ত্রৈলঙ্গ রায়ের আজ কালের আখ্যান

 

উত্তরপাড়ার একটি শতাব্দীপ্রাচীন অট্টালিকার গোসলখানায় মিস চিকনবরণী সেনের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বিভোর হয়ে গেলেন দীঘলগাঁয়ের ত্রৈলঙ্গ রায়। খুঁজে খুঁজে আনকোরা এই নামখানা যিনি রেখেছিলেন, তাঁর জ্ঞানগম্যির তারিফ না করে পারলেন না। কাঁচা দুধে কাঁচা হলুদ মেশালে যে রকম রঙ হয়, অবিকল সেই রকম! ছোটোবেলায় সর্দিকাশির উপদ্রব হলে মা দুধ আর কাঁচা হলুদ মিশিয়ে খাওয়তোকফ নাকি ফৌত হয়ে যেত তাতে। কফ ফৌত হত কিনা স্মৃতিতে নেই, কিন্তু সেই রঙটা স্মৃতিপটে আঁকা আছে এখনো। ঘরটা আঁধারে, চল্লিশ ওয়াটের বেশী স্পর্ধা নেই বাল্বটার, কিন্তু চোখের জ্যোতি আগের চেয়ে কম সে কম পঞ্চাশগুণ হয়ে গিয়েছে অনেকদিন পর আবার সেই চেনা রঙটাই প্রত্যক্ষ করলেন ত্রৈলঙ্গ রায় চিকনবরণীর অঙ্গে যেন দুধ-হলুদের বান ডেকেছে। কোমরের বাঁদিকের কাছে দুএকখানা প্রকট লালতিল সেই দুধ-হলুদের মহিমাচতুর্গুণ বাড়িয়েছে। চিকনবরণীর নিটোল নিতম্বের বিভাজিকা আর ঈষত পৃথুল নির্লোম নিষ্কলুষ দুটি জঙ্ঘার দিকে গোপনে চেয়ে থাকতে থাকতে ভোম হয়ে গেলেন ত্রৈলঙ্গ রায়।

সেরেফ এই মেয়েটির টানেই তো মহানগরীর আস্তানা ছেড়ে উত্তরপাড়ায় একটা বিশ্রী বেলগাছের ডালে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। এলাকায় সারাক্ষণ শাঁকচুন্নিদের ছুঁচোর কেত্তন, বেম্মদত্যি-পেঁচো-পুশকরা-মামদোদের আকচাআকচি! আঁধার নামল কী, এদের দৌরাত্ম্যে টেকাই দায় হয় ত্রৈলঙ্গ রায়ের মতো শিক্ষিত মার্জিত প্রেতের এই সব দুষ্কৃতির সংস্পর্শ ত্যাগ করবেন বলে একসময় দীঘলগাঁয়ের ভিটে অব্দি ছেড়েছিলেন তিনি। অথচ আজ, উত্তরপাড়ার রেল ইস্টিশানের ধারে এই বেলগাছে বসে নিশ্চুপে সব কিছু মেনে নিচ্ছেন, চিকনবরণীর ত্রিসীমানায় থাকার লোভে গেরস্থ বাড়িতে বিষ্ঠা ছিটানোর মতো মামদো-কীর্তি উপেক্ষা করছেন, এর-ওর বাড়িতে গিয়ে মাঝরাত্তিরে দাঁত খিঁচোনো, খাল-বিল-ডোবা থেকে রুই-কাতলা-কালবোস খালাস করে দেওয়া শাঁকচুন্নিদের ছ্যাঁচড়ামির প্রতিবাদ পর্যন্ত করছেন নাএকটি মার্কিন তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কেরানিবৃত্তি করার সুবাদে প্রায়োরিটি নির্দিষ্ট করার ক্ষমতা জন্মেছে তাঁর অনেকদিনই, প্রতিবাদ ট্রতিবাদের চেয়ে নির্বিঘ্নে চিকনবরণী সেনকে ঘরে তোলাটাই তাঁর কাছে এখন হাই প্রায়োরিটি

আর তো কটা মাত্র দিন, এই বৈশাখমাসেই তো চিকনবরণীর সেই প্রাণঘাতী ফাঁড়া।

ই ফাঁড়া কাটানোর সাধ্যি কারো নেই। অনেক মাদুলি কবচ যজ্ঞি করেচে ওরা, কিন্তু পারবে না। আমি আমার অক্কাপ্রাপ্তির অনেক আগেই এই গণণা করে গিয়েছিলুম…আমার গণণা ভুল হবার নয়। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো ত্রৈলঙ্গদাদু, চিকনবরণী তোমারই হবে নতুন ঠাকুমা আশ্বস্ত করেছেন ত্রৈলঙ্গ রায়কে।

