নতুন আলো

 

১.

ঊনবিংশ শতাব্দী শেষ হয়ে এসেছে। বছরের শেষ দিনের শেষ রাত্রি। কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের ওপর দোতলা বাড়ির একটি ঘর। ঘরের কোণে দুটি ছেলে দাঁড়িয়ে। গায়ে তাদের গরম নিকার-বোকার সুট, মাথায় টুপি, পায়ে কুটকুটে গরম ফুলমোজা, তার ওপরে বুটজুতো। চিনেবাজারের মুচিকে ফরমায়েশ দিয়ে সে জুতো তৈরি করেছে। ছেলে দুটোর বয়স অল্প হলেও নাম বেশ ভারিক্কি – প্রেমাঙ্কুর আর জ্ঞানাঙ্কুর। বয়স যথাক্রমে দশ এবং আট বছর। সেই ভোররাত্রে তারা উঠে সাজগোজ করে দাঁড়িয়ে আছে। পয়লা জানুয়ারির সকালে গড়ের মাঠে সৈন্যদের কুচকাওয়াজ হবে, আর সঙ্গে সঙ্গে হবে কৃত্রিম যুদ্ধ। তাই দেখতে যাবার আয়োজন চলছে। প্রেমাঙ্কুর আর জ্ঞানাঙ্কুরের ডাক নাম যথাক্রমে বুড়ো এবং লালু।

ওদিকে বিছানার ওপরে এদের বড়ো ভাই বাবু সাজসজ্জা করছে।বাবুর বয়েস বারো বছর। তার পছন্দ-অপছন্দ কিছু প্রবল। তাই নিয়ে মায়ের সাথে ঝগড়া চলছে। মাঝে মাঝে চড়-চাপড়ও যে চলছে-না তা নয়।

কুটকুটে মোজা পরতে বাবু প্রবল আপত্তি জানাল। তাদের মা হাল ছেড়ে দিয়ে স্বামীর দিকে ফিরে তাকালেন, ‘ওগো, দ্যাখো, তোমার বড়ো ছেলে মোজা পরতে চাইছে না!’

বাবা মহেশচন্দ্র দীর্ঘকায়, গৌরবর্ণ পুরুষ। ঘরের এককোণে  হ্যারিকেন লণ্ঠনের ওপরে একটা বড়ো কাঁসার বাটিতে দুধ গরম করার চেষ্টা করছিলেন। স্ত্রীর অনুযোগে ঘাড় ঘুরিয়ে পুত্রের দিকে ফিরলেন, ‘বছরের প্রথম দিনেই মার খাবে, বাবু? মনে রেখো, একেবারে খুন করে ফেলব!’

বাবু বিনাবাক্যব্যয়ে কুটকুটে মোজার ভেতর পা ঢুকিয়ে দিল।

এবার মা ছেলেদের হাতে একটা করে সন্দেশ আর কমলা দিলেন। সন্দেশগুলো যে যার মুখে টপাটপ পুরে দিল। কমলাগুলো এখুনি খাওয়া বারণ। ফেরার সময় যখন গলা শুকিয়ে উঠবে, তখন খাওয়া হবে।

ইতিমধ্যে লালুর কমলাটা বুড়ো নিজের পকেটে পুরে ফেলেছে। লালু বারদুয়েক চেষ্টা করেও সেটা আদায় না করতে পেরে মায়ের কাছে আপিল করল, ‘দ্যাখো না মা, বুড়ো কী করছে?’

বুড়ো তাড়াতাড়ি কমলাটা লালুর পকেটে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল।

মা ঘাড় ফিরিয়ে এ দৃশ্য দেখে ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছিলেন। তিনি ধমকে উঠলেন, ‘এই বুড়ো! হচ্ছেটা কী!’

তারপর স্বামীর দিকে ফিরে বলতে লাগলেন, ‘নাঃ, এ ছেলেটাও নষ্ট হয়ে গেল দেখছি! বড়োটার দেখাদেখি ছোটোটাও শিখবে। আমার যেমন বরাত!’

