বাংলা সাহিত্যের নারীবাদী পাঠ: বঙ্কিমচন্দ্রের ইন্দিরা

 

আজও যে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে অনতিক্রান্ত, তা তাঁর নারী চরিত্রের জন্য। এমনই জীবনসম্ভবা তাঁর নায়িকাকুল যে, তাঁরা তাঁদের স্রষ্টাকেও বিমূঢ় করে দিয়েছে

সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উক্তি (বঙ্কিমচন্দ্র ও বাংলা উপন্যাসের প্রতিষ্ঠা‘, বাংলা উপন্যাসের কালান্তর ) যে কোনও বঙ্কিম পাঠককে একমত করবে। বঙ্কিমচন্দ্রের বহু উপন্যাস যে কেবল নারী-প্রধান, তা-ই তো শুধু নয়, বঙ্কিমের নারীরা স্বতন্ত্র। তৎকালীন সামাজিক চিত্রে তাঁরা কেমনভাবে অবস্থান করতেন তাঁদের এই বিপুল নিজস্বতা নিয়ে, তা জানি না। সম্ভবত করতেন না। বঙ্কিমমানসেই তাঁদের অবস্থান। আর বঙ্কিম বোধহয় ভরসা রেখেছিলেন তাঁর পাঠকদের ওপর। আশা করেছিলেন, তাঁর প্রেরিত সমস্ত ইঙ্গিত তাঁর বুদ্ধিমান পাঠকেরা বুঝবেন, আর বুঝবেন তাঁর ‘অসহায়তা‘-। কাঙ্খিত সমাজে তো সবসময় তিনি তাঁদের স্থাপন করতে পারবেন নাতাই উনিশ শতকীয় বাংলার সমাজে মরে যেতে হয় কুন্দনন্দিনী, রোহিনীদের। পদ্মাবতীকে মোতিবিবি হয়ে যেতে হয়। শৈবলীনিকে ক্ষতবিক্ষত হতে হয়। এমনকী দেবী চৌধুরানীকে-ও ফিরে আসতে হয় পুকুরঘাটে। আমরা বঙ্কিমী দ্বিধা নিয়ে সমালোচনা করে থাকি, নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে বঙ্কিমের অসহায়তাও তো কম নয়।

সেই অসহায়তারও তো অনেকগুলো ক্ষেত্র। যে সময়ে দাঁড়িয়ে লিখছেন বঙ্কিম, তখন একজন নারীর ভূমিকা কী? কল্যাণী বধূ, সার্থক জননী ছাড়া? বাংলাদেশের সাহিত্য তখনও সুয়োরানি-দুয়োরানির গল্পে আবর্তিত। কিরণমালা ব্যতিক্রমী এক নারী, তাদের সাহসিকতার জন্য ইতিহাসমালা- নারীরা নিন্দিত। কেবল আছেন মধুসূদনের ‘বীরাঙ্গনা’রা, যাঁদের বীরত্ব মানে পুরুষকে প্রেমপ্রস্তাব দেওয়া কিংবা পুরুষের ভুল-ত্রুটিতে তর্জনী তোলা। অথচ প্রায় সকলেই তাঁরা পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার শিকার এবং অসহায়। কিন্তু বঙ্কিমের নারীরা আরও একধাপ এগিয়ে। বঙ্কিমের কাছে ছিল সমসময়ের অপারগতার অসহায়তা। আর ছিল এক নারীর পার্শ্বে অবস্থানকারী পুরুষটির অক্ষমতার অসহায়তা। এই দুই ‘না পারা‘-কে মেনে নিয়ে বঙ্কিম স্থাপন করেছেন তাঁর মেয়েদের। আর বঙ্কিমের মেয়েরাও মানিয়ে নিয়েছে ‘ক্ষমাঘেন্নাকরে। তাই মধুসূদনের বীরাঙ্গনা- মতো তাদের চোখে জল নেই, তারা কৌতুকে, হাসিতে উজ্জ্বল। সূর্যমুখী স্বামীর বিয়ে দেয়, কপালকুণ্ডলা ভাবে, ‘অন্তঃকরণমধ্যে দৃষ্টি করিয়া দেখিলেন তথায় তো নবকুমারকে দেখিতে পাইলেন না, তবে কেন লুৎফ-উন্নিসার সুখের পথ রোধ করিবেন?’ ভ্রমর স্পষ্টতই গোবিন্দলালকে বলে, যতদিন তুমি শ্রদ্ধার যোগ্য, ততদিনই আমার শ্রদ্ধা।’

