ক্যাশলেস থেকে মানিলেস

 

প্রাকক্থন

৮ নভেম্বরের সাঁঝবেলা শেষের ঘোষণার পরপরই তিনি পাড়ি দেন জাপানে। পরের দিন সকালের কাগজে দেখতে পাই তাঁর ছবি, একেবারে প্রথম পাতায়, পেটিএমের বিজ্ঞাপনে। পুরো পাতা জোড়া। বুঝতে পারছি, প্রায় নবীন এক পরিসরের ভিতর ঢুকে পড়ছি আমরা!

দুদিন পর স্বাক্ষরিত হয় নিউক্লিয়ার চুক্তি, জাপানের সঙ্গে। সিভিল নিউক্লিয়ার চুক্তি, যুদ্ধুটুদ্ধু হবে না, কেননা নিউক্লিয়ার শক্তির নিরাপদ ব্যবহার!

এ খবরটা চাপা পড়ে যায় ডিমানিটাইজেশনের ডামাডোলে, ঠিক যেমন চাপা পড়ে গিয়েছিল ১৯৯২র ৬ ডিসেম্বরের ঘটনার মোক্ষম চাপে গ্যাট চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারটা।

ভবিষ্যতের ছবি ১

সারা গায়ের জ্বালা যন্ত্রনাগুলো বাড়ছে অনবরত। কানেও ভাল শুনতে পাই না আজকাল। এটা নাকি অনেকেরই হচ্ছে, বললেন ডাক্তারবাবু। অনেকটা মড়কের মত লেগেছে এমনসব ঘটনা: কারোর মাথায় গজাচ্ছে টেনিস বল, কারোর বা হৃদয়জুড়ে যন্ত্রনা, যুবকের কমে যাচ্ছে স্পার্ম কাউন্ট, বাচ্চাকাচ্চা হচ্ছে না বা হলেও নুলো বাচ্চা জন্মাচ্ছে—ন্যালাখ্যাপা, ওই অটিস্টিক বা কী যেন একটা বলে, এমনসব বাচ্চা।

ডাক্তারবাবুকে জিগ্যেস করলুম, কেন এমনটি হচ্ছে বলুন তো?

চুপ, কাউকে বলবেন না। ট্রপিক্যাল মেডিসিনের লোকজন সাহেবদের নিয়ে সার্ভে করছিলো কিন্তু রিপোর্টটা গেছে চেপে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি করে এনার্জির সমস্যাটা তো মেটাতে হচ্ছিল ভারতবর্ষে। তার জন্য ইয়ুরেনিয়াম, প্লুটোনিয়ামের খনি খনন বা ওইসব খনিজের আমদানি করতে করতে, আরও নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট বাড়াতে বাড়াতে কখন যে আমরা রেডিয়োঅ্যাক্টিভেটেড হয়ে গেছি তা নিজেরাও আমরা খেয়াল করিনি। হুঁ, হুঁ, বাবা, ডিজিটাল ইন্ডিয়া বলে কতা! এত্তো কয়লা আর পাবে কোথায়? তার ওপর আবার এত সেল ফোনস। এগুলোর ব্যাটারির কথাই ধরুন না হয়। এগুলোর জন্য কোবাল্ট লাগে, লিথিয়াম লাগে। সেগুলোও তো খনি থেকে বের করে আনতে হয়। এর জন্য কঙ্গোর খনিতে গৃহযুদ্ধ লাগালে কী হবে, মালটা তো চাই ই চাই। আর এই সব জিনিস গায়ে সেঁটে থাকলে হৃৎপিণ্ড বা কান তো বিগড়োবেই কেননা এসব গ্যাজেটসের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশ্যান এড়ানো অসম্ভব। তুমি বাপু নিউক আর বিদ্যুৎ চুম্বকীয় বিকিরণ তৈরি করে ডিজিটাল ভারত বানাবে, রাসায়নিক সার আর কীটনাশক দেওয়া খাবার খাবে আবার স্বাস্থ্যও ভাল রাখবে, এ কখনও হয় নাকি? কেনো, আরও কেনো জাঙ্ক ফুডস, অনলাইনে পচা, দরকচা প্রিজারভেটিভস দেওয়া খাবার আরও কপকপ খাও!

