মোদি সরকারের সামনে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

 

নরেন্দ্র মোদির সরকারকে ঘিরে এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বিপুল। গড়পড়তা পরিবারের আশা, মূল্যবৃদ্ধিতে এবার রাশ পড়বে, বাজারে গিয়ে দেখা যাবে প্রয়োজনীয় সব পণ্যের দামই তাদের আয়ত্তের মধ্যে এসে গেছে। শিক্ষিত যুবক-যুবতির আশা, এবার চাকরির বাজার খুলে যাবে, যাকে ‘ডিসেন্ট জব’ বলে অর্থাৎ যাতে মাইনে ভালো এবং কাজ ছাড়লে সমমানের কাজ পাওয়া যায় অতি দ্রুত, সেগুলি পর্যাপ্ত সংখ্যায় পাওয়া যাবে সর্বত্র। অদক্ষ শ্রমের বাজার চাঙ্গা হবে একইসাথে – এই প্রত্যাশাও আছে গ্রাম-শহরের সমস্ত স্বল্প শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের। অন্যদিকে, কর্পোরেট পুঁজির আশা, অর্থনৈতিক সংস্কারে বকেয়া যে সব কাজ পড়ে আছে ‘নীতিপঙ্গুত্বের কারণে’, মনমোহন সিংহ-র সরকার যা করে উঠতে পারেনি, সেগুলির এবার দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। সারা ভারত জুড়ে আবার এ সবের সঙ্গে আছে এই আশা যে, প্রশাসন এবার দুর্নীতিমুক্ত হবে, ঘোটালা বন্ধ হবে, কালো টাকা উদ্ধার করা যাবে। প্রত্যাশার ফিরিস্তি আরও লম্বা করা যায়। মোটের ওপর সবারই ধারণা, ভারতে এবার সুদিন আসছে। আসছে নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে। মোদির সরকার হবে অন্যরকম সরকার এবং তাতে দেশের ভালোই হবে।

কোনটা কতটা করে উঠতে পারবে নরেন্দ্র মোদির সরকার, সে নিয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে সমস্যাগুলো কোথায় এবং সেগুলোর মোকাবিলা করতে মোদিকে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের সামনে পড়তে হবে, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য মোদির পক্ষে কী করা সম্ভব, কী সম্ভব নয় – সেসব নিয়ে কিছু কথা অবশ্যই বলা যায়। বর্তমান প্রবন্ধে সেই কথাগুলোই বলা হবে।

