ধর্মে আছি, জিরাফে নেই

 

এই মধুমাসে এসে অনুজ টের পেলেন জরায় আক্রান্ত হয়েছেন। বাথরুমে বসা থেকে উঠতে খুব কষ্ট হয়। বয়স, সময় কখন যে হাতের ফাঁক দিয়ে গলে গেল, টের পাওয়া মুশকিল। প্রতিদিন সামান্য হলেও যোগব্যায়াম করলে ভালো হয় – জরায় এসে যৌবনের সেইসব অভ্যাস বিদায় নিয়েছে। এই বয়সটা বানপ্রস্থে যাওয়ার। এখন মানুষের গড় আয়ু পঁয়ষট্টি দশমিক পাঁচ বছর – ২০১১-র আদমসুমারি অনুযায়ী ভারতবর্ষের পুরুষদের গড় আয়ু। নারীদের সাতষট্টি বছর। অনুজের বয়স একান্ন। গড় আয়ু যদি আপেক্ষিক শর্ত হয়, তাঁকে বেঁচে থাকতে হবে আরও চোদ্দ দশমিক পাঁচ বছর। আর এখনই নতুন বসন্তের আগমনে তিনি জরায় আক্রান্ত। বাথরুমে কলে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে পা দুটো থরথর করে কেঁপে উঠল। পৃথুল শরীরে নানা অনাচারের সংকেত। অনুজের উচ্চতা পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি। সতেরো বছরে ওঁর উচ্চতা ছিল এক ইঞ্চি বেশি। এখন ওজন নব্বই কেজি আর তখন ছিল বিয়াল্লিশ কেজি। উচ্চতা কমেছে, বেড়েছেন আয়তনে। রাজা যযাতির অকাল জরা এসেছিল। ভারতবর্ষের মানুষদের গড় আয়ু বিবেচনা করলে অনুজেরও অকাল জরা নিয়ে অনুজ যে উদ্বিগ্ন তা মোটেই নয়, কিন্তু বানপ্রস্থে যাওয়ার মতো মানসিক গঠন বা আস্তিকতার চর্চা, এই অকাল জরার আক্রমণ ঈশ্বরের প্রতি, ধর্মের প্রতি তাঁকে এখনও সংক্রামিত করতে পারছে না।

সরকারি চাকরির আয়ু ক্রমশ বাড়ছে। পঞ্চান্ন থেকে আটান্ন, তারপর এখন ষাট। মানুষের গড় আয়ুর মতোই ধাবমান, চলিষ্ণু  সরকারি কর্মচারীদের দক্ষতার সম্প্রসারণ। রাজা যযাতি অভিশাপগ্রস্ত হয়েছিলেন। অভিশাপ যেন সেকালের দর্পণ। ক্রোধ, অসূয়া শুধু একালের নয়, সেকালেরও দর্পণ, সেকালেরও পরম ধন ছিল। অষ্টাবক্র শরীর নিয়ে ভূমিষ্ঠ হন জ্ঞানী তাপস।

একই অভিশাপের কাহিনিকে অনুসরণ করে ও তার প্রতিক্রিয়া দীর্ঘ তপস্যায় খণ্ডন করে ভগীরথ মা গঙ্গাকে নিয়ে এলেন মর্ত্যে। শিবের জটা থেকেও নাকি ভগীরথ গঙ্গানদীকে মুক্ত করেছিলেন। অনুজকে ওঁর পিতামহ ডাকতেন ‘অংশু’ বলে। অংশু মানে জ্যোতি। ইক্ষাকু বংশেও একজন অংশু ছিলেন। তাঁর নাম অংশুমান। সগরের ষাট হাজার পুত্রের খোঁজে বেরিয়েছিলেন অংশুমান। রামায়ণ, ভাগবত, হরিবংশ ও পুরাণে রয়েছে, অংশুমান উদ্ধার করলেন সগর রাজার অশ্বমেধের ঘোড়া। কিন্তু সগর রাজার পুত্ররা – তাঁরা কেউ বেঁচে রইল না।