এই দ্বিধাশূন্যতাই বঙ্কিমের নারীদের বৈশিষ্ট্য। আর ইন্দিরা যেন এই দ্বিধাহীন বুদ্ধিমত্তার এক আশ্চর্য প্রতীক। ঙ্কিম কখনোই কোনো উপন্যাসেই সামাজিক নিয়মের অমোঘ ল হিসেবে কোনো সম্পর্ক রচনা করেননি। অর্থাৎ বিবাহিত দম্পতিরাও মুক্ত। স্বাধীন। নবকুমার পদ্মাবতীকে চিনতে পারে না মোতিবিবি রূপে। ইন্দিরার স্বামী উপেন্দ্র ইন্দিরাকে চিনতে পারে না। এবং এদের কারোরই সন্তান নেই। অর্থাৎ স্বামী স্ত্রী পরস্পরের কাছে আসার জন্য কোনও নিয়ম-নীতির বন্ধন কাজ করে নাকেবল ‘প্রেম’-ই নরনারীর নৈকট্যের প্রধানতম কারণ।

ইন্দিরা - কাহিনিটি-ও বঙ্কিমের অন্যান্য উপন্যাসের মতো বেশ পরিকল্পিত বুননে তৈরি। বেশ স্পষ্ট একটা প্যাটার্ন আছে এই আখ্যানে। খানিকটা কি আমাদের রূপকথার ধরণ? উচ্চ বংশীয় কন্যা, শিক্ষিতা বুদ্ধিমতী মেয়ে ইন্দিরা। কিন্তু ভাগ্যবিপর্যয় ঘটে তার। কালাদীঘির ডাকাতদের হাতে পড়ে তার ভাগ্যের দিক নির্দেশ বিভ্রান্ত হয়ে যায়। উল্লেখ্য, বঙ্কিম খুব স্পষ্ট করে তাঁর পাঠকদের বুঝিয়ে দেন ডাকাতদের হাতে পড়ে ইন্দিরা তার গহনা-সম্পদ হারায়, কিন্তু নারীত্ব হারায় না। এই না-হারানোটুকু চরিত্র হিসেবে ইন্দিরাকে যেমন সাহস যোগায়, তেমনই তার স্রষ্টারও নৈতিক জোর বাড়িয়ে তোলে।

এরপর ধনীবংশের আদুরে মেয়ে বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হয়ে কলকাতায় রাঁধুনিগিরিতে নিযুক্ত হয়। অপরের বাড়ির রাঁধুনি হওয়ার মনোকষ্ট থেকে ইন্দিরা বাঁচে সুভাষিনীর মতো মনিবকে পেয়ে। বঙ্কিমের মানসকন্যার মতোই সুভাষিনী সেই নারী, যিনি ধনী গৃহবধূ হয়েও অমলিন, সংসারের ক্লেদমুক্ত কিশোরী বালিকার মতো স্বচ্ছ, আনন্দিত। ঠিক ইন্দিরাও যেন তারই পরিপূরক। আপাত দারিদ্র, ভাগ্যবিপর্যয় সত্ত্বেও সে আনন্দবিমুখ নয়, জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতকে তুচ্ছ করে হেসে উঠতে পারে। আর এই দুই নারীই অসম্ভব বুদ্ধিমতী। তাদের বুদ্ধি এতটাই স্বচ্ছ যে, তার প্রখরতা তাদের সন্দিগ্ধ বা কুটিল করে না। বরং সহজ সরল করে তোলে। ইন্দিরা বিয়ের পর, কালাদীঘি পর্বের আগেই যখন শ্বশুরবাড়ি রওনা দেয়, তখন তার বোন তাকে প্রশ্ন করে, শ্বশুরবাড়ি কেমন?‘ ইন্দিরা উত্তর দেয়, সেখানে পা দিলেই স্ত্রীজাতি অপ্সরা হয়, পুরুষ ভেড়া হয়।এই একটিমাত্র পংক্তিতে বঙ্কিমের সংসার দর্শনতার অসারতা, মাধুর্য যেমন ধরা পড়ে তেমনই বঙ্কিমী ব্যঙ্গও উঠে আসে। ইন্দিরা যেন প্রথম থেকেই পুরুষ চরিত্রের খুঁটিনাটি জানততাই নিয়ে তার কোনো মোহ বা ভ্রান্তি ছিল না। তখনই তার বুদ্ধিমত্তার মাপকাঠি চিহ্নিত হয়ে যায়। তাই রাঁধুনিবৃত্তির পরিশ্রম বা অমর্যাদাকে যে সে হেলায় তুচ্ছ করতে পারবে, তা বলাই বাহুল্য।