চিকনবরণীদের চানঘরটির চার দেয়ালের বৈবর্ণ্য এবং বাহ্যকৃত্যাদি করার কুণ্ডটির আবিল্য ওঁর অঙ্গসৌষ্ঠবের জন্য নজরেই পড়ছে না। সে এখন ঝরনা-কলের নীচে দাঁড়িয়ে অঙ্গমার্জনা করছে, মখমলের মতোচুল উঁচু করে বাঁধা। ফেনিল জলবুদ্বুদওর রেশমচিকন অঙ্গে অবাধে হড়কে বেড়াচ্ছেওর উন্মুক্ত পৃষ্ঠসংলগ্ন কুচকুম্ভদুটির আভাষ মাত্র লক্ষ্য করে ত্রৈলঙ্গ দারুণ উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন, ইচ্ছে করছে পিছন দিক থেকে গভীর আশ্লেষে আলিঙ্গন করে ওকে আবিষ্ট করে ফেলবেন। কিন্তু পরক্ষণেই খেয়াল হচ্ছে চিকনবরণী আইনত এখনো তার পত্নী নয়, এমনকি সে ত্রৈলঙ্গের অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবহিত নয়, তাঁরা দুজনে দুটি ভিন্ন লোকের বাসিন্দা। এমতাবস্থায় একজন কুমারী নারীকে রিরংসাবশত স্পর্শ করা ঘোর ব্যাভিচারস্যার বর্গীনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের শিষ্য তিনি, প্রাণ থাকতে এমন কম্ম করেননি, প্রাণগচ্চা যাবার পরেও করবেন না।

চিকন, তোর জন্য মুসুরির ডালের বড়া ভেজেছি…জলদি আয়, নইলে জুড়িয়ে যাবে অন্দরমহল থেকে মহিলাকণ্ঠের আওয়াজ। চিকনবরণীর মা

যাই মামণিচানঘর থেকে উত্তর দিল চিকনবরণী। সুমিষ্ট পরিশীলিত মেয়েলি কণ্ঠস্বর। আকাশবাণীর কলকাতা-ক’তে বোধহয় এইরকম স্বর কখনও শুনে থাকবেন ত্রৈলঙ্গ। ত্রৈলঙ্গের প্রাণ জুড়িয়ে গেল।

ভাবী স্ত্রীর সদ্যস্নাত ভরাট পশ্চাৎদেশে মোহাবিষ্ট ত্রৈলঙ্গ আবার তাঁর অস্থায়ী ক্যাম্পের দিকে উড়ে গেলেনকলেজ থেকে একটু আগে ফিরেছে চিকনবরণী, চানটান সেরে এবার সে জলযোগ করবে, তারপর পড়তে বসবে। চিকনবরণী পড়াশোনায় বেড়ে, সাহিত্য বিষয়েও উতসাহী, তার পড়ার ঘরে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের পাশাপাশি বঙ্কিম-তারাশঙ্কর-বিভূতিভূষণও থাকে। মেয়েটা ডাকাবুকোও বটে! বাড়ি থেকে অ্যাতো যে আগলে আগলে রাখছে তাকে, তার কোনো তোয়াক্কাই সে করছে না। ব্যোমকালীবাবা যে ভয়ানক শক্তিশালী প্রাণরক্ষা-কবচটা দিয়েছে সেটাও সে ধারণ করতে চাইছে নাএই যে রোজ তার ছোটোখুড়ো তাকে সঙ্গে করে কলেজে নিয়ে যাচ্ছেন, সঙ্গে করে ফিরিয়ে আনছেন, এই ব্যবস্থাও তার ঘোর অপছন্দের। মনে তার কোনো অনর্থক সংস্কার নেই, সাহিত্যের ছাত্রী হয়েও আশ্চর্য রকম বিজ্ঞানমনস্ক সে।

কী হে কবি, কার ধ্যান করা হচ্চে?

হতপর্ণ লোলচর্ম বেলগাছটির ডালে হা-হুতাশ ভঙ্গিতে ঝুলতে ঝুলতে ত্রৈলঙ্গ রায় চিকনবরণী সেনে বুঁদ হয়েছিলেন। চ্যবন দেবশর্মার হেঁড়ে গলায় চমকে গেলেন

অ্যাঁনাসেরকম কিছু না

কিছু নয়! কিন্তু আমার তো দেখে অন্য কিছু মনে হচ্চে। অনেকক্ষণ থেকে লক্ষ্য করচি তুমি মুদ্রিত চোখে দেয়ালা করচ। কী ব্যাপার হে কবি!

