হুগলি জেলায় ভাগিরথী তীরে ইউরোপিয়ান সমাধি: একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা

 

হুগলি জেলায় বহু বিদেশি মানুষের সমাধিক্ষেত্র রয়েছে। প্রতি বছর বর্ষায় সেগুলি ক্ষয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। ধুয়ে যাচ্ছে কত নাম, শোকগাথা। বেশিরভাগ সমাধিই নদীতীরের কাছাকাছি। বিদেশিরা সাধারণত নদীতীরের কাছাকাছি বসতি গড়ে তুলতেন। ঔপনিবেশিক যুগ শুরু হলে বহু বিদেশি  হুগলি জেলায় আসেন। এঁদের একটি বড়ো অংশ হল পর্তুগিজ, আর্মেনিয়ান, ডাচ, ফরাসি, ব্রিটিশ, ড্যানিশ, এমনকী অস্ট্রিয়ানও। সারা হুগলি জেলা খুঁজলে দেখা যায় অসংখ্য সমাধি রয়েছে এইসব বিদেশি মানুষদের। এঁদের মধ্যে অনেকের শুধুমাত্র দেহাবশেষ নিয়ে গড়ে ওঠা সমাধিক্ষেত্রও রয়েছে। 

ব্যান্ডেলে পর্তুগিজদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ডেল চার্চকে কেন্দ্র করে অনেকগুলি সমাধি রয়েছে। চুঁচুড়ায় আর্মেনিয়ান গির্জার ভিতরে রয়েছে অসংখ্য সমাধি। এইসব সমাধির ওপরটা বাঁধানো। গোটা চত্বরটি একটি উঠোন। উঠোন পেরিয়ে যাওয়া মানে সমাধিগুলি পায়ে মাড়িয়ে যাওয়া। সমাধির ওপরকার লিপি খোদিত রয়েছে আর্মেনিয়ান ভাষায়। চুঁচুড়া প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত রয়েছে ডাচ এবং আর্মেনিয়ানদের নাম। তাঁদের সমাধিভূমি ইতিহাসের সাক্ষী। বহু ইউরোপিয়ানদের হদিশ মেলে এখানে। এছাড়াও রয়েছে অনেকগুলি কবর যা মুসলিমদের। 

আর্মেনিয়ান চার্চ গড়ে ওঠার পর থেকে চুঁচুড়ায় আর্মেনিয়ানদের সমাধিস্থল ছিল শুধু চার্চপ্রাঙ্গন। চিরবিশ্রামের জায়গা হিসেবে এই শান্ত বিশাল গির্জার ভিতরে বিরাজ করছে চিরশান্তির এক আবহাওয়া। এখানে অনেক কবর আছে, আর্মেনিয়ান ভাষায় সমাধিলিপি আছে, পরিচয়লিপি আছে। ভবিষ্যৎ গবেষকরা এর ওপর কাজ করতে পারেন। 

হুগলির ইমামবাড়ির কাছে বহু পুরোনো একটি সমাধিক্ষেত্র রয়েছে। এটি মূলত ইসলাম ধর্মের মানুষদের সমাধিক্ষেত্র। হুগলিতে খান জেহান খাঁ-সহ বহু বিদেশি রক্তের রাজপুরুষদের কবর রয়েছে। বিদেশি রক্তের রাজপুরুষ বলতে বোঝান হচ্ছে মঘল প্রশাসনের ইরানি এবং তুরানি রাজপুরুষদের। এঁদের কবরগুলির হদিশ এখন প্রায় পাওয়াই যায় না। কবরখানাটিরও ভগ্নদশা। এমনই সব কবরখানা রয়েছে কারবালা এবং মল্লিক কাশেম হাটের চৌহদ্দিতে। সময়ের হাতে জীর্ণ এই কবরগুলির নাম-পরিচয় অজ্ঞাত। ঐতিহাসিকদের অনুমান, ইমামবাড়ির কাছের কবরখানায় রয়েছে হুগলির ফৌজদার খাড্ডা খাঁয়ের কবর। তিনি দারিদ্রবিজড়িত হয়ে দেহ রাখেন।

