কলকাতা বন্দর ও ফরাক্কা ব্যারেজ

 

১. ভূমিকা

ভারতবর্ষ নদীমাতৃক দেশ। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র এই দেশের প্রধান নদী। পতিতপাবনী গঙ্গা তার অববাহিকার বিস্তার ঘটিয়েছে ভারতের ১১টি রাজ্য জুড়ে। আর সেই রাজ্যগুলি হল উত্তরাঞ্চল, উত্তরপ্রদেশ, হিমাচলপ্রদেশ, দিল্লি, হরিয়ানা, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, বিহার, ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গ। ভারতবর্ষের গঙ্গা অববাহিকার মোট আয়তন ৮,৬২,৭৬৯ বর্গ কিমি। এ ছাড়াও নেপালের মধ্যে ১,৯০,০০০ বর্গ কিমি এলাকা রয়েছে যা গঙ্গা অববাহিকার অন্তর্গত। প্রতি দশ জন ভারতীয়র মধ্যে চারজন ভারতীয় গঙ্গার জলকে ব্যবহার করেন। ঘর্ঘরা, গণ্ডক, কোশি, মহানন্দা, যমুনা ও শোন গঙ্গার প্রধান উপনদী।

গোমুখের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে গঙ্গার জন্ম। তারপর গাড়োয়াল হিমালয়ে সংকীর্ণ গিরিখাতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে গঙ্গা। এইরকমভাবে গিরিখাতের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে অতিক্রম করে গঙ্গা হরিদ্বারের সমভূমিতে এসে মিশেছে। এখান থেকেই শুরু হয়েছে গঙ্গার মধ্যগতি। এখানে গঙ্গা পূর্ববাহিনী। এরপর গঙ্গা দীর্ঘপথ অতিক্রম করে ঝাড়খণ্ডের রাজমহল পাহাড়ের গা ঘেঁষে বাংলায় প্রবেশ করেছে। রাজমহল পাহাড় থেকে ফরাক্কা পর্যন্ত প্রায় ৭২ কিলোমিটার গতিপথে গঙ্গা প্রবাহিত হয়েছে মালদহ ও সাহেবগঞ্জ জেলার সীমানা ধরে। তারপর গঙ্গা প্রবেশ করেছে মুর্শিদাবাদ জেলায়। মুর্শিদাবাদের উত্তর সীমান্ত ধরে আরও প্রায় ১০২ কিমি পথ অতিক্রম করে জলঙ্গি শহরের কাছে দক্ষিণে বাঁক নিয়েছে। পরে আরও প্রায় চার কিমি পথ নদিয়ার সীমান্ত ধরে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

মুর্শিদাবাদের মিঠিপুরের কাছে গঙ্গা থেকে বের হয়েছে ভাগীরথী। এরপর মুর্শিদাবাদ জেলাকে দুটো অসমান ভাগে ভাগ করে নদিয়া জেলাতে প্রবেশ করেছে। এরপর আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত হয়ে সাগরদ্বীপের পূর্ব ও পশ্চিম দিয়ে দু-ধারায় বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। প্রায় ৫০০ কিমি দীর্ঘ এই নদীটি মুর্শিদাবাদ ও নদিয়াতে ‘ভাগীরথী’ নামে পরিচিত। আর নবদ্বীপের দক্ষিণে ২৮০ কিমি দীর্ঘ অংশ ‘হুগলি’ নদী নামে পরিচিত।

রাজমহল পাহাড় থেকে গঙ্গার গতিপথ গত কয়েক শতাব্দীতে আমূলভাবে বদলে গেছে, এবং এখনও যাচ্ছে। এ বিষয়ে ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন:

ফান ডেন ব্রোকের (১৬৬০) নকশায় দেখিতেছি, রাজমহলের কিঞ্চিত দক্ষিণ হইতে আরম্ভ করিয়া, মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারের মধ্যে গঙ্গার তিনটি দক্ষিণবাহিনী শাখার জল কাশিমবাজারের একটু একটু উত্তর হইতে একত্র বাহিত হইয়া সোজা দক্ষিণবাহিনী হইয়া চলিয়া গিয়াছে সমুদ্রে, বর্তমানে গঙ্গাসাগর-সংগমতীর্থে।

রেনেলের মানচিত্র (১৭৮০) লক্ষ করলে দেখা যাচ্ছে, রাজমহলের দক্ষিণ-পূর্বে তিনটি বিভিন্ন শাখা একটি মাত্র শাখায় রূপান্তরিত হয়ে সূতি থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত একটি ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। আসলে এই তিনটি শাখা হল কালিন্দি, পাগলা ও ছোটো ভাগীরথী। বর্তমানে এই তিনটি মজা শাখানদী গঙ্গার অতীত গতিপথকে মনে করিয়ে দেয়। এ বিষয়ে রেনেল সাহেব (১৭৮৮) লিখেছেন:

Gour, the ancient capital of Bengal, stood on the old bank of the Ganges: although its ruins are 4 or 5 miles from the present bank.