আমাদের মনে পড়ে যায়, দেবী চৌধুরাণী  উপন্যাসে ভবানী পাঠক পাঁচ বছর ধরে কেমনভাবে তাকে তৈরি করেছিলেন তার ইতিবৃত্ত। কোনও বৎসর প্রফুল্ল রাজভোগ খায়কোনও বৎসরে ক্ষুন্নিবৃত্তি। কখনও তার জন্য রাজপোশাক কখনও তার জন্য মুণ্ডিত মস্তক আর একবস্ত্রের আদেশ। আরও ছিল। মুণ্ডিত মস্তক দশায় তরুণ শিষ্যদের সঙ্গে তাকে আলোচনায় বসাতেন ভবানী পাঠক। এই ইন্দ্রিয় কায়-ই ছিল ভবানী পাঠকের মূল শিক্ষা। আর ইন্দিরা যেন প্রথম থেকেই এই ইন্দ্রিয় কায়ে সিদ্ধ। সে পিতৃস্নেহে যেমন স্বচ্ছন্দ, তেমনই ডাকাতদের হাতে লাঞ্ছিত হয়ে ছেঁড়া বস্ত্রে দু-দিন পথ হাঁটতে পারেআবার বড়োলোকের বাড়ির দাসীবৃত্তিও মেনে নেয়।

তবে ইন্দিরার আসল লড়াই শুরু হয় তার স্বামীকে চিহ্নিত করে তার কাছে পৌঁছানোর পথটুকুতেই। এ লড়াই বাহুবলে নয়, বুদ্ধিবলে। এ লড়াই মন পাওয়ার লড়াই। চিত্তরঞ্জিনী বৃত্তি প্রয়োগে মন জয় করা। এই যুদ্ধে প্রতিটি পদক্ষেপ ধীর পায়ে, মৃদু স্বরে। এ যুদ্ধের অস্ত্র বঙ্কিম ভ্রূ-ভঙ্গি, লাস্যময়ী হাসি আর সময়মতো কটাক্ষ। ইন্দিরা প্রতিটি অস্ত্রের নিপুণ প্রয়োগ জানে। এমনকী তার রন্ধন কৌশলও তাকে যুদ্ধে সাহায্য করে। ইন্দিরার স্বামী উপেন্দ্রবাবু যখন খেতে আসেন, তখন ইন্দিরা বলে, ‘আমি অবগুন্ঠনবতী, কিন্তু ঘোমটায় স্ত্রীলোকের স্বভাব ঢাকা পড়ে না। ঘোমটার ভিতর হইতে একবার নিমন্ত্রিত বাবুটিকে দেখিয়া লইলাম। দেখিলাম, তাঁহার বয়স ত্রিশ বৎসর বোধ হয়; তিনি গৌরবর্ণ এবং অত্যন্ত সুপুরুষ; তাহাকে দেখিয়াই রমণীমনোহর বলিয়া বোধ হইল।’ মনে রাখতে হবে, ইন্দিরা তখনও জানে না, এই ভদ্রলোকই তার স্বামী তাও তার সুপুরুষটির প্রতি প্রাথমিক আকর্ষণ তৈরি হয়। বঙ্কিম ইন্দিরার হয়ে বলছেন, ঘোমটায় স্ত্রীলোকের স্বভাব ঢাকা পড়ে না।’ এই একটি বাক্যে ইন্দিরা অশ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠে। আর তারপর তাদের দু-জনের দৃষ্টি বিনিময়ের পর ইন্দিরার মনে হয়, আমি সধবা হইয়াও জন্মবিধবা। বিবাহের সময়ে একবার মাত্র স্বামিদর্শন হইয়াছিলসুতরাং যৌবনের প্রবৃত্তি সকল অপরিতৃপ্ত ছিল। এমন গভীর জলে ক্ষেপণী নিক্ষেপে বুঝি তরঙ্গ উঠিল ভাবিয়া বড় অপ্রফুল্ল হইলাম। মনে মনে নারীজন্মে সহস্র ধিক্কার দিলাম; মনে মনে আপনাকে সহস্র ধিক্কার দিলাম। মনের ভিতর মরিয়া গেলাম।’ এই সেই পরিচিত বাংলাদেশের নারী যিনি আপন প্রবৃত্তিকে আপনি নিন্দা করেন। বঙ্কিম নিজেও কি এই পরিচিত নিন্দার আবহ থেকে মুক্ত থাকতে পারলেন? মধুসূদন দত্তের বীরঙ্গনা- ‘সোমের প্রতি তারা‘- তারা যখন স্পষ্টতই সোমকে শরীরী আহ্বান করে, তখন তাকে পৌরাণিক চরিত্র হয়েই তা করতে হয়, সেটা ইন্দিরাকে দিয়ে বঙ্কিম করাতে পারেন না। সামান্য কুটিল কটাক্ষের বঙ্কিম যেন নিজের চরিত্রকে তিরস্কৃত হতে দেন।