মহেশচন্দ্র দুধের বাটিটা গরম করে সবে হাত ঝাড়ছিলেন। স্ত্রীর অনুযোগে একবার রোষকষায়িত লোচনে বুড়োর দিকে চাইলেন। বেশ বোঝা গেল যে, বাটির উষ্ণতার কিছু অংশ তাঁর মেজাজেও সঞ্চারিত হয়েছে। সেই স্থিরদৃষ্টির আঘাতে বুড়ো অস্থির হয়ে উঠল। কাতর চোখে সে একবার বাবার দিকে আরেকবার দাদার দিকে চাইতে লাগল। এর পরে অবশ্যম্ভাবী যে ঘটনা ঘটতে চলেছে, তা একেবারেই তার অভিপ্রেত নয়।

ভগবান সহায়, ফাঁড়া কেটে গেল। দুর্দান্ত ক্রোধী মহেশচন্দ্র নীরবে তিনটে বাটিতে সমান ভাগে গরম দুধ ঢালতে লাগলেন।

মা বলে উঠলেন, ‘নাও সব খেয়ে নাও। আমাদের উদ্ধার করো।’

তিন ভাইয়ের হাতে দুধের বাটি একে একে ধরিয়ে দেওয়া হল। হুসহাস, ডুড়ুক ডুড়ুক, ফুক ফুক ইত্যাদি নানাবিধ শব্দে তিন ভাই দুধের বাটির সত্কার শুরু করল।

‘কতবার বলেছি যে খাবার সময় এরকম অসভ্য শব্দ করবে না!’, মহেশচন্দ্র চিত্কার করে উঠলেন, ‘চলো, চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।’

শীতের শেষ রাত্রি। হু হু করে বইছে উত্তুরে বাতাস। নির্জন রাস্তা ধরে বাবার সঙ্গে তিন ভাই চলেছে। তাদের পদশব্দে রাত্রির স্তব্ধতা ভঙ্গ হচ্ছে। গ্যাসের আলোর ল্যাম্পপোস্টগুলো সারি সারি দাঁড়িয়ে। তাদের বাতি তখনও ম্রিয়মাণ শিখায় জ্বলছে। তিন ভাই প্যান্টের দু-পকেটে হাত ঢুকিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে হাঁটছে। কানের উপর তাদের পিতার উপদেশামৃত বর্ষিত হচ্ছে।

‘আজ নতুন বছরের সকালে মনে মনে তোমরা কী প্রতিজ্ঞা করেছ?’

ছেলেরা নীরব।

‘বলো : আমরা ভালো ছেলে হব। ভালো করে লেখাপড়া শিখব। কখনো মিথ্যে কথা বলব না।’

ছেলেরা মৃদুকণ্ঠে সমবেত হয়ে এই মহৎ প্রতিজ্ঞা উচ্চারণ করল।

‘বুড়ো, তুমি ধারাবাহিকভাবে পরীক্ষায় খারাপ ফল করছ। প্রতিজ্ঞা করো যে, এ বছর তোমায় ক্লাসে ফার্স্ট হতেই হবে।’

‘হ্যাঁ, বাবা।’

গ্যাসের আলো একে একে নিবতে শুরু করেছে। ভোর হয়ে আসছে। মহেশচন্দ্র চলতে চলতে রাস্তার ডানদিকে একটা বড়ো বাড়ি দেখালেন।

‘এই বাড়িটা চেন?’

ছেলেরা কালো রেলিং আর বড়ো বড়ো গাছের ফাঁকে কিছুটা সাদা দেয়াল দেখতে পেল।

‘কী? চেন বাড়িটা?’

‘না তো!’