এই হাসপাতালে যত রোগী দেখছেন, তারাও এই ডিজিটাল ইন্ডিয়ার বিদ্যুৎ চুম্বকীয় বিকিরণের শিকার—কর্কট রোগাক্রান্ত। তবে কি জানেন, আমি এসব রোগের এটিওলজি নিয়ে আর মাথা ঘামাই না। রোগের প্রিভেনশন নয়, ক্যিওর কী করে করবো, তা ভাবতে গিয়েই মাথার চুল খাড়া হয়ে যায়

এই বলে ডাক্তারবাবু হাঁটতে শুরু করলেন কোনো এক অজানার দিকে। আমিও সঙ্গী হলুম। পৌঁছলুম এক বিশাল ডাম্পিং গ্রাউন্ডে, ধাপার মাঠের মতো কিন্তু তার থেকেও বড়ো এলাকা। স্তূপাকার জঞ্জাল পাহাড়ের আকার নিয়েছে, পুরোনো বাতিল বৈদ্যুতিন নন বায়োডিগ্রেডেবল গ্যাজেটস ফেলা হয় এখানে। ব্যাপক ধোঁয়াশায় আমি জঞ্জালটা ঠিকমতো ঠাহর করতে পারছিলুম না, কিন্তু আমরা দুজন দুজনকে দেখছিলুম—আমাদের গা দিয়ে ঠিকরোচ্ছে ফ্লুরোসেন্ট আলো!

ভবিষ্যতের ছবি ২

ওরা মেনে নেয়নি ক্যাশলেস ইকনমি।

ওরা চেয়েছিল মানিলেস হতে।

টাকাপয়সাকে ওরা নেতিকৃত করেছিল সহজ এক বোধনায়: নিজেই করবো নিজের কাজ, কেউ যেন ছিনিয়ে না নেয়/ আমাদের শ্রম।

ওরা তৈরি করেছিলো এমন এক পল্লী যেখানে নেই কোনো বিনিময়ের জন্য টাকা চিহ্নের উপস্থিতি। এখানে জুতো বানানো হলেও, তৈরি করা হয় না কোনো মানিব্যাগ

একদিকে নিজেদের তৈরি করা বীজে বোনা শস্যক্ষেত্র। তাকে ঘিরে আছে নিম গাছ অথবা ছোটো লঙ্কা গাছ। আরেক দিকে পুকুর আর পশুশালা পুকুরের চারপাশে উঁচু ঢিবি। ঢিবির উপর আম, জাম, কাঁঠালের সারি, নেই কোনো ইয়ুক্যালিপটাস বা সোনাঝুরি। পুকুর থেকেই ছোটো ছোটো কাঁদর চলে যায় শস্যক্ষেত্রে। আর পশুশালার পাশেই তৈরি হয়েছে সার আর গ্যাস তৈরির ঠাঁই। তার পাশেই সৌরশক্তির জন্য কয়েকটা চ্যানেলস। অনতিদূরে বসেছে তাঁতি আর সেলাই মেশিন।

এখানকার স্থাপত্যে কোথাও রিইনফোর্সড কংক্রিট নেই। সামান্য ইট ব্যবহার হয় বটে, তবে বেশিরভাগটাই বাঁশ আর মাটির কেরামতি। কয়েকটা বাড়ির ছাদ ইট দিয়ে বানানো, বিষ্ণুপুরের স্থাপত্যের মতো।

