বঙ্কিম

 

রঙ্গমঞ্চে উপস্থিত অজ্ঞাতকুলশীল যুবক কর্ণকে সুতপুত্র বলে মদগর্বে গর্বিত ভীমসেন যখন পরিহাস করেছিলেন কেউই ভাবেননি কালক্রমে এই যুবক শস্ত্রবিদ্যায় কুরুবংশের প্রিয়পুত্র অর্জুনের সমকক্ষই হবেন না, তাঁকে অতিক্রমও করবেন। উনবিংশ শতাব্দীর বাংলার কাব্যজগতের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সব্যসাচী মহাকবি মধুসূদন জনৈক তরুণের মুখে তাঁর কাব্যের সমালোচনা শুনে বিরক্ত বোধ করেছিলেন। জীবিতাবস্থাতেই তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন উত্তরকালে সেই স্পর্ধিত তরুণের বাংলা কথাসাহিত্যের জনক হয়ে ওঠার পথ পরিক্রমণ। বাংলা ভাষাকে অমিত্রাক্ষর ছন্দের সুরধুনীতে যিনি স্নান করিয়েছেন সেই ভগীরথ মধুসূদন দত্ত, তেমনি সেই কাব্যের সুজলা সুফলা বঙ্গভূমিতে গদ্যসাহিত্যের আশ্চর্য সৌধ যে বিশ্বকর্মা রচনা করেছিলেন তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যাঁর লেখনীতে বঙ্কিম নয় পূর্ণচন্দ্রের জ্যোৎস্না বিকশিত হয়েছে, প্রয়াণের পর শতবর্ষ অতিক্রম করেও তাঁর অমর রচনা আমাদের মননে সুখস্পর্শ অনুভূতির সৃষ্টি করে।

