ধাক্কা। সুমন দিশেহারা হয়ে গেল।

সে তখন ভাবতে বসল তার জীবনে এত ব্যর্থতা কেন? তার চেয়ে কত জুনিয়র ছেলেরা কোথাও না কোথাও প্লেসমেন্ট পেয়ে যাচ্ছে। সেই কি কেবল রয়ে যাবে নিস্ফলের হতাশের দলে? সেই কি কেবল হতেছে একেলা? নারী তাকে ছেড়ে চলে যায়, মাথার উপর জেগে থাকে একাকী চাঁদ, চরাচরে নিঃসৃম এক বাতাস দেয়, প্যাঁচা ডাকে, প্যাঁচা তুলে নেয় ধানের ফসল, সুমনের মাথার ভেতর এক বোধ কাজ করে, তখন এক একাকি সন্ধ্যায় সুমন আবিষ্কার করে এই জলাকে।

জলা কি আগে ছিল না? ছিল। কিন্তু তার কোনো রেখাপাত ছিল না সুমনের জীবনে। সে কেবল পড়াশুনো নিয়েই অর্ধেক যৌবন কাটিয়ে দিল। আগে দোকান চালাত বাবা। এখন মা বসে। আর চরাচরে যে অতীত পৃথিবী জেগে ওঠে, সুমন ক্রমান্বয়ে তাকে আবিষ্কার করতে থাকে।

তাই তো সে এই এলাকা সামলানোর দায়িত্ব পায়। চেঙ্গিস ছেড়ে চলে যাচ্ছে জয় করা এক বিশাল মাটি, তার দায়িত্ব পায় সুমন। এমনি করেই সে দান করে দিয়েছে তার জয় করা ভূমি। তার ছেলে যেনিং আছে উত্তর এশিয়ার মাটিতে, সেখানকার শাসনকর্তা হিসেবে। চেঙ্গিস সুমনকে দিয়ে যায় নিজের প্রিয় এক টাট্টু ঘোড়া। সেই কোন্‌ স্তেপভূমির পথ পার করে চেঙ্গিস এখানে এসেছে, ফেরার পথে তার দেহত্যাগ করার কথা; কিন্তু তখনও যুদ্ধ বাকি রয়ে গেছে, তাই বাকি পৃথিবীকে জানতে দিলে চলবে না, তার চিরকালীন শত্রু সিংগামও যেন তা জানে, তারা জানবে চেঙ্গিস তাদের সঙ্গে আছে, সমস্ত যুদ্ধ জয় করে ফিরেছে। এদিকে নিজের প্রিয় টাট্টু ঘোড়া সুমনকে সমর্পণ করে চেঙ্গিস যে সমাধিস্থ হবে, এ কথা সে ছাড়া আর কে জানে!

একবার কথায় কথায় চেঙ্গিস বলে, ‘আমার কি ভালো লাগে, জানো? জল।’

‘কেমন জল?’

‘জল অতি পবিত্র। সবচেয়ে যা পবিত্র তা হল জলেরই মতো। এই জল থাকে অনেক নিচে, যে স্থানকে মানুষ ঘৃণা করে, সেই স্থানে। আমি সেখানে থাকতে চাই। আমি জানি বাসস্থানের জন্য চাই উৎকৃষ্ট ভূমি। আমি তাই সংগ্রহ করে রেখে যেতে চাই আমার দেশবাসীর জন্য। আর নিজের জন্য ওই অনেক নিচের ভূমি আর জল। এই যে আমি সমগ্র আরব জাতিকে তছনছ করে দিয়ে ফিরছি, আমার পাওনার ঝোলা উপচিয়ে পড়ছে; এখন, এই ফিরতি পথে কী মনে হচ্ছে, জানো? উপচিয়ে ভর্তি করার চেয়ে, থেমে যাওয়া শ্রেয়। তরবারির ধার থাকে ক-দিন? দামী পাথর লুটেছি, অনেক সোনা-জহরত – কিন্তু তাই বা আমি পাহারা দিয়ে রাখব ক-দিন? তাই কাজের শেষে সব বিলিয়ে দিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিতে চাই- এই হচ্ছে স্বর্গের পথ।’

‘সব দিয়ে দিচ্ছ তুমি?’