মজার ব্যাপার হলো এমন এক পল্লীর বাসিন্দারা নিজেদের কাজ নিজেরা ভাগাভাগি করে করে নিলেও একজন আরেকজনের কাজ চমৎকার চালিয়ে নিতে পারেন। আর বেশি তো খাটতে হয় না, দৈনিক আড়াই তিন ঘণ্টার খাটুনিতেই জুটে যায় খাবারদাবার আর পোশাক। তারপর জম্পেশ করে চলে গানবাজনা, নাটক, বইপড়া ইত্যাদি আহ্লাদি কাজকম্মো। কিছু বাসিন্দা আবার পেছনের জঙ্গল থেকে ফলমূল জোগাড় করে আনেন। তাঁরা আবার চাষবাস করতেও রাজি নন, গ্যাদারিংয়ের প্রাচীন রীতি মেনেই তাঁরা এমন কাজকম্মো বেছে নিয়েছেন। বলা বাহুল্য, এঁদের মধ্যে মজুরি শ্রমেরকোন ব্যাপার নেই।

এর মধ্যেই বিতর্ক জমে। সেদিন শুরু হয় ব্যাপক তক্কাতক্কি, কেননা একজন প্রশ্ন তুলেছেন মোক্ষম, তাহলে ওদের কী হবে যারা চুরি করে খায় ব্যাপক মানুষের শ্রম? কী হবে তাহলে প্রগতির, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের অগ্রগতির? আমরা কি নেব না সুফল প্রযুক্তির?

এক প্রবৃদ্ধ শান্ত মাথায় ওর কথাগুলো শোনেন। তারপর ধীরেসুস্থে বলতে শুরু করেন আপন কথা।

আমরা যাইনি কোনো সশস্ত্র বিপ্লব বা অভ্যুত্থানে। আমরা চেয়েছি শুধু নমুনা হয়ে উঠতে, বদলের নমুনা। সে নমুনা যদি অন্যরা অনুসরণ করে তো ভালো, নইলে বাপু একলা চলো রে।

কিন্তু কী সেই নমুনা? আমরা বুঝতে পারছিলুম বেশ যে বাজারে কেনাকাটা করে আর চলবে না। আমরা বুঝছিলুম যে আমরা এত্তো বেশি শিল্প রতিতে (ইন্ডাস্ট্রি ফেটিশ) মগ্ন যে নিসর্গ গেছে বিগড়ে। এই বিগরে যাওয়া নিসর্গকে খানিওকটাও যদি ঠিকঠাক করা যায়, এমন ভাবনা নিয়েই এখানে আসা—সমুদ্রতল থেকে বেশ খানিকটা উঁচু জায়গা আমরা বেছে নিয়েছিলুম খুব স্বার্থপরভাবেই। আমাদের যাপনে আমরা আস্তে আস্তে গুটিয়ে আনছিলুম টাকা নামক চিহ্নের ব্যবহার। কিন্তু কেন? টাকা তো বেশ সুবিধাজনক একটা বিনিময় চিহ্ন। তাহলে? উত্তরটা দেবার চেষ্টা করি।

শ্রমী মানুষ যেটা বানায় তা তো শুধু হতে পারতো তার নিজের আর বৃদ্ধ অপারঙ্গম মানুষ আর শিশুর জন্য। শুধু এটুকুকে আমরা বলব সামাজিকভাবে আবশ্যিক শ্রম

কিন্তু, কার্যগতিকে তাকে বানাতে হচ্ছে আরো, আরো বেশি। অর্থাৎ, সে অ-শ্রমী মানুষদের জন্য ব্যয় করছে তার শ্রম—খরচা করছে অনেক সময়। একে আমরা বলব বাড়তি শ্রমএই শ্রম যখন বেচাকেনার জগতে ঢুকে পড়ে, বাজারের পণ্য হয়, তখন একে স্রেফ শ্রম না বলে বলব শ্রমশক্তিশ্রমী মানুষ তার শ্রমশক্তি বেচে।

এই বেচাকেনার জগতে, মানে বাজারে, যত বেশি পরিমাণে বাড়তি শ্রম বাড়ে, তত বেশি সামাজিকভাবে আবশ্যিক শ্রম কমে আর হারামে খাওয়া অবসরভোগী মানুষদের তত বেশি সুবিধা হয়।

