ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

ড়োবাবু খবরটা শুনেছেন?

পুলিশের লোকেরা মদ খায় না এমন একটা দেখা যায় না। কিন্তু এই থানার বড়োবাবু সত্যিই কোন নেশা করেন না। তবে তাঁর শিবনেত্র, চোখ দুটো সবসময় আরক্ত থাকে। এই সাব-ইনস্পেক্টর ছেলেটা নতুন ঢুকেছে। এমনিতে খুব কাজের, কিন্তু মাঝে মাঝে ফাজলামি করে ফেলে। খুনের আসামি লকআপে আছে বলে বড়োবাবুর কোয়ার্টারে যাওয়া হয়নি। শ্রীনিবাসবাবু সক্কালবেলা হলেই কোর্টে নিয়ে যাবে। ঘুম পাচ্ছে বিস্তর আর তিনি বোধহয় ঘুমিয়েও পড়েছিলেন। থানার লকআপে থাকা ছিঁচকে চোরেরা প্রায়ই দারোগাবাবুর নাসিকা গর্জন শুনে থাকে। ঘুমের চটকা ভেঙে আরো আরক্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন দারোগাবাবু। 

জি প্লটে কুমির কেটেছে একটা জোয়ান বউকে

কুমির কাটবে কীরে, শালা! কাটে তো সাপ বা লতায়

রি, স্যার। কুমির ডাঙায় মানে চরায় তুলে এনে খেয়েছে বউটাকে। 

সেকী রে! জি প্লটে কুমির রয়েছে!

ঘুম এবার পুরোপুরি ভেঙে গেছে দারোগাবাবুর। এখন তিনি পাথরপ্রতিমার দায়িত্বেও রয়েছেন। 

সকালবেলা খুনি আসামী আর রাতে আই প্লটে হাতিরশুঁড়ে কুমির খেল এক জ্যান্ত নারীকে। এইসময় এরকম ঘটনা হয়। কারণ দখিনা বাতাস। দখিনা বাতাসের দরুণ বঙ্গোপসাগরে যে ঢেউ সৃষ্টি হয় তার জোয়ার অনেকটা চলে আসে ঠাকুরাণ, গোবাদিয়া, সপ্তমুখী প্রভৃতি নদীতে। শান্ত নদী তখন অশান্ত হয়ে ওঠে। কুমির দখিনা বাতাসের মুখোমুখি হতে পারে না। সে খোঁজে শান্ত নদী আর খাদ্যের সন্ধানে তটভূমির নিকটবর্তী ঝোরায় মাছ, কাঁকড়া ইত্যাদি। মেয়েটি বোধহয় হাতিরশুঁড়ের কোনো ঝোরায় মাছ ধরতে এসেছিল। এছাড়াও সুন্দরবনের নর-নারী আর কুমিরের প্রিয় খাদ্য মীন। এখানকার মানুষেরা বলে বাগদা চিংড়ির চারা। শুধু খাদ্য বলে নয়, মানুষের জীবিকার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে, মাছের ছালা, ঝোরার কাঁকড়া আর মীন।

হাতিরশুঁড়ে হয়েছে মানে আই প্লটে হাই তুলতে তুলতে বললেন দারোগাবাবু। 

তরুণ আধিকারিকের এবার অবাক হওয়ার পালা। স্যা, আপনি জানলেন কী করে?

খিনা বাতাসের উৎপাতে এসব ঘটনা চৈত্র-বৈশাখ মাসে হয়ে থাকে

মি কি যাব, স্যার?

থানায় কেউ এসেছে

শরীরের ওপরের অংশের ওজন ক্রমশ বাড়ছে। ফলে যাবতীয় চাপ গিয়ে পড়েছে বেচারি পা দুটোর ওপর। ফলে হাঁটু-ব্যথা, পা ফুলে যাওয়া এসব নিরন্তর হচ্ছে। প্রতিদিনই ব্যায়াম করার কথা ভেবেও শেষ অবধি কিছু হয় না।

রে এসো তবে। 

এইটুকু বলে কোয়ার্টারে চলে গেলেন দারোগাবাবু। রাত প্রায় শেষের পথে। 

ভোরবেলা শ্রীনিবাস কনস্টেবল চলে এসেছেন। কুসুমের লকআপে ঢোকার সময় দুটো বিস্কুট আর চাও নিয়ে এসেছেন। চা আর বিস্কুট দুটো হাতে দিয়ে তিনি আরও একটা জিনিস কুসুমের হাতে দিলেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের ছবি। তারপর বললেন, মা, পতিঘাতিনী হয়েছিস ভাগ্যের দোষে। কিন্তু এখন তোকে ঠাকুরকে দিলাম। তিনি এখন তোর স্বামী। ইনি মদও খান না, মারেনও না। সব কথা ইনাকে বলবি। তিনি তোর যাবতীয় পাপ নীলকণ্ঠে ধারণ করবেন। 

শ্রীনিবাস কনস্টেবলকে প্রণাম করল কুসুম। এবার সে খুব কাঁদল। শ্রীনিবাস কনস্টেবলের উর্দি কুসুমের চোখের জলে ভিজে গেল।

 