মনীষীদের সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়শই একটা ভ্রমে পতিত হই। আমাদের অবচেতন মনে একটা ধারণা জন্মে যায়, তাঁদের ব্যক্তিত্ব বুঝি সহজাত। সেকারণে তাঁদের বাল্যকালের তুচ্ছ ঘটনাকেও জীবনী রচনার ক্ষেত্রে অনর্থক গুরুত্ব দেওয়া হয়। জন স্টুয়ার্ট মিলের তিন বৎসর বয়সে গ্রিক শিক্ষা অথবা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রায় সমবয়সে প্রথম কবিতা রচনা করেন এসব তথ্যের ঐতিহাসিক সত্যতায় নিঃসন্দেহ হওয়া কঠিন। তেমনি বঙ্কিমচন্দ্রের বাল্যজীবনেতিহাসে পাওয়া যায় তিনি পাঠশালার প্রথম দিনে সমুদায় বর্ণমালা আয়ত্ত করেছিলেন। যদি এ তথ্য ঐতিহাসিক হয়েও থাকে, বঙ্কিমচন্দ্রের মনীষার বিকাশে কী সহায়তা করেছে, তা স্পষ্ট নয়। এরূপ মেধাবী ছাত্র বর্তমান যুগে বিরল হলেও অসম্ভব নয়। কিন্তু তারা বড়জোড় সুচিকিৎসক, বাস্তুকার অথবা অধ্যাপক হতে পারেন, ডেপুটি কালেক্টর বঙ্কিমচন্দ্র হতে পারেন, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র নয়। যেকোন প্রতিভার বিকাশে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে পারিপার্শ্বিক এবং সমকালীন আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি। তাই শুধুমাত্র কালপঞ্জী অনুসারে তাঁদের পুর্ণ বিশ্লেষণ সম্ভবপর নয়। ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্কিমের জন্ম একথা বললে কোন চিত্র স্পষ্ট হয় না, বরং যদি বলা হয় বঙ্গসাহিত্যে মধুর কিরণ যখন অস্তাচলগামী এবং পূর্ব গগনে রবির উদয় হতে কিছু বিলম্ব আছে তবে কিঞ্চিৎ কাব্যিক ঢঙে হলেও সেই যুগের আভাস দেওয়া সম্ভব। পরবর্তীতে সেই বঙ্কিম ক্রমশ পূর্ণ চন্দ্রে পরিণত হয়েছেন দুর্গেশনন্দিনী থেকে রাজসিংহ-এ। তবে সেই রূপান্তর শিক্ষানবিশের শিল্পীতে রূপান্তর নয়, কারণ বঙ্কিমের কোন রচনাতেই অপটু হাতের ছাপ নেই, বলা যায় মহারথীর অতিরথী পর্যায়ে উত্তরণ। সাতাশ বৎসর বয়সে মাতৃভাষাকে প্রথম উপন্যাসে সমৃদ্ধ করবার দুঃসাহস যিনি দেখাতে পারেন তাঁর সাহিত্যপ্রতিভার আলোচনা ধৃষ্টতা মাত্র। যে ভাষার তিনি জন্মদাতা সেই ‘শবপোড়া’, ‘মড়াদাহ’ ভাষা টেকচাঁদ ঠাকুরের ‘আলালী’ ভাষা সহ পূর্ববতী ও সমসাময়িক সকল ভাষা অপেক্ষা অনেক সহজ ও স্বচ্ছন্দ। তার সাথে স্থানে স্থানে বঙ্কিম মিশিয়েছেন স্যাটায়ারের অম্লমধুর রস। যা রচনায় তিনি বরাবরই সিদ্ধহস্ত। দুর্গেশনন্দিনী-তে আশমানির রূপবর্ণনা কিংবা গজপতির চরিত্রে এই মণিকাঞ্চনের উৎকৃষ্ট সংযোগ ঘটেছে। জর্জ সেন্টসব্যারির মতে উপন্যাসের চারটি প্রধান বৈশিষ্ট্য কাহিনি (প্লট),বর্ণনা ন্যারেশন), চরিত্র (ক্যারেকটার), সংলাপ (ডায়ালগ)। বঙ্কিমের কালে অর্থাৎ উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ অবধি এই ছিল উপন্যাসের লক্ষণ। বঙ্কিম এই ধারাই গ্রহণ করেছেন, রবীন্দ্রনাথও বউ ঠাকুরাণীর হাট এবং রাজর্ষি-তে ঘটনাবহুল উপন্যাসের ধারাকেই অনুসরণ করেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে নৌকাডুবি, চোখের বালি থেকে তিনি এক নতুন উপন্যাসের ধারা প্রচলন করেন যেখানে কাহিনি হয়ে ওঠে গৌণ, প্রধান স্থান পায় চরিত্র। বঙ্কিমের উপন্যাসের পল্ট হল প্রধান সেই প্লটের বর্ণনা পাঠককে এমনই আকর্ষণ করে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়, কেবলই ছুটিতেছে, কোথাও থামিবার অবসর নাই। অবশ্য কাহিনিপ্রধান উপন্যাস হওয়ার কারণে বঙ্কিমসৃষ্ট অধিকাংশ চরিত্র বিশ্লেষণাত্মক নয়, তারা কাহিনীর অঙ্গীভূত হয়ে পড়ে, ঘটনাক্রম চরিত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়নি। তবে বিষবৃক্ষ-তে নরনারীর পারস্পরিক জটিল সম্পর্ক যেভাবে উন্মোচিত হয়েছে, দেবী চৌধুরাণী-তে প্রফুল্লর সাথে সাগর এবং দিবানিশির অকৃত্রিম ভালোবাসা ফুটে উঠেছে, রজনী-তে অন্ধ মেয়ের আপন জগতে নিঃসঙ্গতার বর্ণনা যে লেখক করেছেন তিনি চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করেননি একথা বলতে সংকোচ হয়।

