চ্যবন মুখুজ্জ্যেদের বার্ষিকগতি

 

বেঁচে থাকতে আমি মেনে নেব না। মুখুজ্জ্যেদের ঐতিহ্যে কালি লেপতে দেব না আমি! সীতাপতি গর্জন করলেন।

তিহ্য কী মুখুজ্জ্যেদের একার নাকি! সেনরাও তো সাহেবডাঙার নামকরা লোক। ওদের তো কোনো আপত্তি নেই! ত্রিভঙ্গ বেশ জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করলেন।

সেন আর মুখুজ্জ্যে এক হলো!

তোমার কাছে শুধু পদবিটুকুরই মূল্য! ওদের শিক্ষা-দীক্ষার কোনো দাম নেই!

দের শিক্ষাদীক্ষার কথা শেষে তোর মতো গোমুখ্যুর কাছ থেকে শুনতে হবে! কুলাঙ্গার কোথাকার!

মার শিক্ষাদীক্ষা নেই ঠিকই তবে এইটুকু বোঝার বুদ্ধি আছে—ঐতিহ্য টৈতিহ্য নয়, তুমি আসলে গাঁয়ের লোককে ভয় পাও! ত্রিভঙ্গও ছাড়লেন না।

দূর হ মুখের সামনে থেকে! আমি তোর মুখদর্শন করব না!’ ভয়ানক ক্রোধে বললেন সীতাপতি। ক্রোধে থরথর কাঁপতে কাঁপতে সদর দরজার পাশে রাখা হুড়কোটা হস্তগত করলেন। তারপর হুড়কো তুলে আঘাত করার ভঙ্গিতে দ্বিগুন জোরে বললেন, তুই গেলি

পরিস্থিতি আয়ত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে, চ্যবন বললেন, বাবা, বারবার বলচি, ফেকো ঐতিহ্যর জন্য ভঙ্গুর জীবনটা নষ্ট করো না। তোমাদের তো যা হবার হয়েচে, ভঙ্গুর সামনে গোটা জীবনটা পড়ে আছে

বাবার খালি জেমিনি চাটুজ্জ্যেদের ভয়! চাটুজ্জ্যেরা কী বলবেত্রিভঙ্গ বললেন আবার হুড়কো দেখে ভীত হয়ে তফাতে চলে গিয়েছিলেন খানিক, সেখান থেকেই বললেন।

চাটুজ্জ্যেরা কী বলবে—এই ভেবে আমাদের জীবন চলবে নাকি! চ্যবন ত্রিভঙ্গকে সমর্থনের ভঙ্গিতে বললেন।

ড়োব্যাটাই, তুইও ওই বাউণ্ডুলে বেবাগাটাকে সমর্থন করছিস! হুড়কোটা নামিয়ে বললেন সীতাপতি। ক্রোধ যেন হঠাৎ হতাশায় রূপান্তরিত হল

বাবা, তুমি এখনো দাদুর আমলের ধ্যানধারনা নিয়ে বেঁচে আছো। তুমি ভুলে যাচ্চো এটা আশি সাল, মানুষের জায়গায় যন্তর কাজ করচে কলকারখানায়!

তা বলে কী জাতধর্ম মিথ্যে হয়ে যাবে!

বিদ্যেসাগর সেই যুগে যদি নিজের ছেলের সঙ্গে বিধবার বিয়ে দিতে পারে, তুমি এইযুগে অন্যজাতের সঙ্গে ভঙ্গুর বিয়ে দিতে পারবে না কেন?