আর এই প্রেম পল্লবিত হওয়ার আগেই ইন্দিরা চিনতে পারে, এই রমণীমনোহর ভদ্রলোকটি তার স্বামী। খুব আশ্চর্য এই সংযোইন্দিরা যাকে দেখে আকৃষ্ট হল, সে-ই তার স্বামী। বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে এই উদাহরণটা অবশ্য নতুন নয়। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রবহু ক্ষেত্রেই এমন উদাহরণ আছেনারীর বাসনা, কামনা যদি কারও উদ্দেশে বর্ষিত হয়, হয় তিনিই তার স্বামী বা স্বামী হয়ে ওঠেন। যাই হোক, এক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযুক্ত হওয়ার পর ইন্দিরার উপেন্দ্রকে কাছে পাওয়ার সমস্ত ছলনা, কৌশলেই একটা পবিত্র প্রলেপ পড়ে যায়।

তাই কুমুদিনীরূপী ইন্দিরা যখন রাতে একা উপেন্দ্রর সঙ্গে দেখা করতে চায়, তখন হারাণী এ কাজে রাজি হয় না। কুমু তাকে বলে, ‘কিছু দোষ নাই‘ এবং সুভাষিনী তাতে রাজি হবে। হারাণী অবিশ্বাস করে বলে, তিনি কুলের কুলবধূসতী লক্ষী তিনি কি এ সব কাজে হাত দেন!’ অর্থাৎ বঙ্কিম খুব স্পষ্টই দুটো বিভাজন করে ফেলেন। ইন্দিরার ভূমিকাটা খুব সতী-লক্ষ্মীসুলভ থাকেনাকেবল প্রেম কোনো সম্পর্ককেই পবিত্র করতে পারে না। দাম্পত্যই প্রেমের মূল শক্তি। অন্তত বঙ্কিম কি তাই ভাবছেন?

আর ইন্দিরা হয়তো জানত, এই ভদ্রলোক তার স্বামী। কিন্তু উপেন্দ্র তো জানত না। বঙ্কিম জানতেন, বঙ্কিমের পাঠিকাদের মনে এই প্রশ্ন জাগবে। তাই ইন্দিরা বলছে, অতএব তিনি আমাকে পরস্ত্রী জানিয়া যে আমার প্রণয়াশায় লুব্ধ হইলেন, শুনিয়া মনে মনে বড় নিন্দা করিতেছি। কিন্তু তিনি স্বামী, আমি স্ত্রীতাঁহাকে মন্দ ভাবা আমার অকর্তব্য বলিয়া সে কথার আর আলোচনা করিব না। মনে মনে সংকল্প করিলাম, যদি কখনও দিন পাই, তবে এ স্বভাব ত্যাগ করাইব।’ অর্থাৎ কেবল পুরুষ হওয়ার কারণেই উপেন্দ্রর এ স্বভাব অল্প নিন্দার ওপর দিয়ে যায়। উপেন্দ্রই সেই ভারতবর্ষীয় পুরুষ, যে রামায়ণ -এর রামের উত্তরসূরী। সে অনায়াসে কোনো প্রমাণ বা খোঁজখবর ছাড়াই ডাকাতদের হাতে পড়া স্ত্রী সম্পর্কে বলে, ‘সে স্ত্রীকে পাইলেও আমি আর গ্রহণ করিব, এমন বোধ হয় না। তাঁহার আর জাতি নাই বিবেচনা করিতে হইবে।’

