ইসলামিক স্টেট ও রোহ্যাবা

 

আমাদের বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী আবদুল্লা ওয্যালানের ডিমোক্র্যাটিক কনফেডারিলিসম বা রাষ্ট্রবিহীন গণতন্ত্র তত্ত্বের ভিত্তিতে সিরিয়া তুরস্কের সীমান্ত অঞ্চলে বর্তমানে ঘটে চলছে এক অভূতপূর্ব সামাজিক বিপ্লব। একদিকে তুরস্কের ফ্যাসিবাদী সরকারের তীব্র অসহযোগিতা, কঠিন এমবার্গোর খাড়া প্রাচীর, অন্যদিকে ধর্মান্ধ ইসলামিক স্টেটের (আইএসআইএস) চূড়ান্ত বর্বরতা এবং প্রত্যহ সম্মুখ যুদ্ধ, একই সাথে পেছনে ফেলে আসা হাজারো বছরের চূড়ান্ত রাষ্ট্রীয় দমনের ইতিহাস। এই চরম প্রতিকূলতা এবং সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের বীভৎসতার মধ্যেও পঞ্চাশ লক্ষের অধিক কুর্দ এবং অন্যান্য জনজাতি আঠের হাজার চারশো বর্গ কিলোমিটারের এক বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে আবদুল্লা ওয্যালানের প্রদর্শিত পথে ২০১২ সাল থেকে গড়ে তুলছে রাষ্ট্রহীন গণতন্ত্রের এক অভূতপূর্ব বিপ্লব—রোহ্যাবা রেভ্যুলিউশন। আমাদের বর্তমান সময়ের সম্ভবত সবথেকে উচ্চাভিলাষী বৈপ্লবিক এক সামাজিক পরীক্ষা নিরীক্ষা।

মূলত পশ্চিমের মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা এই অঞ্চল থেকে হাজারে হাজারে মানুষের ইউরোপ অভিমুখে আশ্রয় সন্ধানের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার বিবরণ, সাথে ইসলামিক স্টেট নামক বর্বর ধর্মান্ধগনের সিরিয়া এবং ইরাকের ঐতিহাসিক স্থানগুলি ধ্বংস করে দেওয়ার সংবাদ, নিরস্ত্র অন্য ধর্মের অসহায় নাগরিকের গণহত্যার বীভৎসতা, মহিলাদের যৌন দাসী হিসাবে ব্যবহারের কদর্যতার সম্বন্ধে প্রত্যহ অবগত হচ্ছি। মার্কিন এবং রাশিয়ার সম্রাটদের ইসলামিক স্টেট বিরোধী হুমকি এবং মাঝে মাঝে বিমান হানার খবর আমাদের আশ্বস্ত করছে যাক বিশ্বের প্রধান নেতাগণ ইসলামিক স্টেটের বর্বরতার অবসানে এতদিনে সত্যিই কিছু কাজের কাজ করছেন। অথচ একই সময়ে এই বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে অভূতপূর্ব যে বিপ্লব সংগঠিত হচ্ছে যা প্রকৃত অর্থে একাধারে ইসলামিক স্টেটের অগ্রগতি রুখে দিচ্ছে পাল্টা সামরিক অভিযানে অন্যদিকে তত্বগতভাবে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা এবং তথাকথিত গনতন্ত্র, কম্যুনিস্ট আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের ধারনা এবং ইসলামিক স্টেটের নিরঙ্কুশ মুসলিম মৌলবাদকে আক্রমণ করছে আবদুল্লা ওয্যালানের তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগে তার খবর আমাদের কাছে প্রায় অজ্ঞাত। যদিও রাজনৈতিক ইতিহাস পরিচিতি বিনা উল্লেখে রোহ্যাবার মহিলা যোদ্ধাদের চিত্র আমাদের কাছে মাঝে মাঝে পরিবেশিত হচ্ছে বিভিন্ন পত্র পত্রিকার মাধ্যমে । এমনকি বামপন্থী বুদ্ধিজীবী শক্তি, যা এখনো কিছুটা জনমত তৈরিতে সক্ষম, আশ্চর্যজনক ভাবে তারাও এই অসাধারণ রাষ্ট্রহীন গণতন্ত্রের ম্যাসিভ স্কেলে ঘটে চলা সামাজিক বিপ্লবের বিষয়ে পাথরের মত নিস্তদ্ধ।