সাধারণ মানুষের যা প্রত্যাশা সে প্রত্যাশা পূরণে মোদি কতটা সফল হবেন, সেটা আলোচনা করার আগে এ দেশের কর্পোরেট সেক্টরের সাধ এবং সাধ্য নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। এ দেশের অর্থনৈতিক যা কিছু সমস্যা আছে, নয়া উদারবাদী অর্থনীতিবিদদের মতে তার মূল জায়গাটা হল পুঁজি বিনিয়োগ সংক্রান্ত সমস্যা। এঁদের মতে, পুঁজি বিনিয়োগ সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হলে এ দেশের বিনিয়োগের হার বৃদ্ধি পাবে, বিনিয়োগ বাড়লে একদিকে উৎপাদন বাড়বে অন্যদিকে শ্রমের বাজারও চাঙ্গা হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির হাত ধরে আসবে আয়বৃদ্ধি আর আয়বৃদ্ধি ঘটলে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যও বেড়ে যাবে কর্মরত শ্রমজীবীদের। ভারতে এটা কাঙ্ক্ষিতমাত্রায় ঘটছে না, অর্থাৎ যথেচ্ছ বিনিয়োগ ঘটছে না, কারণ এ দেশে বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগের পথে যে সব প্রাতিষ্ঠানিক অসুবিধাগুলি আছে, নীতিপঙ্গুত্বের কারণে সেগুলি আজও দূর করা যায়নি। এর ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ছে না। আয়বৃদ্ধি এবং নিয়োগবৃদ্ধির হারেও তাই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ত্বরণ ঘটছে না। দেশের সাধারণ মানুষ সঙ্কটে পড়ছেন এর ফলে। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে এটা প্রথমে বুঝতে হবে যে, বিনিয়োগ করার মূল ক্ষমতা আছে দেশি এবং বিদেশি কর্পোরেটগুলির হাতে। এরা যাতে এ দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়, সরকারকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ঘটাতে হবে সেটা মাথায় রেখে। নানা কারণে এতদিন এই সংস্কারের কাজটা ঠিকমতো করা হয়নি। বিকাশপুরুষ নরেন্দ্র মোদির কাছে কর্পোরেটের প্রত্যাশা, মোদি এই সমস্যাটা বুঝবেন এবং অতি দ্রুত এমন সব সংস্কার ঘটাবেন, যাতে কর্পোরেট পুঁজি এ দেশে আরও বেশি করে পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। কোম্পানি আইন, শ্রম আইন, জমি অধিগ্রহণ আইন – এ সবে কর্পোরেট যা চায় সে ধরণের সংস্কার ঘটাতে হবে। আইন বদলালে কর্পোরেট হাউসগুলো বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এর ফলে। বিনিয়োগের সমস্যা, আয়বৃদ্ধি না হওয়ার সমস্যা – সবই মিটে যাবে যদি বেসরকারি পুঁজির বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় এ দেশে। নয়া উদারবাদী অর্থনীতির এটাই হল মূল কথা।

এই ধরণের যুক্তি কাঠামো নিয়ে সমস্যা আছে। বিনিয়োগ বাড়লেই নিয়োগ বাড়বে – অর্থনীতি অতটা সরল পথে না চলতেই পারে। নিয়োগ বাড়িয়ে নতুন প্রযুক্তিতে শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে, এটা তো শ্রমিকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অঙ্গ হয়ে গেছে। তাছাড়া, পাদ-অর্ঘ্য দিয়ে বরণ করলেও কর্পোরেট পুঁজি যে বিনিয়োগে যথেষ্ট আগ্রহী হয় না, গত কয়েক বছর ধরে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলি অহরহ সে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছে। বিনিয়োগ এবং আয়বৃদ্ধি ও নিয়োগবৃদ্ধির আন্তঃসম্পর্কটি অতটা সরল নয়। কিন্তু সে যাই হোক, ধরা যাক নয়া উদারবাদ-নির্ধারিত পথেই মোদি সব সংস্কার করে ফেললেন। কী ঘটতে পারে তার ফলে? জগদীশ ভাগবতী, অরবিন্দ পানাগরিয়া মার্কা অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য, এর ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে। ফলত, আভ্যন্তরীণ উৎপাদনে ত্বরণ আসবে, উৎপাদনে ত্বরণ এলে নিয়োগ বৃদ্ধি হবে, আয় বাড়বে, দেশ স্বাচ্ছন্দ্যের মুখ দেখবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

