চ্যবন মুখুজ্জ্যেদের বার্ষিকগতি

 

পঞ্চাশৎবর্ষের ফটকগোড়ায় দাঁড়িয়ে ধারাবহ মৌজার ত্রিভঙ্গ মুখোপাধ্যায় জ্যেষ্ঠভ্রাতা চ্যবনকে আপনি সম্বোধন করে বসলেন। চ্যবন তখন বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকায় নিবিষ্ট সন্ধিপূজার নির্ঘণ্ট নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি হয়েছে ওঁর মায়ের, তারই উত্তর খুঁজছেনতবু আপনি কর্ণগোচর হল এবং কর্ণ আর হৃদয়ের বিবাদ বেঁধে গেল। ভাবতে চাইলেন নির্ঘাত্‌ ভ্রান্তি হয়েছে, বয়েস তাঁরও কিছু কম হল না। চোখে ছানির প্রাদুর্ভাব হয়নি ঠিকই কিন্তু কর্ণের শ্রবণক্ষমতা নিম্নমুখী গত পরশুই রুরুর কী একটা প্রশ্ন বারতিনেক চেষ্টা করেও ঠাহর করতে পারেননি, দু-বার অ্যাঁ বলে ফেলেছিলেনতাতে রুরু খানিক রুষ্ট হয়েছিল। চ্যবন শেষে একখানা দায়সারা অর্থহীন হ্যাঁ দিয়ে সামাল দিয়েছিলেন। এবং এরকম হচ্ছে আজকাল। কথোপকথনের মাঝে শব্দ-সিলেবল আন্দাজ করে নিতে হচ্ছে। আন্দাজ করতে না পারলে অপরাধী অ্যাঁ। আজও অ্যাঁসূচক সাউন্ড উদ্গার করলেন—কিন্তু ত্রিভঙ্গের সম্বোধনে হেরফের হল না

লছি, ওদের নেমতন্ন করবেন কী?

অ্যাঁ?

ই যে জেমিনি চাটুজ্জ্যে, ওদের নেমতন্ন করবেন কী?

অ্যাঁ, কিছু বললি ভঙ্গা?

লছিলাম, জেমিনি চাটুজ্জ্যেরা তো খুব জ্বালিয়েচে এবার, বিদ্যেধরীর বকনা বাছুরটা ওদের ধান খেয়েছিল বলে আমাদের দুটো পাঁটাকে বিষ খাইয়ে মেরে দিয়েচে। ওদের নেমতন্ন করবেন কী?

করবেন—পষ্ট উচ্চারণ ত্রিভঙ্গের, নির্ভুল শুনেছেন চ্যবন। আগে হলে বলত, দাদা, জেমিনি চাটুজ্জ্যেদের কী নেমতন্ন করবি এবার? এটাই তো সে বলে এসেছে জ্ঞান হওয়ার পর থেকে। নেহাতই নাবালক ছিল যখন, তখন চ্যবনের নাম ধরেই ডাকত। চ্যবন বলতে পারত না, বলত চপন। তারপর কালীকিংকর চাটুজ্জ্যের বিধবা দিদি কালিন্দী দাদা বলা শিখিয়েছিল। দাদা ডাকলেও তুই-ই বলত। বেবাক জীবন তুই-তোকারি করে এই বয়সে ত্রিভঙ্গের এরকম বিটকেল বোধোদয়! শেষ যেবার এসেছিলেন, সেবারও সে তুই-ই ডেকেছেবড়ো ডোবার সংস্কার নিয়ে দু-জনে বিস্তর আলোচনা হয়েছিল সেবার, বাড়ির পশ্চিমদিকে ল্যাভাটরি বানাবার পরিকল্পনা করেছিলেন দু-জনে, ছেষট্টি সালের দুর্ভিক্ষে নির্ভেজাল কলমিসেদ্ধ খাওয়ার স্মৃতিরোমন্থন করেছিলেন। তবে সেবার বেশ কয়েকবার ভাববাচ্যে সে কথা বলেছিল মনে আছে চ্যবনের। নৈশাহারে ডাকার সময় দাদা, এবার খাওয়া হোক বলেছিল ত্রিভঙ্গআর যখন গাঁ থেকে ফিরছিলেন তখন আবার কখন আসা হবে দাদা বলেছিলতবে সেসব নিয়ে তখন বেশি ভাবিত হননি চ্যবন। মাঝখানে আর কথাও হয়নি, ত্রিভঙ্গ এখনো মোবাইল ফোন ব্যবহারে অভ্যস্ত নন। চ্যবনের অশীতিপর মা মোবাইল ফোনের কলা-কৌশল আয়ত্ব করে ফেললেও, ত্রিভঙ্গের এখনও ওসব বশ হয়নি। তাই মায়ের কাছেই অ্যাতোদিন ওঁর খোজখবর নিয়ে এসেছেন চ্যবনমা তো ঘুণাক্ষরেও ছোকরার মতি পরিবর্তনের কথা জানায়নি! অবিশ্যি মা-বাপের সঙ্গে আর কতটুকুই বা বাক্যালাপ হয় ত্রিভঙ্গের, এই বয়সেও তাঁর অ্যাতো বাউণ্ডুলেপনা। 