ঈশ্বরকে দেখেননি, কিন্তু যে মানুষদের সঙ্গে বাল্যকাল, যৌবন কেটেছে, তাঁদের চোখের সামনে হারিয়ে যেতে দেখেছেন অনুজ। ঈশ্বরকে নিরর্থক না খুঁজে তাঁদের খুঁজতে গেলেই লট এইটের সূর্যাস্তের আভার দিকে তাকিয়ে বড্ড দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে। আর তখন মনে হয়, নাস্তিকতার বর্ম পড়লেও অনুজ ধর্মে রয়েছেন, জিরাফে নেই। এপারে লট নম্বর আট আর ওপারে সাগর। মহাত্মা কপিল মুনির আশ্রম। রাজা সগর অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছেন। আর সেই যজ্ঞ সফল হলে তিনি স্বর্গরাজ্যের অধীশ্বরও হতে পারেন। মুশকিলে পড়লেন সাম্রাজ্যবাদী ইন্দ্র। তিনি করলেন কী, ছল করে যজ্ঞের অশ্ব পাতালে লুকিয়ে রাখলেন কপিল মুনির আশ্রমে। ধার্মিকেরা বলেন, পৃথিবীকে যাঁরা ধারণ করে আছেন, কপিল নাকি তাঁদের অন্যতম।

১২ জানুয়ারি ২০১৪। রাত ন-টা। এলসিটি জেটিতে অনুজ দাঁড়িয়ে রয়েছেন সঙ্গে জয়েন্ট বিডিও সমীরণ। এছাড়াও জেটিতে রয়েছেন পয়েন্ট ইনচার্জ ও অতিরিক্ত জেলাশাসক শান্তনু মুখোপাধ্যায়, মহকুমা শাসক অমিতকুমার নাথ। ক্যাপ্টেন আবদুল্লা (নেভাল ডিপার্টমেন্ট), ফ্রিল্যান্স ফোটোগ্রাফার ট্রেজারি অফিসার সাহেব। জাহাজের ক্যাপ্টেন হাত নাড়লেন। তটভূমি ছেড়ে চলে যাচ্ছে জাহাজ ‘জাকির হোসেন’ পুণ্যার্থীদের  গলায় জয়ধ্বনি, ‘গঙ্গা মাঈ কি জয়!’

সেকালে কপিলমুনির আশ্রম ছিল পাতালে। অর্থাৎ ধর্ম, ধর্ম, ঈশ্বর, ঈশ্বর – বিস্তৃতির কারণে মানুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকা সংশয়বাদী জিরাফ ছিল না। হয়তো ছিল। না হলে সগর রাজার নাতি অংশুমান হারিয়ে যাওয়া অশ্বকে শেষমেশ খুঁজে পেলেন কী করে? তাঁর অন্বেষণের মধ্যে সবটা খুঁজে পাননি। তবে তিনি একটা যাত্রা শুরু করে দিয়েছিলেন, যার সমাপ্তিরেখা ভগীরথ।

ষোলো আনা বিশ্বাস বাঙালির নেই। হয়তো আট আনাও নেই। বাঙালির মনন জুড়ে জিরাফের ছায়া। অনন্ত কৌতূহল, কিন্তু ধ্যানের প্রজ্ঞা নেই। ভগীরথ গঙ্গাকে মুক্ত করলেন শিবের জটা থেকে। শাঁখ বাজিয়ে অগ্রবর্তী পথপ্রদর্শক হিসেবে ভগীরথ চলেছেন, আর পিছনে পিছনে চলেছেন বেগবতী গঙ্গা। ধর্মের কাহিনি এ রকমটাই হয়ে থাকে। অনুজরা একালে বলবেন, ভগীরথ ছিলেন কোনও ভূ-তত্ত্ববিদ। টোপোগ্রাফি জানার ফলে তিনি তাঁর বাস্তুকারদের নিয়ে মুক্ত করলেন গঙ্গাকে। কিন্তু কপিল মুনিকে নিয়ে কী করি? ইনি কোন্‌ কপিল? ইতিহাসে একজন কপিল আছেন – সাংখ্যদর্শনের প্রবক্তা। ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে তিনি প্রথম সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।

