চ্যবন মুখুজ্জ্যেদের বার্ষিকগতি

 

সীতাপতি মুখুজ্জ্যের দশ বাই বারো শয়নকক্ষটির চৌকাঠের সামনে দাঁড়ালেন ত্রিভঙ্গ। দরজাটা ভেতর থেকে ভেজানো। পর্যায়ক্রমে মৃদু সাঁইসাঁই আর সপাট সুড়ুৎসুড়ুৎ শব্দ ভেসে আসছে সন্ধিপুজোয় যে ছাগবলি হয়েছিল দুর্গামন্দিরে, তারই দু’চারটুকরো ভাগ পাওয়া গিয়েছিল। চ্যবনের স্ত্রী কুমুদবতী তা দিয়ে অতিরঞ্জিত ঝোল বানিয়েছিলেন শ্বশুরমশাইয়ের জন্য, সীতাপতি সেটিই এখন উপভোগ করছেন। সাঁইসাঁইরবটি বারোমেসে শ্লেষ্মার আর সুড়ুৎ সুড়ুৎ শ্লেষ্মানিবারক সুরুয়ার। রন্ধনপ্রণালী খোদ সীতাপতির। সক্ষম ছিলেন যখন, বৌমাকে যত্ন করে শিখিয়েছিলেন

ত্রিভঙ্গ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন চৌকাঠের বাইরে। সাতটার খবর হচ্ছে রেডিওতে, সাতটার পরে সীতাপতির শয্যাকক্ষে কেউ আর স্বাগত ননকিন্তু ত্রিভঙ্গের হাতে সময় বড়ই অল্প। ঢের সময় বরবাদ হয়েছে, আর নয়—ত্রিভঙ্গের হাবভাবটি এইরকম ধীরে ধীরে দরজার পাল্লাদুটো ঠেললেন মরিয়া ত্রিভঙ্গ। ঘরে সেই পঙ্গু হ্যারিকেন। সীতাপতি বিছানায় বসে আহারাদির পর শৌচ করছেন। শানের মেঝের একটি জায়গা ভেঙ্গে গিয়ে গর্ত মতো হয়েছে, সেখানেই ছিটিয়ে জল ফেলে তর্জনী আর মধ্যমার সাহায্যে ঠোঁটদুটি ভিজিয়ে নিচ্ছেন সীতাপতি, মুখধোয়া হচ্ছেএরপর ঈষৎ উষ্ণ দুগ্ধ সেবন করবেন, সিন্ধুবালা শাড়ির আঁচল দিয়ে গেলাসটা জড়িয়ে আছেন পাশে একটি বড়ো কাপড়ের ঝালর দেওয়া হাতপাখা রাখা, সীতাপতির হস্তশিল্পের নিদর্শন শিল্পী মানুষ ছিলেন সীতাপতি, মাটির ঠাকুর গড়তে পারতেন, রঙ-তুলির হাত ছিল, সুরজ্ঞান ছিল। ত্রিভঙ্গ সীতাপতির এইসব সদগুণ কিছুটা পেয়েছিল।

বাবা মৃদুসুরে ডাকলেন ত্রিভঙ্গ।

ড়োব্যাটাই? মাথা নীচু করেই শৌচ করছিলেন সীতাপতি, ওই অবস্থাতেই বললেন।

ঙ্গু এসেছে পাশ থেকে বললেন সিন্ধুবালা। ত্রিভঙ্গের আগমনের হেতু জানেন সিন্ধুবালা, ত্রিভঙ্গ আগেই সব বলে রেখেছেন মাকে।

ড়োব্যাটাই আসবে না? শিশুসুলভ সারল্যমাখানো স্বরে বললেন সীতাপতি। প্রশ্নটি হাওয়ায় সেরেফ ভাসিয়ে দিলেন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের তেমন সঞ্চালন হলো না। চ্যবন কাল সন্ধে থেকে একবারও সাক্ষাৎ করতে আসেননি, সীতাপতি ভেবেছিলেন চ্যবন এসেছে।মাংসের সুরুয়া টানতে টানতে চ্যবনের কথাই ভাবছিলেন। চ্যবনের কী রাগ-রোষ হলো নাকি সীতাপতির খানিক আশঙ্কা হয়

দা, ছিলকু ওদের সঙ্গেই ঘুরছিল বড়ো। বড়ো এলে ওর বন্ধুরা ওকে ছাড়তে চায় না সিন্ধুবালা বললেন।