সোমত্থ দুটো পাঁটা দাদা, কত কষ্টে মানুষ করলাম, ছটছটি দিয়ে মরে গেল। কুঁচলেফল খাইয়ে মেরে দিল ওরা দাদাকে চুপ থাকতে দেখে আবার বললেন ত্রিভঙ্গ।

চাটুজ্জ্যেদের এই অপকীর্তির কথা চ্যবন মায়ের মুখে ইতিমধ্যেই শুনেছেন শুনে জেমিনি চাটুজ্জ্যের প্রাণসংহার করার ইচ্ছে হয়েছে চ্যবনের ধৃতরাষ্ট্র যেরকম ভাবে লৌহভীমকে বাহু আর বক্ষে ধরে চূর্ণ করেছিল, সেরকম ভাবে। প্রশাসন নিজের হাতে থাকলে ব্যাটাকে অন্তত পিছমোড়া করে বেঁধে কঠিন বেত্রাঘাত করে আসতেন। কিছুদিন আগে এরকম হলে কমপ্লিটলি ওদের সংশ্রব ত্যাগ করতেন, বাক্যালাপ আর সামাজিক সম্পর্ক জলাঞ্জলি দিতেন, মুখোমুখি মুলাকাত হলে সেরেফ উপেক্ষা করতেন, একসঙ্গে পংক্তিভোজন করতেন না, দুর্গাসপ্তমীতে নিমন্ত্রণ করার প্রশ্নই উঠত না কিন্তু এখন পরিস্থিতি কিঞ্চিত্‌ গোলমেলে, জেমিনি চাটুজ্জ্যেদের পার্টি এবার পঞ্চায়েত দখল করেছে, গাঁয়ের ক্ষমতার ভরকেন্দ্র এখন জেমিনি আর পেয়াদাদের মতো পদসঞ্চার করা বিপুলা স্ত্রী তাই একটু চিন্তার অবকাশ আছে, বাবার সঙ্গেও পরামর্শ করবেন বলে ঠিক করেছেন চ্যবন। কিন্তু সেসব চিন্তাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে ত্রিভঙ্গের এই অস্বস্তিকর আচরণ।

জেমিনিবুড়োর সঙ্গে এরপর আর সম্পক্কো রাখার মানে হয় না। সারাজীবন কম জ্বালাল! ওদের বাদই দেওয়া হোক এবার। ত্রিভঙ্গ আবার বললেন।

