চ্যবন মুখুজ্জ্যেদের বার্ষিকগতি

 

পনি বলছ তো দাদাকে?

পনি? হ্যাঁ হ্যাঁ

ত্যি করে বলো। গতবার যখন এসেছিলেন গাঁয়ে, তখন তো বলতে পারোনি লজ্জায়। এবার সেরকম হচ্ছে না তো?

ত্যি, এবার আপনি-ই বলচি—এই গুরুর দিব্যি

দুর্গাসপ্তমীর বৈকালিক পরিবেশধারাবহ মৌজার ত্রিভঙ্গ মুখুজ্জ্যে আর সাহেবডাঙার কাত্যায়নী সেন ফুলপুকুরের ধারে পলাশডাঙায় সামান্য ঘনিষ্ঠভাবে বসেছিলেন। পলাশডাঙা চত্বরটি ধারাবহ আর সাহেবডাঙার মধ্যবর্তী একটি দিগন্তবিস্তৃত মাঠ। মাঠে সরকারি স্নেহচ্ছায়ায় লালিত হওয়া ইউক্যালিপটাসের ইতিউতি জটলা। মাঠের মাঝে একখানা প্রাথমিক ইস্কুলের ওঁচা একতলা দালান, নীল কালিতে লেখা পলাশডাঙা নিন্মবুনিয়াদি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সর্বশিক্ষা অভিযান ইত্যাদি যুক্তাক্ষরের অবস্থানেবিচ্যূতি পষ্টএরই চাতালে বসে যুগলে, একটি স্ত্রী আর একটি পুং বাই-সাইকেল চাতালের সামনে মিতালি করছেজায়গাটি এমনিতেই শুনশান, তারওপর ইস্কুলেও ছুটি চলছে। দূরে কিছু অপ্রাপ্তযৌবন রাখাল, গৃহপালিত চতুষ্পদ আর চাতালে কিছুচঞ্চল কুরকুট জাতীয় পিঁপড়ে এবং ছাগবিষ্ঠা ছাড়া আশেপাশে ধর্তব্যের মধ্যে সেরকম কিছু নেই। নিশ্চিন্তে বিশ্রম্ভালাপের জায়গাই বটে। মুখুজ্জ্যেবাড়িতে সপ্তমীর পংক্তিভোজন সমাধা হতেই ত্রিভঙ্গ সটান হাজির হয়েছেন এখানে। খানিক পরে সাহেবডাঙা থেকে এসেছেন কাত্যায়নী।

র বউদিদিকে? কাত্যায়নী ভ্রুযুগলের বক্রতা বাড়িয়ে বললেন।

এবার শরমে জিভ কাটলেন ত্রিভঙ্গ, ফিক করে হেসে ফেললেন।

লোনি? ইশ অ্যাতোবার করে বললাম! এখনো তুমি চালিয়ে যাচ্ছো? চ্যবনদাদাকে আপনি আর বউদিদিকে তুমিবলিহারি তোমায় আলগা রাগে মুখটি ঘুরিয়ে নিলেন কাত্যায়নী সেন।

পারচি না বিশ্বাস করো ত্রিভঙ্গ ডানহাতটি ধরলেন কাত্যায়নীর, রাগটা যেন উপভোগ করলেন।

ই সামান্য কাজটা তুমি পারছো না! কাত্যায়নীর গলার স্বরটা শেষদিকে কর্কশ হয়ে গেল। ভেবেছিলেন বাগদণ্ড দেবেন, শেষ মুহূর্তে সামলে নিলেন। অভিমানী মানুষ ত্রিভঙ্গ, বেশি অপ্রিয়ভাষণ করলে গুম মেরে বসে থাকবেন, একটি রা-ও নির্গত হবে নাসেটি কাত্যায়নীর জন্য বড়ো বিরক্তিকর

উদিদি আমি আমরা একই বয়সী, কী করব বলো। তবে এখন আর কিছু বলচি না বউদিদিকে

মানে? কথাই বলছ না নাকি?

না, না, তা কেন

বে?

ই ভাববাচ্যের ভরসায় চলচে

উদিদি খেতে দেওয়া হোক? মুখে হাত দিয়ে হাস্য করলেন কাত্যায়নী। সেবার চ্যবনদাদাকে যেমন বলতে?