বাবা, একটা কথা ছিল ত্রিভঙ্গ বললেন।

ত্রিভঙ্গের গলা শুনে সীতাপতি খানিক শঙ্কিত হলেন মনে মনে। কালেভদ্রে বাবার সম্মুখে আসেন ত্রিভঙ্গ, আসেন কাজে, বৈষয়িক পরামর্শ করতে। অমুকের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে বিবাদ, তমুকের সঙ্গে মাছ ধরা নিয়ে মনোমালিন্য এইসব ব্যাপার। সীতাপতি দায়সারা কিছু বলে এড়িয়ে যান, কখনও চ্যবনকে ফোন করতে বলেন।

কী বলবি? নিরুৎসাহী স্বরে বললেন সীতাপতি।

বাবা, জেমিনি চাটুজ্জ্যেরা অ্যাতো বড়ো অন্যায় করে গেল, কিছু বিহিত করবে না? আসল কথাটা বলতে গিয়েও একটি সম্পূর্ণ অপ্রসাঙ্গিক কথা বলে বসলেন ত্রিভঙ্গ।

কী অন্যায়?

ই যে বিদ্যেধরীর পাঁটাদুটোকে

মি আর কী করব বাবাচ্যবনকে বলো সটান বলে দিলেন সীতাপতি।

চ্ছা বলব

ত্রিভঙ্গ এইসব জটিল প্রসঙ্গ এক্কেবারেই উত্থাপন করতে চাননি এখন, ঘটনাক্রমে তা হয়ে গিয়েছেসীতাপতি এই ব্যাপারে কথা বাড়ালেন না দেখে মনে মনে খুশিই হলেন ত্রিভঙ্গ। বললেনর তোমার জন্য গাঁদালপাতা এনেচি। কালীকিংকরখুড়োদের কুয়োতলায় খুব হয়েচে

গাঁদালপাতার বড়া খুব পছন্দের সীতাপতির। গাঁদালের খবরটা শুনে ভালো লাগল, ইচ্ছে হল তাঁকে এখুনি দু-চারটে বড়া বানিয়ে দেওয়া হোক। বললেন, চি?

হ্যাঁ একদম। মা, কাল বড়া বানিয়ে দিবি তো বাবাকে

কুমুকে বলব, বানিয়ে দেবে। ডাল বাটা দিয়ে খাবে না বেসন দিয়েবললেন সিন্ধুবালা।

সীতাপতি চুপ করে রইলেন। এসব অবান্তর প্রশ্নের উত্তর দিতে আর ইচ্ছে করেনা।

ত্রিভঙ্গ তোমাকে কী বলবে বলচে

বার কী?

ভুবনেশ্বরখুড়োদের খবর শুনেচ, ওর দুটো ছেলেই কলকাতাতে ভালো কলেজে পড়চে গৌরচন্দ্রিকা করতে করতে বললেন ত্রিভঙ্গ

শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সীতাপতিসেই ঘটনার পর থেকেই সেনদের সঙ্গে সম্পর্কে শীতলতা আসে, যাতায়াতও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তো ভুবনেশ্বর মারাই যায়।

র ছোটোমেয়েটা এখন চাকরি করচে ধারাবহে জানো? এবার বললেন সিন্ধুবালা।

কী চাকরি? সীতাপতির মুখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে গেল প্রশ্নটা। প্রশ্ন তিনি করতে চাননি। এসব জাগতিক জিজ্ঞাসা তিনি অভ্যেসবশত করে ফেলেছেন, এর উত্তরে তার আর কাজ নেই

ত্রিভঙ্গ একটা নিরবচ্ছিন্ন সংলাপ শুরু করতে চাইছিলেন, জবর মউকা পেলেন এবার।

প্রাইমারি ইস্কুলে তোমার মনে আছে কাত্যায়নীকে?

চুপ করে রইলেন সীতাপতি।

বাবা ত্রিভঙ্গ নাড়া দিলেন আবার।

অ্যাঁ?

ত্রিভঙ্গ বলচে ওদের বিয়েটা এবার ফাইনেল করে দাও সিন্ধুবালা হঠাৎ বলে ফেললেন।

কার বিয়ে?