সে ওরা জ্বালিয়েছে বিস্তর। বরাবরই মুখুজ্জ্যেদের উপর আক্রোশ এই জেমিনি চাটুজ্জ্যের, ওর বাপঠাকুর্দার। চাটুজ্জ্যেপ্রধান গাঁ ধারাবহ, মুখুজ্জ্যেরা সাকুল্যে একটিমাত্তর ঘর। এরা আদতে তিনমাইল দূরের সাহেবডাঙা গাঁয়ের লোক। সাহেবডাঙার রাবণারি মুখুজ্জ্যের সহোদরা উড়ুমতীর বিয়ে হয়েছিল ধারাবহের সর্বজ্ঞ চাটুজ্জ্যের সঙ্গে। সর্বজ্ঞ অপুত্রক, রাবণারির জ্যেষ্ঠপুত্র সীতাপতিকে পিসি উড়ুমতী মানুষ করেছিলেনঅক্কা পাবার আগে সর্বজ্ঞ বেবাক সম্পত্তি দানপত্র করে গেলেন কিশোর সীতাপতিকে। এদিকে সর্বজ্ঞ ফৌত হলে সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল জেমিনি চাটুজ্জ্যের বাবার। এঁরা সর্বজ্ঞের জ্ঞাতি। তা সেটি যখন হল না, নিদারুণ  আক্রোশ গিয়ে পড়ল সীতাপতির উপর। সীতাপতির জ্যেষ্ঠপুত্র চ্যবন আর মধ্যম ত্রিভঙ্গ, শিশুকাল থেকেই চাটুজ্জ্যেদের নিরন্তর উৎপাতের সাক্ষী। পাঁচিলের ওপার থেকে বিষ্ঠা ছুড়ে দিয়েছে, ডাকাতি করিয়েছে একবার, বড়োডোবার জলে ফলিডল দিয়ে মৎস্যবংশ নির্বংশ করেছেতাড়ি সেবন করে ফটকে জলবিয়োগ করে গিয়েছে যুবক জেমিনি, চৌকাঠে গোবৎসের টিবিয়া-ফিবিউলা টাঙিয়ে দিয়েছেযদিও চ্যবনরা জোয়ান হওয়ার পর সেসব উপদ্রব খানিক কমেছে

দেখি, কী করা যায় ত্রিভঙ্গের কথার পিঠে এখন এইটুকুই বললেন চ্যবন।

তত্‌ক্ষণাৎ কোনো মীমাংসায় গেলেন না, অসোয়াস্তি গোপন করতে ত্রিভঙ্গের মুখের দিকে চাইতেও পারলেন না। তোর বউদিদি ডাকচে, দাঁড়া শুনে আসি বলে তিনি খাটিয়া থেকে উঠে পড়লেন, সোজা হাঁটা দিলেন অন্দরমহলের দিকে ত্রিভঙ্গ কিছু টের পেলেন বলে মনে হল না। অলস-মস্তিষ্কের মানুষ ত্রিভঙ্গ, চিন্তাভাবনার কাজটিকে বয়োজ্যেষ্ঠদের উপর ছেড়ে দিয়ে আনন্দেই থাকেন।

দুর্গাদালানে দীর্ঘ ষষ্ঠীকীর্তি দেখে ফিরলেন চ্যবন। পুরোহিত দুর্বাদল ভট্‌চাযের প্রথমবছর এবার, ভালোই উদ্যম আছে পিনাকপাণি চক্রবর্তী ইস্তফা দিয়ে বেমালুম শহরের পুজোয় ভিড়ে গেলেন, বিস্তর সন্ধান করে চড়কডাঙা থেকে দুর্বাদলকে আনা হল দুর্বাদলের কণ্ঠে দরদ আছে, পিনাকপাণির মতো গোঁজামিল দেন নাতবে দন্তপংক্তির স্ট্রাকচার-এ ত্রুটি, উচ্চারণ তাই ঠিক জমাটি হচ্ছে নাআর একটু নিকটবর্তী হলেই অল্পমূল্যের মদ্যের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তবে ওতেই কামাল হয়ে যাচ্ছে, ওমুড়োর ন-খুড়িকে ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে চোখ মুছতে দেখেছেন চ্যবন।