এবার আমরা অনুপাতের আঁক কষলাম: সামাজিকভাবে আবশ্যিক শ্রমইজ টু বাড়তি শ্রমভাগ করে যেটা বেরোলো তা ব্যক্ত (ম্যানিফেস্ট) হলো টাকা-চিহ্নের অবভাসে (অ্যাপিয়ারেন্সে)। কেনাবেচার জগতে এক অনন্ত সার্কিট তৈরি হলো: পণ্য-টাকা-পণ্য

যাঁরা এটুকু বললে অখুশি হবেন তাঁদের জন্য সার্কিটটা খানিকটা এঁকে দিই:

বাড়তি শ্রম : সামাজিকভাবে আবশ্যিক শ্রম = পণ্য-টাকা-পণ্য-টাকা-পণ্য-টাকা… Δ টাকা বা পণ্য

আমরা এই সার্কিটটাকে বিগড়ে দিতে চাইলুম। টাকা চিহ্নের বিনিময়ের মাধ্যমে কেনাকাটা বন্ধ করে দিলুম। তোমরা জানো তো, আমরা যখন সমুদ্রের কাছের ম্যাচিওর এক ব-দ্বীপে ছিলুম, কোলকাতা শহরে, তখন ছাদের ওপর চাষবাস করতুম। অনুপ্রেরণা ছিল কিউবার অগ্যানোপনিকোজ, শহরে জৈব চাষ। আমাদের ছাদই দিত আমাদের খাদ্যের যোগান। আমরা যোগাযোগ রাখলুম পৃথিবীর নানান আন্দোলনের সঙ্গে, যেমন অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট বা মানিলেস স্যোসাইটির মতো উদ্যোগ। টাকা নামের পণ্যের ব্যবহার আমরা মিনিমাইজড করে ফেললুম। ভাবলুম ছোটো করে। বলতে শুরু করলুম, কিছুতেই হব না ভোক্তা বা কনজ্যিউমার। তাই হাবিজাবি অনেক কিছু না শিখে, পরজীবীর মতো হারামে না খেয়ে, জোর দিলুম ওই সামাজিকভাবে আবশ্যিক শ্রমের ওপরে। আমরা সেই শ্রম দক্ষতাই অর্জন করলুম যা আমাদের খাওয়াপরার কাজে লাগে। এই যে পল্লী বানিয়েছি আমরা সবাই, তার প্রথমে সামান্য টাকা চিহ্নের বিনিয়োগ থাকলেও, আস্তে আস্তে আমরা অকেজো করে ফেললুম গোটা কেনাবেচার জগতকে।

আমরা আরো সমস্যা দেখলুম। দেখলুম, নিসর্গকে নির্বিচারে লুঠ করে, তাকে এমনভাবে বদলে ফেলা হয়েছে যে, আমরা এবং না-মানুষেরা বিরাট বিপদে পড়ে গিয়েছি। অটোমেশন শুধু শ্রমিক ছাঁটাই করে না, নিসর্গেরও ক্ষতি করে, যেমন করেছে ডিজিটাল ক্যাশলেস ইকনমি। যন্তরপাতি তৈরি করতে যে যে উপাদান এর প্রবক্তারা প্রকৃতি থেকে লুঠ করেছেন, আমাদের বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের বিকিরণের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন, তা আমাদের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। তদুপরি তৈরি হয়েছে প্রতারণার জগত। ডিজিটাল বিশ্বে হ্যাকাররা যে বিশাল মাপের পকেটমার বা কেপমার, তা তো আমাদের বুঝতে দেরি হয়নি।

তাই আর নিউক অধ্যুষিত বিশ্বে নতুন করে সহিংস্র আক্রমণের বাতুলতায় না গিয়ে আমরা ভিন্ন এক কিপটেমির অর্থনীতির কথা কয়েছি। যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করে গেরিলা যুদ্ধ আমরা করিনি বটে!

তাঁর কথা শেষ হয় না, নবীন যুবা প্রচণ্ড রাগে কয়েকটা ইংরেজি শব্দ বলে দ্রুতগতিতে বেরিয়ে যায় পল্লী ছেড়ে শব্দগুলো এরকম: রিয়্যাকশনারি, এস্কেপিস্ট  

 
 
top