‘দিয়ে দিলাম। আমার ছেলেরা, ছোটো ছেলে টোলুইকে দিয়েছি মঙ্গোলিয়া শাসনের ভার। তাই আমি এখন মুক্ত। তবে আমার আর এক পুত্র যোচি, আমি বেঁচে থাকাকালীনই সে মারা যায়। তাকে আমি ইউরোপের শাসনভার রক্ষা করতে দিয়েছিলাম। এখন তার ছেলে, মানে আমার নাতি সেই জায়গায় রয়েছে। তারা ভোগ করুক। আর আসবে নাতি কুবলাই খান। এক বীর!’

‘এবার আমি কী করে এই রাজ্যপাট সামলাব বলে দাও।’

‘মানুষকে ভালোবেসে, দেশ শাসন করেও, নিজেকে সবার কাছে অজানা রাখতে যদি পার, জেনে রেখ তবে তুমিই হবে সেরা শাসক।’

 

৩.

ক-দিন পর সন্ধের মুখে জলায় এসে সুমন দেখল একটা মেয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। সে অপূর্ব সুন্দরী। একে কি চেঙ্গিস রেখে গেল? রেখেই যদি যাবে তো চলে গেল কেন? কেন ক-দিন ধরে দেখা হচ্ছে না তার সঙ্গে? কেন তাকে এড়িয়ে থাকছে চেঙ্গিস?

মেয়েটা বলল, ‘কি গো, চিনতে পার?’

সুমন হাঁ করে রইল।

‘দেখো না চেনার চেষ্টা করে।’

চেষ্টা করল সে। পারল না। আবার বলল, ‘কে তুমি?’

‘আমি ফুল তুলে রাখি তোমার জন্যে।’

‘ফুল রাখ?’

‘হ্যাঁ। কত গাছের ছায়া দিই তোমায়।’

‘তবে তো তুমি অনেক কিছু করেছ আমার জন্যে! আমার চারপাশ ভরে যাচ্ছে ফুলে ফুলে, বুঝি। আমার মনে তাই আলোড়ন উঠেছে গোপনে, যা আমাকেই অবাক করে দেয়! যখন ঘুমিয়ে থাকি, দেখি যে ফুলের বাগান আমার বুকের ভেতর। কী তার সুবাস! আমার মন প্রফুল্ল হয়ে উঠতে থাকে। আমি যে ক্রমশ নিজের কাছে অচেনা হয়ে উঠছি, তা বেশ বুঝতে পারছি। কিন্তু তুমি আসছ কোথা থেকে?’

‘অনেক দূর থেকে আসছি। কেবল তোমার জন্য।’

‘আমার জন্যে? সুমন অবাক। তার জন্য জলার ধারে একজন সুন্দরী রমণী দাঁড়িয়ে আছে ভাবতেই তার হৃদকম্পন শুরু হল। বলল, ঘোড়ার দল তুমি দেখেছ?’

‘দেখলাম তো।’

‘কোনদিকে গেল তারা?’

‘হুই ওই দিকে।’

‘হুম। আর ওদের দলনেতা চেঙ্গিস? সে এই এলাকার শাসনকর্তা হিসেবে আমাকে নিয়োগ করে গেছে, জানো?’

‘খুব ভালো। তুমি তবে রাজা এখন।’

‘আর তুমি? আমার রাণি?’

সে লজ্জা পেল। বলল, ‘আমরা কি তবে বিয়ে করব?’