বলা বাহুল্য, ইন্দিরা সেই ভারতবর্ষীয় নারী, যে আশা রাখে, একদিন তাকে স্বামী গ্রহণ করবে। আর সেই গ্রহণের জন্য যে পদ্ধতি সে নেয়, তাকে তার মুখ, দিয়ে তার পুরুষ স্রষ্টা-ই চরম নিন্দা করেন এই ভাষায়, ‘ বলিতে কি স্ত্রীলোকই পৃথিবীর কণ্টক। আমাদের জাতি হইতে পৃথিবীর যত অনিষ্ট ঘটে, পুরুষ হইতে তত ঘটে না।’ আর এই প্রচেষ্টার ফল নর-নারীর মিলনে। ইন্দিরা তার স্বামীর সঙ্গে মিলিত হয়। কিন্তু উপেন্দ্র? ইন্দিরা বলে, তিনি আমায় কুলটা বলিয়া জানিলেন। তাহাও সহ্য করিলাম।’

কেন এই সহ্য করা? স্বামীর প্রতি ভালোবাসা? ইন্দিরা তেমনটাও দাবি করে, ‘ইনি আমার স্বামীপতিসেবাতেই আমার আনন্দ তাই কৃত্রিম নহে সমস্ত অন্তঃকরণের সহিত, আমি তাহা করিতেছিলাম।’ কিন্তু এই পতিসেবার কারণটা কী? ইন্দিরা তো তার স্বামীকে আগে চিনত না! যখন চিনল, তখন তিনি তাকে চেনেননিকেবল সুন্দরী নারী এবং কুলটা জ্ঞানে তিনি গ্রহণ করেছেন। স্পষ্টতই জানিয়েছেনস্ত্রীকে আর ঘরে নেবেন না। তাহলে কেন এই সেবা? কেবল পতি বলেই? অর্থাৎ ইন্দিরা নামক নারী চরিত্রের মধ্য দিয়ে বঙ্কিম খুব স্পষ্টতই বলে দিয়েছেন,স্বামীর যত অকর্তব্যই থাক, স্ত্রী তাকে ভালোবেসেই আনন্দে থাকবে। কুলটা গ্রহণে স্বামীর চরিত্র স্খলন হয় না, কিন্তু স্বামীর উদ্দেশেও কুটিল কটাক্ষ নিক্ষেপ হলে স্ত্রী নিন্দিতাই হন।

আমরা শুরু করেছিলাম বঙ্কিমের অসহায়তা দিয়ে, বঙ্কিমের ছিল যুগের অসহায়তা। বঙ্কিমের কাছে সমসময়ের কোনও উদাহরণ ছিল না, যাকে তিনি স্থাপন করতে পারেন। কিন্তু দ্বন্দ্ব জাগেইন্দিরা - সমাপ্তি বঙ্কিম ঘটান নাটকীয়ভাবে। সে পিতৃগৃহে ফিরে আসে। স্বামীকেও স্বপরিচয়ে ফিরে পায়। অথচ এটা কি যথেষ্ট অসম্ভব কল্পনা ছিল না? ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে জন্মানো মানোদা দেবী তাঁর শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত-এ জানান, ধনী পিতার সন্তান হয়েও ছোট্ট একটা ভুলের জন্য তাকে পতিতাবৃত্তি নিতে হয় বাধ্য হয়ে। ইন্দিরার ঘটনা তাই কাল্পনিক। শুধু তার অনুভব চিরাচরিত পুরুষতান্ত্রিকতায় দুষ্ট—যার থেকে বঙ্কিম বেরোতে পারেননি।

 
 
top