ফিরেই চ্যবন তাঁর পিতৃদেবের কুঠুরিতে এলেন। সীতাপতি উবু হয়ে বসে কলকাতা-ক শুনছেন। তরুণ চক্রবর্তীর মন্দ্র কণ্ঠ। যষ্টিটি আর হাতপাখা ডানপাশে রাখা, অম্বুরি তামাকের খুশবুতে ম-ম করছে ঘরঘরে একটি প্রাচীন হ্যারিকেন জ্বলছে, কাঁচটা আদ্ধেক ভাঙা, পিচবোর্ড গুঁজে শিখার জীবনরক্ষা হচ্ছেগাঁয়ে বিদ্যুতের খুঁটি খাড়া করে গিয়েছে কোম্পানি, বিদ্যুৎ আসার এখনো বিলম্ব আছে।

বাবা ধীর গলায় ডাকলেন চ্যবন। সীতাপতি রেডিও শুনতে শুনতে ঝিমোচ্ছিলেন।

অ্যাঁ? কিছু বলবি, ব্যাটাসীতাপতি মুখ না-তুলেই বললেনসীতাপতি এখন নব্বুই, তবু জ্ঞানগম্যি এখনো কম পড়েনি। রেডিও মৃদু ভল্যুমেই শুনতে পান, খালি চোখে রামায়ণ পড়তে পারেন। একটি সাদাকালো টেলিভিশন আছে ত্রিভঙ্গের ঘরে, সেখানেও খবর শোনেন ইচ্ছে হলে। দাঁত অবিশ্যি মার খেয়েছেদু-চারটে নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় শো-পিস বাদে, করিতকর্মারা সবাই সীতাপতিকে বিদায় জানিয়েছে। চ্যবন চেয়েছিলেন বাঁধিয়ে দেবেন দামি কোম্পানির দাঁত দিয়ে, সীতাপতি রাজি হননি। মাংস তিনি ত্যাগ করেছেন, ফলপাকুড়ও খান সেদ্ধ, মেঠাই খান চূর্ণ, চানাচুরে রুচি নেই। দাঁতের আর উপযোগিতা কোথায়?  সেদিন অব্দি বাই-সাইকেল চালাতেন। কয়েক বছর আগে বড়োডোবার পাড়ে সায়ংকৃত্য করতে গিয়ে এক বিভ্রাট ঘটে, তারপর থেকে সাইকেল বন্ধ সেদিন অর্ধচন্দ্রের আলোয় সীতাপতি দেখলেন, পাকুড়গাছের শাখায় স্বয়ং পিতামহ রঘুমণি মুখুজ্জ্যে—মহাবীর কোলিয়ারির মাইনিং সর্দার, একান্তে গঞ্জিকাসেবন করতে করতে বঙ্কিমহাস্য করছেন। ব্যস, পুকুরপাড়ে সীতাপতির সপাট পতন আর মুর্চ্ছা। তখন থেকেই পায়ের উপর নিয়ন্ত্রণটা যেন কমেছে, সাইকেল চালাতে আর সুরক্ষিত বোধ করেন না।

বাবা, নেমতন্নটা ফাইনাল করে নাও পিতৃদেবের পাশটিতে বসলেন চ্যবন। রেডিওর নব ঘুরিয়ে আওয়াজটা প্রায় বন্ধই করে দিলেন

ষ্ঠীকিত্তি হল? চ্যবনের প্রশ্নটি খেয়াল না-করেই বললেন সীতাপতি। এমনিই প্রশ্ন করলেন। ষষ্ঠীকীর্তি না হলেও সীতাপতির জীবনচর্যায় কিছু পরিবর্তন হত না।

হ্যাঁ। পিনাকপাণি তো নেই এবার, পুরোহিত নতুন। তা তুমি গেলে না কেন? কালীকিংকরখুড়ো গোটা পুজোটা বসে দেখল