প্যারিস কমিউন টিকে ছিল মাত্র সত্তর-আশি দিন, স্পেনের বিপ্লব তিন বৎসরের কিঞ্চিৎ অধিক, অন্যদিকে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতেতে রোহ্যাবা বিপ্লব টিঁকে আছে তিন বৎসরের অধিক সময়। সম্প্রতি রোহ্যাবা তার প্রাথমিক সংবিধানটি বিপুল গণভোটে পাস করেছে। এই সংবিধানের অন্যান্য অনেক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তের সাথে অন্যতম বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত বাল্য বিবাহ এবং বহুবিবাহ প্রথা নিষিদ্ধ। আরব মুসলমান প্রধান দুনিয়াতে যা প্রথম এবং অভূতপূর্ব। এই অসাধারণ সামাজিক বিপ্লব, তার সমস্ত প্রতিকূলতা অগ্রাহ্য করে টিঁকে থাকা, বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ক্রম প্রসার এবং সেই নিয়ে পৃথিবীর সমস্ত বিষয়ে জ্ঞানবান বুদ্ধিজীবী বিশেষত বামপন্থী বুদ্ধিজীবী গনের অদ্ভুত নীরবতা বিষয়ে ডেভিড গ্রেইবার সম্প্রতি তাঁর দ্য গার্ডিয়েন- প্রকাশিত এক লেখায় বলেছেনইজ দ্য ওয়ার্ল্ড—অ্যান্ড দিস টাইম মোস্ট স্ক্যান্ডালাসলি অব অল, দ্য ইন্টারন্যাশানাল লেফট—রিয়্যেলি গোয়িং টু বি কমপ্লিসিট ইন লেটিং হিস্ট্রি রিপিট ইটসেলফ?

রোহ্যাবা বিপ্লবের প্রেক্ষাপট: কুর্দ লড়াইয়ের ইতিহাস তত্ত্বের

পাহাড়ি নদীর অনেক বাঁক থাকে (কুর্দিশ ফোক সং থেকে)

পৃথিবীর সব থেকে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা কুর্দদের এই ধারাবাহিক স্বাধীনতার আন্দোলনের ইতিহাসে এত বাঁক, এত উথাল পাথাল, এত বিশাল জটিলতা এবং এত বিভিন্ন পথ এই দীর্ঘ সময়ে তা অতিক্রম করেছে তাকে ব্যাখ্যা করা প্রায় অসম্ভব। প্রায় তিন কোটির অধিক জনসংখ্যার এই কুর্দরা মধ্য এশিয়ার নন-অ্যারাব রাষ্ট্রহীন এক অদ্ভুত স্বাধীনতা প্রিয় জনজাতি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাম্রাজ্য এবং সরকার দ্বারা ব্যবহৃত, নিপীড়িত এই জনজাতির স্বাধীনতা এবং সতন্ত্রতার লড়াইয়ের ইতিহাসের সন্ধান আবদুল্লা ওয্যালান খুঁজে পেয়েছেন সেই সুমেরিয় সভ্যতার সময় থেকে। ভাষাগত এবং এথেনেসিটির দিক থেকে এরা পারস্য বা ইরানিদের জাতিগত ভাই গোত্রের। কুর্দিস্তান বা বর্তমানের সিরিয়া, তুরস্ক, ইরান এবং ইরাকের সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী এই জনজাতির ছোট ছোট নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা পারস্য, আরব, গ্রিস এমনকি রোমান সাম্রাজ্যের দ্বারা আক্রান্ত এবং অধিকৃত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। প্রতিটি সাম্রাজ্যই এই স্বাধীনতা প্রিয় কুর্দ জনজাতির বশ্যতা আদায়ে অসমর্থ হওয়ায় নামিয়ে এনেছে আক্রমণ। কুর্দরা ক্রমে দুর্গম থেকে অতি দুর্গম পাহাড়ি এলাকার আশ্রয়ে নিজেদের স্বাতন্ত্রতা বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে এসেছে দীর্ঘকাল ধরে । কুর্দরা তাই বলেন দ্য কুর্দজ হ্যাভ নো ফ্রেন্ডজ বাট দ্য মাউনটেন্স