সরকারি উকিল মৃগাঙ্ক দত্ত ফুল কোর্ট হয়ে যাওয়াতে এসিজেএম সাহেবের চেম্বারে এসেছেন। সাহেব সুরসিক এবং বিচারক হিসেবে তাঁর রায়ে সবসময় মানবতাকে প্রাধান্য দেন। এমনিতে সরকারি দেওয়ানি মামলায় পয়সা নেই। তাছাড়াও সেই বরাদ্দকৃত মজুরি পেতে কালঘাম ছুটে যায়। জিপি সাহেব, পিপি সাহেব নির্দিষ্ট করে পেয়ে থাকেন। তাঁদের মাস মাইনেও রয়েছে। কিন্তু বাকি অধস্তনদের করুণ অবস্থা। তাই মৃগাঙ্ক দত্ত ফৌজদারি মামলা করেন। সেখানে তিনি সরকারপক্ষের কেউ নন। জটিল খুনের মামলায় কেউ মৃগাঙ্ক দত্তের কাছে ভিড় করে না, কেউ আসে না। সচরাচর ছিঁচকে ঘটনার জামিনপ্রার্থী আসামিরা তাঁর কাছে ভিড় করে। 

এখন মৃগাঙ্ক দত্তের কাছে দুটো খুনের মামলার ক্লায়েন্ট এসেছে। ক্লায়েন্ট মানে খয়াটে মার্কা এক বাউল আর একজন দুঃস্থা স্ত্রী। পয়সা তেমন কিছু আসবে না। তবে এই মামলার কারণে প্রেস তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। মৃগাঙ্ক দত্তের বয়স বিয়াল্লিশ, মাথাজোড়া টাক, পুরু গোঁফ রয়েছে। খয়াটে, গরিব খদ্দেরের দল তাঁর ঘরে ধর্না দিয়ে বসে রয়েছে। এই দৃশ্য খুব বিরল। ওঁর ওকালতি জীবনের এই দুটো মামলা যে এক নতুন মোড়, এই ভেবে মৃগাঙ্ক দত্ত ভিতরে ভিতরে বেশ রোমাঞ্চিত হচ্ছেন।

এসিজেএম সাহেব চেয়ারে বসেই চায়ের অর্ডার দিলেন। সচরাচর এমনটা ঘটে না। মৃগাঙ্ক দত্তের আগমনে কোথাও কোনো সাড়া পড়ে না। তাঁর চেয়ে বয়সে জুনিয়রেরা এই অবসর সময়ে এসিজেএম সাহেবের ঘর আলোকিত করে থাকেন। বিপুল কর বার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি, কস্মিনকালেও মৃগাঙ্ক দত্তের মতন সিনিয়র দাদাকে পাত্তা দিতেন না। আজ বসার জন্য চেয়ার এগিয়ে দিলেন। বিপুল করই বললেন, স্যার, মৃগাঙ্কদার পিছনে এখন যাবতীয় মিডিয়ার ভিড়। 

এসিজেএম সবটাই জানেন কারণ তাঁর এজলাসেই মামলা দুটো উঠবে। তবুও তিনি মুচকি হেসে বললেন, কী ব্যাপার, মৃগাঙ্ক, বিপুল এসব কী বলছে?  

বাড়িতে ওঁর স্ত্রী সুধাও অবাক হয়ে গিয়েছেন। এমন দুটো খুনের মামলা এবং যা সমাজের চোখে অতি ঘৃণ্য, মৃগাঙ্ক নিলেন কী করে! বিশেষ করে পতিঘাতিনী মেয়েমানুষটির প্রতি সুধা তীব্র ঘৃণা পোষন করেন। এরা সব পাবলিক ওম্যান। তাছাড়া মক্কেলের পয়সাও নেই। তবে কেন মৃগাঙ্কর এই অধঃপতন!

ই হে, মৃগাঙ্ক, কিছু বলো এসিজেএম সাহেব অন্যমনস্কভাবে বললেন।

বিপুল, বাবা ছেলেকে মার্ডার করেছে, সেই কেসটা তুমি নাও। অন্যটা আমি নিচ্ছি

বিপুল কর মুখ ফসকে বলে ফেললেন, মৃগাঙ্কদা তুমি ভেবে বলছ! পরকীয়ার জন্য স্বামীকে খুন। আমরা নিলে কেউ কিছু বলত না। কিন্তু এই শহরে তোমার অন্যরকম সুনাম রয়েছে

মৃগাঙ্ক দত্তর কাছে কেঁদেকেটে পড়েছে শ্রীনিবাস কনস্টেবল। বাউল ছোকরাকে শ্রীনিবাসই নিয়ে এসেছিল মৃগাঙ্কর কাছে। শাস্তি হবেই। লোয়ার কোর্টে যাব্বজীবন দেবেই। তবুও শ্রীনিবাসের কাছ থেকে কিছুটা শোনার পর কেমন রোখ চেপে গেছে মৃগাঙ্ক দত্তের। 

বিপুল আমি মনস্থির করে ফেলেছি। 

এসিজেএম সাহেব একটা আইনের বই এগিয়ে দিলেন, পিপি সাহেব নিজে থাকবেন

বিপুল কর যোগ করলেন, হি ইজ পিউরিট্যান অ্যান্ড অর্থোডক্স

কিছুই যেন শুনছেন না মৃগাঙ্ক দত্ত। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছেন। 

বাকি মামলাটা শুনবে, বিপুল? পরিস্থিতিকে অগ্রাহ্য করে বললেন মৃগাঙ্ক। 

মি কিছুটা জানি দাদা। ছেলেটা অসম্ভব বদ ছিল। জাল নোটের ব্যাবসা করে ধরাও পড়েছিল। অসম্ভব নির্যাতন করত বাবা-মাকে। 

এসিজেএম সাহেব বললেন, ক্সট্রিম প্রোভোকেশন। 

মৃগাঙ্ক দত্ত হঠাৎ বলে উঠলেন, মেয়েটির ক্ষেত্রেও এক্সট্রিম প্রোভোকেশন ছিল

সংযত হলেন এসিজেএম সাহেব। কোর্টের বাইরে প্রভাবিত হতে চাইছিলেন না তিনি। 

(ক্রমশ…)

 
 
top