ত্রিভঙ্গ দন্তবিকাশ না করে শুধু ওষ্ঠাধর প্রসারিত করে আকর্ণ হাস্য করলেনচত্বারিংশৎ কাত্যায়নী পঞ্চাশৎ ত্রিভঙ্গের দিকে তাকিয়ে মুখব্যাদান করলেনত্রিভঙ্গ বালকসুলভ আবেগে কাত্যায়নীর ঈষৎ স্ফীত কটিদেশ ডানবাহু দিয়ে বেষ্টন করলেন, উত্তরে কাত্যায়নী মাথাটি নিহিত করলেন ত্রিভঙ্গের বাম স্কন্ধে। স্বতঃস্ফূর্ত শরীরীভাষা!

শারীরীভাষার এই স্বতঃস্ফূর্ততা দুযুগ আগেও ছিল না অ্যাতোটা। এই পলাশডাঙাতেই একদিন খেয়াল বশে কাত্যায়নীর জঙ্ঘায় হাত রেখেছিলেন ত্রিভঙ্গ, এতে বেশ বিরক্তই হয়েছিলেন কাত্যায়নী। অথচ এমন নয় যে তখন নতুন প্রেমদুজন দুজনের সঙ্গে সবে পরিচিত হচ্ছেন। প্রেম পর্বের সূচনা হয়েছে এর বেশ কয়েকবছর আগে। কাত্যায়নী সেনদের বাড়ি নিত্যপুজো করতে যেতেন ত্রিভঙ্গ। সপ্তমশ্রেণীতে দীর্ঘকাল অকৃতকার্য হতে হতে পড়া ছেড়েছেন ততদিনে, পিতাঠাকুর আর জ্যেষ্ঠভ্রাতার তত্বাবধানে খানিক মন্ত্রশিক্ষা করেছেনসাহেবডাঙার সেন বাড়ির নারায়ণ সেবা দিয়ে অনুশীলন শুরু হয়েছেএই চত্বরে সেন বাড়ি স্বনামখ্যাত, সেনবাড়ির কর্তা ভুবনেশ্বর সেন নামকরা কবিরাজসেনদের সঙ্গে মুখুজ্জ্যেদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতাধারাবহ গাঁয়ের যাত্রানুষ্ঠান, পালপার্বণে বরাবর নিমন্ত্রণ থাকে সেনদের, গুষ্টিসুদ্ধু গোশকটে সওয়ার হয়ে ভুবনেশ্বর সেন মুখুজ্জ্যেবাড়িতে এসে ওঠেন। মুখুজ্জ্যদের দুধকুপি আমগাছের আম ঝাঁকাবন্দি করে পৌঁছে দিয়ে আসে হাম্বীর বাউরি, মুখুজ্জ্যদের মুনিশ। আবার সীতাপতি মুখুজ্জ্যের পিত্তশ্লৈষ্মিকশূল রোগ, মুরারির শয্যামূত্র রোগের চিকিৎসা করেন ভুবনেশ্বর, সীতাপতির জন্য এক্সক্লুসিভ শূলবজ্রিণী বটিকা, ক্ষেমঙ্করীর জন্য জ্বরভৈরবচূর্ণ প্রস্তুত করে দেনছোটোখাটো অস্ত্রপ্রক্রিয়াও করেন ভুবনেশ্বর। আসলে মুখুজ্জ্যেরা সাহেবডাঙারই লোক, গাঁতুতো সম্পর্ক তো আছেই তারও পর ভুবনেশ্বরের বাবা ত্রিলোকেশ্বর সেন সীতাপতি মুখুজ্জ্যের ভিক্ষেবাবা। আত্মীয়তার খামতি নেইপুত্রসন্তানের আকাঙ্খায় ভুবনেশ্বরের পর পর চারটি কন্যা হয়, কাত্যায়নী তাদের মধ্যে কনিষ্ঠ। কাত্যায়নী ইস্কুলে পড়েন, বাবার জন্য চূর্ণ-ক্বাথ-লেপ-সিরাপ প্রস্তুত করেন, ত্রিভঙ্গের নিত্যপূজার জোগাড়যন্তর করেন। এসব করতে করতেই আওল যৌবন শৈশব গেল। চরণ চপলতা লোচন নেলকাত্যায়নী ডাগর হলেন, ত্রিভঙ্গেরও গুম্ফরেখার রোম দৃঢ় আর কুঞ্চিত হল, কণ্ঠস্বরে দুর্দান্ত হেঁড়েলভাব এলোপুজো-আচ্চার পাশাপাশি ত্রিভঙ্গ যত্ন করে জবাফুলের গর্ভকেশর চক্রের ছবি এঁকে দেন কাত্যায়নীকে, কখনো খেলার পুতুল, তালপাতার সেপাই বানিয়ে দেনত্রিভঙ্গের গড়া শিয়াল, শকুন জিতাষষ্ঠী পুজোর থানে দিতে নিয়ে যায় কাত্যায়নী। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা হতে থাকেতারপর সেই মকর সংক্রান্তির দিন। ধারাবহ থেকে সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে ত্রিভঙ্গ মকরস্নান করতে গিয়েছেন দামোদর নদে, সাহেবডাঙা থেকে সখিদের সঙ্গে গিয়েছেন কাত্যায়নী। মউকা বুঝে নদীরপাড়ের আমবাগানে দলছুট হলেন দুজনে। ত্রিভঙ্গ কাত্যায়নীর অধরামৃত পান করতে করতে প্রেম নিবেদন করলেন।