পারবো না, কিছুতেই না। আমি বেঁচে থাকতে নয়! মাথা ঝাঁকিয়ে হাত নেড়ে বললেন সীতাপতি।

পুরোনোদিনের কথা ভাবলেই যৌবনকালের তাজা অশ্রু প্রৌঢ় ত্রিভঙ্গের দুই চক্ষুকে সজল করেএইরকমই শারদীয় সময় ছিল সেটাত্রিভঙ্গ গিয়েছিলেন সাহেবডাঙায় অষ্টমীর পুজো দেখতে, আসলে কাত্যায়নীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। বাবা সীতাপতির কাছে সেদিনই বিবাহপ্রসঙ্গ উত্থাপন করা জ্যেষ্ঠভ্রাতা চ্যবন আর মা সিন্ধুবালা আগেই জানতেন সব। মা কিছু বলেনি, দাদা বলেছিল চিন্তা নেই, বাবাকে বোঝাব। তারপর যা হলো! সেকী রণং দেহী মূর্তি ধরলেন সীতাপতি! অবিশ্যি একদিনের ব্যাপার নয়, এরপর এই রকম সংঘাত অনেকদিনই চলেছিল

বড়োডোবার পাড়ে বসে মৎস্যশিকার করতে করতে সেইসব দিনের কথা ভাবছিলেন ত্রিভঙ্গ। ছিপখানা বাগিয়ে বসে আসছেন অনেকক্ষণ, ফাৎনা ডুব দিয়ে যাচ্ছে মাঝেমাঝে, টোপও খেয়ে যাচ্ছে শিকার তথাপি ধরা পড়ছে না সারা বিকেল বসে গোটা দুই মাত্তর চারাপোনাকে অ্যারেস্ট করা গিয়েছেত্রিভঙ্গের মনোযোগও অবিশ্যি কম। একাকী হলেই খালি পুরোনো দিনের কথাই মনে পড়ে যায়, বাহ্যজ্ঞান যেন লোপ পেয়ে যায় ত্রিভঙ্গের। খালি ভাবেন, সেইসময় সীতাপতির লৌহকঠিন সিদ্ধান্তের সামনে ঝুঁকে না পড়লেই ভালো হত। পরক্ষণেই ভাবেন, সেও কী সম্ভব ছিল! লেখাপড়া সেরকম শেখেননি, রোজগারও ছিল না, অন্নের বন্দোবস্ত হত কী করে! কোলিয়ারির মজদুরি করা তার মতন ব্রাহ্মন সন্তানের পক্ষে কী সম্ভব ছিল সেসময়! এইসব যুক্তি-প্রতিযুক্তির খেলা চলতে থাকে ত্রিভঙ্গের মনে, সেই খেলায় তিনি কখনো সীতাপতি, কখনও চ্যবন, কখনও নিজে! কাত্যায়নীর সঙ্গে পুনর্যোগাযোগ হবার পর থেকে খেলাটা বেড়েছে।

তবে আর নয়! ত্রিভঙ্গ স্থির করে ফেলেছেন। পিতৃদেবের কাছে আবার যাবেন আর্জি নিয়ে। এবং এবার সীতাপতির নিষেধ আর গ্রাহ্য করবেন না। কাত্যায়নী উপার্জন করছেন, তিনিও সাধ্যমত কাজ করে সংসার চালাবেন। সীতাপতি ত্যাজ্য করলেও আর কিছু যায় আসে না।

ঙ্গু চা ঠান্ডা হয়ে গেল খিড়কি দরজা থেকে বউদিদি কুমুদ্‌বতী হাঁক পাড়ছেন। মুখুজ্জ্যদের বড়োডোবাটি ভিটের চৌহদ্দির নিকটবর্তী

সচি বউদিদি ত্রিভঙ্গ ছিপ গোটান। জগৎসংসারের ঘটনাক্রম আকাঙ্খা মতো চললে অ্যাতোদিন বউদিদির সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে হেঁশেল সামলাতো কাত্যায়নী। দুর্গাসপ্তমীতে অন্নভোগ রান্না করত। উলুধ্বনি দিয়ে দোলা বরণ করত গাঁয়ের আর পাঁচটা এয়োতির মতদশমীতে সিঁদুর খেলা খেলত।

র দেরী নয়! মনে মনে  প্রতিজ্ঞা করলেন ত্রিভঙ্গ।

(ক্রমশ…)

 
 
top