ত্রৈলঙ্গ রায়ের আজ-কালের আখ্যান

 

উদীয়মান কবি শ্রীত্রৈলঙ্গ রায়-এর পশ্চাৎদেশে জাঁহাবাজ একটি হাতি একটি বিরাশি সিক্কারলাথি কষিয়ে দিতেই ওঁর মাজা ভেঙ্গে গেল। সবে চাট্টি আনকা শব্দ জোগাড় করে- বিস্তর পারমুটেশন-কম্বিনেশন করে আড়াআড়ি বসিয়েছিলেন, এমন সময় এই উৎকট বিভ্রাট! গগনবিদারী আর্তচিৎকার শুনে আশেপাশের খেতখামার থেকে মুনিশ-কামিনরা ছুটে এল, ততক্ষণে প্রায় অনেকটাইসাবাড়। দু-দিন সদর হাসপাতালে ভরতি থাকার পর তিনদিনের দিন বেস্পতিবারের বারবেলায় ত্রৈলঙ্গ রায় বেমক্কা ব্যয় হয়ে গেলেন।

গাঁয়ের মাথার পলাশকুঞ্জে একান্তে কাব্যচর্চা করতে গিয়ে দলমার দাঁতালদের অন্যায় হুজ্জুতির শিকার হয়ে গেলেন দীঘলগাঁয়ের ত্রৈলঙ্গ রায়।

অপঘাতে নিকেশ হওয়ার দরুণ ত্রৈলঙ্গ রায় সেরেফ প্রেত হয়ে গেলেন। গতরটা বায়ুর মতো হালকা হয়ে গেল, বডিতে কেরাটিন, ক্যালসিয়াম, মেলানিনের বাড়বাড়ন্ত হল – ক্যানাইন দাঁতগুলো ছুঁচলো আর পুরুষ্ট হল, কান-চুল-নখেরও দর্শনীয় বৃদ্ধি হল। আর জৈবিক চাহিদাগুলো কম-বেশি একইরকম রইল – যদিও সেগুলির কয়েকটি নেহাত অলংকার হিসেবেই রইল।

দীঘলগাঁয়ের আমবন, শ্যাওড়াবন, বাবলাবনে এক্কাদোক্কাখেলে কাটল ক-টা দিন ত্রৈলঙ্গের। পৈতৃক ভিটের আশেপাশে, শোকগ্রস্ত বাপ-মায়ের চৌহদ্দিতে আরো গুটিকয় দিন কাটল। জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে মোলাকাত হয়েছিল আগেই – ত্রৈলঙ্গের জ্যাঠামশাই শ্রীমান রামকিংকর রায় বিসূচিকারোগে ফৌত হয়ে গিয়েছিলেন দশ বছর বয়েসে। মরার আগেই তাঁর উপনয়ণ হয়েছিল, তিনিও বেম্মদত্যি হয়ে আছেন সেই সুরাবর্দির আমল থেকে। আছেন ভিটের পশ্চিমদিকের একটি বেলগাছে, একটা আগাপাশতলা দিগম্বর আর ক্ষয়াটে বেলগাছ, পেল্লাই তার বহর। ওরই শাখায় শাখায় জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে কুমিরডাঙা খেলে ত্রৈলঙ্গের আরো কিছুদিন পেরুলো। ও মুড়োর চারটে মামদো, খানকয়েক সর্বহারা বেম্মদত্যি, তিনটে বুর্জোয়াগোত্রের শাঁকচুন্নিদের সঙ্গেও কিঞ্চিৎ ওঠবোস হল। কিন্তু গাঁয়ের আবহাওয়ায় আর পোষালো না ত্রৈলঙ্গের। চাকরিসূত্রে জীবনের অর্ধদশক তিনি মহানগরীর মেসবাড়িতে দিনযাপন করেছেন, কলকাতার সিলিকনভ্যালি সল্টলেকে ছিল তাঁর আটতলা আপিস। এই আপিসের একটি কোণে বিভোর হয়ে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‘কম্পিউটার প্রোগ্রাম’ লিখেছেন, ফিরিঙ্গি মক্কেলদের হরেক বায়নাক্কা সামলাতে গিয়ে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের তোয়াক্কা করেননি। এই মহানগরীর বুকেই তিনি কবিতাচর্চা করেছেন। গড়ুরপঙ্খী নামক একটি ‘অনলাইন’ সাহিত্যপত্রিকায় নিয়মিত কবিতা বেরুত তাঁর। আপিস সমাধা করে প্রায়ই যাদবপুর কফিহাউজে যেতেন, সেখানেই ছিল ‘বাতচক্র’ বলে একটা সাংস্কৃতিক আড্ডা। যাত্রা-থিয়েটারের টানে চিৎপুর-অ্যাকাডেমি-মধুসূদন-এ মাথা ঠুকে আসতেন ফুরসত পেলেই। সে সবের কাছে কোথায় লাগে রাঢ়বঙ্গের এই গাঁ! হতে পারে এটাই তাঁর জন্মভূমি, এইখানেই তাঁর পৈতৃক ভিটেমাটি, এখানের মাটির গর্ভেই তাঁর প্লাসেন্টা পোঁতা, মাসে একবার নিয়ম করে এইখানেই ফিরে আসতেন তিনি। কিন্তু দীর্ঘ এবং গভীর সান্নিধ্য পরম অনাত্মীয়কেও আত্মীয়ের অধিক করে তোলে, অনাত্মীয় মহানগরীতেই তাঁর এখন প্রাণের আরাম। তাছাড়া ঝগড়ুটে অমার্জিত শাঁকচুন্নি, হাড়হাভাতে বেম্মদত্যি, ইললিটারেট অ্যামেচার মামদোর সঙ্গে মেলামেশাটা একদম পোষাল না। রাতদুপুরে বাউরিপাড়ায় দাঁত খিঁচোন– মামদোচাচার নৈশকালীন কর্মকাণ্ড বলতে এটাই। ত্রৈলঙ্গ একটু দাঁত বের করে খোশ্‌-বাতচিত করেছে কী ‘চল্‌ রে বাচ্চা, বাউরিপাড়ার লেন্ডিগেন্ডিগুলোকে খিমচে দিয়ে আসি’ – বলে ত্রৈলঙ্গকে বগলদাবা করার চেষ্টা করে সে।