যে কয়েকবার শারীরিক নৈকট্য হয়েছিল, এটিই ছিল তীব্রতম।

প্রেমপর্ব চলেছিল অনেকদিন। মাঝে দু-একবার ঝঞ্ঝাট যা হয়েছিল, হয়েছিল ত্রিভঙ্গের বাউণ্ডুলেপনার জন্যেই। যাত্রাপালায় অভিনেতা হিসেবে নাম ছিল ত্রিভঙ্গের, আশেপাশে গাঁয়ের অ্যামেচার পালায় নায়কের পার্ট করতেন। সে করতে গিয়ে ফিমেল-শিল্পীদের সঙ্গে একদুবার তাৎক্ষণিক ঘনিষ্ঠতা হয়েছিলএসব খবর গোপন থাকেনি, কাত্যায়নী বাক্যালাপ বন্ধ করে দিয়েছিলেন বেশ কয়েকবার

তবে ত্রিভঙ্গ-কাত্যায়নীর প্রেমচিত্রলেখার রেখাটি নিম্নমুখি হয়নি সেরকম, ঊর্ধমুখি হতে হতে স্থিতাবস্থায় এসেছে। তবে শেষরক্ষা যে হয়নি তা বলাই বাহুল্য কাত্যায়নী বদ্যি, ত্রিভঙ্গ কুলীন ব্রাহ্মন। সীতাপতি ত্রিভঙ্গের প্রস্তাব সটান নাকচ করে দেনসেসময় বিস্তর অন্তর্কলহ হয়েছিল, পিতাপুত্রে বিষম বাগবিতন্ডা হয়েছিল, ভয়ানক ক্রোধে সীতাপতি ত্রিভঙ্গকে লগুড়াঘাত পর্যন্ত করতে উদ্যত হয়েছিলেনচ্যবন সেসময় মধ্যমভ্রাতাটির পক্ষ নেন, তখন নিকিতা ক্রুশ্চেভ পড়ছেন তিনি, বামপন্থী রাজনীতির সংস্রবও রয়েছে। বিস্তর যুক্তিজাল রচনা করে সীতাপতিকে অভিভূত করে ফেলার চেষ্টা করেন চ্যবনকিন্তু সীতাপতি কোনো যুক্তিরই ধার ধারলেন না, জেমিনি চাটুজ্জ্যেদের ভয়ে সমাজের বিরুদ্ধাচরণ করতে চাইলেন নাকিছুতেই কিছু হবার নয় জেনে রাগে দুঃখে ত্রিভঙ্গ একমাস বাড়িছাড়া ছিলেন। তিনদিন শুধু গঞ্জিকা সেবন করে পড়েছিলেন আটপৌরিবাবার আশ্রমে পনেরো দিন বাড়িতে থেকেও স্বপাক আহার করেছেন, কুঁচলেফল খেয়ে আত্মবিনাশ করার চেষ্টা করেছিলেন একবার, কার্যসিদ্ধি হয়নি, লোক জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। কোনো কিছুতেই কৃতকাম হননি ত্রিভঙ্গ, শুধু একটি প্রতিজ্ঞা সফল হয়েছে এখনো অব্দি। ত্রিভঙ্গ আর পাণিগ্রহণ করেননি।

