চ্যবন মুখুজ্জ্যেদের বার্ষিকগতি

 

ফোনটিকে নিয়ে উপরকোঠায় এসে বসলেন চ্যবন। আগাপাশ্‌তলা মৃত্তিকানির্মিত দোতলা কোঠাবাড়ি, খড় দিয়ে ছাওয়া, কড়িবর্গাগুলো তালকাঠেরপিসেমশাই সর্বজ্ঞের চাটুজ্জ্যের যেটুকু সম্পত্তি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন সীতাপতি, তারমধ্যে এই বাড়িটিও ছিল। বহুবছর আগেই এই জীর্ণ বাড়িটি ভেঙ্গে একতলা পাকাবাড়ি করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন চ্যবন। তখন সীতাপতি বাধা দিয়েছিলেন। নারায়ণশিলা রাখার কুলুঙ্গি, সর্বজ্ঞ চাটুজ্জ্যেরর পৈতৃক ত্রিশূলটি রাখার কোণ, মা লক্ষ্মী পাতবার বেদীখানি—সবই এই মাটির ঘরের একতলায়। এসব চুরমার করতে সাহস হয়নি সীতাপতিরচ্যবন নিজেও এখন আর ভাঙচুর চাননা।

দোতলার এইকোঠাটিতেই একমাত্তর ইন্টারনেটের সিগন্যালটা ভালো পাওয়া যায়। চ্যবন আন্তর্জালে যুক্ত হয়ে গেলেন। নৈশাহারের দেরী আছে, এখন একটু খবর পড়বেন, সারাদিন সময় পাননি। রুরুর ছবি পাঠানোর কথা আমেরিকার দুর্গাপুজোর, সেটিও দেখতে হবে

-মেলটা খুলতে একটু সময় লাগছে। রুরু গতবার যখন দেশে এসেছিল, এই ফোনটি কিনে দিয়েছিল, -মেল-আইডি বানিয়ে দিয়েছিল, ব্যবহারপ্রণালীও শিখিয়ে দিয়েছিল। বেশ কিছুদিন ব্যবহার করার পর চ্যবন এখন বেশ স্বচ্ছন্দ হয়েছেন। গুগ্‌ল্‌ সার্চ করাও আয়ত্ব করে ফেলেছেন।

দু’খানা ছবি পাঠিয়েছে রুরু। ফোনের পটে ভেসে উঠতে সময় নিয়েছে একটু, বেশ উজ্জ্বল ছবি। একটিতে রুরু পাজামা-পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে, পশ্চাৎপটে দুর্গামূর্তি, দুর্গামূর্তির সামনে ধুনুচি হাতে পুরোহিত। আরেকটিতে একই পোষাকে রুরু, পশ্চাৎপটে সেই দুর্গামূর্তি, কিন্তু রুরুর বামপার্শ্বে একটি নারীমূর্তিসালোয়ার কামিজ পরা, লম্বাটে গড়ন, রুরুর মত অতো ফর্সা নয়, তবে বেশ সুশ্রী। মেয়ে কোত্থেকে এলো! চ্যবন ভ্রুকুটি করলেন

শুনচ, বুঝলে! ছবি দুটো দেখেই হাঁক পাড়লেন চ্যবন। মেয়েটির ছবি দেখে একটু চিন্তিত হয়ে পড়েছেন চ্যবন, স্ত্রী কুমুদবতীকে দরকার এইসময়।

কী হয়েচে? কুমুদবতী নীচের তলায় ছিলেন, হয়তো ব্যস্ত কোনো কাজে।

অ্যাই রুরু ছবি পাঠিয়েচে

সচি

আবার ভালো করে ছবিটি দেখলেন চ্যবনরুরু কী সেদিন এই মেয়েটির কথাই বলতে চেয়েছিল! সেই ভোররাতের কথাটা খুব মনে পড়ল চ্যবনের, সেই হাম্বীর বাউরির কাঁধে এক রত্তি রুরু, নদীর খেয়া ধরার জন্য হনহন করে হাঁটছেন চ্যবন তারপর ভালোয় ভালোয় পরীক্ষা হয়ে গেলে রুরু বিস্কুট খেতে চেয়েছিল। সেই রুরু! তা রুরুর সঙ্গে ভালোই মানাবে মেয়েটিকে, জেমিনি চাটু্জ্জ্যেদের ঈর্ষা হবে নিশ্চিত মুখুজ্জ্যেদের ছেলে বিদেশবাসী হয়েছে, এতেই চাটুজ্জ্যেরা হিংসেয় জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে ভেতরে ভেতরেআর এইরকম পাত্রী পেলে তো-! চ্যবনও আহ্লাদিত হচ্ছেন অন্দরে অন্দরে, এইরকমই তিনি চেয়েছিলেন। কিন্তু নাম কী মেয়েটির, কোথায় বাড়ি!