ত্রৈলঙ্গ – ‘চাচা, বাউরিপাড়ায় সর্দির মড়ক লেগেছে – বড্ড ছোঁয়াচে…’–বলে আটকানর চেষ্টা করেও রেহাই পান না।

‘ভূতেদের আবার সর্দির ভয়! তুই হাসালি বাপজান!’ বলে ঘেঁটি ধরে ত্রৈলঙ্গকে নিয়ে বাউরিপাড়া যায় চাচা।

এদিকে বেম্মরা দল বেঁধে যাবে গেরস্থবাড়িতে বিষ্ঠা বৃষ্টি করতে। বেম্মসর্দার মেও বাঁড়ুজ্জ্যে জাত বামপন্থী – ওর নেতৃত্বেই জোতদার-মজুতদারদের হিট-লিস্টি তৈরি হয়। তারপর বেম্মদের দল প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়ে বিজাতীয় সব বিষ্ঠার বন্যা বইয়ে দেয় – বন্দুকের নলে এদের আস্থা খুব কম। ত্রৈলঙ্গও আজীবন দ্বন্দ্বমূলক বস্তবাদের চর্চা করেছেন – বামপন্থীদের প্রতি তাঁর সহানুভূতি আছে – কিন্তু বিপ্লবের নামে এই ধরণের ব্যভিচার তিনি মেনে নিতে পারেন না।

আর এদের মধ্যে সবচেয়ে ওঁচা শাঁকচুন্নির দল – কৃমীগন্ধী, গৃধিনীদর্শী, চরম ভোগবাদী, আকালে-কাক এক-একটা। রোজ সন্ধে সন্ধে এরা যাবে পুকুরে পুকুরে মৎস্য-মৎস্যপোতের সন্ধানে। কখনো কখনো নাবালক নাবালক সব পুংকে বেমক্কা হাতছানি দেবে, পুংলিঙ্গ নিয়ে নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করবে। এসব ছিঁচকেমি ত্রৈলঙ্গের মনকে আকৃষ্ট করল না মোটেই। ত্রৈলঙ্গের মন আঁটো হয়ে রইল কলকাতায় তাঁর সেই মেসবাড়ির খোপটিতে- সেই বাউণ্ডুলে খোপ, তার চারটে কোণ, বই রাখার সেই স্পাইনলেস শেল্‌ফ, খোঁড়া তেপায়াটি। অবিশ্যি এই ক’দিন একটি একানড়ের সঙ্গে সখ্য হল – সেইটিই যা একমাত্র পাওনা। ‘একানড়ের সঙ্গে সখ্য’ – কথাটি ভেবে মনে মনে হাসেন ত্রৈলঙ্গ। ব্যাপারটা অ্যাতোদিন সোনার পাথরবাটির মতো মনে হত ত্রৈলঙ্গের। জীবদ্দশায় একানড়েদের নাম শুনলে ওঁর রীতিমতো হৃৎকম্প হত। এদের হুজ্জুতির কাহিনি ত্রৈলঙ্গ ঠাকুমার মুখে শুনেছেন ছোটোবেলায়, হাড়হিম করা কাহিনি সব। তালগাছে বাস এদের, একঠেঙে তালঢ্যাঙা সবগুলো- লেঙচে চলে – তিলেখচ্চর। ত্রৈলঙ্গের ঠাকুর্দা রামরাম রায় নাকি বেশ কয়েকবার এদের পাল্লায় পড়েছিলেন। রামরাম কাজ করতে যেতেন দামোদর নদ ডিঙিয়ে, আসানসোলের কারখানায় ছিল তাঁর কাজ। বাড়ি ফিরতে ফিরতে ওঁর সেই সন্ধে হয়ে যেত। ফেরার পথে প্রায়ই কারখানার ক্যান্টিনের আলুর চপ, ফুলুরি, নিখুতি নিয়ে আসতেন তাঁর নাবালিকা বধূটির জন্য। এদিকে গাঁয়ের মাথায় ছিল মস্ত তালবন, সেখানে ছিল কিছু একানড়ের মজলিশ, উন্মার্গগামী কিছু একানড়ে। ব্যাটাদের তীক্ষ্ণ নজর থাকত রামরামের হাতে ঝোলানো ‘ভালোমন্দ’র দিকে।