চ্যবন দেবশর্মা নাছোড়বান্দা লোক। কিছুদিন আগেই আলাপ হয়েছে ত্রৈলঙ্গের সঙ্গে। কথায় কথায় জানতে পেরেছেন যে ত্রৈলঙ্গ এককালে কাব্যি লিখতেন, তখন থেকেই কবি সম্বোধন করেন। আষাঢ়ে গপ্পে ওস্তাদ চ্যবন দেবশর্মা, সব বিষয়েই মাতব্বরি। আসলে সেই উনবিংশ শতাব্দীর মানুষ, ঠ্যাঙাড়ের মারে কেষ্টপ্রাপ্তি হয়েছিল ওঁর ভাষায়, ইহলীলা সংবরণ করেছিলুমতখন থেকে প্রেতদশা কাটেনি আর। তিনি অবিশ্যি অন্যকথা বলেন। তিনি নাকি স্বর্গ-ফেরত, স্বেচ্ছায় স্বর্গবাসের অধিকার ত্যাগ করেছেন। ত্রৈলঙ্গকে প্রায়ই বলেন, খনো স্বর্গে চড়ার জন্য হেদিয়ে মরো নাবৎস, মোটেই সুবিধের জায়গা নয়উঞ্ছবৃত্তিধারী ঋষি মুদগলের কাহিনী আমি আগেই জানতুম তা সত্ত্বেও বিধাতা যখন আমায় স্বর্গে আহ্বান করলেন, আমি কেন জানি নে রাজি হয়ে গেলুম। মুদগল্‌ স্বর্গে যেতে চাননিকারণ স্বর্গে নতুন কোনো কম্ম করা যায় না, সেখেনে শুধু পূর্বকৃত সুকর্মের ফল ভোগ হয়। গিয়ে দেখি ঠিক তাই, শুধুই আনন্দ আর ফূর্তি আমি তো হাঁপিয়ে গিয়েছিলুম বাছা। বিধাতা সে কিছুতেই ছাড়তে চায়নে, অনেক হাতেপায়ে ধরে আবার সোজা এই লোকে। তাই আগের থেকে তোমাকেও সাবধান করে রাখচি’খন, তখন বলোনা ত্রৈলঙ্গের হাসির উদ্রেক হয়, অতিকষ্টে ছদ্ম-গাম্ভীর্য নিয়ে সব শোনেন চ্যবন দেবশর্মাকে চটানো কাজের কথা নয়। ওঁরকাছে চাক্ষুষীবিদ্যে শিক্ষা করছেন ত্রৈলঙ্গ। গুহ্যবিদ্যা, প্রাচীনকালের প্রেতদের এসব করায়ত্ব। ওইটি আয়ত্ব করতে পারলে চিকনবরণীর গতিবিধির উপর ত্রৈলঙ্গ নজরদারি করতে পারবেন এই বেলগাছে বসেই

না আসলে আমাদের একটা পুষ্যি ছাগল ছিলকিরীটিশ্বর। তারই কীর্তিকলাপের কথা খুব মনে পড়ছে ত্রৈলঙ্গ চিকনবরণীর কথাটা ফাঁস করেননি অ্যাতোদিন। যতক্ষণ না একটা হেস্তনেস্ত হচ্ছে, কাউকে কিচ্ছুটি জানাবেন না তিনি। এটাই ওঁর চরিত্তির

টে! পাঁটা? কস্মিনকালে স্বর্গে খেয়েছিলুম খুব তিরপিত করে, রম্ভার হাতের রান্না। আঃ, -ফূ-র্বযাক গে যাক, সেসব মনে করতে চাইনে আর। তা হ্যাঁ হে, ওই নেউটিয়াটা এয়েছিল নাকি? সশব্দে তাম্বুল চর্বন করতে করতে বললেন চ্যবননেউটিয়া বলে এক মধ্যবয়সীর আনাগোনা আছে এই চত্বরেভদ্রলোক বড়বাজারের বড়ো ব্যবসায়ী, ভবানীপুরে নাকি মস্ত ভিটে। পরিবারকে লুকিয়ে যবনপাখি খেতেন রেস্তোরায়, তারই হাড্ডি গলায় হঠাৎ আটকে টেঁসে যানজীবনবীমা ছিল মোটা টাকার, তাঁর বংশধররা বেমালুম সেই অর্থ ভোগ করবে, তিনি তার কানাকড়িও পাবেন নাপরলোকে এসে এই বেদনায় আকুল নেউটিয়া তিনিও চাক্ষুষীবিদ্যে রপ্ত করার চেষ্টা করছেন। তাঁর ধনদৌলতের উপর সারাক্ষণ নজর রাখতেই এই ব্যবস্থা। এই বেলগাছে বসেই দুজন অসমবয়সী ছাত্রকে গুপ্তবিদ্যার পাঠ দেন চ্যবন শর্মা।

নেউটিয়াজি আসুক, আপনি বসুন ততক্ষণ। আমি খানিকঘুরে আসছি! ত্রৈলঙ্গ ওঠার উদযোগ করলেন।

সে না হয় বসচি কিন্তু তুমি কোথায় চললে হে চ্যবন বলতে বলতে ত্রৈলঙ্গ ফস করে উড়ে চলে গেলেন।

বিংশ শতাব্দীর চারাপোনাদের মতিগতি বোঝা দায়বিরক্তি প্রকাশ করলেন চ্যবন।

ঘুরেফিরে সেই চিকনবরণীদের অট্টালিকার সামনে এসে দাঁড়ালেন ত্রৈলঙ্গ। বিদ্যুৎবিভ্রাট, গোটা অঞ্চলটা যেন একটা কালো জোব্বা পরে উপুড় হয়ে বেহেডের মতোপড়ে আছেচিকনকে আবার দেখার সাধ হচ্ছে খুব।

দীর্ঘ উল্লম্ফ, ত্রৈলঙ্গ দোতলার জানালায়। চিকনবরণী পড়ার ঘরে একটি কেদারায়, সামনে চৌপায়ার উপর একটি ছোট্ট ল্যাপটপ ল্যাপটপে গোঁজা আন্তর্জালে জড়িয়ে যাবার যষ্টি, নীলআলো দিপদিপ করছে। পাশে রাখা ক্ষীণ মোমবাতিটি সামর্থ্যের তুলনায় ভালোই পরিষেবা দিচ্ছেমঙ্গলকাব্য-এর দুটি পাতা খোলা আর টাটকা একটি কিশোর পত্রিকাপাশে রেকাবে রাখা মুসুরির ডালের বড়া।

