ব্যা ব্যা ব্যাঙ্কশিপ

 

বার বিদায় নেবার পালা রে!

নিমেদার এমত হুঙ্কারে যারপর নাই চমকে উঠে তাকিয়ে দেখি নিমেদা লোটাকম্বল সমেত এসে হাজির একেবারে আমার পড়ার ঘরে। আমি তখন মন দিয়ে মাষ্টারদার শিষ্য অনন্ত সিংহের, কেউ বলে বিপ্লবী কেউ বলে ডাকাত, বইটা পড়ছিলুম—পড়ছিলুম কম্যুনিস্ট এই বিপ্লবীর ব্যাঙ্ক ডাকাতির কিসসা। এদ্দিন ধরে ব্যাঙ্কের আদ্যশ্রাদ্ধ করে, ব্যাঙ্কের প্রতি বিতৃষ্ণায় মন ভরে রয়েছে। ভাবছি ব্যাঙ্ক ডাকাতি করে যায় কিনা! এমত সময় কেটে পড়ার কথা কইছে কেন রে বাবা!

নিমেদা আমার হাত থেকে বইটা নিয়ে উলটে পালটে দেখে ফ্যাক করে হেসে ফেলে বলল, দেখ বাপু, ব্যাঙ্কের ঘাপলা নিয়ে কে যেন একজন তাঁর বিখ্যাত বই, ইম্পেরিয়্যালিজম, হায়েস্ট স্টেজ অব ক্যাপিট্যালিজম-এ একটা আস্ত চ্যাপ্টার লিখেছিলেন বহুকাল আগে। সেইসব পড়েটড়ে বিপ্লবের প্ল্যান ভাঁজছিলেন কমরেড অনন্ত সিংহ। মাষ্টারদার উপযুক্ত শিস্য বটে তিনি! একদিকে অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, আর অন্যদিকে ব্যাঙ্ক। হু, হ্‌ বাবা, দুটোই মোক্ষম জায়গা বটেক! এক্কেবারে পুঁজিবাদের প্রাণভোমরা। এ তো সেই পুঁজিবাদের বানানো দড়ি দিয়ে পুঁজিবাদীদেরই ল্যাম্পপোস্টে লটকে দেওয়া। তবে বাপু, আমি এ পথে নেই। হিংসাত্মক কাজকম্ম করে আর কিস্যু হবে না বাপু

কেন এ কথা বলছ নিমেদা?

রে বাবা, পুঁজিবাদীরাই এখন আমাদের হাতে নিজে থেকে এসে অস্ত্র তুলে দিয়ে লড়াই বাঁধাবে—ভানসর্বস্ব সিম্যুলেটেড লড়াই। সে লড়াইয়ে সবচেয়ে সফট টার্গেটরা খতম হবে, কোনো পুঁজিবাদীর গায়ে আঁচড়টিও লাগবে না। আমাদের এই পোড়া দেশে কে কবে আসলি বুর্জোয়া খুতম করেছে রে?

তাহলে করণীয় কী? হোয়্যাট ইজ টু বি ডান?

টু বি অর নট টু বি? আমাদের টু বি গুলো সব বুর্জোয়া ধাঁচায় বাঁধা পড়ে গেছে রে হতচ্ছাড়া। আমাদের বিকামিং-এর ইচ্ছেগুলো সব পুঁজিবাদী কামনা বাসনায় বাঁধা পড়ে গেছে। আমাদের শেকল ছাড়াও এখন কোকের বোতল হারানোর ভয় আছে। আর কোক হোল গিয়ে উন্নয়নের প্রতীক। এখন আর হোয়্যাট ইজ স্টিল টু বি ডান বলারও ফুরসৎ নেই

কেমন কথা কইছ তুমি? কোথায় বলবে কিনা ফ্রি ফ্লো অব প্রাইভেট ক্যাপিট্যাল তুমি রুখে দেবে, সমস্ত কারখানার যন্ত্রপাতি (মানে যাকে বলে মিন্স অব প্রোডাকশান) দখল করবে, সামরিক শক্তিকে নিজের দখলে আনবে, উদ্বৃত্ত শ্রম চুরি বন্ধ করবে, তা নয় তুমি পালাচ্ছো? কেটে পড়ছো?

নিমেদা হা হা করে হেসে উঠল। তারপর একটু দম নিয়ে বলল, হুকাল আগে আইজেনস্টাইন চার্লি চ্যাপলিনকে নিয়ে একটা বই লিখেছিলেন, চার্লি দ্য কিড। সেখানে উনি ঘোষনা করেছিলেন ভৌগলিকভাবে পালানোর জায়গা আর নেই এই পৃথিবীতে: সব জায়গাতেই উঁকি মারছে মহাপ্রবলবলী। তাই চ্যাপলিনের মতো করেই বায়ালজিক্যাল রিগ্রেশনে নিজেকে বাচ্চা করে নিতে হবে আর তারপর শিশুর মতন হেসে দু হাত দিয়ে বিশ্বকে নিজের কাছে টেনে নিতে হবে। দেখ, কেমনভাবে রবি ঠাকুর আর চ্যাপলিনকে মিলিয়ে দিলুম

তাও তুমি কেটে পড়ছ? কেন? এটা তো তোমার ভৌগলিক পলায়ন!