রামরাম হনহনিয়ে হেঁটে যেতেন আর – ‘কীঁ আঁমআঁম কাঁরখানার হালঁচাল কীঁ? ক্যাঁন্টিনে মেঁচাসন্দেশ বাঁনায় এঁখনো?’ পিছু ডাকত ওদেরই একজন। ‘রামরাম’ উচ্চারণ নিষিদ্ধ, তাই ‘আঁমআঁম’। রামরাম ঘাবড়াতেন না, আজন্ম বায়ুরোগী হলে কী হবে, মনে বেজায় জোর।

‘কীঁ হেঁ আঁমআঁম, কাঁরখানার হালঁচাল কীঁ?’

ওরা রামরামের পাশেপাশে হাঁটত আর একই কথা বারবার আউড়ে যেত। মাঝেমাঝে নিখুতির ঝোলা ধরে টানাটানি করত। গামছার খুঁট ধরে বেমতলব বেইজ্জত করার চেষ্টা করত। আসলে নদী উজিয়ে যাতায়াত করতে হত বলে গামছা পেঁচিয়েই আপিস যেতেন রামরাম, দামোদরের পাড়ে প্রাতঃকৃত্য সেরে, দামোদরের জলে শৌচাদি কর্ম করে, হাঁটুজল দামোদর ডিঙিয়ে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাতেন, তারপর আটহাতি ধুতিটি পেঁচিয়ে নিতেন। ফিরতেন যখন, ভেজা গামছাটি লত্‌পত করত।

রামরাম একহাতে ব্রহ্মসূত্রটি আর গামছা আঁকড়ে ধরতেন, একহাতে ধরতেন চপের পুঁটুলি আর একসঙ্গে খানচারেক বিড়ি ধরিয়ে, আগুনমুখে আপননাম জপ করতে করতে দে ছুট!

ঠাকুমার মুখে এসব শুনেছিলেন ত্রৈলঙ্গ – একানড়েদের নিয়ে বদখত একটা ইমেজ তৈরি হয়েছিল মনে। কিন্তু এই একনড়েটার ব্যাপারটা স্বতন্ত্র – তালগাছে তার বসত হলেও, ঈষৎ লেঙচে চললেও বেশ অন্তর্মুখী স্বভাবের একানড়ে, ভাবুক আর ল্যাকাডেইজিক্‌ল্‌ একটু, ত্রৈলঙ্গের চরিত্তিরের সঙ্গে বেশ মিল। পাশের গাঁয়ের ইস্কুলেপ্যারা-টিচারছিল ছোকরা, প্রকৃতিমায়ের ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে কালকেউটের এক ছোবলেই শিথিল হয়ে গিয়েছিল একদিন ভোরের বেলা।

‘তোমার ইতিহাস শুনেছিলাম মায়ের কাছে। গত বর্ষায়, না?’ ত্রৈলঙ্গ জিগ্যেস করেছিলেন একানড়ে ফ্যারাও সদ্‌গোপকে। সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতেও তর হয়নি, গাড়িতে গোরু জুততে জুততেই অক্কাপ্রাপ্তি হয়েছিল ছোকরার। ইচ্ছেময় গুণিন এসেছিল, বিশেষ সুবিধে করতে পারেনি। লতায় কাটা লাশ, চিতায় চড়ানর প্রশ্ন ওঠে না, কলার মান্দাসে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিলদামোদরে। ত্রৈলঙ্গ সবই শুনেছিলেন মায়ের কাছে, গাঁগুলোতে সেবার মনসাপূজার খুব হিড়িক পড়েছিল।

‘হ্যাঁ, গত আষাঢ়ে। তটিনী বাউরি কয়লা কুড়িয়ে ওদিক দিয়েই যাচ্ছিল। ওর নজর খু-ব খারাপ, ওকে এড়াতে গিয়ে কখন যে গহিন ঝোপে সেঁধিয়ে গিয়েছিলাম খেয়াল হয়নি। আমি কম্ম সাবাড় করার আগেই দেখি ব্যাটা খরিশ সব সাবাড় করে ফেলেছে।’ বলেছিল একানড়ে।

‘ইচ্ছেময়ের তো খুব হাতযশ শুনেছি – ওর দ্বারাও কিছু হল না!’