বিভিন্ন সময়ের লড়াই, আধিপত্যকারী সাম্রাজ্যের দুর্বল হওয়া এবং বিভিন্ন উপায়ে অটোমান সাম্রাজ্যের উত্থানের প্রাক্কালে অবশেষে ১৫০০ সাল নাগাদ কুর্দ জনজাতি বর্তমানের কুর্দিস্তান অঞ্চলে এক ধরনের স্বশাসনের স্বাধীনতা অর্জনে সক্ষম হয়। অটোমান সাম্রাজ্য উনবিংস শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় তিনশো সাড়ে তিনশো বছরের অধিক সময়কালে কুর্দদের এই অটোনমি নিয়ে বিশেষ একটা মাথা ঘামায়নি। কিন্তু ১৮৩০-১৮৩৫ সাল নাগাদ অটোমান সাম্রাজ্য এই স্বাধীন কুর্দ এলাকাকে কস্তনাতিনওপোলের অধীনে নিয়ে আসতে ব্যগ্র হয়ে পরে। ছোটোখাট যুদ্ধ বিগ্রহ অবশেষে ১৮৪৭ সালে বদর খান বেগের নেতৃত্বে কুর্দদের এই বিদ্রোহ এক বিশাল যুদ্ধের আকার নেয়। অটোমান সাম্রাজ্য এই বিদ্রোহ দমন করে চূড়ান্ত নির্মমতার সাথে। শুরু হয় একশ সত্তর বছরের ধারাবাহিক নিপীড়ন এবং কুর্দ স্বাধীনতার এক অনন্য আন্দোলনের

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তৎকালীন তুরস্কের রাজতন্ত্র অনুগামী ইয়ং তুর্কস পার্টি পরিকল্পিতভাবে জনজাতি নিধনের যে অভিযানটি চালায় তা ইতিহাসে আর্মেনিয়ন জেনোসাইড হিসাবে কুখ্যাত। দশ লক্ষের অধিক আর্মেনিয় হত্যার এই অভিযানের সাথেই চলতে থাকে কুর্দদের ওপর আক্রমণ। ১৯১৬ সাল থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে প্রায় সাত লক্ষের অধিক কুর্দ জনজাতিকে সেই সময় বলপূর্বক ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। অবশেষে ১৯২০ সালের গস্ট মাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্য পরাজিত হওয়ার পর কুর্দদের প্রতি এই দমনের ধারাবাহিকতায় সাময়িক বিরতি ঘটে। পরাজিত অটোমান সাম্রাজ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জয়ী পক্ষের সাথে অবমাননামূলক ট্রিটি অব সেভ্র চুক্তি সাক্ষর করতে বাধ্য হয়। এই চুক্তি অনুসারে অটোমান সাম্রাজ্যের তুর্ক প্রধান অঞ্চলগুলিকে বাদ দিয়ে জয়ী পক্ষ নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী বাকি সাম্রাজ্য ভাগ বাঁটোয়ারা করে নেয়। বালির ওপর দাগ কেটে সীমানা সৃষ্টি হয় বর্তমান আরব দুনিয়ার। আজকের সিরিয়া এবং তার পার্শ্ববর্তী চলে আসে ফ্রান্সের প্রভাবে, ইরাক হয়ে পরে ইংল্যান্ডের অধীন, আর কুর্দিস্তানের বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া হয় এক রেফারেন্ডামের ফলাফলের ওপর। সদ্যগঠিত আর্মেনিয়া, ব্রিটিশ প্রভাবিত ইরাক, ফ্রান্স প্রভাবিত সিরিয়া এবং তৎকালীন খণ্ডিত অটোমান সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট অংশ বর্তমান তুরস্কের মধ্যে স্বাধীন কুর্দিস্তানের সীমানা কী হওয়া উচিৎ, এ নিয়ে তর্কবিতর্ক চলতে থাকে। ভার্সাই চুক্তির অবমাননাকর শর্ত যেমন পরবর্তীতে জার্মান জাতীয়তাবাদ এবং হিটলারের উত্থানের কারণ, ঠিক সেইভাবেই ট্রিটি অব সেভ্র-এর অবমাননাকর শর্ত কেমাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্কের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্ম দেয়। ১৯২২ সালে কেমাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ফলে তুরস্ক থেকে সুলতানেতের অবসান ঘটে। আতাতুর্কের এই উগ্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ফলে ব্যবস্থা পরিবর্তন ব্রিটেন এবং অন্যান্য অ্যালায়েড শক্তিকে বাধ্য করে এক নতুন চুক্তির উপস্থাপনা করতে। এই চুক্তিটিকে আমরা ট্রিটি অব লোজান হিসাবে জানি। ১৯২৩ সালে সাক্ষরিত এই নতুন চুক্তি অনুসার কুর্দদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকার করে কুর্দিস্তানকে পুনরায় কেমাল আতাতুর্কের তুরস্কর সাথে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়। ট্রিটি অব সেভ্র-এর মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া স্বাধীন কুর্দিস্তানের স্বপ্ন এবং আপাত শান্তি মাত্র কয়েকবছরের ব্যবধানে ট্রিটি অব লোজানের মাধ্যমে ডেকে আনে পুনরায় রাষ্ট্রীয় দমন পীড়নের ইতিহাস।