এতক্ষণ আমরা শুধুমাত্র বঙ্কিমের সৃষ্টির বর্ণনাতেই ব্যপৃত ছিলাম। কিন্তু কোন স্রষ্টা সমাজচেতনা ব্যতিরেকে সম্পূর্ণতা লাভ করেন না, সে তিনি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার বা শিল্পী হোন। বঙ্কিমের উপন্যাসের (এবং কৃষ্ণচরিত্র প্রভৃতি রচনাসাহিত্যিক উৎকর্ষতা সম্বন্ধে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন, শুধু একথাই বলতে হয়, ধৃষ্টতা মার্জনীয়, রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎচন্দ্র রচিত সকল উপন্যাস বঙ্কিমের মত সমাদর পায়নি। একমাত্র বিংশ শতাব্দীতে সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ চিন্তাধারার কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই বঙ্কিম উপন্যাসের উৎকর্ষতা তুলনীয়।  মানিকের রচনাতে মার্কসবাদী চেতনার সঙ্গে অস্তিত্ববাদী দর্শনের সংমিশ্রণ ঘটেছে, বঙ্কিমের চেতনাতেও প্রতিফলন ঘটেছে প্রগতিশীল (তৎকালীন) বুর্জোয়া ধ্যানধারণার। বঙ্কিম বাংলার নবজাগরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান। উনবিংশ শতাব্দীর পাশ্চাত্ত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, লক, হিউম, পেইনের সঙ্গে মিল, বেন্থামের বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষালাভ। পূর্বসূরী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মত বঙ্কিম একাধারে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, আবার প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ। রামায়ণ, মহাভারত, বেদ বা ভগবদগীতা তাঁর কন্ঠস্থ ছিলো তা বঙ্কিম পাঠক মাত্রই উপলব্ধি করবেন। তবু কথা থেকে যায়। কৃষ্ণচরিত্রকে মহাকাব্যিক চরিত্র বিশ্লেষণ বলে গ্রহণ করতে দ্বিধা নেই, কিন্তু বঙ্কিমের মূল উদ্দেশ্য তা নয়। কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং এই সূত্রে তিনি সমস্ত প্রবন্ধকে গেঁথেছেন। যদিও রচনামধ্যে সর্বদা কৃষ্ণের মানবচরিত্রকে অনুসন্ধান করার কথা বলা হয়েছে যখনই লেখক কোন অসংগতি পেয়েছেন তাকে প্রক্ষেপ বলে ত্যাগ করে কৃষ্ণকে আদর্শ নরধর্মী ঈশ্বর মেনে নিয়েছেন। দ্রোণবধের সময় যুধিষ্ঠিরকে মিথ্যাভাষণের উপদেশ অথবা ঘটোৎকচবধের পর উদ্দাম নৃত্য সকলকিছুকেই প্রক্ষিপ্ত বলে গ্রহণ করতে স্পষ্ট অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন রাজশেখর বসু তাঁর মহাভারত-এর (সারানুবাদ) ভূমিকায়। একেও যদিবা সাহিত্যের অঙ্গ বলে মেনে নেওয়া হয় যখন বঙ্কিম আমাদের জাতীয় জীবনে অবক্ষয়ের প্রধান কারণ উল্লেখ করেন কৃষ্ণচরিত্রের অবমাননাকে তখন তা আর শুধুমাত্র সাহিত্যের গন্ডীতে সীমাবদ্ধ থাকে না, লেখকের রাজনৈতিক চেতনার (সম্ভবতঃ ধর্মীয়ও বটে) দর্পণ হয়ে ওঠে।

শুধু কৃষ্ণচরিত্রের বর্ণনাই একমাত্র উদাহরণ নয়। বঙ্কিমের মতে, ভারতবর্ষের ব্রাহ্মণেরা নিঃস্বার্থ ও নিষ্কাম হইয়া রচনা করিতেন, লোকহিত ভিন্ন আপনাদিগের যশ তাঁহাদের অভিপ্রেত ছিল না। একথা সত্য প্রাচীন শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলির অধিকাংশ লেখকের নামই অজ্ঞাত,ভারতীয় সংস্কৃতির এ এক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু শুধু এটুকু দিয়েই ব্রাহ্মণদের চরিত্র বোঝা সম্ভব নয়। যে বর্ণাশ্রম প্রথা প্রাচীন ভারতীয় সমাজের ভিত্তিস্বরূপ ছিল, যে কলঙ্ক আজও আমাদের সমাজে বর্তমান সেই কুৎসিত প্রথার প্রধান উপভোক্তা ছিলেন ব্রাহ্মণেরা। এমনকি মহাকাব্যদ্বয়ের মধ্যেও বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র প্রভৃতি তথাকথিত মহর্ষিদের যে চরিত্র পাওয়া যায় তা মোটেই নিঃস্বার্থ, নিষ্কাম, লোকহিতে রত নয়, রাজানুগ্রহের প্রত্যাশী ক্ষমতালোভীদের চিত্র।

