ত্রৈলঙ্গ রায়ের আজ কালের আখ্যান

 

জমকালো শাড়িপরা পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির ঈষৎ বক্র দেহপল্লবটি দেখে কাঙালের পলিতকেশ রোমাঞ্চে খাড়া হয়ে গিয়েছিল। এর কয়েক মুহূর্ত আগে তেঁতুলগাছের মগডালে বসে ত্রৈলঙ্গ রায়কে দর্শন দিয়ে দিয়েছেন প্রম্লোচ্চা কুমারীত্রৈলঙ্গের পিছনেই ছিলেন কাঙাল, তেঁতুলগাছটির আরেকটি শাখায় পা দিয়ে ভারসাম্য রেখে দাঁড়িয়েছিলেন। গলার স্বরটি আগেই কানে এসেছিল কিন্তু সেই চিক্কন গলাটি নেই, পঞ্চভূতে বিলীন হওয়ার পর একটু সানুনাসিক হয়েছে। কাঙাল অতটা ঠাহর করতে পারেননি। কিন্তু পরক্ষণেই ত্রৈলঙ্গের পিছনে দাঁড়িয়ে অপাঙ্গে দেখলেন সেই কঞ্চির মতো নির্মেদ দেহ, কালসন্ধের মতো কেশ, অ্যালবিনোর মতো গাত্রবর্ণ, গোলাপখাস আমের মতো মুখমণ্ডল, মূষিকের মতো দশন, দপ করে ওঠা হ্যাজাকবাতির মতো আঁখিঠার! কাঙাল ভাবাবিষ্ট হয়ে গেলেনগত ষাট-সত্তর বছর ধরে এঁর জন্যেই তাঁর হৃদ-পুকুর শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে, ট্রামে-বাসে-ট্রেনে-পাল্কিতে যাঁহাতক আনমনা হয়েছেন, এঁরই শ্রীমুখটি মায়াছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠেছে, এঁরই বিরহ-শর দেহ-মনকে বধ করেছে প্রতিদিন যদিও সময়ের মুখঝামটা খেয়ে চেহারাটার অনিষ্ট হয়েছে, একদা অষ্টাদশী সেই নদী এখন অনেকটাই মজেছে, বাঁকগুলিও যদিও আবিষ্কার করতে হয়, তা সত্ত্বেও চিনতে অসুবিধে হয়নি।

কাঙাল সেরেফ আছড়ে পড়েছিলেন প্রম্লোচ্চার উপর। প্রম্লোচ্চা কিছু বোঝার আগেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিলেন। পাঁজাকোলা করে সোজাতুলে নিয়েছিলেন কোলে।

রণ! বুড়ো মিন্‌সের শখ কম নয় দেকচি! এ কী পালা হচ্চে নাকি! যার যখন খুশি অপহরণ করচে, বাঙলায় কি দেবী সিং-এর রাজত্ব চলচে! প্রম্লোচ্চা চিৎকার করে উঠেছিলেন। ততক্ষণে ওঁকে ক্রোড়ে ধারণ করে সড়সড় করে তেঁতুলগাছের নীচে নেমে এসেছেন কাঙাল। পুকুরপাড়ের খেয়ালি হাওয়ায় তাঁর ধুতিটি বিস্রস্ত হয়েছে।

বোধহয় অর্ধশতাব্দী পরে সেই অসাধারণ মূর্তিটি আবার অ্যাতো সামনে থেকে দেখছেন কাঙাল। সেই ঘনবদ্ধ ভ্রূ-যুগল,এখন বিরক্তিতে খানিক কুঁচকে আছে। আম্রপত্রের মতো আঁখি,এখন ক্রোধে বটপাতার মতো হয়েছে। ঈগলচঞ্চুর মতো নাসিকার পাটা ফুলেফুলে উঠছে, নাতিবিস্তৃত ললাটে কুঞ্চনরেখা, রঞ্জকে রাঙা ওষ্ঠাধরের ফাঁক দিয়ে বিদ্যুৎবর্ণের দন্তরাশি কিড়মিড় করছে। বহিরঙ্গে বৃদ্ধ কাঙালচরণের অন্তঃকরণ প্রেমসুধায় প্লাবিত হয়ে গেল।