‘সো অহং! ’ আমিই সে। আমার মধ্যেই রয়েছে ঈশ্বরতত্ত্বের বীজ। সাংখ্য প্রবক্তা কপিলমুনিকে অনুসরণ করেছিলেন গৌতম বুদ্ধ। আচারসর্বস্ব বেদকেও তিনি অস্বীকার করেন। কিন্তু গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর বৌদ্ধধর্মের প্রধাণ দুটি গোষ্ঠী হীনযান ও মহাযান ধর্মের আচারসর্বস্বতার মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে পড়ে।

ক্যাপ্টেন আবদুল্লা বললেন, ‘৬৫ বছর পর এমন তিথি আসছে, যখন এই মকর সংক্রান্তির স্নানে অতলান্ত পুণ্য অর্জন করা যাবে।’

ক্যাপ্টেন আবদুল্লার সঙ্গে কয়েকজন নেভি ড্রাইভার এসেছেন। কেউ জলে পড়ে গেলে ওঁরাই উদ্ধার করবেন। ক্যাপ্টেন আবদুল্লা বহু বছর ধরে গঙ্গাসাগর মেলায় আসছেন। মা অভয়া লঞ্চ যে-বার ডুবে গেল, বেশ কিছু মানুষ মারা গেল – মণ্ডল কমিশন গঠিত হয়েছিল যে বছর – সেইসময় থেকে ক্যাপ্টেন আবদুল্লা এই মেলায় আসছেন। ওঁর মেয়ে আমেরিকায় রয়েছে এবং গণিতশাস্ত্রে গবেষণা করছে। ধর্ম তেমনভাবে মানেন না, কিন্তু তবুও ভিন্ন ধর্মের মানুষদের এই সহিষ্ণুতা ওঁকে অবাক করে।

মেলার কাজের ফাঁকে জয়েন্ট সাহেবকে নিয়ে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের মহারাজের কাছে গিয়েছিলেন অনুজ। স্বামী অধ্যাত্মানন্দ। এই তিনি আজ কথা বলছেন কাকদ্বীপের মঠে বসে, কালই হয়তো চলে যাবেন বিদেশে ধর্মকথা শোনাতে।

অনুজ বললেন মহারাজকে, ‘মহারাজ, লট এইটে ঈশ্বরকে দেখা যায় না, কিন্তু দেখা যায় জনরাশি।’

মহারাজ মৃদু হাসলেন। জয়েন্ট সাহেব ওঁর ছবি নিলেন।

‘জীবের মধ্যেই তিনি রয়েছেন।’

অনুজ এবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘মকর সংক্রান্তির এই স্নানে আলাদা কিছু পুণ্য হয় কি?’

মহারাজ স্মিত হাসি বজায় রেখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। ছবি তোলা শেষ হলে বললেন, ‘স্নানে হয়তো কিছু হয় না, কিন্তু তীর্থযাত্রার মধ্য দিয়ে নানা গ্রন্থির মোচন হয়। এই আমার বাড়ি, আমার জমি – পথের কষ্টে সেই মোহের লাঘব হয়।’

‘গঙ্গাসাগর মেলায় অখণ্ড ভারতবর্ষের ছবি রয়েছে,’ অনুজ বললেন। মহারাজের একের পর এক স্ন্যাপ নিচ্ছেন জয়েন্ট সাহেব।

‘হ্যাঁ, রয়েছে তো।’

তবে সেই ভারতবর্ষের অনেকটা জুড়ে রয়েছে খুবই দীন মানুষ। ধর্মের আফিমের মৌতাতে তারা যেন কিছু না-বুঝেই ছুটে এসেছে।

মহারাজ বললেন, ‘জ্ঞানী যোগি পিল রহে সব মন কি ঘানি। এইরকম তর্ক করে তাকে বোঝা যায় না। ধ্যান করতে হয়, ভাবতে হয় – আমি কে? কেনই বা এলাম এই পৃথিবীতে।’

‘আমরা যে কাজ করছি, রাতের পর রাত জেগে দাঁড়িয়ে থেকে পুণ্যার্থীদের পার করার – এর মধ্যে কোনো ধ্যান নেই।’

‘নিশ্চয়ই আছে। ধর্ম বর্ধনার ব্রহ্মা। আর কর্ম ছাড়া বর্ধনা হবে কী করে!’