ঙ্গুর সঙ্গে আবার ভাব হয়েচে কাত্যায়নীর

সীতাপতি চুপ মেরে গেলেন। আর এসব ব্যাপারে কী জড়াতে চান তিনি? মুহূর্তের জন্য এই প্রশ্নটাই মাথায় এলো সীতাপতির সংসারের নিত্য খুঁটিনাটিতে আবার জড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা বা ইচ্ছে কোনোটাই কী আর আছে! কিছু বছর আগে হলেও জোরালো মতামত দিতেন, ত্রিভঙ্গের বাউণ্ডুলেপনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেন তিনি। কঠিন স্বরে নিজের অপছন্দের কথা বলতেন ত্রিভঙ্গকে কিন্তু এখন ওকে উঁচু স্বরে যে দুটো তিরষ্কার করবেন সে ইচ্ছেও আর করে না, ক্ষমতাতেও আর কুলোয় না। অভিমান করে একবেলা উপবাস করে থাকবেন, সেটুকুও আর ধৈর্য নেই। আর কীই বা হওয়ার আছে, তিনি তাঁর সময় অতিবাহিত করে ফেলেছেন, এবার সন্তানদের দায়িত্ব। চ্যবনকেই সামলাতে হবে ঝক্কি, মুখুজ্জ্যেদের পারিবারিক সংস্কার সব আগলাবে চ্যবন, জেমিনি চাটুজ্জ্যেদের সামলাবে চ্যবন, তিনি আর কোথাও নেই। এরকমটা আরো বেশী করে মনে হয়েছে সেদিন সেই বড়োডোবায় পতিত হবার পর থেকে। সেদিন বড়োডোবার পাড়ে সায়ংকৃত্য করতে গিয়ে সেই যে পিতামহ রঘুমণি মুখুজ্জ্যেকে দেখলেন, তারপর থেকে আরও অবসন্ন হয়ে গিয়েছে মন। ঠিক খুঁজতে খুঁজতে সাহেবডাঙা থেকে ঠাকুর্দা ধারাবহে পৌঁছে গিয়েছে।

র বদ্যি তো কী! মেয়ে ভালো, চাকরি করে সীতাপতির মনোভাব বুঝে সিন্ধুবালা বললেন। ভঙ্গুর মা আগে মতামত দিত না, এখন দিচ্ছে। ভাবলেন সীতাপতি।

সীতাপতি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। ওদিকে মা-ব্যাটাতেও নিশ্চুপ। যেন অধীর আগ্রহে সীতাপতির রায়দানের প্রতীক্ষা করছেন।

দুধটা নৈঃশব্দ্য ভেঙ্গে বললেন সীতাপতি। সিন্ধুবালা দুধের গেলাসটি বাড়িয়ে দিলেন। এমনিতে মাংস সেবন করে দুগ্ধ সেবন নিষেধ। তবে সীতাপতি মাংস সেরকম খাননি, একটু অস্থিমজ্জা শুষেছেন এই যা।

র ত্রিভঙ্গেরও তো বয়েস হলো। আমি যাবার পরে ওকে কে দেখবে সেটাও তো দেখতে হবে সিন্ধুবালা চিন্তিত গলায় বললেন।

জগত সংসারের এই একটি ব্যাপার এখনো কিঞ্চিৎ ভাবায় সীতাপতিকে। ত্রিভঙ্গকে দেখার কেউ রইল না। সেদিন চ্যবনের কাছে ওর বিয়ের প্রসঙ্গটা তুলেছিলেন ওই জন্যেই। সেটা তোলাই কাল হল, চ্যবন ওঁকে দোষারোপ করে চলে গেল। সেই থেকেই বোধহয় রেগে আছে চ্যবন। চ্যবন কী জানে সীতাপতির চ্যবনপ্রাশ শেষ হয়ে যাবে এই মাসেই!

ড়োব্যাটাই কী বলচে?

চ্যবন তো কতোদিন আগেই বলেচে, তোমার মনে নেই? সিন্ধুবালা বললেন।

সব মনে আছে সীতাপতির। কিছুই ভোলেননি। ত্রিভঙ্গের সঙ্গে ভয়ানক বিবাদ হয়েছিল, কটুবাক্য বলেছিল ত্রিভঙ্গ। চ্যবনও সেসময় বাবার মত খণ্ডন করেছিল। সীতাপতি একাই লড়াই করেছিলেন সেবার। কিন্তু আর সম্ভব নয়। সীতাপতি তাঁর আজন্মলালিত সংস্কারের গাঁঠরি বেঁধে ফেলেছেন, সব সঙ্গে নিয়ে যাবেন, সীতাপতি তৈরি। এবার শুধু খেয়ার অপেক্ষা

দ্যাখ তোরা যা ভালো বুঝিস কর। নিস্পৃহ সুরে বললেন সীতাপতি।

ব্যস এই একটি কথা দিয়েই শেষ করলেন ত্রিভঙ্গ উল্লম্ফন করতে করতে বেরিয়ে এলেন। বাবাকে দণ্ডবৎ করতে ইচ্ছে হয়েছিল, কিন্তু শেষমুহূর্তে সামলে নিয়েছেনইশ, একটা যদি ফোন থাকতো এখুনি টুক করে খবরটা দিয়ে দিতেন কাত্যায়নীকে!

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য।)

 

 
 
top