কালী এসেছিলবলেই চুপ করে গেলেন সীতাপতি। একটা সময় ছিল সীতাপতি-কালীকিংকররা দুর্গাদালানে বসে পুজোর তদারকি করতেন, পুরোহিতের মন্ত্র আর পূজাপদ্ধতিতে ত্রুটি ধরতেন। বিদ্যের বহর ছিল না বিশেষ কিন্তু স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। বাপ-ঠাকুর্দার কাছে যেটুকু পুজো-আচ্চা শিখেছিলেন, ওইটুকুইএকসময় হারমোনিয়াম বাজিয়ে পুরাতনি গেয়েছেন, কালীকিংকর তবলায় সঙ্গত করেছে। এখন সংগীতের আওয়াজে পীড়িত হন। সোশালাইজও আর করেন না সীতাপতি, পুজো-পাশা, গল্পগুজব, বিবাহ উপনয়ন অন্নপ্রাশন কোনোকিছুতেই হেলদোল নেই। এই ঘরের কোণটিতে উবু হয়ে বসেই সারাটা দিন কাটে, রেডিওটা আপনমনে গুজগুজ করে। স্ত্রী সিন্ধুবালা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সময় সময় খাবারটি দিয়ে যান।

তোমার কথা শুধোচ্ছিল কালীখুড়ো। বলল সীতাদাদাকে অনেকদিন দেখি না, একদিন গানবাজনা হোক

সেরেফ একটি দীর্ঘনিশ্বাস শুনলেন চ্যবন।

চ্ছা বাবা, সপ্তমীর নেমতন্নটা ফাইনাল করে নাও

তোরা কর। ভঙ্গুকে ডাক নিস্পৃহ গলায় বললেন সীতাপতি

ঙ্গা বলচে, জেমিনি চাটুজ্জ্যেদের ডাকবে কি এবার? ত্রিভঙ্গের সেই সম্বোধনের ব্যাপারটা এখনো চ্যবন ওঁর মা বা স্ত্রী কাউকেই বলেননি। সারাদিন ত্রিভঙ্গের সঙ্গে দেখাও হয়নি, মধ্যাহ্ণভোজের সময়ও না, ষষ্ঠীকীর্তির সময়ও সে দুর্গাদালানে ছিল না।

ঙ্গার কী মত? সীতাপতি এখন নিজস্ব মতামত দিতে ভয় পান। গাঁয়ে বড়ো রাজনৈতিক দলাদলি আর গোষ্ঠীকোঁদল এখন। কুড়িটি মাত্তর বামুনঘর, অন্তত তিনটি রাজনৈতিক দলের সমর্থক, রাজনৈতিক দলের ভিতর আবার গোষ্ঠীর দলাদলি। ত্রিভঙ্গের কাছেই শোনেন এসব। ভেবেচিন্তে কথা কইতে হয়। আর ত্রিভঙ্গ যেহেতু সারাদিন টোটো করে বেড়ায়, চ্যবনের চেয়ে গাঁয়ের পরিস্থিতি অনেক বেশি তার আয়ত্বে।

ও তো নিষেধ করচে সোজাকিন্তু জেমিনি চাটুজ্জ্যদের হাতেই এখন পঞ্চায়েত, ওদের সঙ্গে বিবাদ করলে ফল ভালো হবে? সামনেই ধানকাটা আছে। মুনিশকামিন পাবে?

জেমিনি চাটুজ্জ্যেদের কাণ্ডকারখানা নিয়ে কিঞ্চিত ভয়েই থাকেন সীতাপতি বিষম উত্যক্ত করেছে একসময়বড়োডোবায় চান করতে নেমেছেন সীতাপতি, যুবক জেমিনি ধুতি-গামছা হাওয়া করে দিয়েছে আজানু পঙ্কলেপন করে ঘরে ফিরেছেন সীতাপতি, চল্লিশ শতাংশের বেশি লজ্জানিবারণ হয়নি সেইসব বেইজ্জতির কথা ভুলতে পারেন না তিনি।

ঙ্গার কথা শুনিস না, উড়নচণ্ডী একটাতুই যা ভালো বুজছিস কর বললেন তিনি।

চ্ছা। আর বাকিদের যেমন করা হয়, সেরকমই তো?