‘ইচ্ছেময়আর কী করবে, ইচ্ছেময়ের কেস ছিল না ওটা। কম সে কম ছ-এমএল চালান করে দিয়েছিল ব্যাটা, বিষের নদী একেবারে – দু-দণ্ড যেতে না যেতেই তটিনী বাউরির কোলে ঢলে পড়েছিলাম, জ্ঞান ছিল না। এরপর আর কী কিছু হবার ছিল!’

‘প্রতিশোধ নাওনি?’

‘চেষ্টা করেছি অনেক। বড়দিঘির ওই ঝোপটাতেই ছোঁক ছোঁক করে বেড়াতে দেখেছি ব্যাটা রেপ্টাইলকে। রাতের দিকে একবার যদি বেরুত – ঘাড় মটকে ছেড়ে দিতাম বাছাধনের!’ ফ্যারাও সদ্‌গোপ দাঁত কিড়মিড় করে উঠল।

‘আমারটা তো আবার হাতি, জানই তো। দল বেঁধে থাকে সব – সবগুলো একছাঁচে গড়া – আলাদা করে চেনার উপায় নেই। আর চিনলেই বা কী, হাতির ঘাড় মটকানো আমার কম্ম নয়।’ বললেন ত্রৈলঙ্গ।

‘ঘাড় না, ঘাড় না, সব কটার শুঁড় মটকে ফেলে দিতে হবে – তবেই যদি এই দলমার খুনিয়ারাগুলোর শিক্ষে হয়। গতবার আমাদের গাঁয়ে কত যে ধানখেত দুমড়ে মাড়িয়ে নষ্ট করেছিল!’ বলেছিল ফ্যারাও।

ছেলেটার গা নীলচে, তন্দ্রালু চোখ, মুখেচোখে ফাজলামি নেই, বরং মায়া আছে। ফচকে-ফোক্কড়দের সঙ্গে বাতচিত করে ত্রৈলঙ্গ কখনোই সোয়াস্তি পান না। একানড়েকে তাই ভালোই লেগেছিল ত্রৈলঙ্গের। এইরকম শিষ্ট মানুষকে কি ‘একানড়ে’ হতে হয়! জগতের এ কোন্‌ নিয়ম! কথাটা ফ্যারাওকে বলে ফেলেছিলেন ত্রৈলঙ্গ।

‘আমার গুষ্টিতে এর উদাহরণ নেই বিশ্বাস করো, আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি। বিধাতার কোন ভুলে যে এই বেলেল্লাদের দলে পড়ে গেলাম! হেন কুকম্মটি নেই যা এরা পারে না বা করে না! ধিক ধরে গেল হে, ধিক ধরে গেল!’ হতাশায় বলেছিল একানড়ে।

‘দরখাস্ত দিলে হয় না? যদি কর্তৃপক্ষ ভুলটা শুধরে নিয়ে মোটামুটি একটা পেরেত বানিয়ে দেয়!’ বলেছিলেন ত্রৈলঙ্গ।

‘ভুল স্বীকার করলে তো – খবর হয়ে যাবে না! আমি চেষ্টা যে করিনি তা নয়, যমদপ্তরের এক পেয়াদার সঙ্গে একদিন মোলাকাত হয়েছিল – ব্যাটা খুব নীচু দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল একদিন আর আমি ওই ঢ্যাঙা তালগাছটার টঙে বসেছিলাম। কথা বলতেই চায় না, অনেক কষ্টে সমস্যাটা বললাম। সব শুনেটুনে পরিষ্কার বলল এসব নিয়ে বেশি ট্যান্ডাইম্যান্ডাই করতে গেলে সোজা নরকে পাঠিয়ে দেবে। কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মুখ খোলা যাবে না, ভায়া।’

হতাশ সুরে বলেছিল একানড়ে। ছোকরার দুঃখে ত্রৈলঙ্গ সমবেদনা জানিয়েছিলেন মনে মনে।

আসলে দু-জনেই অপঘাতে অকালে মৃত, দু-জনের মৃত্যুর পিছনে মানুষ্যেতর জীব ইত্যাদি এইসব মিলের জন্যফ্যারাওয়ের প্রতি আলাদা একটা অনুভূতি তৈরি হয়েছিল ত্রৈলঙ্গের মনে। তাই আবেগাণ্বিত হয়ে বলে ফেলেছিলেন, ‘তুমি ভাই আমার সঙ্গে কলকাতা চলো। ওখানে আমার একটা ডেরা আছে – দুজনে আরামসে কাটিয়ে দেব।’

কলকাতারনাম শুনে একানড়েটা বেশ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল।

‘কলকাতা খুব বড় গঞ্জ গো। বছর তিনেক আগে গেছিলাম সেখেনে, জীবনে ওই একবারই। অল বেঙ্গল প্যারা-টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের মিটিং ছিল একটা কলেজ স্ট্রিটে। বাঁকুড়া ইস্টিশনে ট্রেন ধরেছিলাম। হাওড়া ব্রিজ দেখে তো টাটক লেগে যাবার জোগাড়,আর কলেজ স্ট্রিট তো আস্ত বই-বাগান একটা! চক্রবর্তী না চৌধুরি কার জানি দোকান থেকে সুকান্ত ভটচাযের একটা কবিতার বইও কিনেছিলাম সেবার।’ বলেছিল ছোকরা।