তোতা রঙের একটি সালোয়ার-কামিজ পরেছে চিকনবরণী, লম্বাচুলগুলো গোটা পিঠটিকে ঢেকে আছে। লোহার কাঁকন আর কর্ণালঙ্কার ছাড়া গায়ে গয়নার বাহুল্য নেই সে রকম। আয়তাকার চোখদুটি চিকনবরণীর,ঘনভুরু দুটির মাঝখানে একটি ছোট্ট বিন্দি, স্কারলেট জোহানসনের মতো নাসা আর চাপা ওষ্ঠাধরবারংবার দেখেও ত্রৈলঙ্গের সাধ মেটে না, চিকনবরণী যেন সদ্য ফোটা গাঁদা! একবার পিছন ফিরে চেয়েছিল সে, ক্ষণিকের দেখা, চিকনবরণী আবার ল্যাপটপে মগ্ন হল ত্রৈলঙ্গও সেই জানালায় ঘাপটি মেরে রইলেন। অপরিচিত বাড়ির অন্দরমহলে ঢুকতে তাঁর প্রবল অনীহা, জীবদ্দশার এই স্বাভাবিক প্রবৃত্তিটির এখনও পরিবর্তন হয়নি

ওখানে ঝুলতে ঝুলতে ত্রৈলঙ্গ ভাবলেন, দেখি তো অ্যাতো মনোযোগ দিয়ে কী পড়ছে চিকন। চোখ বিস্ফারিত করলেন, আর তাতেই ল্যাপটপের পট খুব কাছে চলে এল।

গড়ুরপঙ্খী অনলাইন পত্রিকার একটি পাতা খোলা, চিকনবরণীর মন ও মাউসপয়েণ্টার একটি কবিতায় স্থির। কবিতার নাম শুচিস্মিতার উদগ্র সেফটিপিনকালপুরুষ ফন্ট, বোধহয় চোদ্দ পয়েন্টের আর নীচে বারো পয়েন্টে কবির নাম। ত্রৈলঙ্গের বুক ধড়াস্‌ করে উঠল সবকিছু অ্যাতো চেনাচেনা ঠেকছে কেন! নাকি বিশ্রী রকমের বিভ্রম হচ্ছে! বিভ্রম হবার কথা নয়, মাদক তিনি সেবন করেননি আজ। চাক্ষুষীবিদ্যে আহরণ করার সময় ওসব সেবন করতে হয়, সে সব পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভূক্ত। কিন্তু আজ তো চ্যবন দেবশর্মার ক্লাসটাই তিনি করেননি, মাদকের প্রশ্নই ওঠেনা। আর জ্বরজালা হলে বিভ্রম হতে পারে এবং অবশ্যই তিনি প্রেমজ্বরে কাতর, কিন্তু তাবলে বিকার তো হয়নি এখনোতবে কী এ ভ্রান্তি নয়! যা চাক্ষুষ করছেন সব ওই চৌপায়ার মতোই সত্য! শুচিস্মিতার উদগ্র সেফটিপিন, কবি ত্রৈলঙ্গ রায়! বেশ কিছু বছর আগে তাঁরই রচনা করা সেই বিরহ-কবিতা! চিকনবরণী ওঁর কবিতা পড়ে! শুধু পড়েনা, একনিষ্ঠ পাঠিকা, নইলে কবিতাটি তার বাংলা খাতায় লিখে নিচ্ছে কেনশুধু লিখছে না, মৃদু উচ্চারণে আউড়াতে শুরু করেছে