‘সে তো করতেই হবে। তোমায় চেঙ্গিস খানের কথা বলি। সে ফিরছে। মেসোপটেমিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল লুঠ ও ধ্বংস করে সে ফিরছে নিজের দেশে, তখন আমার সঙ্গে দেখা। ওদের দলের অনেকেই এখানে রয়ে যেতে চায়। ওরা বাংলার নদী মাটি অরণ্যকে ভালোবেসে ফেলেছে। কিশোরীর পায়ের নুপূর তারা শুনেছে। তারা দেখেছে কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাত। ওরা এখানেই থেকে যেতে চায় তাই। কাদা মাটি ভেঙে যেখানে চাষা চাষ করছে, তারা মাটির গায়ে সেই চাষ ফুটিয়ে তুলতে চায়। সেই ছবি তারা ফুটিয়ে তুলবে মন্দিরগাত্রে টেরাকোটার কাজের মাধ্যমে। সঙ্গে আমাকে দেশ শাসন করতে সাহায্য করবে। সৈন্য রেখে যাচ্ছে। এক সহস্র পদাতিক সৈন্য। কিন্তু তারা মাটির।’

‘মানে?’

‘তারা সব মাটির পুতুল। পুতুল মানে ভেব না তারা খেলনা পুতুল, মানুষের যা উচ্চতা, তাদেরও তাই। তারা থাকবে মাটির নিচে, এক গোপন চেম্বারে। সেখানে তারা ততদিনই রক্ষিত থাকবে যতদিন না তাদের ডাকা হচ্ছে।’

‘মাটির পুতুল লড়াই করবে কী করে?’

‘আহা, তুমি বুঝতে পারছ না মেয়ে, যখন প্রয়োজন পড়বে ওরা আর মাটির থাকবে না, হয়ে যাবে রক্তমাংসের মানুষ। গোপন এক মন্ত্রে তারা জীবিত হয়ে উঠবে। যেমন তুমি আমি। ওদের তখন যুদ্ধে পাঠানো হবে।’

‘কার সঙ্গে যুদ্ধ?’

‘যে আক্রমণ করবে।’

‘কে করবে?’

একটু ধাঁধাঁয় পড়ে গেল সুমন। সত্যি তো কে করতে পারে তার এলাকাকে অস্থির! সে যে গোটা বিশ্বকে পদানত করা চেঙ্গিসের মনোনীত প্রতিনিধি। তাকে আক্রমণের সাধ্য কার!

সে ভারি চিন্তিত হয়ে বলল, ‘তবে অত মাটির সেনা নিয়ে আমি কী করব?’

‘ওদের জাগিয়ে তোলো। তুলে অন্য কাজে লাগাও।’

‘কী সেটা?’

‘কোনো ভালো কাজ।’

‘কী ভালো কাজ?’

‘হুম! চলো একসঙ্গে ভাবি।’

‘তাই চলো।’

‘চলো ওই উঁচুটাতে গিয়ে বসি। ‘

 

৪.

উঁচু ঢিপিতে পাশাপাশি বসে সুমন বলল, ‘এবার বল দিকি তুমি কে?’

‘তুমি যখন চিনতে পারছ না, আমিই বলি, আমি এক পরি।’

‘পরি?’

‘হ্যাঁ।’

‘তুমি থাক কোথায়?’

‘থাকি এক নদীর ধারের গাছে।’

‘কি নাম সে নদীর?’

‘অনং নদী।’

‘কী কর সেখানে?’

‘সেই নদীর ভেতর একটি মানুষ শুয়ে আছে, আমি তার দেখভাল করি।’

‘কত বছর সে শুয়ে আছে জলের নীচে?’

‘প্রায় হাজার বছর।’

‘সে কি মঙ্গোলিয়ার রাজা?’