ঘোর দৈবদুর্বিপাকে পড়ে কাত্যায়নীও অনূঢ়া থেকে গিয়েছেন আজ অব্দিভুবনেশ্বর বিবাহের চেষ্টা করছিলেন, ঠিকুজিকুষ্ঠি মেলানো হয়েছিল, আলোকচিত্র আদান প্রদান হচ্ছিল কয়েক জায়গায়এসব চলাকালীনই একদিন কর্কটরোগে প্রাণ যায় ভুবনেশ্বরেরবাড়িতে বিধবা মা, দুটি নেহাত নাবালক যমজ ভাই, নিরুপায় কাত্যায়নীকেই সংসারের হাল ধরতে হয়শহরে একটি চাকরি নেন কাত্যায়নী, ভাইদের মানুষ করেন। শহরেই থাকতেন অ্যাতোদিন, কৃতী ভাইরা কলকাতায় হস্টেলবাসী হবার পর আবার সাহেবডাঙায় ফেরত এসেছেন বৃদ্ধ মাকে নিয়ে। ধারাবহ প্রাথমিক ইস্কুলে চাকরিও পেয়েছেন একটা। দীর্ঘকাল দেখাসাক্ষাৎ ছিল না,সাহেবডাঙায় ফেরার কিছুদিন পরথেকেই ত্রিভঙ্গের সঙ্গে পুরোনো সম্পর্কের পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। ত্রিভঙ্গ আবার নতুন করে আবিষ্কার করছেন কাত্যায়নীকে, চেহারাটা আর পাঁচটা মেচেতাদুষ্ট গ্রাম্য মধ্যবয়সীদের মত নয়—লাবণ্য আছেভাষাটাও সুন্দর হয়েছে, ছোটোবেলার সেই গ্রাম্য অ্যাকসেন্ট আর নেই। ছোটোবেলায় যত না ভালো লেগেছিল কাত্যায়নীকে, এই প্রৌঢ়বয়সে এসে তার চেয়েও মধুর লাগছে।

বার ভাবচি বাবাকে বলব কাত্যায়নীর আঙুলগুলি নিয়ে খেলা করতে করতে বললেন ত্রিভঙ্গ। কাত্যায়নীর গাত্রস্পর্শ করলেই শিহরণ হয় ত্রিভঙ্গের দেহে।

কীকাত্যায়নী সবই জানেন, তবু প্রশ্ন করলেন।

র দেরী করে লাভ আছে, অনেক তো দেরী হলো

বাবা যদি আবার না করে দেয়?

বার তোমাকে নিয়ে সটকান দেবোসেই ভুল আর করব না

কাত্যায়নী হেসে ফেললেন।

ই বুড়ো বয়সে পালিয়ে যাবে! যাবেই বা কোথায়, খাবেই বা কী!

সে ঠিক জুটে যাবে হালকা চালে বললেন ত্রিভঙ্গ। বেবাক জীবন চাকরি করেননি, আয় উপায় নেই। চ্যবনের অন্নে প্রতিপালিত হন এখনো, সঞ্চয় বলতে বাৎসরিক ধানবিক্রির সামান্য ধন

পালিয়ে যাবার দরকার হবে না আশা করি, দাদাও আছে, বাবাকে বুঝিয়ে ফেলবো এবার আবার বললেন ত্রিভঙ্গ।

চ্যবনদাদাই ভরসা চ্যবনকে খুব শ্রদ্ধা করেন কাত্যায়নী। ত্রিভঙ্গকে দিয়ে আপনি আজ্ঞে বলিয়ে আসলে চ্যবনের শ্রীচরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করছেন কাত্যায়নী সেনএই মানুষটার মতো সচ্চরিত্তিরের লোক এই চত্বরে আরেকটিও নেই। আর ত্রিভঙ্গকেও খুব স্নেহ করেন, সময়-অসময়ে পক্ষ নেন এইরকম মানুষকে আপনি বলবে না!