চুক্তি সাক্ষরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আতাতুর্ক পয়ষট্টিটি বিভিন্ন ধরনের ডিক্রি জারি করে কুর্দদের অস্তিত্বই অস্বীকার করার জাতীয়তাবাদের নামে এক নিষ্ঠুর দমনের খেলা খেলতে থাকেন। কুর্দ অঞ্চলের সমস্ত জনজাতিকে পাহাড়ি তুর্ক বলে নতুন নামাকরণ করা হয়। যে কোন পাবলিক প্লেস, স্কুল-কলেজে কুর্দিশ ভাষার ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। কুর্দদের উৎসবগুলি রাতারাতি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। কুর্দিশ বিশিষ্ট ব্যক্তির নামে নামাঙ্কিত রাস্তাঘাট, শহর এমনকি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামও বিশুদ্ধ তুর্কীয় নামে পরিবর্তিত করা হতে থাকে। কুর্দদের গোষ্ঠীর জমি দখল করে নেওয়া হতে থাকে। কুর্দ কমুইনিটি ফান্ড বাজেয়াপ্ত করা হয়। কুর্দিশ রাজনৈতিক সংগঠন, কুর্দদের প্রতি সহানুভূতিশীল প্রতিষ্ঠান শেষ করার পর্ব চলতে থাকে। এক কথায়, কুর্দ অসিত্বই মিটিয়ে দেওয়ার পর্ব চলতে থাকে। ট্রিটি অব লোজানের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে কুর্দিস্তানকে বর্তমানের সিরিয়া, তুরস্ক, ইরাক এবং ইরানের মধ্যে চার টুকরো করে দেওয়া হয় এক কলমের খোঁচায়।