‘আমি জানি না। আমি পাড়ে বসে চুল শুকোচ্ছিলাম; তখন কয়েকজন মানুষ এসে আমায় বলল, এই যে সমাধি দেখছ, এখান দিয়ে এক নদী বইবে। তার নাম অনং নদী। আমি অমনি তাদের বললাম, তা কী করে সম্ভব, সে নদী তো দূরে বইছে। এখানে তার আসার কথা নয়। নদী তবে আসবে কীভাবে? তারা বললে সে ভাবনা আমাদের। তুমি কি জানো না নদী তার পুরোনো খাত বদলে নতুন খাতে চলতে শুরু করে? ওই যে মানুষটিকে মাটির নিচে শোয়ান হয়েছে, সে খুব জল ভালোবাসে। তার ইচ্ছে ছিল, তার সমাধির উপর যেন জল বয়ে যায়। আমরা তাই নদীকে ডেকে আনছি।’

‘তারপর?’

‘য়ে দিল এই পথে। সমাধির উপর দিয়ে বয়ে চলল নদী। তারা বলেছিল, যে মানুষ শুয়ে আছে জলের নিচে, সে হল পৃথিবীর অধীশ্বর। সে যখন জেগে উঠবে, আমায় বিয়ে করবে। আমি রানি হব। তাই যতদিন না তার জাগার সময় আসে, আমি সেই ঘুরিয়ে দেওয়া নদীর ধারে গাছ লাগাতে লাগলাম। হাজার হাজার গাছ। নইলে গরমের দিনে জল উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। জলের নিচে থাকা মানুষটার কষ্ট হবে। গাছ আমার প্রাণ। সেই মানুষ যেমন জল ভালোবাসে, তেমনি আমি থাকি গাছ নিয়ে। সে যখন ঘুম ভেঙে উঠবে হাজার বছর পর, দেখবে আমি তার প্রিয় জলাধারের পাশে হাজার গাছের ফুল ফুটিয়ে রেখেছি।’

‘হ্যাঁ, কত ফুল ফুটে আছে! দূর হলেও তা দেখতে পাচ্ছি।’

‘আর কী দেখছ?’

‘নদীর বাতাস কী সুন্দর!’

‘আর?’

‘কী দারুন সেই জলের প্রবাহ। আমার খুব জল ভালো লাগে, জানো। এই জন্যই আমি জলের নিচে ছিলাম।’

‘তাই তোমার গায়ে শ্যাওলা।’

‘সেই সময়ের ভাষাও তুমি এই শ্যাওলা-গায়ে পাবে। সে এক আশ্চর্য ভাষা। তার নাম সন্ধ্যাভাষা।’

‘হ্যাঁ। তা হাজার বছরের পুরোনো। সে সময় আমি বনের এক হরিণী হয়ে ছিলাম। বনকে রক্ষা করতাম যেমন, সেই নদীর প্রতিও আমার খেয়াল ছিল।’

‘তুমি হরিণী, তুমি কি নিলয় জানো?’

‘না।’

‘আমি তোমায় নিলয় শেখাব।’

‘শিখিয়ো।’

‘তোমার মুখে পান-তাম্বুল দোব।’

‘দিয়ো।’

‘আমরা এই টিলার উপর ঘর বাঁধব।’

‘তাই বাঁধব।’

‘তুমি তখন কী করবে?’

‘চোর যদি আমার কানের খুলে নেয়, সকাল না-হওয়া অবধি অপেক্ষা করব।’

‘আর?’

‘এই কাদামাটি তোমার গায়ে মাখিয়ে দেব। সেই পুরোনো সময়ের উপর নতুনের প্রলেপ লাগাব। এসো আমার রাজা।’

‘তুমি খুব সুন্দর, পরি। আমি তোমার একটা নাম দেব।’

 

৫.