 

তুমি কী একটুও খাবে না? মুর্গির মাংসের এক খণ্ড রুরুর দিকে তাক করে বললেন ঋজুধর্মা। উত্তরে রুরু শুধু মাথা নাড়লেন। ঋজুধর্মা কথা না বাড়িয়ে কুক্কুটখণ্ডটিকে তাঁর ইঁদুরদন্ত দিয়ে দুরমুশ করতে লাগলেন।

রুরু আর ঋজুধর্মা সুগারল্যাণ্ডস্থিত একটি দিশি রেস্তোরায় মধ্যাহ্নভোজ সারছিলেন। আজ শনিবার, রুরু আর ঋজুধর্মা দুজনেরই আপিস ছুটি। ছুটির দিনগুলোতে একসঙ্গেই আহারাদি হয়, তারওপর আজ এখানে দুর্গাসপ্তমী। দুর্গাবাড়িতে সপ্তমীর পুজো দর্শন করে দুজনে এই ভারতীয় রেস্তোরায় এসে বসেছেন। স্টেট হাইওয়ে সিক্সের ধারে ছোটো রেস্তোরা বম্বে মাসালা, দিশিদের চেয়ে ফিরিঙ্গিদের জমায়েতই বেশী। মৃদুভলিউমে পুরোনো হিন্দি ছবির সুর বাজছে। সদাহাস্যময় রেস্তোরার মালিক দুইবাহু প্রসারিত করে খরিদ্দারদের আপ্যায়ন করছে। তবে খয়েরিদু পেয়েদের প্রতি মনোযোগ নেই, মূলত স্বর্ণকেশীদের প্রতি প্রেম বর্ষিত হচ্ছেএই রকম বৈষম্যমূলক আচরণ দেশে থাকতে বিস্তর অভিজ্ঞতা করেছেন রুরু, মা-ঠাকুমাকে হাম্বীর বাউরি ভুটেল সাঁওতালদের ছোঁয়াচ এড়িয়ে চলতে দেখেছেন, এমনকি কদাপি ছোঁয়া লাগলে ফুলপুকুরে ডুব দিয়ে শুদ্ধ হতেও দেখেছেন। তবে বৈষম্যের ব্যাপারটুকু উপেক্ষা করতে পারলে রেস্তোরাটির খাদ্যদ্রব্য উপাদেয়, বিশেষ করে এখানের মুর্গ নেহারি ঋজুধর্মার খুব পছন্দের। সেটিরই বরাত দেওয়া হয়েছে, সঙ্গে নিরামিষ মাঞ্চুরিয়ান। সংস্কারবশতঃ সপ্তমীর দুপুরে আমিষ আহার করেন নারুরু

মুখুজ্জ্যেবাড়ির বৌ-রা কিন্তু কুক্কুট খায়না ছদ্মগাম্ভীর্য নিয়ে রুরু বললেন

জানি। তুমি অনেকবার বলেছ

খন থেকেই অভ্যেস করলে হয় না?

নৈঃশব্দ্য। গাড়ির চাবিটি টেবিল থেকে পড়ে গিয়েছিল, নীচু হয়ে সেটি কুড়োলেন ঋজুধর্মা। রুরু এখনো গাড়ি কেনেননি, ঋজুধর্মার ভরসায় চলছে কয়েক বছর।

কী, কিছু বললে না?

কী বলব?

খন থেকেই অভ্যেস করলে হয় না?

মিডিয়ভ্যল ট্র্যাডিশন শুষ্ক স্বরে বললেন ঋজুধর্মা রায় বলার সময় মুখটা বিকৃত হল ক্ষণিকের জন্য। রুরু মুখুজ্জ্যে মজার ছলেই শুরু করেছিলেন প্রসঙ্গটা, এখন ঋজুধর্মার কাষ্ঠবৎ অবস্থান দেখে সামান্য আহত হলেন। ঋজুধর্মা যে এইসব পাড়াগেঁয়ে রীতিনীতি অনুসরণ করবেন না এই নিয়ে কোনো ধন্দ নেই রুরুর মনে। কিন্তু তাবলে এভাবে নস্যাৎ করে দেওয়া!

তা বটে রুরু শুধু এইটুকু বলে চুপ করে গেলেন। স্বরে বক্রতা ছিল। দুটি শব্দ যেন ঋজুধর্মার বক্তব্যের নিরুচ্চার প্রতিবাদ। এবং ঋজুধর্মা এই প্রতিবাদ পাঠ করে ফেললেন অনায়াসেই।

তা বটে মানে? এসব কেউ আর মানে? তুমিই তো বলেছিলে তোমার ছোটো কাকিমা ইউজড টু হ্যাভ ইট ইভন আফটার ম্যারেজ?

কিছুদিন খেয়েছিল

খন?

