রাজনৈতিক চলচ্চিত্র

 

 ভূমিকা

 

ফরাসীভাষায় ‘engage’ বলে একটা কথা আছে। আমার মনে হয়, সর্ব শিল্পে সেইটিকে গ্রহণ করা উচিত।নিরলম্ব, বায়ুভূত শিল্প কখনও শিল্পের পর্যায়ে ওঠে না। - ঋত্বিক ঘটক

 

রাজনৈতিক চলচ্চিত্র কাকে বলব? এ প্রশ্নের উত্তর দু-ভাবে দেওয়া যেতে পারে। এক, যেসব চলচ্চিত্র প্রত্যক্ষ রাজনীতিকে ছবির বিষয় হিসাবে উপস্থাপন করে অথবা যেসব ছবি সরাসরি রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে উদ্ভূত। উদাহরণস্বরূপ, ১৯২০ সালের সোভিয়েত চলচ্চিত্রের কথা বলা যায়। দুই, রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের ধারণাকে একটু বৃহত্তর অর্থে দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ, প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছবিগুলি ছাড়াও চলচ্চিত্র-ভাষার রাজনীতি বিশেষভাবে প্রকাশ পায়, এমন ছবিকেও রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের অন্তর্ভুক্ত করেন অনেকে। যেমন ধরা যাক সুর্‌রিয়ালিস্ট ছবি। সুর্‌রিয়ালিজম প্রচলিত শিক্ষা-ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং তার বিপ্রতীপে অবস্থান করে। তাই অনেকেই পরাবাস্তবাদী ছবিকে রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের অন্তর্ভুক্ত করে থাকেন বৃহত্তর অর্থে। এ ভাবে ভাবলে সোভিয়েত মন্তাজ চলচ্চিত্র থেকে ফরাসি নবতরঙ্গ – রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকে একটি ব্যাপ্ত পরিসরে দেখা যায়।

রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের এই বৃহত্তর সংজ্ঞা মূলত বিংশ শতাব্দীর আধুনিকতাবাদী সমালোচকদের লেখায় বহুলভাবে আলোচিত। এই ধরণের সংজ্ঞায়নে রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকে দেখার উৎসাহ বা আগ্রহ কোনোটাই এই লেখকের নেই, কারণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে কেবল আঙ্গিক বা ভাষার রাজনীতি সম্বল করে কোনো শিল্পকর্মকে রাজনৈতিক শিল্প আখ্যা দেওয়াটা একপ্রকার আঙ্গিকবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে পর্যবসিত হয় শেষ পর্যন্ত। ফলে এ পথে হাঁটার ইচ্ছে তেমন নেই। আবার প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত ছবিকেই কেবল রাজনৈতিক চলচ্চিত্র ভাবা হবে, এ রকমটা আজকাল বড়ো একটা কেউ বিশ্বাস করেন না। সমাজতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদ, বিপ্লব বা প্রতিবিপ্লব, শ্রমিক বা পুঁজিপতি, শাসক ও শোষিত – কেবল এভাবে ভাবলেও আবার রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের সংজ্ঞাটা খুব ছোটো হয়ে যায়। এ ভাবে ভাবলে ইতালির নববাস্তববাদী চলচ্চিত্রকে রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের মধ্যে পাঠ করা মুশকিল হবে। ইতালির নববাস্তববাদ ফরাসি নবতরঙ্গের মতো কেবল শিল্প আন্দোলন যেমন নয়, তেমনই তা সরাসরি রাজনৈতিক চলচ্চিত্রও নয়; অথচ নববাস্তববাদের সঙ্গে রাজনীতি এতটাই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত যে, তাকে রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত না করে উপায় নেই।

তাই রাজনৈতিক চলচ্চিত্র বলতে আমরা সেই চলচ্চিত্রকে বোঝাব, যা একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রকল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। সে চলচ্চিত্রকে প্রত্যক্ষ রাজনীতির কর্মকাণ্ডের অংশ হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; কিন্তু তার সঙ্গে রাজনীতির একটা স্পষ্ট যোগসূত্র থাকবে। এই রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হতে পারে কোনো চলচ্চিত্র আন্দোলন – যেমন ইতালির নববাস্তববাদ বা ব্রাজিলের সিনেমা নোভা। অথবা হতে পারে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা যেমন লুই বুনুয়েলের ল্যান্ড উইদাউট ব্রেড, জরিস ইভেন্সের দ্য স্প্যানিশ আর্থ  বা চার্লি চ্যাপলিনের দ্য গ্রেট ডিক্টেটর 

রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের একটি সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক রূপরেখা দিতে গেলে অবশ্যই শুরু করতে হয় ১৯২০-র দশকের সোভিয়েত চলচ্চিত্র থেকে। পুদ্‌ভকিন-আইজেনস্টাইন-ভের্তভদের মন্তাজ-চলচ্চিত্র সিনেমার ইতিহাসে প্রথম সংগঠিত রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রয়াস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানের দু-দশক (১৯১৯-১৯৩৮) কেবল সোভিয়েত ইউনিয়নে নয়, জার্মানিতেও রাজনৈতিক চলচ্চিত্র বিকাশ লাভ করে। মূলত, সমাজতান্ত্রিক চলচ্চিত্র ভাবনার প্রভাবে হল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের তথ্যচিত্রেও রাজনৈতিক চেতনা-সমৃদ্ধ ছবি নির্মিত হতে দেখা যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের একটি নতুন রূপ দেখা যায় ইতালির নববাস্তববাদী চলচ্চিত্রের উত্থান ও বিকাশের মধ্য দিয়ে। ১৯২০ ও ১৯৩০-এর প্রোপাগান্ডাধর্মী চলচ্চিত্রের পরিবর্তে নিওরিয়ালিজম রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকে ১৯৪০-এর দশকে পূর্ণ সংজ্ঞায়িত করল প্রতিরোধের সিনেমারূপে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রেও আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল। প্রথমত, এশিয়া ও আফ্রিকার অধিকাংশ দেশে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটল; জন্ম নিল নতুন সব স্বাধীন রাষ্ট্র। দ্বিতীয়ত, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়তে থাকল দক্ষিণ আমেরিকা ও পূর্ব এশিয়ায়। অন্যদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে নিরঙ্কুশ প্রভাব বিস্তার করল। তৃতীয়ত, চিন ও কিউবার সফল বিপ্লব তৃতীয় বিশ্ব নামক একটি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তির জন্ম দিল।

চলচ্চিত্রের জগতেও স্পষ্ট কয়েকটি পরিবর্তন দেখা গেল। ইতালির নববাস্তববাদ সামাজিক মানুষের প্রান্তিক জীবনকে কীভাবে বাহুল্যবর্জিত ঢঙে দেখা যায় ও বিশ্লেষণ করা যায়, তার উজ্জ্বলতম নিদর্শন রাখল। দুই, চলচ্চিত্রের ভাষা এতটাই সাবলীল হয়ে উঠল যে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে চলচ্চিত্রের পর্দায় উপস্থাপন আর কঠিন রইল না। তিন, উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে ১৯৫০-১৯৭০ – এই তিন দশকে জাতীয় চলচ্চিত্রের বিকাশ ঘটতে থাকল। চার, দক্ষিণ আমেরিকার কিউবা, ব্রাজিল, চিলে, মেক্সিকো এবং আর্জেন্টিনার নতুন চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে প্রতিরোধের চলচ্চিত্রের ধারণাটি তৃতীয় চলচ্চিত্র বা থার্ড সিনেমারূপে তৃতীয় বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। এবং পাঁচ, ভিয়েতনাম যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ছবি বিশ্বজনীন চেহারা লাভ করল।

ঐতিহাসিক সময়-সারণিতে চোখ রাখলে রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম পর্ব, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝের দু-দশক। দ্বিতীয় পর্ব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১৯৮০-র দশক পর্যন্ত চার দশক। আর তৃতীয় পর্ব, সোভিয়েত পরবর্তী যুগ, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমের বিশ্বায়ন।

১৯৯০ পরবর্তী এই তৃতীয় পর্বে ইরান এবং চিনের ছবিকে রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের আঙিনায় উপস্থিত দেখতে পাচ্ছি। দক্ষিণ কোরিয়া-সহ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকারদের মধ্যে নতুন যুগের রাজনৈতিক ছবিকে দেখা যাচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়ে ওঠার ফলে বিশ্বজুড়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের সংখ্যা অনেকগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইদানিং বেশ কয়েকটি তথ্যচিত্র সাম্প্রতিককালের রাজনৈতিক চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে ছোটো-বড়ো প্রতিবাদ, সামাজিক অসন্তোষ, জীবন ও জীবিকার আমূল পরিবর্তনের ফলে মানুষের বিপন্নতা – এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই তৈরি হচ্ছে আজকের দিনের রাজনৈতিক চলচ্চিত্র।

(ক্রমশ…)

 

 
 
top