ই দেখো কার ছবি চ্যবন ফোনটি বাড়িয়ে দিলেন। পাশেই চ্যবনের চশমাটি রাখা, কুমুদবতী সেটিই পরে ফোনটি হাতে নিলেন।

বলেছিল ছবি পাঠাবে ভালো করে দেখতে দেখতে বললেন কুমুদবতী, ভালোই তো?

তুমি সব জানো?

বলেচে কিছু কিছু। তোমায় বলতে বারণ করেচে, বলচে নিজেই বাবাকে বলবসেই একটা সিরিয়াল হয় না, সেই মেয়েটার মত দেখতে না অনেকটা?

কী নাম? থাকে কোথায়? কুমুদবতীর প্রশ্নটিকে পাত্তা না দিয়েই বললেন ব্যগ্র চ্যবন।

জুধর্মা। বরানগরে বাড়ি। আপিসের কাজে এখন সুগারল্যাণ্ডে আছে

অ্যাঁ?

জুধর্মা ঋজুধর্মা

জুধর্মা? নামটা আনকোরাঋজুধর্মা মা দুর্গার নাম বোধহয়! চাকরি করে?

হ্যাঁ, সেরকমই বলল রুরু

কোথায় করে কিছু বলল?

কী একটা নাম বলল, কী কনসালটেন্সি একটা

অ্যাঁ?

কী একটা কনসালটেন্সি মনে নেই এখন

জুধর্মা কী?

রা

অ্যাঁ?

রা, রায়। তুমি এবার কানের ডাক্তার দেখাও

রা!

রায় সাধারণত উপাধি হয়, রায় কারোর প্রকৃত পদবি হয় না। চ্যবনের পুরোনো আপিসে এক সহকর্মী ছিল, পদবি ছিল রায়, কিন্তু আসলে ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়, মোঘল আমলে পূর্বপুরুষরা রায় উপাধি পেয়েছিল। সিড়িঙ্গে মত ছিল ছেলেটা, নিরীহ ছিল, চ্যবনের অবসর নেবার বছর খানেক আগে চাকরিতে ঢুকেছিল। আরেকজন ছিল তারাগতি রায়, ইস্কুলের বন্ধু, ছিল উগ্রক্ষত্রিয় মানে আগুরি। মারকুটে স্বভাব ছিল, লেখাপড়া হয়নি সেরকম। খুব ছোটোবেলায় জামির রায় বলে একজন আসত পিতৃদেবের কাছে, ইন্দ্রজালে পারদর্শী ছিল। টাকা নিমেষে দ্বিগুণ করে দেবে বলে সীতাপতিকে খুব ধরেছিল, সীতাপতি রাজি হননিকানাকড়ি ছিল কোথায় সীতাপতির! তা, সে ছিল বোধহয় পূর্ববঙ্গীয় উদ্বাস্তু, জাত বলতো সোনার বেনে। আর রায়দের মধ্যে রামমোহন রায় বামুন, সুকুমার রায় ব্রাহ্ম, অন্নদা রায় নীহার রায় কী ছিলেন জানা নেই। রায় কী না হয়! বামুন, কায়েত, বেনে, আগুরি! চ্যবন মনে মনে শুধু এসবই ভাবছেন। জাতধর্ম নিয়ে আগে সেরকম কী ভেবেছেন চ্যবন? সেই কোন যুগে তিনিই তো বামুন-বদ্যি বিবাহ সমর্থন করেছিলেন। বাপের সম্মুখে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, বিদ্যেসাগর সেই যুগে যদি নিজের ছেলের সঙ্গে বিধবার বিয়ে দিতে পারে, তুমি বদ্যির সঙ্গে নিজের ছেলের বিয়ে দিতে পারবে না কেন? চ্যবন তখন বামপন্থী কর্মী, ফুরসৎ পেলে সংগঠনের কাজ করেন, সাঁওতালপাড়ায় নিয়মিত যাতায়াত, লেদেম সাঁওতালের সঙ্গে এক থালায় মুড়ি খান লেদেমের মা ফুলমনি মেঝেন একবার ঢ্যামনা সাপের ঝোল খেতে দিয়েছিল, চ্যবনের রুচি হয়নি সেরকম, তবে মুখে প্রকাশ করেননি, এক’দুপিস বাদ দিয়ে খেয়ে নিয়েছিলেন এই নিয়ে কথা উঠেছিল গাঁয়ে, এক সালিশিসভায় চিনুকচরণ চট্টোপাধ্যায় চ্যবন আর তাঁর সাঙ্গপাঙ্গো গদা, ছিলকুদের জরিমানা করার রায় দিয়েছিল। চ্যবনরা সেদিন প্রকাশ্যে আপন আপন লুঙি উত্তোলনের মাধ্যমে ফ্রন্টাল ন্যুডিটি করে অসভ্যতা করেছিলেন, উড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই রায়ওফ্‌ সে এক সময় ছিল বটে, তাগিদ্‌টাই ছিল অন্য। তখন চ্যবনের নিবিড়কৃষ্ণ কেশ, ছ’ফুট লম্বা সিধে লাশ, দশনম্বর সাইজের জুতো পরে গটপগট করে হাঁটেন বয়েসটা কত অল্প ছিল তখন!