প্রম্লোচ্চাআবেগঘন আর কম্পিত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন কাঙাল। কষ্ট করে ডানবাহুটি সামান্য উঠিয়েছেন, তাতে প্রম্লোচ্চার মুখটি কাঙালের চুম্বন দূরত্বে চলে এসেছে, ওঁরই দিকে দৃষ্টিনিবদ্ধবল প্রয়োগ করতে গিয়ে পরণের ধুতিটিও আলগা হয়েছেকোনোরকমে লজ্জা নিবারণ হচ্ছে।

কে গা আপনি! বলা নেই কওয়া নেই, কোলে নিয়ে তামাশা করছেন! আপনি তো দেখচি কাইনেটিক বিদ্যেধরের চেয়েও বোম্বেটেখেঁকিয়ে উঠলেন প্রম্লোচ্চা।

কাঙাল কিছু বলার চেষ্টা করলেন কিন্তু ভাবাবেগের ভয়ানক প্রাবল্যে কাঙালের স্বরযন্ত্র চোক করে গেল।

থাটা কানে গেল না নাকি? এই বয়েসে রসের তো খাঁকতি নেইকো! এবার দেখচি মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখতে হচ্চে, পেত্নি হয়েচি বলে কি নারী নই! তাঁর রাজত্বে যার যখন খুশি এই রকম নারী নিয্যাতন করে যাবে নাকি! গজগজ করতে লাগলেন প্রম্লোচ্চাকুমারী।

প্রম্লোচ্চা, চিনতে পারলে না আমায়! অনেক কষ্টে খুবই মোলায়েম স্বরে বললেন কাঙাল।

না, আমার চেনার দরকার নেইকো! অ্যাতো কষ্ট করে স্বয়ংবর সভার আয়োজন করলুম কি-না দুচারটে ভদ্দরলোক এসে পাঞ্জা কষবে, জিতে নিয়ে যাবে আমাকে, প্রম্লোচ্চাকুমারী কারোর প্রতি পক্ষপাত করল এই ক্ষোভ থাকবে না কারো মিনশেরা তা না করে এখন গাজোয়ারি করতে লেগেচে। কাইনেটিক লুটে নিয়ে গেল সখিটাকে, এখন ইনি এয়েচেন! মউকা পেলে খেংরাপেটা করতুম সবকটাকে

কবারটি দেখ আমার দিকে। তুমি যেরমটি ভাবচ আমি তা নই

প্রম্লোচ্চা এবার আলগোছে কাঙালের দিকে চাইলেন একবার। হঠাৎ একটু আবেগান্বিত হয়ে গেলেন।

-মা, ঠা-কু--দা-দা নাকি! হায় হায়, খুব ভুল হয়ে গিয়েচে ঠাকুরদাদা, অনেক ছোটোবেলায় দেখেছিলুম তো, তোমার চেহারাটা আর স্মরণে ছিল না! তাই ভাবি, ঠাকুরদাদা ছাড়া আর কে-ই বা কোলে নেবে আমায়মা-বাপের মুখ তো আর দেখিনিআদর যেটুকু পেয়েচি ঠাকুরদাদা-ঠাকমার কাছে

এবার তিনি নিজেই গলা জড়িয়ে ধরলেন কাঙালের। খুবই আদুরে গলায় বললেন, কেমন আছ, ঠাকুরদাদা ঠাকুমা কোথায়? আমি ভালো নেইকো,  জানো!