উদাহরণের তালিকা বিস্তৃত করা অনাবশ্যক। বঙ্কিমের দেশপ্রেম হিন্দু স্বাজাত্যবোধে সিক্ত সে বিষয় স্বতঃসিদ্ধ। এখানেই শেষ নয়, বঙ্কিম বেদ প্রভৃতি প্রাচীন সাহিত্যকে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বলে ধরে নিয়েছেন যদিও সেকালে হিন্দু শব্দের কোন অস্তিত্ব ছিল না। আর্যসভ্যতাকে হিন্দুসভ্যতা বলে এক কাল্পনিক সনাতনধর্মের অবতারণা আজও উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের প্রচারের এক শক্তিশালী অস্ত্র। একই মুদ্রার অপরদিকে বঙ্কিমের রচনায় স্থানে-অস্থানে ছড়িয়ে রয়েছে মুসলমানের প্রতি অকারণ অবজ্ঞা। বঙ্কিম বাংলার পরাধীনতার কাল নিরূপণ করেছেন বক্তিয়ার খিলজীর বঙ্গবিজয় থেকে। আনন্দমঠ-এ সন্তানদলের প্রধান লক্ষ্য মুসলমান রাজ্যের উচ্ছেদসাধন। শূকরনিবাস, যবনপুরী প্রভৃতি শব্দবন্ধ সত্যই পীড়াদায়ক। যদিওবা সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ঐতিহাসিকতার কারণে এর যৌক্তিকতা স্বীকার করে নেওয়া হয়, রাজসিংহ-তে আওরংজেবকে যেভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে তা স্পষ্টই ইতিহাসের সীমা লঙ্ঘন করে। ১৬৫৯ সালে আওরংজেব বারাণসীর শাসক আবুল হাসানকে নূতন মন্দির নির্মাণের অনুমতি দিতে নিষেধ করেন একথা ঠিক, কিন্তু একইসঙ্গে পুরাতন মন্দির ধ্বংস না করারও নির্দেশ দেন। ১৬৮১ এবং ১৬৮৯ সালে বারাণসীর ভগবন্ত গোঁসাই ও রামজীবন গোঁসাইকে মন্দির স্থাপনের জন্য ভূমিদান করার বাদশাহী ফরমান আছে। অথচ উপন্যাসে বিপরীত চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। আজকের যুগে ইতিহাসের ছাত্র মাত্রেই  মানবেন, আকবরের দীন--ইলাহীর মত উদার ধর্মীয় মতবাদ ষোড়শ বা সপ্তদশ শতকে ইউরোপের ক্রিশ্চান রাজাদের পক্ষে অকল্পনীয় ছিলো এবং আওরংজেব প্রবর্তিত দার-উল-ইসলাম নীতি সমসাময়িক ইউরোপীয় নৃপতিবর্গের তুলনায় অধিক প্রতিক্রিয়াশীল ছিল না।

শুধুমাত্র ঐতিহাসিক উপন্যাসেই নয়, সামাজিক রচনাতেও ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রতি অবজ্ঞা কম নেই। কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসে ডিটেকটিব ইন্সপেক্টর ফিচেল খাঁকে, নামটি পরিহাসযোগ্য, নিয়ে প্রহসনের আয়োজন করা হয়েছে। সম্পূর্ণ স্যাটায়ার কমলাকান্তের জবানবন্দীতে আসামীর কাঠগড়ায় উপস্থিত গরুচোর নেড়ে এ কথা উল্লেখ করতে লেখক ভোলেননি। সর্বশেষ উপন্যাস সীতারাম-এর প্রারম্ভেই ফোকলা ফকিরকে উপলক্ষ করে আরেক প্রস্থ তামাশা করা হয়েছে