বিশুদ্ধ চ্যবনপ্রাশ মন্থন করেছে

আমার প্রচণ্ড সিসটার্ন

সেখানেই শ্বেতসার হয়ে থাকো তুমি

আর জাগুক তোমার উদগ্র সেফটিপিন

প্রথম চারটে পঙক্তি! ত্রৈলঙ্গ ফুর্তিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন। অ্যাতো ফুর্তি ইস্কুল-কলেজের পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েও কোনোদিন হয়নিকী অভাবনীয় সুখকর চমক রাখা ছিল মৃত্যুর পর! হৃদয় থেকে যাকে যাচ্ঞা করেন, সে ইতিমধ্যেই তাঁর কবিতার অনুরাগিণী! একজন অ্যামেচার কবির এর চেয়ে বেশী কী পাওনা থাকতে পারে! কবিবন্ধু অয়স্কান্তের কথা মনে পড়ল। যাদবপুর কফিহাউসের আড্ডায় একবার খুব হেয়জ্ঞান করেছিল ছোকরা, ত্রৈলঙ্গের একটা কবিতাও কেকর পত্রিকায় মুদ্রিত হয়নি বলেখুব উপহাস করেছিলকেকর-এ কবিতা প্রকাশিত না হবার এক যন্ত্রনা, তার-উপর অয়স্কান্তের ওই শ্লেষ! সেদিন খুবই আহত হয়েছিলেন ত্রৈলঙ্গ। ওফ্‌, আজ স--ব অপমান-নৈরাশ্য চিকনবরণী এক লহমায় লোপাট করে দিলসেই গুম্ফদাম উদগমের কাল থেকে আমৃত্যু যে কাব্যচর্চা করলেন, তা আজ সার্থক। নিজেকে বাঙলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব ঘোষণা করে দিতে ইচ্ছে হল ত্রৈলঙ্গের। বাব ত্রৈলঙ্গ রা, বাব ত্রৈলঙ্গ রা বলে দুবার দুহাত উপরে তুলে চেঁচালেনওসেই চেঁচানি চিকনবরণী শুনতে পেলনা, প্রেতরা না চাইলে তাদের কীর্তিকলাপ কেউই জানতে পারেনাযদিও চতুঃসীমার বাইরের দুচারটে পেত্নী হল্লা শুনে ঈষৎ তাজ্জব বনে গেল, বেম্মর পো ইতিহাস পড়েনি গো বলে কটা অপশব্দবের করল, ভাবল বুঝি ছোকরার উন্মাদরোগ। ত্রৈলঙ্গের এখন একটু আফশোষও হল, ইশ জীবনকালে যদি জানতে পারতেন যে চিকনবরণী তাঁর কাব্যানুরাগী! অ্যাতোদিন আলাপপর্বটা সেরে রাখা যেতআজ আর চ্যবন দেবশর্মার কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করল না ত্রৈলঙ্গের, চিকনবরণীদের বাড়ির চৌহদ্দিতে একটা কুয়োতলা আছে, ভাবলেন এখানেই এবার ডেরা বাধবেন।

কুয়োতলাটা পেল্লায়, যদিও কুয়োটির ঘের সেরকম বড়ো নয়। ঘের বড়ো না হলেও গভীরতায় খামতি নেই। অবিশ্যি সেই গভীরতায় শুধু নিস্তল অন্ধকারই ধরা আছে বলে মনে হয়, কুয়োটা ব্যবহার বোধহয় আর হয় না, কপিকল নেই, নেই দড়ি বালতিওচিকনবরণীদের এক বায়ুরোগী পূর্বপুরুষ এই কুয়োতেই প্রাণবিসর্জন দিয়েছিল, মনুষ্যজাতির পক্ষে পরিবেশটা তাই ছমছমে। কাঁঠাল, পেয়ারা, আম, জবা, গন্ধরাজ আর কুকশিমার জমায়েত আরো জমজমাট করেছে চত্বরটিকে। ত্রৈলঙ্গ কূপগহ্বরের দিকে পা ঝুলিয়ে বসলেন, চোখটা নির্নিমেষে চেয়ে রইল চিকনবরণীর কুঠুরির জানালার দিকে। রাত সেরকম না হলেও গোটা বাড়িটা নিঝুম হয়ে আছে। আনাচকানাচ থেকে পান্নালাল ভট্চায ভেসে আসছে, ঘেউ ঘেউ আর অকাল নাসিকা গর্জনও আসছে। জমিতে বিষধর সরীসৃপ, ছুটন্ত ছুছুন্দর আর শতপদীর উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে। চিকনবরণীর দেহের উপরিভাগ জানলার আশেপাশে ঘুরঘুর করছে, হাতে কবিতার খাতা। ত্রৈলঙ্গ হাঁ করে সেদিকে তাকিয়ে, ভবিষ্যৎকালের পাঁচমেশালি চিন্তা মনকে উচাটন করছে

তুন ঠাকুমার ভবিষ্যৎবাণী ফলবতী না হয় যদি!

লবতী হলেও যদি চিকনবরণী তাঁর ঘরণী হতে রাজি না হয়?

রাজি যদি হয়ও, দাম্পত্যজীবন যদি সুখের না হয়!

সুখের হলেও, সেই সুখ যদি ক্ষণস্থায়ী হয়,যমপেয়াদায় ধরে নিয়ে যায় যদি!

ত্রৈলঙ্গ ভাবনা-সাগরে খাবি খেতে লাগলেন। বেশকিছু বছর আগে বাবা রামবন্ধু রায়ের পিত্তপাথর অস্তর হয়েছিল, তখনও অ্যাতো ভাবনা হয়নি ত্রৈলঙ্গেরমহানগরীর সুখের আস্তানা ছেড়ে উত্তরপাড়ায় এই কুয়োতলায় বসে এইভাবে হাজার চিন্তায়ত্রৈলঙ্গ রায়ের আজ-কাল অতিবাহিত হতে লাগল

 