অনুজরা ভারত সেবাশ্রম থেকে বেরিয়ে এলেন। পিআর ৬, পিআর ৮ – পুণ্যার্থীদের ভিড়ে উপচে পড়েছে।

লক্ষাধিক মানুষ ক্ষণকালের ব্যবধানে চলে এসেছে। অনুজের মনে হল, এ তো মানুষের সুনামি। এই প্লাবন ঠেকানো যাবে কী করে! হঠাৎ আবার দেখা হল ক্যাপ্টেন আবদুল্লার সঙ্গে। মাথায় টুপি। কোমল স্বরে বললেন, ‘সব ঠিকঠাক হবে। স্যার, সবটাই ডিভাইন ডিজাইন। তবে আমার আল্লা, আপনার ঈশ্বর এ রকম ভেবে থাকেন কিনা জানি না।’

অনুজ সাহস করে প্রশ্ন করলেন, ‘ক্যাপ্টেন আবদুল্লা, আপনি নামাজ পড়েন না?’

ক্যাপ্টেন হেসে প্রশ্ন করলেন, ‘স্যার, আপনার কী মনে হয়!’

‘আমি জানি না।’

‘ইচ্ছে হলে পড়ি। রেগুলার কিছু নয়। তবে ও সবও আগে করতাম। এখন অনেকটা মুক্ত হয়ে গেছি!’

‘কোথায় থাকেন আপনি?’

‘রানিকুঠি, টালিগঞ্জ। আসলে আমাদের মুসলিম সমাজে একটি মেয়ে আমেরিকা গিয়ে রিসার্চ করছে – সচরাচর ঘটে না। ওদের পড়াশুনার কারণে পার্ক সার্কাস থেকে টালিগঞ্জ চলে এসেছিলাম।’

জেটি নম্বর চারে বিডিও গোসাবার সঙ্গে দেখা হল অনুজের। ছেলেটির মুখে দেবদূতের মতো একটা চমৎকার হাসি লেগে থাকে। কাল ওঁকে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। জোর করে রিলিজ নিয়ে চলে এসেছে।

১৩ জানুয়ারি সকালবেলা দেখে বোঝার উপায় ছিল না মানুষের প্লাবন কীভাবে উপচে পড়ে যাবতীয় পরিকাঠামোকে পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দেবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেটি এলসিটি পূণ্যার্থীদের বেশিরভাগ চাপ ওখান থেকেই নেওয়া হয়।

আকাশের চাঁদ সুন্দরী হয়ে উঠছে ক্রমশ। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। যাত্রী পরিষেবার জন্য এবার তিনটি বড়ো জাহাজ এসেছে। জাকির হোসেন, ভি ভি গিরি ও রাজগোপাল আচারি। এর মধ্যে রাজগোপাল আচারি সাড়ে তিন হাজার পুণ্যার্থী বহন করতে পারে। আর জাকির এবং ভি ভি গিরি দেড় হাজার করে।

যযাতি নিজের যৌবন দান করেছিলেন। যৌবন যেন স্বর্ণালি রোদে এক ঝাঁক সাদা পায়রা উড়ে যাওয়ার মতো। নীল দিগন্তে হারিয়ে গেলে সে আর ফেরে না।

অনেক রাতে অনুজ মাকে ডাকছিলেন। ‘মা, মা আমার খুব একা লাগছে – তুমি ফিরে এসো।’ বাবা বলল, ‘তুমি যাও ছেলেটা তোমায় ডাকছে।’ জ্বর হয়েছে। মাথায় জলপট্টি। আরও রোগা ক্ষীণ, মাথাটা লম্বাকৃতি, মধ্যিখানে একটা খাঁজ আছে। পাড়ার বয়সে বড়ো দাদারা মাথাটা নাড়িয়ে দিয়ে বলত, ‘ট্যু ব্রেন’। দীপিকান্ত ফোন করেছিল। ও বলেছিল, ‘তোদের বাড়িতে শেকড়-বাকর গজিয়ে গেছে। দেখে আমার খুব কান্না পাচ্ছিল। মাসিমার কথা মনে পড়ছিল।’ দীপিকান্তের বউ বলল, ‘অনুজদা, আপনার কোন্নগরে থাকতে ভালো লাগে না।’