এবার বিষয়টিকে বোঝার জন্যই ছোটো ভাগীরথী, কালিন্দি ও পাগলা নদীর গতিপথ সম্পর্কে জেনে নেওয়া প্রয়োজন। অতীত কালে (১৭৮০) ছোটো ভাগীরথী গৌড়ের দক্ষিণ সীমা ধরে পশ্চিম থেকে পূর্বে বয়ে যেত। গৌড়ের উত্তর সীমা ধরে বয়ে যেত কালিন্দি। মানিকচক ঘাটের কাছে যেখানে মহানন্দা নদীর শাখা ফুলাহার গঙ্গাতে মিশেছে সেখান থেকেই কালিন্দির জন্ম। তার পর এই নদী পূর্বদিকে প্রায় ৪৫ কিমি-র বেশি পথ অতিক্রম করে নিমাসরাই ঘাটে মহানন্দার সঙ্গে মিশেছে। পাগলা নদীটি পঞ্চানন্দপুরের কাছে পাগলা কালির থানা থেকে বেরিয়ে গৌড়ের কিছুটা ভাটিতে ছোটো ভাগীরথীর সঙ্গে মিলিত হচ্ছে। পরবর্তী অংশে আমরা গঙ্গার গতিপথের পরিবর্তন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

 

২. নদিয়া রিভারস ডিভিশন

প্রধাণ নদী ও শাখানদী মিলিয়ে মোট ২১টি নদী ছিল নদিয়া রিভারস ডিভিশন বা নদিয়া নদী বিভাগের মধ্যে। এই নদীগুলি হল :

১. গঙ্গা

২. ভাগীরথী (Upper and Lower Farakka Channels)

৩. ভৈরব জলঙ্গি ও তার শাখানদী

ক. কলকলি নদী

খ. শিয়ালমারী

৪. মাথাভাঙা ও তার শাখানদী

ক. চূর্নি

খ. ইছামতী

৫. জলঙ্গি

৬. গড়াই

৭. মহানন্দা ও তার শাখানদী

ক. কালিন্দি

খ. কংকর

গ. পুনর্ভবা

ঘ. টাঙ্গন

৮. বরাল

৯. আত্রেয়ী

১০. উরোসাগর নদী

১১. বড়লৈ

১২. ইছামতী (পাবনার নিকটবর্তী যে নদীটি মিশেছে দরমার কার উরোসাগর নদীতে)

১৩. যমুনা

 

Annual Report on Major Rivers-এর ১৯৩১-’৩২ সালের প্রতিবেদনে গঙ্গা সম্পর্কে লেখা হচ্ছে:

The River is navigable throughout the year. During the floods, it supplies through the medium of its innumerable spill channels water for irrigation of crops and is, therefore, a very important river from the economic, agricultural and commercial point of view.

নদিয়া রিভার ডিভিশনের ৮টি স্থানে গঙ্গার জলের পরিমাপ করা হত অর্থাৎ ‘Ganges’-এর উচ্চতা নির্ণয় করা হত। এই স্থানগুলি হল নিম্নরূপ :

 ১. রাজমহল

 ২. ধুলিয়ান- রাজমহল থেকে ৩০ মাইল ভাটিতে

 ৩. কালিগঞ্জ- ধুলিয়ানের ৮ মাইল ভাটিতে

 ৪. চকঘাট- কালিগঞ্জের ১২ মাইল ভাটিতে

 ৫. রামপুর বোয়ালিয়া- চকঘাটের ৪০ মাইল ভাটিতে

 ৬. সারদা- রামপুর বোয়ালিয়ার ১২ মাইল ভাটিতে

 ৭. পাবনা- সারদার ৬০ মাইল ভাটিতে

 ৮. গোয়ালন্দ- পাবনার ৪৯ মাইল ভাটিতে

গঙ্গা তার গতিপথের পরিবর্তন করেছিল বারবার। ১৭৪০ থেকে ১৭৮০ সালের মধ্যে পাটনা থেকে বাংলাদেশের সারদা পর্যন্ত রেনেল সাহেব স্বচক্ষে গঙ্গার গতিপথ বদল করতে দেখেছেন। Annual Report on Major Rivers-এর ১৯৩২-’৩৩ সালের প্রতিবেদনে লেখা হচ্ছে:

The Rajshahi char will, in all probability, be scoured away and the main channel will again shift to the left and strike the bank below the Rajshahi revetment, while a char will be formed west of the existing char.

এবার আসা যাক ভাগীরথী-হুগলি নদীর কথায়। ১৭৮৭ সালে রেনেল সাহেব এই নদীর অবস্থা সম্পর্কে লিখেছেন:

In 1787 Rennell wrote that cossimbazar river (i.e., the Bhagirathi) was almost dry from October to May.

  আবার ১৭৯৭ সালে ক্যাপ্টেন কোলব্রুক সাহেব লিখছেন :

The Bhagirathi and the Jellanghi are not navigable throughout during the dry season. There have been instances of all these rivers continuing open in their turn during dry season…. The Bhagirathi was navigable in the dry season of 1796.

অর্থাৎ রেনেল ও কোলব্রুকের বর্ণনা থেকে বোঝা যাচ্ছে ভাগীরথী নদীতে শুখা মরসুমে কোনো জল থাকত না। কিন্তু কোলব্রুক জানাচ্ছেন যে, ১৭৯৬ সালে ভাগীরথীতে শুখা মরশুমেও জল ছিল।

ভাগীরথীতে জল থাকা না থাকার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে কলকাতা বন্দরের। কারণ কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বজায় রাখার জন্য ভাগীরথীতে গঙ্গার জল প্রবেশ করা প্রয়োজন। ভাগীরথীতে গঙ্গার জল প্রবেশ করবে কীভাবে? সোজা উত্তর। ভাগীরথীর উৎসমুখ দিয়ে। কিন্তু ভাগীরথী নদীর এই উৎসমুখই বারবার পরিবর্তন হয়েছে। এর ফলে ভাগীরথীর জলসংকট সমস্যাও দেখা দিয়েছে।

ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের নদীগুলির বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায় সেচ দপ্তরের প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে। এই সরকারি প্রতিবেদনগুলির তথ্যের উপর ভিত্তি করেই জেনে নেওয়া যাক ভাগীরথীর উৎসমুখের স্থানান্তরের ইতিহাসকে।

(ক্রমশ…)

 

 
 
top