প্রম্লোচ্চা, আমি সেই লোক নইকাঙাল একটু জোর দিয়ে বললেন। আরাধ্যা নারীর মুখে ঠাকুরদাদা ডাক শুনে আহত হলেন খানিক। কালের মারে ঘায়েল হয়েছেন, দুষ্কর্ম করতে গিয়ে দাঁতগুলোও ছেতরে গিয়েছেতাঁর প্রতি অতিপক্ষপাতদুষ্ট কোনো মিতার পক্ষেও তাঁকে জোয়ান বা নিদেনপক্ষে প্রৌঢ় বলাও সম্ভব নয়, প্রম্লোচ্চার আর কী দোষ! কাঙাল তাই ধৈর্য হারালেন নানিজের পরিচয়টা দিতে একটু ইতস্তত করছেন তিনি, সেই কোন্ যুগে কোনোরকম কোনো কৈফিয়ত না দিয়েই ত্যাগ করেছিলেন প্রম্লোচ্চাকে মনে অপরাধবোধ হাঁড়ির পোড়া কালির মতো জমাট বেঁধে আছে

ঠাকুরদাদা নও! তাই তো বলি, ঠাকুরদাদা তো আমায় কোনোদিন প্রম্লোচ্চা বলে ডাকেনিকো, বলত বিড়ুলরানিআর ঠাকুরদাদার তো প্রম্লোচ্চা নামটা জানারই কথা নয়প্রম্লোচ্চা বাহু দুটো ছাড়িয়ে নিলেন

বে কে আপনি! আমাকে কী দরকার! আমি তো চিনতে পারচি নে!

ভালো করে চেয়ে দ্যাখো আমার চোখে লক্ষ্মীটি, ঠিক চিনতে পারবে!

অ্যাতোক্ষণ আড়চোখে আড়চোখে কাঙালকে দেখছিলেন প্রম্লোচ্চা, এবার চোখ আরো বিস্ফারিত করে কাঙালের দিকে চাইলেন। বেশ খানিকক্ষণ ধরে স্থিরদৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করলেন জাঁহাবাজ চেহারার মূর্তিটিকে।

বৃষের মতো স্কন্ধ, খড়্গধেনুর মতো নাসা, দিগন্তবিস্তৃত কপাল, দ্বিধাবিভক্ত থুতনি, আকর্ণবিস্তৃত ওষ্ঠ আর জ্বলজ্বলে চোখদুটিতে যেন অমোঘ হাতছানি! বহুকাল আগে এক অজপাড়াগাঁয়ের পুকুরপাড়ের রাতটির কথা মনে পড়ে গেল প্রম্লোচ্চারঅবিকল সেই জাম্বুবানবেশী যুবাপুরুষ! সেদিন সেই পুরুষটির লৌহমুষলতুল্য বাহু আর হিমালয়তুল্য বক্ষে নিষ্পেষিত হয়েছিলেনসেই সুখানুভূতি কি প্রম্লোচ্চা কখনও বিস্মৃত হতে পারেনপরবর্তী কালে অনেকেই এসেছে জীবনে, হৃদয় বিনিময়ও হয়েছে, কিন্তু অ্যাতোদিন পরেও সেই মানুষটির মূর্তি যেন তাঁর সিকিভাগ হৃদয় অধিকার করে আছে।প্রম্লোচ্চার বাক্যস্ফূর্তি হল না। চিত্তে ষোড়শীর শিহরণ অনুভব করলেন তিনি। যদিও তা প্রকাশ করলেন না।

র আমি তোমায় কোথাও যেতে দেব না গো, চিরকাল এমনি করে বাহুডোরে বেঁধে রাখব বাষ্পান্বিত চোখে বললেন কাঙাল। তার ধুতিটি কটিচ্যূত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর হেলদোল হল না, তিনি আরো নিবিড়পাশে কাছে টেনে নিলেন প্রম্লোচ্চাকে।

ত্রৈলঙ্গ তখনও তেঁতুলগাছের মগডালে। কাঙালের সেই ক্ষিপ্র দৌড় দেখেই তিনি ব্যাপারটা আন্দাজ করেছিলেন। তিনি তফাতে দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে সেই মিলনদৃশ্য উপভোগ করতে লাগলেন।