বঙ্কিম কি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে আচ্ছন্ন ছিলেন? এর স্পষ্ট উত্তর, না। এক্ষেত্রে গোপাল হালদারের মত প্রণিধানযোগ্য। মুসলমান পাঠকেরা বহুক্ষেত্রে বঙ্কিমকে কঠোরভাবে বিচার করেন। বাংলার কৃষক হাসেম শেখ, রামা কৈবর্ত বা পরাণ মন্ডল যে একই শোষিত শ্রেণির প্রতিনিধি একথা বঙ্কিম স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দেন। দুর্গেশনন্দিনী-তে তিলোত্তমা অপেক্ষা আয়েষা চরিত্র আমাদের মুগ্ধ করে। একই কথা ওসমান সম্বন্ধে বলা চলে। রাজসিংহ-তে মবারক সত্যই বীর, তা গ্রন্থকার স্বয়ং স্বীকার করেন। পাঠকের মনে কোন বিভ্রান্তির অবকাশ না রেখে উপন্যাসের শেষে লেখক স্পষ্ট ব্যাখ্যা করেন, হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে তারতম্য নির্দেশ করা গ্রন্থের উদ্দেশ্য নয়।

তাহলে এর মূল কারণ কী? প্রধান কারণ সমকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপট। উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে বিশেষতঃ কলকাতার হিন্দুসমাজে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রসার ঘটছিল। একদিকে মিশনারিদের হিন্দুধর্মবিরোধী প্রচার, অপরদিকে হিন্দু কলেজের ছাত্রদের স্বাধীনচেতা ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন এবং দেবেন্দ্রনাথ, কেশবচন্দ্র সেন প্রবর্তিত ব্রাহ্মসমাজ এই ত্রিমুখী আক্রমণের সামনে হিন্দুসমাজ নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছিল। হিন্দুদের প্রচলিত কুসংস্কার ও সামাজিক কুপ্রথাকে আক্রমণ করে তাঁরা সঠিক কাজই করেছিলেন। কিন্তু যখন ইয়ং বেঙ্গলের সভ্যবৃন্দ মদ্যপান প্রভৃতি কাজ না করাকে কুসংস্কার বলে গণ্য করেন, তখন তাঁরা নিজেরাই একপ্রকার সামাজিক গোঁড়ামিতে আচ্ছন্ন হলেন। বিদ্যাসাগরের মতস্থিতপ্রজ্ঞ, ধৈর্যশীল নেতা তাঁদের মধ্যে ছিলেন না। তাই যৌবনের ক্ষণিক উচ্ছাসের সাথে সামাজিক আন্দোলনের পার্থক্য তাঁরা উপলব্ধি করেননি। অন্যদিকে ব্রাহ্মসমাজের পৌত্তলিকতা বিরোধী প্রচার প্রধানতঃ শহরবাসী শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে রইল, কারণ যুগ যুগ ব্যাপী বদ্ধমূল সংস্কারে হঠাৎ আঘাত করলে মানুষ তা গ্রহণ করে না, দূরে সরে যায়। তাই কেশবচন্দ্রের ভাবগম্ভীর বাণী জনগণের মধ্যে যত না প্রভাব বিস্তার করে, অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে দক্ষিণেশ্বরের সাধক ব্রাহ্মণসন্তানের সহজ সরল কথা।

এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষিত হিন্দুসমাজের একাংশ আপন ধর্মের স্বকীয়তা রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। অনেকসময় মতাদর্শগত আক্রমণের হাত থেকে স্বীয় মতবাদ রক্ষা করতে গিয়ে একধরণের সংকীর্ণতাবাদ জন্ম নেয়। তাই আপনধর্মের সকলপ্রকার কুসংস্কারের দিকে চোখ বন্ধ করে তাঁরা স্বাজাত্যবোধের প্রচারে ব্যপৃত হলেন। হাঁচি, টিকটিকি প্রভৃতিকে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে জাস্টিফাই করতে শুরু করেন তাঁরা। (রবীন্দ্রনাথের হাস্যকৌতুক আর্য্য ও অনার্য্য পঠিতব্য) অবশ্য বঙ্কিম এ ধরণের হাস্যকর প্রয়াস কখনও করেননি, কারণ তিনি কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন না। কিন্তু তিনি হিন্দু শভিনিজমের পক্ষেই দাঁড়ালেন। হিন্দুকে হিন্দু না রাখিলে কে রাখিবে, এই বুঝি ছিল তাঁর মনোগত উপলব্ধি। দুঃখের বিষয়, এ ধরণের আন্দোলনের কোন বাস্তব ভিত্তি ছিল না। যে  যুগ চলে গেছে তাকে ফিরিয়ে আনা যায় না। লর্ড মেকলে প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থার মানুষ হয়ে বল্লালী প্রথার জয়গান সম্ভব নয়। তাই সমকালীন সমাজে কোন আশ্রয় না পেয়ে হিন্দু স্বাজাত্যবোধকে আশ্রয় নিতে হল প্রাচীন আর্যযুগে। তবে বঙ্কিম সাহিত্যে এর অন্য দিকও আছে। তখন ভারতে কোম্পানীর শাসন শেষ হয়ে ব্রিটিশ শাসনের সুত্রপাত হয়েছে। পরাধীনতার নিগড়ে আবদ্ধ দেশে জাতীয় আন্দোলনের সুদূরতম সম্ভাবনা না দেখে বঙ্কিমের ব্যথিত মন হয়ত বা এক কল্পলোকের রচনা করেছে। তা কখনো আশ্রয় করেছে আদর্শ যুগপুরুষ কৃষ্ণকে, কখনো বা রাজপুত বীরপুরুষ প্রতাপ বা রাজসিংহকে।