খন দুর্গাসপ্তমীর ভোগ রান্না করে, তাই ছেড়ে দিয়েছে

ই উইল অলসো ডু দ্যাট দেনআমিও যখন ভোগ রান্না করব তখন ছেড়ে দেব ঋজুধর্মা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বললেন।

মাথা নীচু করে ফুলকপির মাঞ্চুরিয়ান খাচ্ছিলেন রুরু, মাথাটা তুলে খানিক অভিমানী সুরে বললেন, দূ, ওসব পাড়াগেঁয়ে ব্যাপার স্যাপার

পাড়াগেঁয়ে না শহুরে সে পরে দেখা যাবে। আগে তুমি বাড়িতে কথা বলো, তারপর এসব নিয়ে ভাবব

এক টুকরো মাংসখণ্ড তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছিলেন ঋজুধর্মা, দেখে সেরেফ একটু তামাশা করতে ইচ্ছে হয়েছিল রুরু মুখুজ্জ্যের। ঋজুধর্মা যেন একটু অস্থিরই হয়ে পড়লেন

আসলে রুরু গতকালই সরাসরি বাবার কাছে কথাটা পাড়বেন বলে মনস্থ করেছিলেন। পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্নণা দেবেন ভেবেছিলেন।ঋজুধর্মা রায়, বরানগরে বাড়ি। রুরুর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল রেসিডেন্স-ইন ম্যারিয়টেমার্কিনদেশে পদার্পণ করার পর কিছুদিন এই হোটেলেই ছিলেন রুরু। ঋজুধর্মাও তখন একই হোটেলে, আপিসের কাজে তিনিও সুগারল্যাণ্ড এসেছেন আলাপটা অবিশ্যি হোটেলে হয়নি, হয়েছিল বাসস্টপে। হোটেলের কাছেই একটি বাসস্টপে রোজ বাস ধরতেন দুজনে। নেহাত প্রয়োজনেই রুরুকে আলাপ করতে হয়েছিল একদিন, বাসভাড়ার একটা কোয়ার্টার ডলার কম পড়েছিল। রুরু ঋণ নিয়ে ছিলেন ঋজুধর্মার কাছ থেকেএসব বৃত্তান্ত বলতে গিয়েও বাবাকে বলতে পারেননি রুরু, শেষ মুহূর্তে সামলে নিয়েছিলেন। বাবার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে শেষ মুহূর্তে ভীত হয়ে পড়েছিলেন

কী হল, চুপ করে গেলে? ঋজুধর্মা বললেন।

না চুপ করব কেন। ভাবছি কালকেই বাড়িতে কথা বলব ফস্‌ করে বলে বসলেন রুরুনা ভেবেই বলে ফেললেন। বলতে চাননি, কিন্তু একমুহূর্তে মনে হল, এবার না বললে রুরুর সদিচ্ছা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যাবে।

ডোনট হ্যাভ টু হারিভেবেচিন্তে বলো ঋজুধর্মা খুশি হলেন কিন্তু প্রকাশ করলেন না। রুরু একটু আবেগপ্রবণ, হয়ত খোঁচা খেয়ে ফস্‌ করে বলে ফেলেছে।

না না, তাড়াহুড়ো হয়। এটা অনেকদিনই ইয়ে আছে

লছোরুরুর গম্ভীর মুখ দেখে কপট গাম্ভীর্য নিয়ে বললেন ঋজুধর্মা।

রুরু অপ্রতিভ হয়ে গেলেন, খাবারের প্লেট থেকে মুখ না তুলেই বললেন, ভাবছি আজ দুর্গাবাড়িতে দুজনে ছবিটা তুললাম ওটা পাঠিয়ে দেব। আমাদের ছবিটাও দেখতে পাবে

ন্টারনেট আছে?

হ্যাঁ, বাবা স্মার্টফোনটায় কানেকশন নিয়েছে

গ্রে! দুর্গাবাড়ি যাবেন বলে ভালোই শৃঙ্গার করেছিলেন ঋজুধর্মা, ছবিটাও ভালো উঠেছে। ঋজুধর্মার বেশ আনন্দ হল। ভাবলেন গাড়িতে যেতে যেতে রুরুকে একটা চুম্বন দেবেন।

আঃ!

কী হলো!

দাঁতে-জিভে কাটা গেলরুরু গালে হাত দিলেন। ইশ, বড্ড অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন।

(ক্রমশ…)

 
 
top