ওদিকে মার্কিন দেশের দক্ষিণপ্রান্তের একটি প্রদেশের রেসিডেন্ট এলিয়েন বোষ্টুম চট্টোপাধ্যায় দুটি ব্যাপার নিয়ে মহা সঙ্কটে পড়েছেনতাঁর প্রাচীন শেভ্ররলে গাড়িটির অন্তরঙ্গেও এবার জরার লক্ষণ ফুটে উঠতে শুরু করেছে। একে একে ব্রেক-প্যাড, ব্যাটরি, ফুয়েল-পাম্প পরিবর্তন করলেন ওয়েনসাহেবের গারাজে, হাজার খানেক মার্কিন মুদ্রা গচ্চা গেলভেবেছিলেন এ যাত্রা রক্ষা পেলেন। কিন্তু বিশ্বকর্মার অন্য অভিপ্রায় ছিল। এক শনিবার পরিবারকে নিয়ে বেরিয়েছিলেন দিশি মুদিখানায় মাসকাবারি বাজার করতে। ওয়েস্টপার্ক ড্রাইভের সিগন্যালে সেইযে গাড়ি থমকালো, আর নড়াচড়া নেইবারংবার চাবি ঘোরালেন, গাড়ি শুধুই ঘরঘরঘরঘর করে অনিচ্ছা প্রকাশ করলপিছনে গাড়ির প্যাঁ-পোঁ, ভয়ে অষ্টমঙ্গলের কান্না, বোষ্টুম দিশেহারা হয়ে গেলেন। শেষে বীমা কোম্পানিকে ফোন করলেন, এক কৃষ্ণাঙ্গ ভবঘুরের সাহায্যে ঠেলে গাড়িটিকে পাশের একটি পার্কিং-চত্বরে এনে তুললেন। বীমা কোম্পানি যথাসময়ে সেটি টোয়িং-কার-এ চড়িয়ে ওয়েনসাহেবের গারাজে নিয়ে গেলবোষ্টুম অদৃষ্টকে দোষারোপ করতে করতে হলুদ-ক্যাব ধরে বাড়ি ফিরলেন কেবলই খুড়ো ভর্গোনাথ চাটুজ্জ্যের সাবধানবাণী মনে পড়তে লাগল, সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়ি কিনতে যাস নে খোকা, চাটুজ্জ্যদের ধাতে ও সয় না ভর্গোনাথ ভুক্তভোগী, প্রথম যৌবনে বহু-হাত-ফেরতা একটি ল্যামব্রেটা স্কুটার কিনেছিলেন মহৌৎসাহে। বোঁটা-মুচকুন্দপুরের প্রথম এঞ্জিনচালিত যান, দারুণ গর্ববোধও ছিল চাটুজ্জ্যদের। দুর্ভাগ্যবশতঃ চাটুজ্জ্যেরা সেটা যত না চালিয়েছিল, ঠেলেছিল তার চেয়ে ঢের বেশী। শেষমেশ লৌহমূল্যে বেচে ল্যামব্রেটা আর ল্যামব্রেটা-মালিকের যন্ত্রণামুক্তি ঘটে। বোষ্টুম তখন নাবালক, তবে মনে ছিল সবকিছুই। কিন্তু মার্কিনমুলুকে পা দেওয়া ইস্তক পরিস্থিতি এমনই দাঁড়িয়েছিল যে বাছবিচার করার কথা ভাবতেই পারেননি তিনিসঙ্গে সন্তানসম্ভবা স্ত্রী, হপ্তায় হপ্তায় স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের অ্যাপোয়েন্টমেন্ট, আপিস যাতায়াতের সমস্যা, তারপর পেটের ভাত-জোটানো। কোমরের নীচে চারটে চাকা ছাড়া একদিনও চলে নাকি! এদিকে রেস্তর খাঁকতি এই পরিস্থিতিতে শূন্যদশকের শেভ্রলে ছাড়া উত্তম কিছু কী আর জোটে! যাই হোক, আবারও শ’পাঁচেক মার্কিনমুদ্রা গচ্চা গিয়েছে গাড়ির পিছনে, গাড়ি আবার চলছে কিন্তু পরিবার নিয়ে আর হাওয়া খেতে যাবার সাহস পাচ্ছেন না বোষ্টুম। মাঝরাস্তায় আবার আটক হয়ে যাবার ভয় বুকে চেপে বসেছে। খদ্দের দেখে এবার গাড়িটিকে বেচবার চেষ্টা করবেন ভাবছেন।

তাকে না হয় বেচে দিয়ে মুক্তি মিলবে, কিন্তু বোষ্টুমের খোকা! ওঁর চারমাসের খোকাটিকে নিয়ে কি অসোয়াস্তিতেই না পড়েছেন বোষ্টুম খোকার চেহারা দিনকে দিন খুলছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে আধিদৈবিক কাণ্ডকারখানা। ঘুমের ঘোরে খিকখিক হাসি তো ছিলই, এখন যোগ হয়েছে গলা খাঁকারি। পৃষ্ঠ-কণ্ডূয়ন, পা-কাটাকুটি করে শুয়ে পাওয়ার ন্যাপ নেওয়া, চান করানোর সময় দুহাত দিয়ে লজ্জানিবারণের প্রচেষ্টা ইত্যাদি দেখে বোষ্টুম-সর্বমঙ্গলা ঘেমেনেয়ে একশা। সর্বমঙ্গলা বোষ্টুমের কাছ থেকে গাত্রবন্ধন মন্ত্রটি শিখে নিয়েছেন, জোর করেই শিখেছেন। গা-ও বেঁধে দিয়েছেন খোকার কিন্তু তা সেরকম ফলবতী হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে ইতিকর্তব্য নিয়ে স্বামী-স্ত্রী প্রায়ই ব্রেইনস্টর্মিং করেন। আজ দুপুরেও করছেন। ছুটির দুপুর, বিলম্বিত মধ্যাহ্নভোজের পর মাঝারি অ্যালুমিনিয়াম বাটির একবাটি লবনজারিত চেরিফল নিয়ে বসেছেন দুজনে। পশ্চিমউপকূলে চেরির ফলন ভালো এবারে, আটানব্বুই সেন্ট প্রতি পাউন্ডে ঢালাও বিক্কিরি হচ্ছে ওয়ালমার্ট, ক্রোগারে।