অ্যাতোই যদি চাইতেন আমায়, কেন পালিয়ে গিয়েছিলেন তবে! একবার ঘুণাক্ষরেও ভেবে দেখেছিলেন আমার মনের অবস্থাটা

প্রাথমিক ভাব বিনিময় হবার পর সেদিন গেঁড়ে গিরিধারীর পুকুরপাড়ে এই প্রশ্নটাই ধেয়ে এল কাঙালচরণের দিকে। প্রম্লোচ্চা ততক্ষণে কোল থেকে নেমে পড়েছেন।

ভেবেচি গো, শুধুই ভেবেচি। ভাবনার বানে ভেসে গিয়েচি শুধু, কূল পাইনি। আজ সবই খুলে বলব তোমাকে সজল চোখে কাঙাল বলতে শুরু করলেন। তাঁর মাতৃসত্য রক্ষার কথা বর্ণনা করলেন, পারিবারিক দায়বদ্ধতার কথা বললেনদুর্ভাগ্যবশত প্রম্লোচ্চার হৃদয় তাতে বিগলিত হল না

পনি তো আপনার বাপ-মাকে চিনতেন, জানতেন যে তারা এ সব মেনে নেবে নাকো। সবজেনেও তবে কেন আমায় প্রতিশ্রুতি দিতে গেলেন

বিশ্বেস করো, লক্ষ্মীটি, ভেবেছিলুম মা-বাবাকে আমি ঠিক রাজি করিয়ে ফেলব একমাত্তর সন্তান আমি, আমার সুখের জন্য ওঁরা কক্ষনো অবুঝ হবেন না। কিন্তু… 

বলতে বলতে শোকবিহ্বল শৃগালের মতো অশ্রুবিয়োগ করে ফেললেন কাঙাল। তাঁর প্রেমের নমুনা দিলেন নানা উদাহরণ দিয়ে দুজনের এই সেন্টিমেন্টাল ডিস্‌কোর্স ত্রৈলঙ্গ রায়ের কানেও এল। তিনি অযাচিতভাবে এগিয়ে এলেন, প্রম্লোচ্চার প্রতি কাঙালের আমৃত্যু কমিটেড থাকার ইতিহাস যতটুকু জানেন বোঝানোর চেষ্টা করলেন। আজীবন একটি সফটওয়্যার কোম্পানির কেরানিবৃত্তি করেছেন, ফিরিঙ্গি মক্কেলদের কনভিন্স করা তাঁর আপিস-কর্তব্যের অঙ্গ ছিল। সেই দক্ষতাকেই তিনি কাজে লাগাবার চেষ্টা করলেন।

চ্ছা, মানলুম আপনার ভালোবাসা, এই ছোকরার কথাও শুনলুম মন দিয়ে! কী যেন নাম বললে বাছা তোমার, ত্রৈলঙ্গ? যাক, একটা কথা বলুন দিকি, আপনার বাপ-মা তো এই প্রেতলোকেই আছে, তারা যদি এসে আবার আমায় ত্যাগ করতে বলে, তখন!

অ্যাতোক্ষণ কাঙাল কেঁদেকেটে গলদ্ঘর্ম হয়ে গিয়েছিলেন, জ্বলজ্বলে চোখদুটো ছাই হয়ে যাচ্ছিল, হতাশায় পুকুরপাড়ে গড়াগড়ি দিয়ে দিচ্ছিলেন অর্বাচীন শিশুর মতোপ্রম্লোচ্চাকুমারীর এই প্রশ্নটা শুনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন, মুখে ভাষা জোগাল নাএ প্রশ্ন তো কস্মিনকালেও নিজেকে করেননি কাঙাল এঁর কোনো যুক্তিগ্রাহ্য উত্তরই যে তাঁর কাছে নেই! এখনো যদি দোর্দণ্ডপ্রতাপ পিতৃদেব ঈশ্বর বাউলচরণ মুখুটি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলে দেন, তৈলাক্ত বাঁশ আর নাছোড়বান্দা শম্বুক-এর আঁকটা কষেচ? কষোনি? পড়াশোনা গোল্লায় দিয়ে শেষে এক যা-ত্রা-ভি-নে-ত্রী! হা হতোস্মি! কোথায় যাবেন কাঙাল! মা তো আবার দিব্যি দেবেন নিশ্চিত! ওফ, এ তো সাধারণ প্রশ্নবাণ নয়, সাক্ষাৎ পাশুপত! মিলনসুখ বোধহয় তাঁর অদৃষ্টে নেই!