বহু খোঁজাখুজির পর মন্টু তার পাড়ার লোককে নিয়ে সুমনকে জলার ধারের এক ঢিপি থেকে উদ্ধার করল। ওদিকে কেউ যায় না। ঢিপি ও তার আশপাশ ভূতুড়ে জায়গা, মাতালদের আড্ডা, জুয়াড়িদের বাস ও ইত্যাদি নানা না-বাচক হওয়ায় ওদিকে কেউ যায় না। ফলে একদম শেষ সময়ে তারা ঢিপির দিকে গেল। দেখল ঢিপির উপর কাত হয়ে পড়ে আছে জামা খোলা, কর্দমাক্ত সুমন। হয়তো ঘুমিয়ে আছে। অথবা সে চলেছে এমন এক রাজ্যের প্রতি, যার অস্তিত্ব এখনকার মানুষ অতীত বলে স্বীকার করে। সুমন জানে সে সব হতে পারে বহুদিন পূর্বের ঘটনা, কিন্তু অতীত নয়। সেই সব ঘটনা আজও এই সময়ের সঙ্গে সমান তালে বয়ে চলেছে।

তাকে কাদামাটি মাখা অবস্থায় ওইভাবে শুয়ে থাকতে দেখে ওর মা ডুকরে কেঁদে উঠল।

সুমনকে আমার বারুইপুরের অন্তরা মানসিক হাসপাতালে ভরতি করা হল। প্যারানয়েড স্কিজোফ্রেনিক পেশেন্ট হিসেবে সে দু’বছর আগে মেল ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছিল। এখানে থাকতে যে সুমনের ভালো লাগে না, তা নয়। জায়গাটা ভালো। প্রচুর গাছপালা আছে। বাগান আছে। এরা নানা রকমের হাতের কাজ শেখায়। কিন্তু রেখে দেয় পাগলদের সঙ্গে। সুমন যে পাগল নয়, তা এদের কে বোঝায়!

এখানে সে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার।

তবে এখানের পাগলরা তার কথা বিশ্বাস করে। এটা আর একটি কারণ এখানে ভালো লাগার। এদের মধ্যে অনেকেই লেখাপড়া জানে না। কিন্তু তারা গল্প শুনতে চায়। সমস্ত জয়ের গল্প। বিশ্বজয়ের গল্প। এক মোঙ্গলীয় দস্যু, তার সেই টাট্টু ঘোড়ার পিঠে চেপে রেশম পথ দিয়ে বিশ্বজয়ের দিকে দৌড়, তার সমাধির উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর গল্প তারা হাঁ করে শোনে। তারা সুমনকে স্যালুট দেয় যখন দেখে কীভাবে গোটা বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাব হয়ে উঠেছে সে। তখন সুমন ভাবে, হ্যাঁ, এই হল জীবন। তার সঙ্গে আছে এক সহস্র মাটির সৈন্য।

অন্য মানসিক রুগিরা বলে, কেবল মাটির সৈন্যহবে কেন সুমন, আমরাও তোমার সঙ্গে আছি।

সুমন বলে, ‘আমি যাত্রাপথে কোনো বৃদ্ধ দেখব না। আমি জানি জরা বা মৃত্যুকে কেউই জয় করতে পারে না। তাই এ জন্য আমি উদাস হয়ে যাব না। আমি জানি তখন এক লাঠিধারী বৃদ্ধ মানুষ আমার পিছুপিছু আসবে। সেই ধুতি পরা মানুষটি আমায় যুদ্ধে যেতে বারণ করবে। রাজা অশোক, তুমিও বারণ করবে? ভারতীয়রা কোনো ঐতিহাসিক যুদ্ধে যেতেনি! কোনো অভিযান করেনি। কেবল গান গেয়ে গেছে ভারত আবার জগতসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে। কীভাবে লবে, কেউ জানে না। কেবল হেরে গেছে আর তাই শান্তির বানী আউড়েছে! পৃথিবীর কোন্‌ দেশ শান্তির বাণীতে হাত ধুয়ে বসে আছে আমাকে দেখাও! মধ্যপ্রাচ্যে এখনও লড়াই জারি। তারা যুদ্ধই চায়। তাই তারা ভেঙে ফেলে বুদ্ধের মূর্তি। এতে হাজার হোক, কাজের অসুবিধা হচ্ছিল। মানুষ মারার সেই কাজে একটা লোক সেই প্রাচীনকাল থেকে শান্ত সমাহিত চোখে তাদের দেখছে আর ঈশ্বরকে বলছে, ওদের ক্ষমা করো। তাঁর ওই চোখ ওদের সহ্য হচ্ছিল না। ওই মুখের শান্ত ভঙ্গি তাদের সেই পুরোনো শান্তির পথে ফিরিয়ে আনছিল। তাই তারা বলল, ভাঙো। তাই আমি যুদ্ধে যেতে চাই। আমি যুদ্ধ চাই। সারা পৃথিবীব্যাপী জয় চাই।’