অনুজ উত্তর দিতে গিয়ে চুপ করে রইলেন। নিজের বাড়ি সে তো স্মৃতির মিছিল। নিজের জায়গা বলতে চেনা রোদ্দুর, চেনা আকাশ, চেনা ভালোবাসার ঘাট, যাঁরা চলে গেলেন অনুজের কাছে সকলেই আসেন। তাঁদের সঙ্গে কথা হয়। রাতভর ঘুমন্ত অনুজকে ঘিরে তাঁরা প্রাক্তন সময়কে জাগিয়ে রাখেন। ওখানে কোকিল ডাকে মধুমাস ফুরোতে চায় না। কোষের মৃত্যু হয় না। অনুজের বয়স বাড়ে না। ইচ্ছেমতন ওঁর বাল্যকাল, যৌবন ফিরে আসে।

এই সায়াহ্নবেলায়ও অনেকখানি সৌন্দর্য রয়েছে। ফেলে আসা প্রান্তরে যেন কোনও প্রখর তাপের জ্বালা ছিল না। চাঁদের আলোর মায়াবি পথ। মায়ের গন্ধ আছে সেই পথে। আর আছে সখিদের ছায়া। তারা সব অনুজের মেলার বউ। মেলা শেষ হলে তারা সব জীবন থেকে হারিয়ে যায়। কোনও আক্ষেপ নেই। বরং এই পৃথিবীর কাছে অনুজের অনেকটা পাওয়া হয়ে গেল।

ধর্ম কী? বিজ্ঞান বলবে যা বস্তু ধারণ করে বা বস্তুর গুণ তা তার ধর্মকে নির্দিষ্ট করে দেয়। জিরাফ কী? গলা উঁচু একটি প্রানী। সাদা কালো ডোরা কাটা তার আকর্ষণ তীব্র। সে গলা উঁচু করে সবকিছু দেখে, অনন্ত কৌতূহল নিয়ে জীবনের রস নিংড়ে নিতে চায়। ফলে কামেব গন্ধ তার গায়ে। সে চাঁদের আলো আর নীরের প্রেমকে অস্বীকার করতে পারে না। চাঁদের আলোয় ডুব দিতে সে যেমন ভালোবাসে, ভালোবাসে নারী শরীরের পূর্ণ আঘ্রাণ নিতে। ধর্মের কোনও স্বপ্ন নেই। তার গতি সরল-রৈখিক। অধর্মের জিরাফ পাপ করে বলেই সে নিজেকে খোঁজে। ভালবাসাকে সে ঈশ্বর বলে জেনেছে। অধর্মের জিরাফ জানে তার নিজের স্ত্রীও একান্ত নিজের নারী নয়। অন্য পুরুষের শরীরের আঘ্রাণও তার কাছে সমান আকর্ষণের। যেহেতু জিরাফ ধর্মের সীমারেখা মানে না, সে নিজের স্ত্রীর ভালোবাসার উন্মুক্ত প্রান্তরকে অস্বীকার করে না।

৫ নম্বর জেটি ভেরি ইমপরট্যান্ট পার্সনদের জেটি। এঁরা প্রত্যেকেই খুব ধর্মভীরু। তবে ওঁদের মধ্যে জিরাফের সাদা-কালো রেখা কি নেই! আছে হয়তো, কিন্তু তাঁরা মকর সংক্রান্তির পুণ্য-স্নানে জিরাফের বিসর্জন দিতে আসেন। এক জিরাফের বিসর্জন হয়, আবার নতুন জিরাফের জন্ম হয়। ফলে ভিআইপি-দের আসতে হয় গঙ্গাসাগরের পুণ্যস্নানে, আসতে হয় দরিদ্র মানুষদেরও।

স্নানে যদি পুণ্যও হয় তবুও কি যাবতীয় পাপের মোচন হয়?