সলে, পিতাঠাকুর তো অনেকদিনই এখানের বাসিন্দা ছিলেন, অ্যাতোদিনে নিশ্চিত ওঁর বিচার হয়ে পুনর্জন্ম হয়েচে। আর মা- আমতা আমতা করে বললেন কাঙাল। মগজমন্থন করে এঁর বেশি কিছু আর নিষ্কাশিত হল না।

র যদি বিচার না হয়ে গিয়ে থাকেপ্রম্লোচ্চার বাক্যবাণ। 

পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ত্রৈলঙ্গ রায়ও চিন্তায় পড়ে গেলেন কাঙালচরণ প্রম্লোচ্চাকুমারীকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে তাঁর প্রেতজন্মও বৃথা যাবে, এ রকমই মনে হতে লাগলএই পরিস্থিতি থেকে কীভাবে মুক্তি পাওয়া যায় ভাবতে লাগলেন তিনি, চকিতে তাঁর উর্বর মস্তিষ্কে কূটবুদ্ধি খেলে গেল।

সলে দাদুর একটু স্মৃতিবিভ্রাট হয়েছে। দাদু, সেই কথাটি কি ভুলে গেলেন নাকি? কাঙালের দিকে তাকিয়ে চোখ মিটমিট করে বললেন ত্রৈলঙ্গ। 

কোন্ কথাটি বলো দেখি, দাদু, আমার তো ঠিক খেয়াল পড়চে না। 

ই যে, আপনি বলেছিলেন যে মরবার আগে বাপ-মায়ের পিণ্ডি দিয়ে এসেছিলেন গয়ায়, ভুলে গেলেন সে কথা?

হ্যাঁইয়েমানে ঠিকই কাঙাল প্রথমে একটু অপ্রতিভ হয়ে গিয়েছিলেন, এখন সামলে নিলেন। য়েসটা বড্ড বেশিই হয়েচে, অতো পুঙ্খানুপুঙ্খ খেয়াল থাকে না। আসলে এই গতবছরই পিণ্ডি দিয়ে এসেচি শ্রীবিষ্ণুর পাদপদ্মে

তাহলে নিশ্চয় এখন ওঁরা প্রেতলোকের ঊর্ধে বিরাজ করছেন। তাই তো, দাদু? বললেন ত্রৈলঙ্গ। একটি মহান কার্যসিদ্ধির জন্য একটু কেরামতি করতে হল।

বিলক্ষণ, দাদুভাইদেখেচআসল কথাটাই খেয়ালই ছিল না আমার। পিণ্ডি যখন দিয়েচি তখন নিশ্চিত তাঁদের আত্মা মুক্তি পেয়েচে, প্রেতদশা কেটে গিয়েচে তাঁদের। ব্যস, তাহলে তো আর কোনো বাধাই রইলো না! কী গো, কী বলোপ্রম্লোচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন কাঙাল। প্রম্লোচ্চার সঙ্কুচিত ভুরু শিথিল হয়েছে, কাঙালের মনে হল অ্যাতোদিনে নিজের অভিনয় প্রতিভার সদ্ব্যবহার হল। তবে নিখাদ অসত্যভাষণের জন্য তিনি নিজেকে তিরস্কার করলেন আর ত্রৈলঙ্গের উপস্থিত বুদ্ধির তারিফ করলেন মনে মনে।

কী গা, এর পরেও আর কোনো প্রশ্ন আছে নাকি? প্রম্লোচ্চার বাঙনিষ্পত্তি হল না দেখে বললেন কাঙাল।

প্রম্লোচ্চা বোধহয় আরো কিছু বলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, হয়তো জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন, ত্যি করে বলুন তো, ওঁরা এখানে থাকলে আপনি আবার আমায় ছেড়ে চলে যেতেন?