রোহ্যাবা রেভ্যুলিউশন বর্তমানের যে ভৌগলিক সীমানায় সংগঠিত হচ্ছে সেই সিরিয়া চুক্তিবলে ফ্রান্সের অধীন আধা কলোনি আধা স্বাধীন এক রাষ্ট্র হিসাবে পরিণত হয়। চুক্তি সাক্ষরিত হওয়ার সময় সিরিয়ার জনজাতির আঠারো শতাংশ ছিল কুর্দ (বর্তমানে ভারতে মুসলমান জনসংখ্যা চোদ্দ থেকে ষোল শতাংশ), সিরিয়ার বৃহত্তম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। সিরিয়ার আরব এবং অন্যন্য জনজাতি ফ্রান্সের আধিপত্যর বিরোধে সংগঠিত করতে থাকেন অসংখ্য ছোটোখাটো বিদ্রোহ। সিরিয়ার আরব সম্প্রদায়ের এই বিদ্রোহ দমন করতে ফ্রান্স পরিচিত ডিভাইড অ্যান্ড রুল সাম্রাজ্যবাদী পলিসি অবলম্বনে বিভিন্ন নন-অ্যারাব ট্রাইব যেমন কুর্দ, খ্রিস্টান, দ্রুযে এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে লোক জন নিয়ে তাদের সাম্রাজ্যবাদী সৈন্যবাহিনীটি গড়ে তোলে। সিরিয়ার আরবদের মধ্যে সংখ্যালঘু এবং কুর্দ বিরোধী মনোভাব গড়ে ওঠার এ এক অন্যতম প্রধান কারন। ১৯৪৬ সালে ফ্রান্সের কবল থেকে স্বাধীনতা প্রাপ্ত সিরিয়া সাথে সাথে আভ্যন্তরীণ শত্রুদের শক্ত হাতে মোকাবিলা করা শুরু করে। প্রায় দু লক্ষের অধিক কুর্দদের পরিচয় পত্র কেড়ে নেওয়া হয়, কুর্দরা হয়ে পরে এক স্টেটলেস সংখ্যালঘু জনজাতি, রাষ্ট্রীয় মদতে আভ্যন্তরীণ শত্রুদের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হতে থাকে। জমিহারা, নাগরিকত্বহারা কুর্দ এবং অন্যান্য জনজাতি পরিবর্তিত হতে থাকেন দাস শ্রমিকে। কুর্দ এলাকার সমস্ত গ্রাম, শহর ইত্যাদি নাম বদলে দেওয়া চলতে থাকে, সামাজিক ভারসাম্য বিঘ্নিত করতে অন্য এলাকা থেকে আরব বেদুইনদের এনে কুর্দদের এলাকায় বসতি গড়ে দেওয়া হয়। আরব বেদুইনদের অঞ্চল প্রধান থেকে পুলিস প্রধান হিসাবে নিযুক্ত করা চলতে থাকে এবং সাথে উস্কে দেওয়া হতে থাকে কুর্দ বিরোধী জাতীয়তাবাদ। ফ্রান্সের দাবাড় বোড়ে হিসাবে ব্যবহৃত কুর্দ জনজাতি হয়ে পরে সিরিয়ার আরব সম্প্রদায়ের গণশত্রু চলতে থাকে কুর্দিশ সংস্থা এবং প্রথার নিষিদ্ধকরণ, হাজারো কুর্দ নাগরিক এবং ট্রাইবাল নেতাদেরকে তুচ্ছ অজুহাতে গ্রেপ্তার এবং গুপ্তহত্যার এক মহোৎসব চলে সিরিয়ার স্বাধীনতার পরবর্তী প্রায় একযুগ ধরে।

অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের অবশেষে ইরাক, ইরান, সিরিয়া এবং তুরস্কের নব্য জাতীয়তাবাদী এবং মৌলবাদী সরকারগুলির কুর্দ নিপীড়নের মধ্যে এক ধরনের সাজুস্য বর্তমান। নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া, গন-উচ্ছেদ, ভাষা, প্রথা এবং সংস্কৃতির ওপর নিষেধাজ্ঞা, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংগঠন গুলির নিসিদ্ধ্বকরন। ছোটোখাট অজুহাতে সামরিক অভিযান, খেত, শস্য বোমাবর্ষণ ইত্যাদি। সাদ্দাম হুসেনের ১৯৮৬-১৯৮৯ সাল জুড়ে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগে প্রায় দু লক্ষ কুর্দ জনজাতির নিধন সম্ভবত দীর্ঘকাল ধরে এই বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চলে আসা কুর্দ নিপীড়নের সর্ববৃহৎ গণহত্যার উধাহর। এই দীর্ঘ সময় জুড়ে সভ্য জগত বিশেষত পশ্চিমের শক্তিগুলির ডিপ্লোম্যাটিক নীরবতা, আশ্চর্যজনক উদাসীনতা সাথে সময়ে সময়ে কুর্দদের উস্কে দিয়ে নিজেদের তেলের ভাণ্ডারের ওপর দখল এবং আঞ্চলিক স্বার্থ বজায় রাখার জটিল খেলা কুর্দ জনজাতি বুঝতে শুরু করে রক্ত এবং নিপীড়নের বিনিময়ে ১৯৭০ দশকের শেষের দিক থেকে। জন্ম হয় আবদুল্লা ওয্যালানের নেতৃত্বে কুর্দি ওয়ার্কার্স পার্টির।

(ক্রমশ…)

 
 
top