একটানা কথাগুলো বলে সুমন হাঁপাচ্ছিল।

একজন ডিপ্রেশন রুগি উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘আমরাও যাব তোমার সঙ্গে।’

‘অনেক চিন্তা করেছি আমি। অনেক প্রার্থনা করেছি ঈশ্বরের কাছে। সবই শূণ্য বলে মনে হয়…।’

অন্য এক ম্যানিয়াক মানসিক রুগি বলল, ‘নিজেকে একা ভেব না, সুমন। আমরা তোমার সঙ্গে আছি।’

অপর একজন জানাল, ‘হ্যাঁ, সুমন। বাইরের লোক আমাদের কথা বিশ্বাস করে না। আমাদের গালাগাল করে, মারে, হাসে। বাড়ির লোক কত উপেক্ষা করেছে। আর নয়, সুমন!’

দৃঢ় প্রত্যয়ে একজন মুষ্ঠিবদ্ধ হাত তুলে ধরল উপর দিকে, ‘এবার জবাব দেবার সময় এসেছে। চলো ভাইসব, বিপ্লব আবার শুরু করা যাক।

‘আমরাও যুদ্ধে যাব, পৃথিবী জয় করব। নতুন করে গড়ে দেব বামিয়ানের সেই সুবিশাল বুদ্ধমূর্তি, দখল করব পামীর মালভূমি, বাইজেন্তাইন সভ্যতা আর মিশরীয় নারীদের। তুমিই আমাদের লিডার সুমন।’

সুমন উত্তেজিত হয়ে বলতে থাকে, ‘চেঙ্গিস খান তার সেনাদের তিনটি দলে ভাগ করে এক একটি রাজ্যকে আক্রমণ করত। ছেলে যেবির অধীনে থাকত প্রথম দল, পরের দল অন্য ছেলে চাগাতাইয়ের কথায় চলত। শেষ দলের নেতা স্বয়ং চেঙ্গিস ও ছেলে টোলই। দলে কুড়ি হাজার সেনা। ভাবতে পার?’

‘তারপর কী হল?’

সকলের কৌতূহল।

সমরখন্দ আক্রমণ করলচেঙ্গিস আফ্রিকান বন্দিদের নিয়ে।

তারপর সুমন…।

তাকে অমনি একজন ধমকে ওঠে, ‘এই! সুমন কীরে? রাজা চেঙ্গিস খান বল!’

অমনি সকলে ‘রাজা চেঙ্গিস খান’ বলে জয়ধ্বনি দেয়।

শুনে খুশি হয় সুমন। মিটিমিটি হাসে। আর অলক্ষে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘আগে সেনাদলকে ঠিকঠিক গড়ে নিই, তারপর স্বসাগরা পৃথিবী অভিযানে বেরুব। তার আগে জাগিয়ে নিতে হবে সেই মাটির সৈন্যদলকে। সেই সময় না-আসা পর্যন্ত তুমি ওই বকুল গাছেই বাস করো মঙ্গোলিয়ান পরি। ফিরে এসে আমার রানি করব তোমায়।’

তখন বাতাসে গাছটা দুলে ওঠে। সুমন আনন্দে গোটা বারান্দায় দৌড়ে বেড়ায়। না, সুমন নয়। চেঙ্গিস খান। এটা তার নিজের পৃথিবী।

 
 
top