এই দূর গ্রামদেশের এক ছোকরা কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে কবিতার বই কিনে এনেছে, এমন কথা সাতজন্মেও শোনেননি ত্রৈলঙ্গ। খুব উৎসাহভরে ত্রৈলঙ্গসেদিন ছোকরাকে উত্তরোত্তর আধুনিক যুগের অনেক কবিতা শুনিয়েছিলেন। ছোকরা ইস্কুলে সুভাষ মুখুজ্জে-নীরেন চক্কোত্তির দু-চারটি কবিতা পড়ে থাকলেও কস্মিনকালেও বিনয়-বিষ্ণু-শক্তির নাম শোনেনি। কালিদাস রায়-জসীমউদ্দিন-সত্যেন দত্তের কবিতায় ছন্দের চালচলনে এখনো সে মোহমুগ্ধ। একটি পয়ারপদ্যও লেখা শুরু করেছিল তার শেষকালের জীবন নিয়ে – কিন্তু প্রথম পংক্তির শেষে ‘একানড়ে’ শব্দটি বসিয়ে ফেলতেই সেই কবিতা আর একঘুণও এগোয়নি। তাই দাঁড়ি-কমা-পূর্ণচ্ছেদ-সর্বোপরি ছন্দবিযুক্ত ত্রৈলঙ্গের কবিতা ফ্যারাও কতটা হৃদয়ঙ্গম করেছিল বলা মুশকিল, তবে বারংবার বলেছিল, ‘তোমার কবিতার যা আড়বহর দেখলাম হে, তাতে মনে হচ্ছে না তুমি এইখানে টিঁকবার মানুষ। এইটা তোমার জায়গা নয়, তুমি এইখানে পড়ে থেকো না।তোমার কর্মভূমিতে ফিরে যাও।’ সে নিজে অবিশ্যি মহানগরীতে বসত গড়তে চায়নি। ‘তালখেজুরের বাতাস না খেলে আমার আবার চোঁয়াচোঁয়া ঢেকুর ওঠে’ – এই বলে সে ত্রৈলঙ্গের কলকাতা অভিযানের আহ্বান এড়িয়ে গিয়েছিল।

সেদিন একানড়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আপন ভিটের পশ্চিমদিকের ল্যাঙটো বেলগাছটার ডালে গিয়ে বসেছিলেন ত্রৈলঙ্গ রায়। বেলগাছটার পিছনেই সূর্যটা বিস্তর গড়িমসি করে অস্ত গিয়েছে একটু আগে, সন্ধেটা বেড়ে জমকালো হয়েছে আজ। সেই বুনোহাতিটার মোক্ষম পদাঘাতটি খাবার পর থেকেই দিনেরবেলাটা একটু অস্বস্তিকর ঠেকে, গতরখেকোর মতো দশা হয়, চোখের ‘ওয়াট’ও খানিক কমে যায় যেন। অবিশ্যি আঁধার নামতে না-নামতেই ক্রিয়েন্দ্রিয়–জ্ঞানেন্দ্রিয়-বহিরিন্দ্রিয় একসঙ্গে সব চৌকস হয়ে ওঠে – অন্তরিন্দ্রিয়ও আবার চনমনে হয়ে যায়। অথচ এই ত্রৈলঙ্গই ছোটোবেলায় অন্ধকারকে কী ভয়টাই না পেতেন, সন্ধে হতে না-হতেই সেঁধিয়ে যেতেন মায়ের আঁচলে! আর ওই বেলগাছটার দিকে তো তাকাবার হিম্মতটুকুও হত না। ঠাকুমা বলত, ‘ভাইটি, বুড়োগাছটার ঘাড়ে থাকে বেম্মদত্যি, সন্ধে হলেই দ্যাখোনি ওদের চোখ কেমন জ্বলে-নেভে! ভুলেও তাকিয়ো না ওইদিকে।’