ভগীরথ তবুও চললেন গঙ্গাকে আনতে। অমৃতবাহিনী গঙ্গা শিবের জটাজালে আবদ্ধ। একজন জিরাফ-মানুষ, সংশয়বাদী বিজ্ঞানী প্রশ্ন তুলেছিলেন এই গল্পের বৈজ্ঞানিক সত্যতা নিয়ে। তারপর অন্তত একশো বছর বয়ে গেল বিশ্বাস একই রয়ে গেল। অখণ্ড, অপার্থিব রাত্রি। আরও অপার্থিব তীর্থযাত্রীর দল – এরা কারা, যেন কোনো শেষ নেই, চলছে তো চলছেই। মারাঠি, তামিল, গুজরাটি, বাঙালি, বিহারি – কাউকে পরিচ্ছদ ছাড়া আর কিছু দিয়ে আলাদা করা যাচ্ছে না। আজকের চাঁদ আরও গোলাকৃতি। জাকির হোসেনের পাটাতনে উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়াতে বেশ কিছু তীর্থযাত্রী ভিজে গেল। কারুর ক্ষোভ নেই। গঙ্গা মাতার পুণ্য জল। ভগীরথ যখন শাঁখ বাজিয়ে নদী মন্দাকে মর্ত্যে পথ দেখাচ্ছিলেন, সেই সময় আরও একজন নারী শঙ্খধ্বনি করছিলেন। দিগ্‌ভ্রষ্ট গঙ্গার সেই শাখা নদীর নাম ‘পদ্মা’।

ক্যাপ্টেন মুরাদ আবদুল্লা অনুজের পাশে এসে আবার দাঁড়িয়েছেন।

‘স্যার, আপনি আমার ওপর ভরসা রাখতে পারেন, কটেজে গিয়ে রেস্ট নিন।’

অনুজ বললেন, ‘এই ওয়াটার অব ইন্ডিয়া একটু পাতলা হোক, তারপর যাব।’

‘ও কে আপনার যা ইচ্ছে। তবে আজকে কিন্তু নদী বা এই সমুদ্র উত্তাল।’

‘হ্যাঁ, একটু আগেই বেশ বড়ো ঢেউ এসেছিল।’

বিল্বদল গরম কফি পাঠিয়েছেন। ক্যাপ্টেনকে এক কাপ এগিয়ে অনুজ কফিতে চুমুক দিলেন।

‘কী বলছিলেন, ক্যাপ্টেন?’

‘স্যার, এই বড়ো ঢেউগুলিকে আমরা জাহাজিরা কী বলি জানেন!’

‘কী?’

‘ব্রেকার। এরকমই এক ব্রেকার…’

হঠাৎ গলা ধরে এল ক্যাপ্টেন মুরাদ আবদুল্লার। চোখ-দুটো যেন ছলছল করছে। অনুজ বললেন, ‘থাক না ক্যাপ্টেন, খারাপ লাগলে বলার দরকার নেই।’

এই সময়ে চোখে পড়ল অনুজের ওঁর অফিস স্টাফের একটা দল জাহাজে রয়েছে। ওঁরাও চলেছেন পুণ্যস্নানে।

‘স্যার, সেই একবারই জাহাজে বউ আর মেয়েকে নিয়ে গেছিলাম। মেয়ে তখন শিশুকন্যা। কেবিনে শুয়ে রয়েছে। কেবিনে গল্প করছিলাম দুজনে। ব্রেকারের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলাম, আমি জাহাজি মানুষ বাঁচলাম। কিন্তু তাকে আর ফেরত পেলাম না। স্যার, আমাদের তো মৌসুমি পাখির জীবন – ওই একবারই লোভ হয়েছিল দল বেঁধে ওড়ার।’

‘আপনি আল্লার ওপর আস্থা রাখেন।’

অনুজ বলেই জিভ কাটলেন।

‘রাখি স্যার, লণ্ঠন হাতে ছায়াজগত বেয়ে তিনি যেন আসেন। আমার বিবিকেও দেখতে পান। একটা কিছু বিশ্বাস লাগে স্যার।’

অনুজ চুপ করে রইলেন। হঠাৎ হাওয়া যেন থম মেরে রয়েছে। ঠান্ডার ভাব কমে আসছে। দূরের আকাশে লালচে রেখা। এবার অনুজ বললেন, ‘আগামী চব্বিশ ঘণ্টায় ঝড়-বাদলের আশঙ্কা রয়েছে।’

‘হবে না স্যার। বাংলাদেশের দিকে চলে যাবে।’

‘কী করে বুঝলেন!’