হুগলি জেলার ইউরোপীয় সমাধিক্ষেত্রগুলিতে সমাধিলিপির প্রাচুর্য বিস্মিত করে, যদিও ঠিকমত সংরক্ষণের অভাবে আজ তা কালের কবলে পতিত হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে, এইসব সমাধিক্ষেত্রের মাটিতে যাঁরা শেষ শয্যা পেতেছেন তাঁদের মধ্যে একটি বড় অংশ হল মহিলা এবং শিশু। এদের অনেকেরই মৃত্যু হয়েছিল বর্ষায় বা বসন্তে। দুরারোগ্য পেটের অসুখ বা বসন্তের আক্রমণে ঝরে গিয়েছিল এইসব প্রাণ। স্বদেশের তুষারভরা সমাধিক্ষেত্র থেকে বহু দূরে বিদেশের মাটিতে চিরঘুমে ঘুমিয়ে পড়তেন বিদেশিরা।

হুগলি জেলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইউরোপিয় সমাধিভূমি তিনটি। চুঁচুড়ায় ডাচেদের এলাকায়, চন্দননগরে ফরাসিদের এলাকায় এবং শ্রীরামপুরে ড্যানিশদের এলাকায়। এছাড়াও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনেক সমাধিভূমি রয়েছে। গির্জাগুলির চত্বরে রয়েছে অনেক সমাধি যেমন ব্যান্ডেলের গির্জা এবং চুঁচুড়ায় আর্মেনিয়ানদের গির্জা।

পলাশির যুদ্ধের বহু বছর আগে, ১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দে চন্দননগরে ফরাসিদের দুর্গ গড়ে উঠেছে। তখন থেকে চন্দননগরে ইউরোপিয় সমাধিক্ষেত্রটি তৈরি হয়। চন্দননগরে তখন বহু খ্রিস্টান মানুষের ভিড়। তারপর ধীরে ধীরে তিনটি গির্জা তৈরি হয়েছে যার দুটি এখনও অক্ষত রয়েছে। সেটি অপেক্ষাকৃত কম প্রাচীন। কালের বিচারে চুঁচুড়ার সমাধিভূমিটি অনেক বেশি প্রাচীন। বর্তমানে কুলপুকুরের কাছে গোরস্থান মোড়ে নেমে একটু এগিয়ে গেলে চোখে পড়বে ডাচ সিমেট্রি। বর্তমানে নারিকেলবাগানের পাশে, শহরের একপ্রান্তে পাঁচিল-ঘেরা এই সমাধিভূমিটি বহু পুরোনো কবরের পরিচয় বহন করছে। এই সমাধিভূমিতে অধিকাংশ কবরই ডাচেদের, তবে কয়েকজন অন্যান্য ইউরোপীয় মানুষও আছেন। ডাচ স্থাপত্যের রীতি জড়ানো রয়েছে সমাধিগুলির গঠনবিন্যাসে। অধিকাংশ সমাধি খুব উঁচু স্তম্ভশোভিত। দীর্ঘ, শীর্ষ স্মরণস্তম্ভ এর বৈশিষ্ট্য। এখানে রাজপুরুষ, নৌসেনা বা পদাতিক সৈন্যবাহিনীর মানুষ ছাড়াও আছে নাগরিক পরিবারভুক্ত সাধারণ মানুষ। একদিন যাঁরা এপিটাফে লিখেছিলেন শোকগাথা, তাঁদেরই অনেকেরই শেষশয্যা রচিত হয়েছে এই গোরস্তানে। আবার রচিত হয়েছে এপিটাফ। চুঁচুড়া এবং চন্দননগরের সমাধিভূমিগুলি তারই সাক্ষ্য দেয়।

(ক্রমশ…)

 
 
top