‘এটা হল প্রেসিডেন্সি কলেজ। কলকাতার সেরা কলেজ। এখানকার মাইনে বারো টাকা। বড়ো হয়ে তোমাদের এখানে পড়তে হবে। মানুষ হতে হবে।’

বলতে বলতেই মহেশচন্দ্রের পাশ দিয়ে ঢং ঢং শব্দে দিনের প্রথম ট্রাম বেরিয়ে গেল। ভরতি লোক। সবাই সেজেগুজে গড়ের মাঠে প্যারেড দেখতে চলেছে।

ট্রামের আওয়াজে মহেশচন্দ্রের উপদেশের স্রোত ঢাকা পড়ে গেছিল। এবার আবার তা প্রবল বিক্রমে শুরু হল।

‘কতবার বলেছি যে, তোমাদের রুটিন করে পড়তে হবে। কী বল, বাবু?’

বাবু মাথা নাড়ল।

‘সকালে ঘুম থেকে উঠেই ভগবানের নাম নিয়ে পড়বে টানা ন-টা পর্যন্ত। তারপর স্নান করে স্কুল। স্কুল থেকে ফিরে কী করবে?’

‘কেন হাতের লেখা আর অঙ্ক কষা?’

‘বেশ, বেশ, বাবু! তারপর?’

‘আপনি যখন আপিস থেকে ফিরবেন তখন আপনার সঙ্গে প্রার্থনায় বসব। ভগবানের নাম করব।’

‘এক্সেলেন্ট ! তারপর?’

‘আবার পড়ব সাড়ে ন-টা, দশটা অবধি। তারপর খেয়েদেয়ে ভগবানের নাম করে শুয়ে পড়ব।’

মহেশচন্দ্রের শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখ স্মিতহাস্যে ভরে উঠছিল। হঠাৎ তিনি থমকে গেলেন বাবুর ‍‍‍‍‍‌‌‌‌‌‌‌‍‍‌প্রশ্নে।

‘কিন্তু বাবা, খেলাধুলো? সেটা করব কখন? রুটিনে খেলাধুলোর সময় থাকবে না?’

‘খেলাধুলো! বাবু, গত বার্ষিক পরীক্ষায় তুমি কত পেয়েছ?’

বাবু মাথা নিচু করে চুপ করে রইল।

‘তোমাদের ডাফ কলেজের টমরীর হাতেপায়ে ধরে তোমাকে ক্লাসে তুলতে হয়েছে। ভাগ্যে শ্যামবাবু ছিলেন।’

বাবু মাথা নিচু করে ফিস ফিস করে বলল, ‘দুই জানোয়ার!’

‘কী বললে?’

‘বলছিলাম, খুব খারাপ ব্যাপার!’

‘খারাপ মানে? জঘন্য! একেবারে জঘন্য! তুমি, বাবু, আমার নাম ডোবাবে। এ বছর তোমার খেলাধুলো বন্ধ!’

মহেশচন্দ্র বলে চললেন, ‘কত ইচ্ছে ছিল যে ভালো করে লেখাপড়া শিখব। কিন্তু ছেলেবেলায় বাবা মারা গেলেন। আর কিছু হল না। তোমাদের বকিঝকি, মার দিই – সে তো তোমাদের ভালোর জন্যেই। এবং এটা তোমরা এখন না-বুঝলে আর কবে বুঝবে?’

শীতের কুয়াশার থেকেও ভারী মহেশচন্দ্রের কণ্ঠস্বর। ভোরের শিশিরবিন্দু তাঁর কালো দাড়িতে চকচক করছে। আকাশে ভোরের আলো ফুটছে।

বুড়ো জিগ্যেস করল, ‘এবার কাদের মধ্যে যুদ্ধ হবে রে, দাদা?’

বাবু বিজ্ঞের সুরে বলল, ‘কেন, শিখ আর ইংরেজ।’

‘জিতবে কারা?’

‘কেন শিখরা! ওরাই তো সবসময় জেতে। ওদের চেহারা দেখেছিস?’

বুড়ো শিখ সৈন্যদের প্রকাণ্ড চেহারা এবং ততোধিক বিশাল দাড়ির সঙ্গে পরিচিত। তুলনায় লালমুখো ইংরেজ সৈন্যগুলো বেঁটে বেঁটে।

‘দাদা, এই বিরাট শিখগুলো ইংরেজদের কাছে হারল কেন?’