নেক হলো, এবার দেশেই ফিরে চল, বুঝলে চেরির বিচি লজেঞ্জুসের মতো চোষন করতে করতে সর্বমঙ্গলা পরামর্শ দিয়েছিলেন। সর্বমঙ্গলা এক্কেবারে বঙ্কিমবর্ণিত সহধর্মিণীটি তিনি বোষ্টুমের উচ্চ আশায় আশাবতী, কঠিন কার্যের সহায়, সঙ্কটে মন্ত্রী, বিপদে সাহসদায়িনী, জয়ে আনন্দময়ী কিন্তু সর্বমঙ্গলার এই পরামর্শে বোষ্টুম খুশি হননি

ফ্ল্যাট কেনার পর মাথায় লক্ষ লক্ষ টাকার দেনা। এখন দেশে ফিরে গেলে ভোজনং যত্রতত্র, শয়নং হট্টমন্দিরে হয়ে যাবেতার উপর মার্কিন নাগরিক সঙ্গে নিয়ে যাবে, তাকে তো আর পাতি দিশি ট্রিটমেন্ট দেওয়া যায় না! বোষ্টুম বলেছিলেন। গাঁধী আর লিংকনের চিরাচরিত দ্বন্দ্ব।

বসময় মার্কিননাগরিক মার্কিননাগরিক না করলেই কী নয়! হলোই বা সে মার্কিন, রক্ত তো রাঢ়বাংলার আচ্ছা,তুমি কী দেশে বসে খোকাকে মার্কিন শৈশব জোগাড় করে দেবার কথা ভাবছ নাকি? জিজ্ঞেস করলেন সর্বমঙ্গলা।

বোষ্টুম কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু একটা বিচি গলাধঃকরণ করে ফেললেন।

গিলে ফেললে?

বার কী! এই বিচি-আঁটিওলা ফল এই জন্যেই আমার না-পসন্দ! এর চেয়ে আঙুর আমার ঢে-র ভালো। যাক গে, যেটা বলতে যাচ্ছিলাম, ওই দিশি বেতনে মার্কিন শৈশব খরিদ করার আশা আমি করিনাকিন্তু তা বলে তো খোকাকে বোঁটা মুচকুন্দপুর নিম্ন বুনিয়াদি প্রাথমিক বিদ্যালয়-এ ভর্তি করতেও পারব না কখনো!

খোকা ঘুমাচ্ছিল, বাপ-মায়ের কথার মাঝে হঠাৎ ভুরু কুঁচকে অস্ফুটে কী একটা বলল, মাথাটা নাড়াল, আবার ঘুমে ঢলে গেল।

সর্বমঙ্গলা চেরি ফেলে দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেললেন। বোষ্টুমের মাথায় হাত।

সবদিক ভেবেচিন্তে বোঁটা মুচকুন্দপুর থেকে সর্বেশ্বর চট্টোপাধ্যায় আর ঈশ্বরীদেবীর আসা স্থির হয়েছেমার্কিন-কনসুলেটের ছাড়পত্রও মিলেছে যথাসময়েতবে বেশ কঠিন হয়েছে বোষ্টুমের ঠাকুমা-ঠাকুর্দার অনুমতি পাওয়াসর্বেশ্বর যে সস্ত্রীক স্বদেশ প্রত্যাগমন করবেন, এনিয়ে ওঁদের ঘোরতর সন্দেহ

বুড়ো বাপ-মাকে ফেলে ওখানে ঘাটি গাড়বার মতলব আটছিস। আমি সব বুঝি বোষ্টুমের ঠাকুমা তর্জনী নাচিয়ে বলেছিলেন জ্যেষ্ঠপুত্র সর্বেশ্বরকে

মার্কিন সরকার তো আমার চোদ্দপুরুষ যে এই তুচ্ছ ট্যুরিস্ট ভিসা দেখেই আমাদের নাগরিকত্ব গছিয়ে দেবে। কতবার বলেছি,এ রকম হয় না মা ছেলেটা বিদেশ বিঁভুই-এ একটু বেকায়দায় পড়েছে, তাই

খনই পইপই করে মানা করেছিলাম পোয়াতি নাতবৌটা সঙ্গে পাঠাস না, শুনলি আমাদের কথা

সর্বেশ্বর চুপ করে রইলেন। গর্ভিণী স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মার্কিনমুলুক পাড়ি জামনোটা একান্তই বোষ্টুমের সিদ্ধান্ত। তিনি বোষ্টুমের অন্যসব ব্যাপারে কঠিন মতমত দিলেও এই ব্যাপারটা নিয়ে কিছু বলেননি।

তোদের যদি যেতে হয় আমরাও যাব সর্বক্ষণের সঙ্গী লাঠিটি মেঝেয় দুবার ঠকঠক করে ঠুকে ঘোষণা করলেন বোষ্টুমের ঠাকুর্দা সর্বসিদ্ধ চট্টোপাধ্যায়।

তোমরা! তোমাদের পাসপোর্ট আছে? তিড়িং করে উঠলেন সর্বেশ্বর।

পাসপোর্টের কী দরকার, ভিসা করাব!