কিন্তু কাঙাল আর তাঁকে সে সুযোগ দিলেন না। ত্বরিতে গায়ে গায়ে এলেন প্রম্লোচ্চার, ডানহাতটি দিয়ে ওঁর স্ফুরিত ওষ্ঠাধর আলতো করে চাপা দিলেন। তারপর ধীরে ধীরে তাঁর মুখটি নামিয়ে নিলেন প্রম্লোচ্চার মুখের উপর।

শুভদৃষ্টি, প্রগাঢ় আলিঙ্গন আর দী-র্ঘ চুম্বন।

কাঙালের মুখের আভ্যন্তরীণ ভগ্নদশা, বয়সজনিত কারণে মুখগহ্বরস্থিত যন্ত্রপাতির নিখুঁত সমন্বয়ের অভাব এবং অধরামৃত পানে তাঁর অপটুত্বের জন্য বেশ জোরেই শব্দ হল।

পরিস্থিতি আঁচ করে আগেই পিঠটান দিয়েছেন লাজুক ত্রৈলঙ্গ। তিনি শুধু শুনলেন কপোত-কপোতীর কথোপকথন। 

পনার এইরকম লম্বাদাঁত তো ছিল নাকো! সেই আপনিই তো! একটু হেসে বললেন প্রম্লোচ্চা।

গুলো শ্বদন্ত। তোমারও হয়েচে, পুকুরের জলে দেখে এসো গিয়ে! মুচকি হেসে বললেন কাঙাল।

লছেন? তা আপনার শ্বদন্ত হলে, আমার গজদন্ত!

স্বয়ংবর সভার বিজয়ীর জন্য গাঁথা দশ বাইচণ্ডিফুলের মালাটি তখনও প্রম্লোচ্চার গলায় অক্ষতওইটিই কাঙালের গলায় পরিয়ে দিলেন তিনি। মদন চতুর্দশী তখনও কাটেনি, বিরহের হীরক জয়ন্তী পেরিয়ে প্রম্লোচ্চা কুমারী আর তাঁর আজীবন আরাধ্যক কাঙালচরণ মুখুটির মালাবদল হল। ঝাঁকেঝাঁকে জোনাকিরা এসে শূন্যেই শুভবিবাহ লিখে গেলপুকুরপাড়স্থিত নক্তচারী জন্তু-জানোয়াররা ভিড় করে দেখতে লাগল এই অদ্ভূত মিলনছোলঙ্গ আর তার দলবল আশেপাশেই লুক্কায়িত ছিল, এই দৃশ্যদেখে তারা সমবেত উলুধ্বনি করল, কেউ তড়িঘড়ি পুকুর থেকে শালুক তুলে এনে তার পাপড়ি ছড়িয়ে দিতে লাগলঠাঁকুমা, এঁবার কিঁন্তু আঁমাদের বেঁ-টা মৃদু গলায় দাবী করতে ছাড়ল নাকাইনেটিকের লগুড়াঘাত খেয়ে প্রেতদর্শন গেজেট এর সাংবাদিক মুর্চ্ছা গিয়েছিল, এখন জেগে গিয়ে সে নববিবাহিতের সাক্ষাৎকার নিল

প্রম্লোচ্চার সাক্ষাৎকার চলাকালীন কাঙালকে একটু তফাতে নিয়ে গেলেন ত্রৈলঙ্গ

দাদু, পিণ্ডি দেবার ব্যবস্থাটি কিন্তু যত শিগ্‌গির সম্ভব করে ফেলতে হবে, না হলে কিন্তু অনর্থ বাধবে ত্রৈলঙ্গ ফিসফিস করে বললেন কাঙালচরণকে।