আমি জানি অনেকদিন ধরেই, নিমেদা সমুদ্রতল থেকে উঁচু কোনো জায়গায় গিয়ে, ফুকোয়োকার ওয়ান স্ট্র রিভোল্যুশন-কে মান্যতা দিয়ে চাষবাস করবে, যে চাষাদের মোদ্দা কথাই হোল, নো ফার্মিং ইজ দ্য বেষ্ট ফার্মিং। অথবা জঙ্গলে আহরণ করে দিন গুজরান করবে—অর্থাৎ কিনা টাকা পয়সা ছাড়াই জীবন যাপন করবে। নিমেদার গোষ্ঠীতে এমন লোকও আছেন যিনি তাঁত চালাতে জানেন বা জুতো বানাতে জানেন। নিমেদার এমনতর সিদ্ধান্তের পিছনে যেটা কাজ করছে তা আবহাওয়ার পরিবর্তন বিষয়ক এক বা একাধিক বিশেষ ধারনা: কার্বন উদ্গীরণ বাড়লে বরফ গলবে আর জলের তলায় ডুবে যাবে পৃথিবীর অধিকাংশ স্থলভাগ। স্রেফ মানুশের জন্য তৈরি হওয়া এই গরম বেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে বলা হচ্ছে অ্যানথ্রেপজনিক গ্লোবাল হিটিং আর মানুষের এই হিংস্র প্রকৃতি বিজয়ের অভিযানের যে যুগ, সেই যুগের নাম দেওয়া হয়েছে অ্যানথ্রোপসিন। কেউ কেউ আবার, খুব সংগতভাবেই, পুঁজিবাদের সঙ্গে জুড়ে থাকা এমন যুগের নামকরণ করেছেন ক্যাপিটালোসিন। পুঁজিবাদ এবং রাষ্ট্রীয় সমাজবাদ (যা আদতে পুঁজিবাদেরই আয়না প্রতিবিম্ব)—দু পক্ষই কার্বন উদ্গীরণের সঙ্গে তাঁদের উন্নয়নকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। এর ফলে যা সব্বোনাশ হবার তা হয়ে গেছে। একে উলটো মুখে আর বোধহয় ঘোরানো যাবে না।

নিমেদা স্বগতোক্তি করে, নে আছে কি তোর, সেই যে গ্যাংটকের কাছেই একটা মনাস্টারির কাছে দাঁড়িয়ে ছিলুম? সেখানে লেখা ছিল: পৃথিবীর সব গাছ শেষ হলে,/সব পোকামাকড় মরে গেলে,/সব মাটি নোনা জলে ডুবে গেলে,/তখন,/কি আমরা বসে বসে টাকা চিবোবো?

সত্যিই তো, একগাদা টাকা নিয়ে ডুবন্ত স্থলভাগে বসে আমি কী করবো? অতিধনীরা নয় অবস্থাগতিক সুবিধের নয় দেখে স্পেস স্টেশন বানিয়ে রেখেছেন, কিন্তু আমরা কী করবো? খাবো কি? পরবো কি? থাকবো কোথায়? টাকার বাজারে ধ্বস নামলে আমরা হৈ হৈ করি, কিন্তু প্রকৃতির ধ্বস?

আগে ভাবতুম অন্যভাবে। ব্যাঙ্ক ফেল মারলে, রাষ্ট্র তাকে ভর্তুকি না দিলে, আমার মাটিতে পোঁতা টাকা পয়সা দিয়ে চালিয়ে নেব। এখন সে উপায়ও নেই। ধুস, এসব বাজে কথা। আমার কাছে ডোনাল্ড ট্রাম্প আছে, রিপাবলিক্যান পার্টি আছে—ওরা এসব জলবায়ু ফলবায়ু পরিবর্তন মানে না। ব্যাড ফেইথ, মোভা ফোই।

নিমেদা বিঁড়িতে টান দিয়ে কার্বন গ্রহন আর উদ্গীরন করতে করতে হঠাত আমার কাগচপত্তরের গোছা থেকে আমার করা একটা পিটিশন বের করে। চেঞ্জ.অরগ-এ পোস্ট করবো বলে ভেবেছিলুম। আমাদের এ পোড়া গণতন্ত্রে ৩১% বা ৪৬% ভোট পেয়ে কোন পার্টি সগর্বে বলে পাবলিক—সব জণগন আমাদের চাইছে। এই সবের দৌরাত্মে সংখ্যাগুরু ৬৯% বা ৫৪% হারিয়ে যায়। তাই আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানিয়ে একটা পিটিশন করেছিলুম। নেটে আর ছাড়া হয়নি। তখন ভেবেছিলুম সরকারকে কর না দেওয়ার প্রস্তাব জানিয়ে একটা আবেদন ছাড়বো। অবশ্যই শর্ত সাপেক্ষ: যতদিন না ব্যাঙ্ক ঋণ (থুড়ি সাবসিডি) নিয়ে পালিয়ে যাওয়া অতিধনী, স্যুইস ব্যাঙ্কে টাকা রাখা পুঁজিপতি, শ্রমিকদের পিএফ মেরে দেওয়া ডিফল্টার কারখানার মালিকদের হাতে হাতকড়া না পরানো হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত শালা ট্যাক্সই দেব না ইত্যাদি।

নিমেদা এগুলো দেখেশুনে গম্ভীর মুখে বলে, বই ঠিক আছে। এমন সব ছোটো ছোটো রিফর্মই এখন বড়ো কোনো কিছুর দিকে টেনে নিয়ে যাবে হয়তো। কিন্তু ব্যাপারটা সাময়িক। প্রকৃতির প্রতিশোধের সামনে তোরা কিস্যু করতে পারবি না। যা হবার তা হরে গেছে

এই বলে নিমেদা লোটাকম্বল নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে সমুদ্রতল থেকে আরও উঁচু জায়গায় পাড়ি দেয়। আমিও যাব কি? আপনারা?

কোথা থেকে যেন এক নারি কণ্ঠ শুনতে পাই: বাবু, বেলা যে পড়ে এল।  

(সমাপ্ত।)

 
 
top