ঠাকুমা কথাটা আপন বিশ্বাস থেকে বলত নাকি ভয় পাওয়ানোই মূল উদ্দেশ্য ছিল, এখন আর ঠাহর করতে পারলেন না ত্রৈলঙ্গ। আজ তিনি নিজেই সাক্ষাৎ বেম্মদত্যি – দু’পাশের ক্যানাইন দন্ত দু’টি একটু বেশিই ছুঁচলো আর লম্বাটে, কর্ণলতি অনাবশ্যক দীর্ঘায়িত আর খাঁজকাটা – ঠাকুমা তাঁর দর্শন পেলে নিশ্চয় ভির্মি খাবে! আর তাঁর মা, মা কি আর ডেকে বলবে ‘ভালো ছিলি তো, খোকা?’ তাঁর বাবা তো ভূত-পেরেত-ব্রহ্মদত্যির অস্তিত্বে কোনোদিন বিশ্বাসই করেননি! অথচ তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই কীরকম যেন হয়ে গিয়েছেন বাবা, সারাক্ষণ ‘নিত্যকর্ম পদ্ধতি’টা বাগিয়ে বসে থাকেন, শেষজীবনটা মনে হয় পুজো-আচ্চা করেই কাটাবেন বাবা। ভাবতেই অবাক লাগে ত্রৈলঙ্গের – এই মানুষটাই সাতের দশকে লেনিনবাদের পাঠ নিয়েছিলেন – অনেক আগে বাবার একটা ভাঙাচোরা তোরঙ্গে ত্রৈলঙ্গ আবিষ্কার করেছিলেন মাওয়ের রেড-বুক!

এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ত্রৈলঙ্গ বেলগাছের ডালে বসে দোল খেতে লাগলেন। ইতিমধ্যেই তিনি মনস্থির করে ফেলেছেন কলকাতায় ফিরে যাবেন। পাঁচ নম্বর কিম্পুরুষ লেনের আস্তানাটা তো আছেই – সেখানেই আবার ঘাঁটি গাড়বেন। বাড়িওলা, পাড়াপড়শি, মেস-সঙ্গী, সন্ন্যেসি – কাউকেও টের পেতে দেবেন না তাঁর বিদেহী উপস্থিতি। নিশ্চুপে মহানগরীর দিকবিদিক্‌ চরকি কেটে বেড়াবেন – কাউকে বিরক্ত করবেন না। মা-বাপকে দেখবার ইচ্ছে হলে মাসে একবার করে আসবেন না-হয়,যেমনটি তিনি করতেন ইহজীবনে। অবিশ্যি শুধুই দেখবেন, দেখা আর হবে না, দেখা দিয়ে হুলুস্থুল বাধাতে চান না ত্রৈলঙ্গ।

‘একদিন আমায় শালডাঙা ইস্কুলে নিয়ে যাবি, ভাইপো? আমি কখনো ইস্কুল দেখিনি।’

বিভোর হয়েছিলেন, খোকাজ্যাঠামশাই কখন পাশটিতে এসে বসেছেন অ্যাতোক্ষণ টের পাননি।

‘ইস্কুলে? ইস্কুলে তো কানমলা দেয় মাস্টাররা, তুমি ইস্কুলে যাবে। অ্যাতোদিন যাওনি যখন, ওই ঝক্কি নিয়ে আর কী লাভ?’ ত্রৈলঙ্গ বললেন।

‘আমার ফিটের ব্যামো ছিল তো, মা কিছুতেই কোল-ছাড়া করতে চাইত না, তাই… । তা বলছিস যখন থাক, থাক।’

রামকিংকর একটু ভয় পেলেন মনে হল। রামরাম রায়ের অত্যন্ত আদরের সন্তান, কানমলার নামে ভীতি হওয়াই স্বাভাবিক। বললেন, ‘তুই ভাইপো তাহলে একদিন আমায় কারখানা দেখাতে নিয়ে যাস। ওই দূরে দামোদরের ওপারে কারখানার চিমনি – আগে কেমন ধোঁয়া উড়ত, সাইরেন বাজত। বাবা রোজ নদী পেরিয়ে যেত কারখানায়। আমি বায়না করতাম, কিন্তু সঙ্গে নিয়ে যেত না কোনো দিন। তুই আমায় নিয়ে যাবি একদিন।’

‘সে কারখানা কবে বন্ধ হয়ে গেছে জ্যাঠা – ও আর নেই। তোমায় আমি বরং কেরেঙগাড়ি চালান শিখিয়ে দেব।’

‘বন্ধ হয়ে গেল! আর খুলবে না?’

ত্রৈলঙ্গ মালিক-শ্রমিক-ইউনিয়ন-মুনফা-উদ্বৃত্তমূল্য ইত্যাদি নিয়ে একটা জ্ঞানগর্ভ বক্তিমে আউড়াতে যাচ্ছিলেন – কিন্তু জ্যাঠামশাই-এর বয়েসটার কথা ভেবে চুপ করে গেলেন। এই খোকাপ্রেতটির কথা ভেবেই খানিক চিন্তা হয় ত্রৈলঙ্গের – চতুর্দিকে অ্যাতো প্রলোভন, অ্যাতো লারেলাপ্পামি, বদসঙ্গে পড়ে জ্যাঠাটা শেষে উচ্ছন্নে না-যায়! ইতিমধ্যেই ধেড়ে কিছু প্রেতের সঙ্গে ওঁর মিতালি হয়েছে, কিছু ইতর শব্দও আয়ত্ব করেছেন। ত্রৈলঙ্গ লক্ষ করেছেন ব্যাপারটা, জ্যাঠাকে আকারে-ইঙ্গিতে নিষেধও করেছেন। কিন্তু কতদিন আর তিনি ওঁকে আগলে আগলে রাখবেন, কতদিন! ওঁকে পাহারা দিতে গেলে তো ত্রৈলঙ্গকে বেবাক মরণকাল এখানেই পড়ে থাকতে হবে – জ্যাঠামশাই তো বরাবর দশমবর্ষীয়ই রয়ে যাবেন!