জানি দাদুভাই। মিথ্যাচার করতে হল সেসময়, ও ছাড়া উপায়ও ছিল নাঅবিশ্যি পরে একটি শ্লোক মন পড়ল, মহাভারতের কর্ণপর্বে অর্জুনকে দেওয়া শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে পষ্টাপষ্টি বলা আছে বিবাহকালে অসত্যভাষণে দোষ নেই:

বিবাহকালে রতিসম্প্রয়োগে

প্রাণাত্যয়ে সর্বধনাপহারে।।

বিপ্রস্য চার্থে হ্যনৃতং বদতে

পঞ্চানৃতান্যাহুরপাতকানি।।

সে যাক। এখন কাকে দিয়ে যে পিণ্ডি দেয়াই, সেটাই ভাবচি। আমার তো সাতকুলেও কেউ নেই আর। তবে পাথুরেঘাটায় আমার এক দূরসম্পর্কের ভাই আছে, তাকে স্বপ্ন দিতে পারি। যদিও বয়স তার অনেক হয়েচে, গয়া যেতে গিয়ে আবার তার কাশীপ্রাপ্তি না ঘটে!

উঁহু দাদু, পিণ্ডি খাবার বয়সে লোকে কী আর পিণ্ডি দিতে যায় নাকি। ওসব দায় আর তখন থাকে না। আপনি একটু কমবয়সী দেখুন

তাও বটে। দেখি, ওর ছেলেপিলেদের কাউকে ভয় দেখিয়ে দেখি

তাই করুন, ভয় দেখানের কাজে দরকার হলে ফ্যারাওকে ডাকা যেতে পারে। তবে সাবধান। ভালো করে বুঝিয়ে দেবেন যেন আপনার বাবা-মায়ের নামেই পিণ্ডি পড়ে, উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে যেন না হয়ভুল করে আপনার নামে দিয়ে ফেললে কিন্তু খেল-খতমডানহাতে তুড়ি বাজিয়ে বললেন ত্রৈলঙ্গ।

ওদিকে মহানগরীর নিকষকালো আকাশে কয়েকজন নিম্নপদমর্যাদার দেবপুরুষ তাঁদের কর্তব্যে মগ্ন ছিলেন। কাঙাল প্রম্লোচ্চার অভূতপূর্ব মিলন দেখে তাঁরাও চমকিত। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলেন:

দেব এক: আহা! এই রকমও হয়কাঙালচরণের এলেম আর প্রেম দুটোই আছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হবে কী, হয়তো ক’দিন পরেই বিচারের জন্য পেয়াদাধরে নিয়ে যাবে এদেরআচ্ছা, প্রভুকে বলে যমদপ্তরে একটা ফরমান পাঠানো যায় না।

দেব দুই: কী ফরমান?

দেব এক: যে এই দুজনের বিচারকার্য কিছুদিন স্থগিতরাখা হোক, এদের আরো কিছুকাল সংসার করতে দেওয়া হোক।

দেব দুই: পাঠানো মুশকিল। তখন বলবে যমদপ্তরের কাজে কেন্দ্র থেকে হস্তক্ষেপ করা হচ্চে।

দেব এক: হুমম। যমদপ্তরটা একটা ঘোঘের বাসা হয়েচে। এইজন্যেই কাইনেটিক বিদ্যেধরের বিরুদ্ধে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া গেল না!