হ্যাঁ। না ভেবেই বললেন সীতাপতিবলতে হয় বললেন। চ্যবন এখনো সব ব্যাপারে তাঁর মতামত নেয়, সীতাপতির ভালোই লাগে। তবে আর তলিয়ে ভাবেন না তিনি। সময় সময় চাট্টি অন্ন পেলেই তাঁর সব চাহিদা-আকাঙ্খার নিবৃত্তি হয়।

চ্ছা, তাহলে আসচি আমি। দেখি গে, কালকের সব যোগাড়যন্তর করতে হবে পিতৃদেব কথা বাড়ালেন না দেখে বললেন চ্যবন।

য়। হ্যাঁরে, মুরারি আসবে না এবারে? আর ক্ষেমি?

মুরারি ছুটি পায়নি। ক্ষেমির শাশুড়ির কী একটা অস্তর হবে, এবার আর আসবে না। 

আর রুরুদাদু ভালো আছে? এবার বিয়ে দে একটা ওর

দেখাশোনা তো শুরু করব ভাবচি এই পুজোর পর থেকেই। আচ্ছা বাবা, ভঙ্গা ঠিক আছেকী মনে হল, প্রশ্নটা করেই বসলেন চ্যবন। ভেবেছিলেন মা-কে শুধোবেন, কিন্তু সারাদিনটা গাঁ বেড়িয়েই কেটে গেল।

ই আছে। সারাদিনে একবারও মুখদর্শন হয়না বলে কিছুক্ষণ থামলেন সীতাপতি। তারপর কী মনে হল, বললেন, র বিয়ের ব্যাপারে কিছু ভাবলি?

বিয়ে? ওর কত বয়েস হল খেয়াল আছেআঁতকে উঠলেন চ্যবন। র ভঙ্গার বিয়ে তো তোমরাই হতে দিলে না, এখন আর বলে কী হবে খানিক তিরিক্ষি মেজাজেই বললেন, একটু ধমকের স্পর্শ ছিল। ত্রিভঙ্গের সখ্য ছিল চড়কডাঙার বদ্যিদের একটি মেয়ের সঙ্গেত্রিভঙ্গ খুব চেয়েছিলসীতাপতি মেনে নেননি।

ন্য জাত যে ব্যাটা, ওরা বদ্যি যে তুই তো সবই জানিস ক্ষীণস্বরে বললেন সীতাপতিচবনের মৃদু ধমকে আরো গুটিয়ে গেলেন

র জাত! যাক গে আমি এলাম বাবা চ্যবন দ্রুত বেরিয়ে এলেন। পিতৃদেবকে তিরস্কার করে আত্মগ্লানি হল চ্যবনের। মানুষটার এমন জড়ভরত দশা দেখলে মনটা বড়ো বিস্বাদ হয় বহির্জগতে সেরকম দাপট না দেখালেও, সীতাপতির ঘরোয়া পৌরুষের প্রকাশ ছিল ভালোই। রান্না পছন্দ না হলে খাবারের থালা নির্দ্বিধায় ধুলোয় ফেলতেন, স্ত্রীকে রেয়াত করতেন না, চ্যবন-ত্রিভঙ্গদের অনেক বড়ো বয়েস অব্দি সজোর চপেটাঘাত করতেনভীমবিক্রম দেখিয়েছেন ত্রিভঙ্গের সেই ব্যাপারটাতেওফ্‌, জরা পুরুষকার নিয়েও এমন ছেলেখেলা করে!

(ক্রমশ…)

 
 
top