মোহনা

 

কে ডাকো? সেই মেঘের আওয়াজ যেন। বন্ধ কুটীরের ভেতর থেকে।

মি

কে আমিচিনিনে

মি মোহনা

কোন নদীর মোহনাজানিনে

মি বিনি বিনি মোহনার ডাক নাম এই ডাক নামেই প্রথম পরিচয় দিয়েছিল তান্ত্রিককে।

বিনি সুতোয় মালা গাঁথা হয়না হে যুবুতীদরজার আগল খুলে সামনে দাঁড়িয়ে সেই দীর্ঘদেহী। আজ রক্তবর্ণ কাপড় জড়ানো, চোখ লাল। ভোরের আলো সোজা পড়েছে তাঁর মুখে।

মি এসেছিলাম গতমাসে, দিঘির পাড়ে আপনার সঙ্গে দেখা হয়। আমি কলকাতায় থাকি

কেন এসেছো?

পনি যে বলেছিলেন মোহনার দিকে যাও। কেন বলেছিলেন? কোথায় মোহনা? কোন সে পথ? পথ নির্দেশ দিন আমায়

হা হা করে অট্টহাসি সেই দীর্ঘদেহীর। ফিরে যাও হে যুবুতী আর এসো না, সর্বনাশ হবে। আমি তোমার পথ-নির্দেশক নই

ব্যাকুল হয় মোহনা। হতাশ হয় মোহনা। দীর্ঘদেহী কাছে এসে কাঁধে হাত রাখেন। বলেন, যুবুতী হলে কবে হে নারী? সেদিন কোন সে পুরুষ তোমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলচমকে ওঠে মোহনা, শিউরে ওঠে। উনি কি সর্বজ্ঞ?

জানিনা? কে তিনি?

মূর্খ। সে প্রবাহ, সে জীবন, যুবুতী জীবন চেন না যাও ফিরে যাও। গতি আছে প্রবল। বয়ে চল। যাও এখান থেকে

দি বাধা আসে? যদি শক্তি হারিয়ে যায়? যদি থেমে যাই? মোহনার উৎকণ্ঠিত জিজ্ঞাসা।

ক টুকরো কালো মেঘ ধেয়ে আসছে

আকাশের দিকে তাকায় মোহনা স্বচ্ছ নীল ভোরের আকাশ। কোথাও মেঘ নেই।

ব তছনছ হবে। যাও হে যুবুতী মোহনার দিকে যাও দীর্ঘদেহী কুটীরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

ঘড়ির দিকে তাকায় মোহনা। সাতটা পনেরর ট্রেনটা পেয়ে যাবে। মার মামাবাড়িতে আর দেখা করতে যাবে না। ট্রেনে উঠে একটা ফোন করে জানিয়ে দেবে।

প্যাসেঞ্জার ট্রেন। ভিড়। সবজীওয়ালি চাচী, নানীরা চলেছে কলকাতার দিকে। সবজীর বড় বড় বস্তা তুলছে টেনে টেনে। লেডিস কম্পার্টমেন্টে কোনও রকমে ওঠে মোহনা। সুস্থির হয়ে বসে। প্যাসেঞ্জার ট্রেনের ঝাঁকুনিতে আর সবজীওয়ালিদের কলকলানিতে ঝিমিয়ে পড়ে মোহনা। তন্দ্রা নেমে আসে চোখে। ভুলে যায় মার মামাবাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দেবার কথা। চৈত মাসের গরম রে বিটি, এখুন সকালবেলাখানে একটুক জিরিয়ে নাও এক সবজীওয়ালি সস্নেহে বলে ওকে। চৈত্র মাস এটা। মনে পড়ে মোহনার। ওর মামাবাড়ি এলাকার কাটিগঙ্গা থেকে চৈত্র সংক্রান্তিতে কালী ওঠেন, যখন মানুষ জেগে থাকতে থাকতে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয় ঠিক তখন। ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন ছিন্নগঙ্গা বক্ষ থেকে কালী উঠে আসেন। পাশেই জাগ্রত এক কালী মন্দিরের মূর্তিতে অধিষ্ঠান নেন। প্রচলিত কথা। প্রচলিত কাহিনি।

তন্দ্রাচ্ছন্ন মোহনার কানে যেন চৈত্রসংক্রান্তির চড়ক মেলার ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসে। খুব ভোরে কালী ভক্তরা খাঁড়া হাতে কালীর মুখোশ পড়ে কালী সেজে নগর পরিক্রমায় বেরোত। ছোট্ট মোহনার খুব ভয় করত বাচ্চাবেলায়। শক্ত করে চেপে ধরে থাকত ওর বাবার হাত। কালীবাড়ির পুরোহিত সেই কালী সাজের নৃত্যরত মানুষগুলোকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতেনঢাকের এক অদ্ভুত বোল। চড়কের ঢাক অন্য এক বোল তোলে যা সারা বছর কখনও বাজাতে শোনেনি মোহনা। ছোটো থেকে বড় হয় মোহনা। তবু চড়কের ঢাকের এই সর্বনাশা বোল শুনলে ওর আতঙ্ক হয় যেন। বড় একটা ঝাঁকুনিতে তন্দ্রা ভাঙ্গে মোহনার। ট্রেন হঠাৎ মাঝ পথে দাঁড়িয়ে পড়েছে। উল্টোদিক থেকে মালগাড়ি আসছে । ক্রসিং হবে ।

ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে মোহনা। মার মামাবাড়িতে ফোন করতে ভুলে গিয়েছিল। অজস্র মিসকল। কী হল? সপ্তর্ষির কোনো মিসকল নেই। ওর বাবার কোনো মিসকল নেই। কি হল? অধিকাংশ সপ্তর্ষির বন্ধুদের। কিছু ওর আত্মীয়দের যাদের সঙ্গে মোহনার তেমন কোনো যোগাযোগ নেই। সপ্তর্ষির বন্ধু অনির্বানদাকে ফোন করে ও। অনির্বানের বউ রিনা ধরে। অন্যরকম অদ্ভুত এক কান্নাভেজা কণ্ঠস্বর যেন রিনার। জিজ্ঞেস করে, মোহনা তুমি কত দূরে? কোন স্টেশন? নাম বল

কী হয়েছে?

হ নামটা বল স্টেশনের ধমকে ওঠে রিনা।

বেথুয়াডহরি ঢুকছে

নেমে পড় ওখানে

মানে?

নেমে পড়, খুব জরুরী ফোন কেটে দেয় রিনা।

ট্রেন বেথুয়াডহরি ঢুকছে। মোহনা নেমে পড়ে। অস্থির হয়ে পায়চারি করতে থাকে প্ল্যাটফর্মে। অস্থির হয়ে ফোন করে অনেককে। কেউ ফোন তুলছে না। সপ্তর্ষিকে কতবার ফোন করল। সপ্তর্ষি গেছে মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ন। কী এক ডকুমেন্টারি তৈরীর কাজে। শশাঙ্ক, বঙ্গের শেষ স্বাধীন হিন্দু রাজা। কী সব গল্প বলছিল একদিন সপ্তর্ষি। কিচ্ছু আর মনে পড়ছে না মোহনার। অস্থির হতে থাকে। দুজন লোক এগিয়ে আসে, একজন অনির্বানদার অফিসের কলিগ, আগে দেখেছে মোহনা।

পনি মোহনা? জিজ্ঞাসা করে।

মাথা নাড়ে মোহনা। কী হয়েছে?

লুন, অনির্বানদা গাড়ি পাঠিয়েছে। আপনাকে আপনার বাপের বাড়ি যেতে হবে

মানে? বাবার কি হয়েছে?

কিছু হয়নি, চলুন

ও ঘোরের মাথায় গাড়িতে গিয়ে বসে। কিছু ভাবতে পারছে না। স্নায়ু অবশ হয়ে আসছে। কখন যেন প্রায় অচৈতন্য হয়ে যায়। গাড়ি জোরে ব্রেক কষে। মোহনার চেতনা ফেরে। ওর বাপের বাড়ির সামনে ভিড়। সকলের মুখে আঁচল চাপা। রুমাল চাপা। মোহনার হাত-পা অবশ। অনির্বানদা এগিয়ে আসে। ধরে ধরে নামায় গাড়ি থেকে।

মোহনা জিজ্ঞেস করে, বাবা?

অনির্বান বলে, রে চল

বাড়ি ঢুকে দেখে মা অজ্ঞান। আত্মীয়রা সকলে ওর দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিচ্ছে। ওকে যেন কেউ দেখতে পাচ্ছে না। বসার ঘরে ঢোকে মোহনা। ওর বাবা ইজিচেয়ারে চোখ বুজে শুয়ে। সপ্তর্ষি? সপ্তর্ষি কোথায়? কোথাও নেই। অনির্বানদা খুব ঠান্ডা গলায় বলে, মোহনাসপ্তর্ষির অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে কর্ণসুবর্নতে। ও আর নেই বলে বাইরে বেরিয়ে যায় অনির্বান। সপ্তর্ষি নেই। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে মোহনা। একা, চুপ, স্তব্ধ, পাথর কেটে গড়া নিষ্প্রাণ মূর্তিটি। মুখে কোনো ছাপ নেই। ভয়, বিষাদ, কান্না, যন্ত্রনা, শোক, উন্মাদনা কিছু নেই। পাথরের মূর্তিটি। চড়কের বাজনা বাজছে যেন দূরে। সিধা তুলতে বেরিয়েছে ওরা। চড়কের ঢাকের বোল মোহনার কানে ভেসে আসছে। কাটিগঙ্গা থেকে কালী উঠবে চৈত্র সংক্রান্তি ভোরে। ঘরের মাঝখানে স্থির মোহনা। কানে বাজছে চড়কের বোল,সর্বনাশের বোল

 
 
top