হুগলি জেলায় ভাগিরথী তীরে ইউরোপিয়ান সমাধি

 

পর্ব ২

চুঁচুড়া শহরের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ইতিহাসসূত্রে দেখা যায় ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট শাহজাহান চুঁচুড়ায় ডাচেদের বানিজ্যকুঠী নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিলেন। শহরটি তৈরি হয়ে গিয়েছিল আনুমানিক ১৬৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই। তখনও চন্দননগর শহর তৈরি হয়নি। ১৬৮৪-তে উইলিয়াম হেজের ডাইরিতে চুঁচুড়া উল্লেখিত হয়েছে Cinchora বলে। তখন চুঁচুড়া বেশ পরচিত শহর, স্বাস্থ্যকর স্থান হিসেবে প্রসিদ্ধ। তখনই এখানে সমাধিক্ষেত্রও তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও ছিল ব্যক্তিগত সমাধিক্ষেত্র।

খাদিনা মোড় থেকে তালগঙ্গার মোড়ের মধ্যে, গ্রান্ড ট্র্যাঙ্ক রোডের পূর্ব দিকে মাঠের মধ্যে একটি সমাধিক্ষেত্র আছে। এটি সুসান আন্না মারিয়া নামে জনৈকা ডাচ মহিলার সমাধি। তিনি মারা যান ১৮০৯-র ১২ মে। সমাধিটি স্থাপিত আছে একটি অষ্টভূজ বেদীর ওপর। বেদীর ওপরে যাওয়ার জন্য চারিদিকে সিঁড়ি আছে এবং ভিতরে প্রবেশের জন্য চারটি গোল খিলানের দরজা আছে। ভবনটির ছাদ গম্বুজাকৃতির। আগে সৌধটির ছাদ থেকে ঝুলত একটি শিকলে ঝোলানো ব্রোঞ্জের ঘণ্টা। এখন সেটি আর নেই। এই ব্যক্তিগত সমাধিভূমিটিকে স্থানীয় মানুষেরা বলেন সাত সায়েরের বিবির কবর। বর্তমান ডাচ সিমেট্রির কিছু দূরে একটি সমাধি রয়েছে। এই সমাধিতে রয়েছে বিশাল উঁচু একটি পিরামিড শীর্ষ। কিন্তু সমাধিটি কার, সেই বিষয়ে কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। সমাধিলিপি পাঠোদ্ধার করে শুধু এইটুকু বোঝা যায় যে এই ডাচ সমাধিটি ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে পুনঃনির্মিত হয়েছিল।

এই দুটি ছাড়াও চুঁচুড়ায় আরো দুটি সমাধিভূমি ছিল এবং দুটোই মুসলমানদের। এই বিস্তৃত সীমারেখা ধরলে এটা বলা যেতে পারে যে ইমামবাড়ির কাছে যে সমাধিভূমিটি আছে, সেটি বেশ প্রাচীন। অনেকে বলেন ওখানে হুগলির শেষ ফৌজদার খাজ্জা খাঁর (খান জেহান খাঁ) সমাধি থাকতে পারে। তবে, সমাধিটি চিহ্নিত নয়।

চুঁচুড়ার আর্মেনিয় চার্চের কথা এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। চার্চটির চত্বরে বহু সমাধি রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হোল জোসেফ ডেভিডিবিচ মেলিক বেগলার সাহেবের সমাধি। বেগলার ছিলেন ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অ্যালেকজান্ডার ক্যানিংহ্যামের যোগ্য সহকারী। বেগলার বেঙ্গল ডিসট্রিক্ট গেজেটিয়ারের অনেকটা রচনা করেছিলেন। তাঁর মৃত্যু হয় চাকদহে। সেখান থেকে তাঁর দেহ চুঁচুড়ায় নিয়ে আসা হয়েছিল। এই চার্চের মধ্যেই কোলার এবং তাঁর বাবার সমাধি রয়েছে। সমাধিফলক থেকে জানা যায় তাঁরা ছিলেন আর্মেনিয়ার একটি রাজপরিবারের সদস্য। ভাগ্যতাড়িত হয়ে তাঁরা ভারতে আসেন। এই চার্চের প্রাঙ্গণে এই পরিবারের অন্তত পাঁচজন সদস্যের সমাধি রয়েছে। এখানে অন্যান্য সমাধিগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মার্গার বংশের সমাধি। খোজা খোয়ানিদের পুত্র মার্গার এই গির্জার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

সুবীর কুমার মিত্রের মতানুসারে এই আর্মেনিয় চার্চ তৈরি হয়েছিল ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে। এখানে বিংশ শতাব্দীতেও দেহ সমাধিস্থ করা হয়েছে। সেবার আদর্শে দীক্ষিত আর্মেনিয়রা বিশ্বাস করত, সমাধিভূমি অজস্র মানুষের পদধূলিতে পূণ্যভূমি হয়ে উঠবে। চার্চে করুণাময় পরমপুরুষের স্নেহছায়ায় শুয়ে থাকবে নশ্বর দেহ।

আর্মেনিয় চার্চের সমাধিলিপিগুলির বেশ কয়েটির অনুলিপি করেছেন ড. দীপঙ্কর দাস। নীচে সেই অনুলিপিগুলি থেকে কয়েকটি তুলে ধরা হোল:

ডেভিডের সমাধিলিপি

ইন লাভিং মেমরি অব আওয়ার বিলাভেড ফাদার ডেভিড

সান অব দ্য লেট ফ্রিডন মেলিক

বিক্ল্যারফ, লাস্ট ইনডিপেন্ডেন্ট প্রিন্স অব

কারাবাক ইন দ্য প্রভিন্স অব টিফিলিস ককেশাস

বরন অন দ্য ১ মে ১৭৯৫ অ্যান্ড ডায়েড ইন

চিনসুরাহ অন ২২ সেপ্টেম্বর ১৮৮৪

নাইন এম দ্য রেজারেকশন অ্যান্ড দ্য

লাইফ.

জোসেফের সমাধিলিপি

ইন লাভিং মেমরি অব জোসেফ সান অব

ডেভিড ফার ইডনউইচ মেলিক বিক্ল্যারফ

অব কারাবাগ

লেট একজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার পি. ডব্লু. ডি &

আর্কিওলজিক্যাল সার্ভেয়র, বেঙ্গল

বরন ২৫ জুন ১৮৪৫

ডায়েড ২৪ এপ্রিল ১৯০৭ অ্যাট চাকদহ।

শামিরের সমাধি ফলক

শামির জসেফিচ বিক্ল্যারফ

২৫ অগস্ট ১৮৮৬

মেরির সমাধিফলক

ইন মেমরি অব মেরি

ওয়াইফ অব জোসেফ ডেভিডিচ মেলিক বিক্ল্যারফ

এ.ডি. ২৫ নভেম্বর ১৮৭৮

এছাড়াও আরও বহু সমাধিফলক আছে যেগুলির পাঠ অবিলম্বে প্রয়োজন।

(ক্রমশ…)

 
 
top