হ্যাঃ! পাসপোর্ট ছাড়া ভিসাই দেবে না বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলেছিলেন সর্বেশ্বর।

সব চক্রান্ত! তুই সব জেনেও আমাদের কখনও পাসপোর্ট করাসনি! আমরা আর এখানে থাকবো না, আমাদের বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আয়!

বৃদ্ধাশ্রমেই তো আছো বাবা! তুমি, মা, আমি, বোষ্টুমের মা-ছোক্‌রা আর কে! ডানহাতের আঙুলগুলো আকাশের দিকে অ্যান্টিক্লক ওয়াইজ মুচড়ে নির্লিপ্ত গলায় বলেছিলেন সর্বেশ্বর।

শেষমেশ তামা-তুলসী স্পর্শ করে দেশে ফেরার শপথ করেছিলেন সর্বেশ্বর আর ঈশ্বরী, তবেই রেহাই মিলেছিল।

ঈশ্বরীর দৃঢ় ধারণা কোনো যবন-খোক্কসের ভর হয়েছে খোকার উপর। ওঁদের দীক্ষাগুরু তাই নানাবিধ মন্ত্রপূতঃ মাদুলি-কবচ তৈরি করে দিয়েছেন, সর্বেশ্বরও সেসবের ব্যবহার-বিধি শিক্ষা করেছেন। সেসব ফলপ্রসূ না-হলে অন্নপ্রাশন তো আছেই। আর কিছুদিন পরেই খোকার অন্নপ্রাশন, মার্কিন দেশের এক দক্ষিণ ভারতীয় পুরোহিতের তত্ত্বাবধানে যজ্ঞ হবে, সেই রকমই স্থির হয়েছে। যজ্ঞির আগুনে ম্লেচ্ছ অপদেবতাকে কুলোর বাতাস দিয়ে খেদানো যাবে এইরকমই আশা। আরেকটি ব্যাপার হল, ইদানীং অষ্টমঙ্গল চট্টোপাধ্যায়ের ঘুমের বহর বেড়েছে। চক্ষু মুদলেই মিস চিকনবরণী সেনের দেহপটের হাই-ডেফিনিশন ছবি ভেসে উঠছে আর সঙ্গে সঙ্গে রোমবিকার হচ্ছে। ওই খেলাটিই সব চেয়ে পছন্দ এখন।

 

পরিশিষ্ট

খাদ্যে বিষক্রিয়ার ফলে চিকনবরণীর কুসুমকোমল দেহ থেকে যেদিন প্রাণবায়ু নির্গত হয়, তারপরের দিনই ত্রৈলঙ্গ রায়ের সঙ্গে তার বিবাহবিবাহ অনুষ্ঠানটি প্রম্লোচ্চা কুমারী আর কাঙালচরণের তত্ত্বাবধানেই ঘটে, দীঘলগাঁ থেকে ত্রৈলঙ্গের প্রেতবন্ধু একানড়ে ফ্যারাও সদগোপ, ত্রৈলঙ্গের অকালমৃত অষ্টমবর্ষীয় ব্রহ্মদত্যি জ্যাঠামশাই রামকিংকর রায়, মেও বাঁড়ুজ্জ্যে, চ্যবন দেবশর্মা, নেউটিয়াজি অনেকেই উপস্থিত ছিলেন, শেষমূহুর্তে রবাহূতের মতো কাইনেটিক বিদ্যেধর আর নীলাম্বরী যুগলে উপস্থিত হয়ে চমক দেয়কাইনেটিকের অ্যাসিড ব্যাণ্ড স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে শ্রেষ্ঠ বাজনাটি বাজায় সেবার।

এদিকে, এক দক্ষিণভারতীয় পুরোহিতের তত্ত্বাবধানে অন্নপ্রাশন হবার পরপরই অষ্টমঙ্গলের আচার-আচরণে অস্বাভাবিকত্ব দূরীভূত হতে থাকে, শিশুত্বের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে ধীরে ধীরে, বোষ্টুম আর সর্বমঙ্গলা হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন

আরোকিছু লিংকনখচিত মুদ্রা উপার্জন করে সটান স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন, এখন বোষ্টুম চাটুজ্জ্যেরর এইরকমই ইচ্ছে। সময় হলেই এক মার্কিন নাগরিক আর তাঁর নেটিভ মাকে সঙ্গে নিয়ে ভালোয় ভালোয় ভদ্রাসনে ফিরবেন, বোষ্টুম এইরকমই স্থির করেছেন মনে মনেএখন শুধু উড়ানের অপেক্ষা।

(সমাপ্ত)

 
 
top