বিদেশি কর্পোরেটের কথায় পরে আসছি। দেশি কর্পোরেটের হাত ধরে আভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বৃদ্ধির আয় এবং নিয়োগবৃদ্ধির স্বপ্ন যাঁরা দেখান, তাঁদের মনে রাখা দরকার, এ দেশের কর্পোরেট বছরে পাঁচ লক্ষ কোটি টাকা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহায়তা পায় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে। এই সহায়তার পোশাকি নাম ‘ইনসেন্টিভ’ (ওটা ‘সাবসিডি’ নয়, ‘সাবসিডি’ বা ভর্তুকি পায় ইতরজনেরা, আম্বানীরা পায় ‘ইনসেন্টিভ’ বা উৎসাহভাতা)। এত ইনসেন্টিভ পাওয়ার পরও তাঁদের ব্যবসার টাকা যোগাড়ের দায় নিতে হয় সমাজকে, সরকারি ব্যাঙ্কে জমানো সাধারণ মানুষের টাকা যায় তাঁদের কাছে ঋণ হিসেবে। ঋণের বদলে সুদ পাওয়ার কথা ব্যাঙ্কগুলোর। সুদ দূরে থাক, আসলই ফেরত পাওয়া যায় না এদের কাছ থেকে। এ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্কগুলিকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে এই ছোটো কর্পোরেটগুলি। এদের দেনার দায় নিয়ে কেউ যাতে উচ্চবাচ্য না করতে পারে সেজন্য আছে কর্পোরেট ডেট রিস্ট্রাকচারিং – যার মোদ্দা কথা হল, দেনার দায়টা তাদের সম্পত্তি বিক্রি করে উসুল করা যাবে না। ঋণের ওপর আরও ঋণ দেওয়া হবে। বকেয়া ঋণ উসুল করার সমস্যাটা যাতে ধামাচাপা দেওয়া যায়, তার জন্য। স্টেট ব্যাংক এবং ইউবিআই-এর ৮০০ কোটি টাকা গিলে ফেলে মালিয়া বহাল তবিয়তে মদের ব্যবসা আর মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি করতে পারে। কিংফিশার এয়ারলাইন্সের কর্মচারী মাইনে না পেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করলেও ওই মদ ব্যবসার টাকায় হাত দেওয়া যাবে না কিংফিশারের বকেয়া ঋণ উসুল করার জন্য। ব্যাঙ্কেরা করবে কর্পোরেট ডেট রিস্ট্রাকচারিং, কর্পোরেটের চাঁই মুকেশ আম্বানী কৃষ্ণা-গোদাবরী বেসিনের গ্যাস লুঠ করবে। ওএনজিসি ওই গ্যাসে হাত দিতে পারবে না। তারপর আবার লোকসান সামলাতে ক্রমাগত ওই গ্যাসের দাম বাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। মোটামুটি এই হল এই দেশের কর্পোরেটের চেহারা। এ দেশের কর্পোরেট হল রাষ্ট্রের ঘাড়ে বসা কর্পোরেট – রাষ্ট্রকে এদের ঘাড়ে নিয়ে চলতে হবে। নেহরু যুগ থেকেই এই কালচার গড়ে উঠেছে এবং সেটাই চলছে দিনের পর দিন। বাজারমুখী সংস্কার মারফত ছোটো কর্পোরেট হাউস দিয়ে চমকপ্রদ সাফল্য পাওয়া যাবে, এ কথা যাঁরা বলেন তাঁরা বাজারের নিয়ম কতটা বোঝেন জানি না। তবে এ দেশের কর্পোরেটের হাল হকিকত সম্পর্কে এঁরা যে চরম অজ্ঞ না-হয় এই লুঠেরাদের বেতনভুক কর্মচারী এঁরা – এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