‘ধুর ধুর! ইংরেজরা তো সবসময় জোচ্চুরি করে জেতে। ঘুষ খাইয়ে লোকদের হাত করে জেতে। ভদ্রলোক শিখরা পারবে কেন? সিরাজউদ্‌দৌলা পেরেছিল? পলাশির কথা ভুলে গেলি? শালা মিরজাফর!’

‘যাই বল দাদা, এই লালমুখো, কটাচোখ সাহেবগুলোকে দেখলে কেমন ভয় ভয় করে।’

‘ধুত্তোর ভয়! সেদিন গড়ের মাঠে এক গোরাকে পিটিয়েছি, জানিস?’

বুড়ো স্তম্ভিত হয়ে গেল। তার বারো বছরের দাদা যে এতটা লায়েক হয়েছে, সেটা সে জানত না। অবিশ্বাসের সুরে সে বলল, ‘ঠিক বলছ, দাদা?’

‘তবে কি মিছে কথা বলছি? বিশ্বাস না হয় মোদোকে জিগ্যেস কর্‌।’

‘মোদো?’

‘হ্যাঁ, মধুসূদন ঘোষ – আমাদের ক্লাসের মোদো। মেছোবাজারের বড়োকরিমের সাগরেদ। বড়োকরিমের নাম শুনেছিস?’

বুড়ো ঘাড় নাড়ল।বড়োকরিমের নাম সে জানে না।

‘তা জানবি কেন! এত বড়ো একটা লোকের নাম না-জেনে মর্‌ ইতিহাস, ভূগোল মুখস্থ করে।’

‘বড়োকরিম কী করে?’

উত্তরে বাবু শিউড়ে উঠে কপালে হাত ঠেকাল।

‘গুন্ডা রে, গুন্ডা! কলকাতার সবচেয়ে বড়ো গুন্ডা। ওর দাপটে মেছোবাজারে একঘাটে বাঘে-গোরুতে জল খায়। ওর আখড়ার সামনে দিয়ে কেউ বুক ফুলিয়ে গেলে এমন ঘুঁষো মারবে যে পিঠ দিয়ে হাত বেরিয়ে যাবে, বুঝলি?’

বুড়ো চমকে গেল। মেছোবাজারের মধ্যে দিয়ে বুক ফুলিয়ে যাওয়ার সংকল্পও সে তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করল।ক্ষীণস্বরে বলল, তা সে দিন গোরাদের সাথে কী করলে?

‘আরে, ফালতু আমাদের পেছনে লাগতে এসেছিল। আমি আর মোদো মিলে অ্যায়সা ধোবিপাট দিয়েছি না, যে বাপের নাম ভুলে গেছে! হুঁ হুঁ, বাবা! মোদোর সঙ্গে চালাকি নয়। ও বড়োকরিমের সাগরেদ। আমাকেও বলেছে বড়োকরিমের আখড়ায় সঙ্গে করে নিয়ে যাবে।’

‘আমি তোমার সঙ্গে যেতে পারি না, দাদা?’

বাবু অত্যন্ত অবজ্ঞার সঙ্গে ভাইয়ের দিকে চাইল, ‘তোকে বড়োকরিম সাগরেদ করবে না। তোর বয়েস হয়নি।’

হায়, হায়! নতুন বছরের প্রথম দিনে এ কী নিদারুণ দুঃসংবাদ! প্রেমাঙ্কুরের বুকভরা আশা ধুক করে নিবে গেল।

দুই ভাই ফিস ফিস করে গল্প করতে করতে একটু আগে এগিয়ে গেছে। লালু বাবার হাত ধরে পেছন পেছন আসছে। অচিরেই তাদের সামনে দিগন্তবিস্তৃত তৃণাচ্ছাদিত এক প্রান্তর ফুটে উঠল। উদীয়মান সূর্যের আলো সবুজ ঘাসের ওপর লুটোপুটি খেলছে। গড়ের মাঠ। গড়ের মাঠ এসে গেছে!

(ক্রমশ…)

 
 
top