যাই হোক, আজ কালসন্ধেয় যে সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন সেটি জ্যাঠামশাইকে জানানো দরকার বলেই মনে হল ত্রৈলঙ্গের। বয়সে বড়ো না-হোন, সম্মানে তো তিনি ত্রৈলঙ্গের বাবারও ওপরে।

‘জ্যাঠা, আমি আর গাঁয়ে থাকব না।’ সহজ গলায় বললেন ত্রৈলঙ্গ।

‘গাঁয়ে থাকবি না, ভাইপো? মামাবাড়ি যাবি? তোর মামাবাড়িতে ভালো নিখুতি পাওয়া যায়?’

‘মামাবাড়ি না জ্যাঠা, আমি কলকাতা চলে যাব।’

‘কলকাতা!’ কথাটা শুনে রামকিংকর কিঞ্চিৎ উদাস হয়ে গেলেন গেলেন। মা-বাপের স্নেহ-ভালোবাসা বস্তুটি কী ভালো করে বোঝার আগেই ধরা থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছিলেন। বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছিল অনেক পরে – বেশিদিন ছিল না, একদিন এক ভীষণদর্শন পেয়াদা এসে ধরে নিয়ে গেল বাবাকে। আরও কিছু আত্মীয়স্বজন ছিল কিছুদিন আগে অব্দি – তারাও এখন আর চোখে পড়ে না। কতদিন পর ভাইপোটা এল, এখন সেও কলকাতা না কোথায় চলে যাবে বলছে।

‘কলকাতা কোথায় রে, ভাইপো?’

‘বেশি দূরে না জ্যাঠামশাই – এই আসানসোল পেরিয়েই-’

‘আমি কখনো যাইনি রে। ওখানে কী পাওয়া যায়?’

‘বন্ধু-বন্ধু আছে অনেক। এখানে বন্ধু-বান্ধব নেই, বড়ো ফাঁকা ফাঁকা লাগে।’

‘আমি তো আছি? রোজ দু-বেলা খেলি তোর সঙ্গে। তুই চলে গেলে আমি কার সঙ্গে কিত্‌কিত্‌ খেলব!’ রামকিংকর করুণমুখে বললেন ত্রৈলঙ্গকে।

এই বালবেম্মকে কী করে বোঝান ত্রৈলঙ্গ! প্রাপ্তমনস্ক মনের চাহিদা একটি দশমবর্ষীয় বালককে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন তিনি!

‘তাছাড়া আমায় যে আপিসে যেতে হবে, খু-উ-ব কাজ যে। ম্যানেজারটা অ্যাতো ঠ্যাঁটা না! ছুটি দিতে চায় না।’ ছেলেভুলানো নির্জলা মিথ্যে বলেন ত্রৈলঙ্গ।

‘‘ম্যানেজার’! ‘ম্যানেজার’ কী রে ভাইপো?’’ অবাক হয়ে শুধান রামকিংকর।

‘ম্যানেজার – আপিসের উপরওলা গো, জ্যাঠা।’

‘ও।’ রামকিংকর হৃদয়ঙ্গম করেন বলে মনে হয়। ‘বাবারও উপরওলা ছিল, জানিস। খুব দুষ্টু, বাবাকে খুব খাটাত। তোকেও খাটায়?’

‘হ্যাঁ, খু-উ-ব।’

‘দাঁ-ড়া- ভাইপো, একদিন আচ্ছাসে ঘাড় মটকে দেব। তারপর মুণ্ডুটা চিবিয়ে ঝাঁঝরা করে দেব!’ বিড়বিড় করতে থাকেন রামকিংকর, আক্রোশে হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে ফেলেন। একরত্তি এই বালবেম্মর মুখ থেকে হিংসাত্মক কথাবার্তা শুনে ত্রৈলঙ্গ বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন – অসৎসঙ্গ না যুগধর্ম!