দেব দুই: তা তো বটেই। তবে শুনলাম কাইনেটিক নাকি শেষমেশ নীলাম্বরীকে বিয়ে করেচে, ভীমঘণ্টের হাতে তুলে দেয়নি।

দেব: এই মাত্তর আমার চর আমাকেও এই একই খবর দিয়েচে। তবে এতে কাইনেটিকের যত না কৃতিত্ব তার চেয়ে বেশী কৃতিত্ব নীলাম্বরীর আজ সন্ধেবেলায় ওর চালচলন দেখেই বুজেচি ছেমরির রসের প্রাবল্য হয়েচে। সেরেফ প্রম্লোচ্চাকে বাঁচাতে গিয়ে সে কাইনেটিকের হাতে ধরা দিয়েচে তা বোধহয় নয়, ওর ওইটিই অভীষ্ট ছিল।

 

যৌতুক হিসেবে প্রম্লোচ্চা পেলেন একটি জোয়ান নাতি। ত্রৈলঙ্গের একটি নতুন ঠাকুমা হল প্রেতলোকে পদার্পণ করার পর পর একটি স্নেহশীল ঠাকুর্দা পাওয়া গিয়েছিল, নবতম সংযোজন এই ঠাকুমা।

তুমি তো দেখচি বাপু একাচোরা মানুষটি, এই বয়সে একা একা থাকা কি পোষায়আমার বোনের নাতনি আছে একটি, চিকনবরণীউত্তরপাড়ায় থাকে, পড়ালেখাতেও ভালো।শিগগির তাঁর একটি ফাঁড়া আছে আমি গুণেচি, তুমি অপেক্ষা করতে পারবে কী কয়েক মাসবললেন প্রম্লোচ্চা। নট্টমন্দির অপেরায় নায়িকাবৃত্তির পাশাপাশি প্রম্লোচ্চাকুমারী শখের জ্যোতিষচর্চা করেছেন, চিতপুর যাত্রা পাড়ায় তাঁর এই ব্যাপারে খানিক খ্যাতিও ছিল।

ত্রৈলঙ্গ লজ্জাবনত হলেন। কলেজ জীবনটা স্যার বর্গীনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের শাকরেদি করে কেটেছে। একান্তে নারীচিন্তা করেছেন বিস্তর, কিন্তু গাঢ় নারীসংশ্রব করেননি সেরকম। আজ চিকনবরণীকে বিয়ে করার প্রস্তাব পেয়ে তাঁর রোমাঞ্চ হল।

প্রম্লোচ্চাকে বিবাহের পর নিজের পৈতৃক ভিটেতেই গার্হস্থ্যাশ্রম শুরু করলেন কাঙালচরণ। কাঙালের পঞ্চত্বপ্রাপ্তির পর বাড়িটা ফাঁকাই পড়েছিল। ওঁদের অনুরোধে ওই ভিটের একটি কামরায় ত্রৈলঙ্গেরও ঠাঁই হল।

ত্রৈলঙ্গ রায় যদি লৌকিক জীবনে অবিবাহিত ছিলেন, প্রেত জীবনে যদিও তাঁর ব্রহ্মচর্য অটুটতা সত্ত্বেও দাম্পত্য জীবনের প্রারম্ভকালটির গুরুত্ব তিনি বিলক্ষণ বোঝেন, এই বিশেষ সময়টিতে নবপরিনীত রামহোৎসাহে শৃঙ্গারতত্ত্বের গুহ্য রহস্য উদ্ঘাটনে মত্ত হয়, দাম্পত্য জীবনের এই পর্বেই দেহতত্ত্বাদি বিষয়ক জীবন্ত ল্যাবরেটরির সিংহদ্বার খুলে যায় যুগলের কাছে। তাঁর সর্বত্রগামী অশরীরী উপস্থিতি যুগলের নিরবচ্ছিন্ন গবেষণায় বিঘ্ন ঘটাতে পারেএই সম্ভাবনা জ্ঞান করে আর দেরী করলেন না ত্রৈলঙ্গ, প্রম্লোচ্চাকুমারী আর লাঙলচন্দ্রের সংসারকে কিছুদিনের জন্য বিদায় জানালেন। সোজা চলে এলেন উত্তরপাড়ায়

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য।)

 
 
top