কী জাত কিছু বলেচে? মুখ দিয়ে প্রশ্নটা যে বেরিয়ে গেল তা নয়, চ্যবনকে দিয়ে যেন কেউ প্রশ্নটা করিয়ে নিল।

মি বারবার শুধোলাম, বলচে সব বলব পরে উদ্বিগ্ন গলায় বললেন কুমুদবতী।

তুমি ভালো করে শুধিয়েছিলে?

লচি তো বারবার শুধোলাম, কিছুতেই বলতে চায় না ছেলে

বাঙালি তো বটেই, সেটা নিয়ে ইয়ে নেইকিন্তু জাতটা

জ যখন ফোন করবে তখন জিজ্ঞেস করো

সে তো করবই। কিন্তু আমার কী রকম একটা লাগচে। অন্যজাতটাত নয় তো, হ্যাঁগো! কায়েতটায়েত…? চ্যবন সারাশরীরে ভয়ানক উত্তাপ অনুভব করলেন ভয় আর আশঙ্কার মেঘ পুঞ্জেপুঞ্জে এসে আচ্ছন্ন করে ফেলল চ্যবনের মনকে অ্যাতো ভয় কোথায় আত্মগোপন করে ছিল অ্যাতোদিন—বার্ধক্যগ্রস্ত চ্যবন নিজেই ঠাহর করতে পারলেন না জেমিনি চাটুজ্জ্যেদের উল্লাস যেন স্পষ্ট শুনতে পেলেন চ্যবন, ওদের বাড়ির কুয়োতলার কাছে অস্থায়ী উনুন বানিয়ে মুর্গি রান্না হচ্ছে, হইহুল্লোড় হচ্ছে, মুখুজ্জ্যেবাড়ির ছেলে বিয়ে করেছে কায়েতকে! চ্যবনকে উপহাস করে টুসুর গান বেঁধেছে চাটুজ্জ্যেবাড়ির মেজোবউ, ষোলোআনা কমিটি জরিমানা করছে চ্যবনকে, দেদার কুম্ভীরাশ্রুও পড়ছে। কারা যেন আলকাতরা দিয়ে মুখুজ্জ্যেদের দেওয়ালে লিখে দিয়ে গিয়েছে, হায় হায় একি হলো, চ্যবনবাবুর ধম্ম গেলো! যে জেমিনি চাটুজ্জ্যেদের সামনে দিয়ে স্ফীতবক্ষে হেঁটে যেতেন চ্যবন, তাদের দেখে এখন মুখ গোপন করছেন

উপরকোঠায় উবু হয়ে বসে চ্যবন মুহূর্তের মধ্যে এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন দেখলেন

না, বামুনই বটে নিশ্চয়। আমাদের রুরু কী আর…! ম্রিয়মান কণ্ঠে বললেন কুমুদবতী।

না গো কায়েতটায়েত চলবে না! রুরুকে আমি পষ্ট বলে দেবো, বামুন ছাড়া আমি অনুমতি দেবোই না ধীরে ধীরে বলে উঠলেন চ্যবন সীতাপতির যে গ্রাম্যসংস্কারকে এককালে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলেন ত্রিংশৎ চ্যবন, সেই সংস্কার ষষ্টিতে এসে যেন চ্যবনের সমগ্র চেতনাকে অধিকার করল।

বাবা অমত করেনিসোল্লাসে এই কথাটি জানানোর জন্য দাদাকে খুঁজতে খুঁজতে উপরকোঠার সিঁড়িতে পৌঁছে গিয়েছেন ত্রিভঙ্গ মুখুজ্জ্যেদাদা-বৌদির সম্পূর্ণ কথোপকথন শুনেছেন সিঁড়িতে দাঁড়িয়েআটের দশকের সেই ঘটনার পর অসংখ্য ঋতুপরিবর্তন হয়েছে, অসংখ্য আহ্নিক আর বার্ষিক চরকিপাক সমাপ্ত করেছে পৃথিবী, দাদাটিও বৃদ্ধ হয়েছেন ওখানেই স্থির হয়ে থাকেন ত্রিভঙ্গ, দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়ে। এরপর আর সুখবরটি দেবার প্রয়োজন বোধ করেন না তিনি

(সমাপ্ত।)

 
 
top