এরপর আর সাতপাঁচ ভাবেন না ত্রৈলঙ্গ। ট্রোপোস্ফিয়ারে চারটে চরকিপাক মেরে গা গরম করে নেন, জ্যাঠামশাইয়ের পদস্পর্শ করেন, আপন ভিটের দিকে তাকিয়ে বাস্তুপুরুষকে নমস্কার করেন, তারপর হুশশ্‌ করে সটান পুব দিকে উড়ে যান।

উড়তে গিয়ে চড়াৎ করে চটকাটা ভেঙে যায় ত্রৈলঙ্গ রায়ের, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান, কয়েক মুহূর্তের জন্য ইতিকর্তব্য বিস্মৃত হয়ে পড়েন। আসলে জন্মের পর প্রথম প্রথম ধাতস্থ হতে সময় লাগে, কয়েকদিন লাগে রপ্ত হতে। কয়েক মুহূর্তেরই ব্যাপার, ত্রৈলঙ্গ রায়ের আবার সব মনে পড়ে যায়, নবজাতকের সনাতন ধর্ম মেনে ভয়ানক শোরগোল জুড়ে দেন।

বোষ্টুম চাটুজ্জ্যে মক্কেলের একটি উদ্ভট আবদারকে ‘প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ’ দিয়ে বশে আনবার চেষ্টায় মগ্ন ছিলেন অ্যাতোক্ষণ, ল্যাপটপ আঁকড়ে ছত্রখান হয়ে পড়েছিলেন। ছেলের চিতকার শুনে দুদ্দাড় লাফিয়ে উঠলেন, সর্বমঙ্গলাও ছুটে এলেন রসুইখানা থেকে।

ভাঁড়সুলভ হরেক মুখব্যাদান করে, গরু-শূকর-ফেউ-এর ডাক ডেকে ছেলে ভুলানোর চেষ্টা করলেন বোষ্টুম, সর্বমঙ্গলা ঘুমপাড়ানি গান গাইলেন, কোলে নিয়ে সাঁওতালী ও ছৌনৃত্য করলেন– কিন্তু অষ্টমঙ্গল কিছুতেই বাগ মানল না। শ্রীত্রৈলঙ্গ রায়- অর্থাত্‌ বোষ্টুম আর সর্বমঙ্গলার নবজাতক সন্তান অষ্টমঙ্গল চাটুজ্জ্যে (‘বোষ্টুম’-এর ‘ষ্ট’ আর সর্বমঙ্গলার ‘মঙ্গল’ খুবলে নিয়ে ‘অষ্টমঙ্গল’ নামটির সংশ্লেষ করেছেন বোষ্টুমের পিতৃদেব) এসবে বরং বেশ বিরক্ত করলেন। গলা তাঁর শুকিয়ে ধু ধু হয়ে গিয়েছে, এখন তাঁর দরকার এক ‘সিপ’ ঠান্ডা দুদু। তাছাড়া ভয় আর আতঙ্কের চোটে বেমক্কা গুহ্যকম্মগুলিও হয়ে গিয়েছে– কোমরের বিজাতীয় লেঙটিটি ফুলে ঢোল, একটুআধটু লীকও হয়েছে! এই সাধারণ ব্যাপারটা অকালকুষ্মান্ড বাপ-মা মিলে ঠাউরাতে পারল না এখনো!

ত্রৈলঙ্গের কান্নার বেগ যতই বাড়তে লাগল, ততই বোষ্টুমের হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে লাগল। যেদিন থেকে সর্বমঙ্গলার গর্ভ বেয়ে এই একরত্তি মাথাটি উঁকি দিয়েছে– সেদিন থেকে মহাফাঁপরে পড়েছেন বোষ্টুম। কোন সাহসে যে তখন পাঁচমাসের পোয়াতি স্ত্রীকে নিয়ে মার্কিনমুল্লুকে-এ পাড়ি জমিয়েছিলেন, কোন মোহের বশে- এখন ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয় বোষ্টুমের। তখন যদি কিঞ্চিত্‌ আন্দাজ করতে পারতেন যে স্ত্রীর গর্ভদশা কাটার পরেই আসল গর্ভযন্ত্রণার শুরু, এই হঠকারিতা করতেন না বিলক্ষণ। তাতে হয়তো সর্বমঙ্গলার তলপেট দ্বিধা হত- হতভাগা দেশের ডাক্তাররা কাঁচি চালাতই, অষ্টমঙ্গলের পাসপোর্টে হয়তো লেখা থাকত না “উই দ্য পিপল্‌”– কিন্তু অ্যাতো হ্যাঙ্গাম তো পোয়াতে হতো না। ছেলেভুলানোর এই জটিল-গণিত কষতে চূড়ান্ত ব্যর্থ তিনি। অবিশ্যি তিনি ব্যর্থ হলেও সর্বমঙ্গলা হাল ছাড়ছেন না সহজে, রাঢ়বঙ্গের লড়াকু মহিলা সর্বমঙ্গলা।

ওই তো, এতক্ষণে অষ্টমঙ্গল চোঁ চোঁ করে সর্বমঙ্গলার বুকের রস টেনে নিচ্ছে, কান্নাও বেশ স্তিমিত হয়েছে।

ওই যে সর্বমঙ্গলা এবার যত্ন করে অষ্টমঙ্গলকে শুইয়ে দিলেন ‘রকিং স্লীপার’-এ। অষ্টমঙ্গল ওরফে ত্রৈলঙ্গ রায় পূর্বকৃত কর্মকাণ্ডে বুঁদ হয়ে গেলেন আবার, ঘুমের ঘোরেই।

(ক্রমশ…)

 

 
 
top