উপসংহারে স্বীকার করতে হয়, এত ক্ষুদ্র পরিসরে বা এত ছোট মাপকাঠিতে বঙ্কিমকে বোঝা সম্ভব নয়। বঙ্কিম বাংলার শ্রেষ্ঠ প্রতিভা। ঐতিহাসিক ও রোমান্টিক উপন্যাস রচনায় তিনি আলেকজান্দার দুমা অথবা ওয়াল্টার স্কটের সমকক্ষ। আর পরধর্ম বিদ্বেষের প্রসঙ্গে বলতে হয়, বহু জগৎপূজ্য সাহিত্যিকও এ ব্যাধি থেকে মুক্ত নন। ইউরোপীয় নৃপতিবর্গের ক্রুসেড নামক নরমেধকে ওয়াল্টার স্কট আইভ্যানহো প্রভৃতি উপন্যাসে এক বীরত্বব্যঞ্জক রূপে চিত্রিত করেছেন। ইংরাজী ভাষার অপ্রতিদ্বন্দ্বী কথাসাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্সের জগৎবিখ্যাত অলিভার টুইস্ট উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে খলনায়ক ফ্যাগিনকে ইহুদী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। শেক্সপিয়র কি সমালোচনার ঊর্ধ্বে? মার্চেন্ট অফ ভেনিস পড়লে তা মনে হয় না। অন্যদিকে সমকালীন সাহিত্যিকদের তুলনায় বঙ্কিম বহু অগ্রগামী চিন্তাধারার মানুষ ছিলেন। তার প্রমাণ আছে রোহিণী বা কুন্দনন্দিনীর বিবাহে। অর্ধশতাব্দী পরেও বাংলার অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র এধরণের দুঃসাহস দেখাননি (পল্লীসমাজ)। বঙ্কিমের বলিষ্ঠ কন্ঠে শোনা যায়, ধর্মপ্রয়োজন সম্বন্ধে ভ্রান্তিতে পড়িয়া মনুষ্য যত মনুষ্য নষ্ট করিয়াছে তত মনুষ্য আর কোন কারণেই নষ্ট হয় নাই…। একথা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তবু খেদ রয়ে যায়। আনন্দমঠ উপন্যাসের প্রায় সর্বক্ষেত্রেই সন্ন্যাসীদের প্রতিযোদ্ধা ইংরেজ সেনা। তবে কেন আগাগোড়া এই মুসলমান বিদ্বেষ? কেনই বা পরিশেষে ইংরেজ স্তুতি বা pax Britannica-র অবতারণা? প্রথম জীবনে সাম্য-তে যিনি রুশোর বাণী প্রচার করেন, তিনিই পরিণত বয়সে পরমপুরুষকে হৃদয়ে জাগরিত করিতে পরামর্শ দেন! এই দ্বন্দ্বের কোন সদুত্তর বঙ্কিমের রচনায় নেই। তাই পরিশেষে কালের পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তাশীল বঙ্কিমকে রামকৃষ্ণদেবের ভাষাতেই আবার বলতে হয়, সখেদে, বেদনায়- ‘বঙ্কিম, বাঁকা কেন?’ বঙ্কিমের ভাবয়িত্রী প্রতিভা বলিষ্ঠ, গভীর, বহুমুখী কিন্তু তা বঙ্কিম।

 
 
top