মোদি যদি বাজারমুখী আরও সংস্কার মারফত দেশি কর্পোরেট লগ্নি দিয়ে বিনিয়োগে ত্বরণ ঘটাতে চান, তাহলে তাঁকে সবার আগে এই কর্পোরেট হাউসগুলির রিস্ট্রাকচারিং করতে হবে। সরকারি সুবিধে আদায় করে ব্যবসায় টিঁকে থাকার রোগের চিকিৎসা হল, সব সুবিধে বন্ধ করা এবং নিয়মকানুনগুলো স্বচ্ছ এবং জনমুখী করা, যাতে আম্বানী বা বিজয় মালিয়ারা বুঝতে পারে যে, নিজেদের অদক্ষতার দায় রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপানোর দিন শেষ, নিজেদের অদক্ষতার দায় নিজেদেরই বহন করতে হবে, দিল্লির মন্ত্রকগুলিতে নিজেদের লোক বসিয়ে নিজেদের অদক্ষতার দায় রাষ্ট্রের ঘাড়ে চালান করা আর সম্ভব হবে না। মোদি এই ধরণের সংস্কার করতে চান কি? লৌহপুরুষের এতটা বুকের পাটা আছে কি? আদৌ না। আজ পর্যন্ত মোদির মুখে কর্পোরেটের কোনো সমালোচনা শোনা যায়নি। সংস্কার অবশ্যই করতে হবে, তবে এ দেশের কর্পোরেট যা চাইছে তেমন নয়। কোম্পানি আইন, শ্রম আইন এবং ব্যাঙ্কের খেলাপি ঋণ উদ্ধারের যে আইনি ব্যবস্থা – তাতে নির্দিষ্ট সংশোধনী এনে এমন ব্যবস্থা করা দরকার যাতে কর্পোরেট হাউসগুলো এটা বুঝতে বাধ্য হয় যে, ক্রনি ক্যাপিটালের যুগ শেষ হয়েছে ভারতবর্ষে। কে নেবে এই ধরনের সংস্কার আনার ঝুঁকি? নরেন্দ্র মোদি? যাঁকে এ দেশের কর্পোরেট সাজিয়ে গুছিয়ে দিল্লিতে বসিয়ে দিয়েছে? প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় মোদি সরকারের পক্ষে সেরকম কিছু করা সম্ভব নয় বরং যেটা ঘটবে, তা হল এরা যাতে আরও ইনসেন্টিভ পায় তার জন্য কর্পোরেটের করহার আরও কমিয়ে দেওয়া এবং ব্যাঙ্কের সুদের হার আরও কমিয়ে আনা যাতে আরও মোটা টাকা ধার করতে পারে কর্পোরেট হাউসগুলো। যে টাকা তারা গিলে ফেলবে এবং তারপরে তাদের জন্য আবার ডেট রিস্ট্রাকচারিং হবে। সুদের হার সম্ভবত কমানো হবে অতি দ্রুত, যাতে এরা সস্তায় ঋণ নিতে পারে। টাকা শোধ করার দায়ও কমানো হবে ছলে-বলে-কৌশলে। এত অর্থব্যয় করে মোদিকে ক্ষমতায় আনার কাজটা এ দেশের কর্পোরেট হাউসগুলো অকারণে যে করেনি তা প্রমাণিত হবে অতি দ্রুত।

বিদেশি পুঁজি কতটা সদয় হবে? নরেন্দ্র মোদি এমন এক সময় ক্ষমতায় এসেছেন, যখন ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাজার মন্দা। ওসব পণ্য রপ্তানি করে আভ্যন্তরীণ আয় বাড়ানোর সুযোগ অটলবিহারী বাজপেয়ীর সময় যতটা ছিল, এখন আর ততটা নেই। তারপর আবার সারা বিশ্ব জুড়েই নেমেছে চিনা পণ্যের আক্রমণ। এমনকী ভারতের আভ্যন্তরীণ বাজারও চিনা পণ্যের জেরে বাড়ছে। এই অবস্থায় এ দেশের এই সরকারনির্ভর খুঁড়িয়ে-হাঁটা কর্পোরেটের জন্য নানা ইনসেন্টিভ দিলেও তার সুফল মিলবে না বাঞ্ছিত মাত্রায়। রপ্তানি-নির্ভর পণ্যের বাজারের ওপর নির্ভর করে বিদেশি পুঁজিও এ দেশে তার বিনিয়োগ বাড়ানোর ঝুঁকি নেবে না – রপ্তানির বাজারই যেখানে মন্দায় ধুঁকছে, সেখানে ভারতে কারখানা বসিয়ে নতুন করে উৎপাদন করার ঝুঁকি কেন নেবে বিদেশি পুঁজি? তা-ও যদি এমন হত যে ভারতের শ্রমিক অনেক বেশি উৎপাদনকুশল, বিদেশি পুঁজি কিছুটা ঝুঁকি হয়তো নিত। এ দেশের শ্রমিকের উৎপাদন কুশলতার মান এখনও নিম্নস্তরেই বাঁধা। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য উৎপাদনে যেসব ক্ষেত্রে কম উৎপাদনকুশল শ্রমের প্রয়োগেই কাজ চলে যায়, পরিচালন শাস্ত্রের পরিভাষায় যাকে বলে ‘লো-এন্ড জব’। ভারতবর্ষের শ্রমজীবির একটা বিপুল অংশ সেই স্তরের উৎপাদনকুশলতায় বাঁধা আছে। বৈদেশিক বাজারে যেসব পণ্যে এই ‘লো-এন্ড জব’-এর আধিক্য আছে, ভারতের শ্রমজীবিদের সস্তা শ্রম কাজে লাগিয়ে এ দেশে সেসব পণ্য উৎপাদনের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ হতেই পারত। কিন্ত সে ক্ষেত্রেও আছে প্রবল প্রতিযোগিতা, যে প্রতিযোগিতায় ভারতবর্ষ খুব একটা সুবিধে করে উঠতে পারছে না। উদাহরণ হিসেবে পোশাক-পরিচ্ছদের আন্তর্জাতিক বাজারের কথা বলা যায়। এ বাজার এখনও, এই মন্দার সময়েও, বেশ ভালো। কিন্তু সেখানেও ভারতের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। মায়ানমার এবং ভিয়েতনাম থেকেও আসছে বিপুল প্রতিযোগিতা। ভারত যে সব ক্ষেত্রে সুবিধেজনক অবস্থায় নেই, এই পরিপ্রেক্ষিতে রপ্তানিনির্ভর পণ্য উৎপাদনের জন্য এদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ঢল নামবে, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই।