‘স্যার, এই গঙ্গাসাগর মেলায় আসছি বেশ কয়েক বছর হল। দখিনা বাতাসের গন্ধ অন্যরকম।’

ক্যাপ্টেন মুরাদ আব্দুল্লাকে এই সময় যেন সন্ত মানুষের মতো লাগে। ওঁর বউয়ের মৃত্যু কি খুব স্বাভাবিক – আবার একরকমের সন্দেহও হয়।

এই সময় মহকুমা শাসকের ফোন আসে। অন্যরকম একটা খবর। তক্তিপুরে জলধর মণ্ডলের বাড়িতে ধোপা-নাপিত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অপরাধ – সে তার মায়ের মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধ-শান্তি কিছু করেনি।

অনুজ বললেন, ‘এটা তো ওঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস।’

‘হ্যাঁ, তাই তো। এপিডিআর যাচ্ছে। ওরাও ভয় পাচ্ছে।’

অনুজ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সাহেবকে ফোন করলেন। তরুণ যুবক। ব্লকে স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করছেন। হয়তো কাজও হবে। উনি ঠিক পারবেন এরকম কু-সংস্কারের প্রসার বন্ধ করতে।

তথ্য আধিকারিকের দপ্তর থেকে বিভিন্ন গান বাজানো হচ্ছে। কখনও কখনও সেইসব সুরেলা কণ্ঠস্বর ছাপিয়ে আর্তনাদের শব্দ হাওয়ায় ভেসে আসছে। পাঁচ বছরের একটি ছেলে হারিয়ে গেছিল, অবশেষে তাকে পাওয়া গেছে।

জলধর মণ্ডলের সত্যিটা বেরিয়ে এল কিছুদিন পর। পশ্চিমবঙ্গে যাবতীয় ঘটনার পিছনে রাজনৈতিক অভিসন্ধি থাকে। জলধর মণ্ডলও তাই মিডিয়া ডেকে একটু নাটক করতে চাইছিল। নিজে গিয়ে অনুজ দেখেছিলেন ওরকম কিছু নয়। জলধর মণ্ডল নিজেই সমস্যা জিইয়ে রাখতে চায়। নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে এরকম ঘটনার সংখ্যা বাড়তে থাকবে। কোনও একটা গ্রামে পঞ্চায়েতে ছাত্রছাত্রীরা অফিসে তালা লাগিয়ে দিল কারণ তারা অনগ্রসর শ্রেনির শংসাপত্র খুব বিলম্বে পাচ্ছে। পুলিশ পাঠানোর উপায় নেই, তাতে রং আরও চড়া হবে। অসুস্থতার ভনিতা করে কেউ কেউ হাসপাতালেও ভরতি হল। অনেকটাই নাটক। কোনও রাজনৈতিক দলই পিছিয়ে নেই।

স্তব্ধ নির্জন ভোর বিকীর্ণ করে কিছু গানের কলি ভেসে আসছে।

ভজন সাধন আমাতে নাই

কেবল নামের দেই গো দোহাই

নামের মহিমা জানাও গো সাঁই

পাপীর প্রতি হও সদয়।।

দিবাকরকে প্রণাম করলেন অনুজ। নতুন দিন, নতুন সময়ের হাতছানি। তারপর প্রহেলিকার মতো জীবনের বয়ে যাওয়া। চোখ মুছলেন অনুজ। ‘ইস্‌ আপনার ভেতর এত কান্না?’

অনুজ চমকে তাকালেন। না, কোথাও কেউ নেই। স্পষ্ট কণ্ঠস্বর এবার হারিয়ে গেল। ব্লকের মধ্যে বাগান চমৎকার হয়েছে। ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা আর তাদের ওপর নিশির শিশির বুক ভরে সুগন্ধ নিলেন অনুজ। আরও কতদিন এই বেঁচে থাকা? একেই বলে বেড়াজাল। ধর্ম, জিরাফ মিলেমিশে এই কুহেলিকার জগৎ।

(ক্রমশ…)

 
 
top