উৎপাদন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আসতে পারে এদেশের আভ্যন্তরীণ বাজার চাঙ্গা হলে। জগদীশ ভাগবতী ও অরবিন্দ পানাগরিয়ার মতে এ বাজার চাঙ্গা হবে না, এ বাজার চাঙ্গা করতে হলে অমর্ত্য সেন যে ধরণের পরামর্শ দিয়েছেন, ভারতের অর্থনীতিকে সে পথে পরিচালিত করতে হবে। রাতারাতি তাতে সাফল্য আসবে না, কিন্তু ধৈর্য ধরে সে পথে বিনিয়োগ ঘটালে ধীরে ধীরে এদেশে একটা মজবুত অর্থনীতি গড়ে উঠবে। এই বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় মূল গুরত্ব থাকে সামাজিক ক্ষেত্রে (স্বাস্থ্য, শিক্ষা) বিনিয়োগে। সামাজিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্ক ঠিক কী, পরবর্তী কোনো এক প্রবন্ধে তা আলোচনা করা যাবে। এখানে এটুকু উল্লেখ করা দরকার যে, কর্পোরেট নির্দেশিত সংস্কারের পথে যে সুদিন-এর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি, প্রবল সম্ভাবনা এই যে, সে সুদিন অধরাই থেকে যাবে সাধারণ ভারতবাসীর কাছে।

নরেন্দ্র মোদি সম্ভবত সরকারি উদ্যোগগুলির বিলগ্নিকরণ, বিশেষত ব্যাঙ্ক, বিমা বেসরকারিকরণের বকেয়া কাজটা অতি দ্রুত করে ফেলবেন। সেনসেক্স যে ঊর্ধ্বমুখী, তার কারণ এটাই। এর ফলে ভারতে কতটা সুদিন আসবে, কতটাই বা এই সম্ভাবনা যে, ব্যাঙ্ক-বিমায় যে অর্থ পুঞ্জিত হয়ে আছে তা লুঠপাট হয়ে ২০০৮ সালে ইউরোপ-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মানুষকে যেভাবে পথে বসানো হয়েছিল, সেটাই ঘটতে চলেছে ভারতবর্ষে – এসব নিয়েও আলোচনা করা দরকার। এই প্রবন্ধের ক্ষুদ্র পরিসরে সে আলোচনা সম্ভব নয়। এটিও স্বতন্ত্র একটি প্রবন্ধে আলোচনা করার ইচ্ছে আছে।

 
 
top