ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

বিশ্বজিৎ বাউল অনেকদিন গান গায় না। গান তাগর প্রাণ। শ্বাস প্রশ্বাসের মতো সত্যি তার এই গান গাওয়া। আদালত গরমের ছুটির জন্য বন্ধ রয়েছে। ততদিন পুলিশি হেফাজতে রয়েছে কুসুমদি। শ্রীনিবাস কনস্টেবল কুসুমদিকে আগলে রাখবে। বড়োবাবু মানুষ খারাপ নন। নারী শিকারের নেশা ওঁর নেই। পয়াসা খান দুহাতে। থানা চালাতে নাই বিস্তর খরচা। ত্রিবেনীতে এসেছে বিশ্বজিৎ বাউল। বাড়িতে অনেকে তার সঙ্গে কথা বলছে না। অনেক কুকথা তার নামে রটেছে। সে খুনের মামলার সঙ্গে জড়িত। পাড়ার লোকেরা সন্দেহের চোখে দেখছে। অবৈধ প্রেম করতে গিয়ে সেও খুনে মদত দিয়েছে, এমন রটনাও ছড়িয়েছে চতুর্দিকে। মা দুটো মুড়ি আর নারকেল কোড়া দিয়েছিল। তাই খেয়ে বিশ্বজিৎ বাউল বাড়ির বাইরে বেরিয়ে পরেছে। ত্রিবেনী থেকে খানিকটা দূরে হুগলির জোড়াঘাটে সে বসে রয়েছে। পলাশ, কৃষ্ণচূড়া হাওয়ায় উড়ে উড়ে ঘাটের সিঁড়ি ভরিয়ে রেখেছে।

অর্কদীপ্তও বসে রয়েছে জোড়াঘাটে। মুমুর শরীর ভীষণ খারাপ। একদিন অর্কদীপ্ত মুমুকে নিয়ে তাদের কোন্নগরের বাড়িতে গিয়েছিল। বাড়িটা বহু বছর তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। গাছপালা গজিয়ে গিয়েছে চারদিকে। সেসব কাটতে কাটতে, মাথায় হেলমেট পড়ে মুমুকে নিয়ে ঢুকেছিল অর্কদীপ্ত। অন্ধকার ঘর। ইলেক্ট্রিক লাইন লাইটের অফিস থেকে কেটে দিয়ে গিয়েছে। স্যাতস্যাতে গন্ধ সমস্ত ঘর জুড়ে। কিন্ত্য খটকা লাগল অন্য জায়গায়। মনে হল, এই ঘর, এসব কিছু, স্বাভাবিক গন্ধ ছাড়াও যেন জীবন্ত। সবাই যেন আছে। দাদু, ঠাকুমা, আতা। তাদের পায়ের শব্দ, হাসির রোল, সব শুনতে পাচ্ছিল অর্কদীপ্ত। মুমুও এই বাড়িতে এসেছে। তখন সে ক্লাস ফোরের ছাত্রী। এই বাড়িতে পিকনিক হয়েছিল স্কুল থেকে। একটা কাঠের ঘোড়া ছিল। অর্কদীপ্ত স্কুলের কাউকে বসতে দিচ্ছিল না। পরে অবশ্য দিয়েছিল মুমুর অনুরোধে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ভেবেছিল ঘোড়াতে বসলেই অশৈলি কাণ্ড কিছু ঘটবে। উড়তে থাকবে ঘোড়া, যেমন করে রূপকথায় হয়ে থাকে। তাই অনেকেই ভয়ও পেয়েছিল বসতে। অর্কদীপ্ত এসব বলেও কাউকে বসতে দিচ্ছিল না। তারপর সে নিজেই বসে ভয়ের যাবতীয় পাহাড় গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। মুমু খুঁজছিল সেই ঘোড়া। ঘোড়ার কথা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে মুমুর মাথা ঘুরিয়ে গেল। কোন্নগর থেকে ফিরে আসার পর মুমুর তীব্র জ্বর এল। ফর্সা শরীরে লাল আভা দেখা দিল। সামান্য টোকা লাগলে চামড়া ফেটে যাচ্ছিল। চোখ বুজে শুয়ে ছিল মুমু। সাদা শাড়ি পরনে তার, গায়ের রং ফর্সা আর টুকড়ো টুকড়ো রক্তের মতন লাল রং। সব মিলিয়ে মুমু ছবির মতন শুয়েছিল। ছাতিম ফুলের গন্ধ বর্ষায় আসে। কিন্তু মুমুদের বাড়ির পাশে ছাতিম গাছে অকালে সাদা ফুল এসেছে। অর্কদীপ্ত তার মাকে এই অদ্ভুত কাণ্ডের কথা বলেছিল। আর মা বলেছিল সাগর দ্বীপেও এরকমটা হয়েছে। মুমুতো বর্ষা ভালোবাসত না।সে ভালোবাসত মার্চ মাস। সে বারবার বলেছে তার মৃত্যু হবে মার্চ মাসে। মানে মুমু আরও একবছর বাঁচতে চেয়েছিল। বালিশের পাশে বাইবেল রয়েছে। কোন্নগরে কেন সে যে নিয়ে গেল! জ্বর কিছুতেই কমছে না। গায়ের সমস্ত চামড়া ফেটে রক্ত গড়াচ্ছে। যন্ত্রণায় মুমু কখনও শব্দ করে কাঁদে না। অর্কদীপ্ত কয়েকবার ডেকেছে। কোন সাড়া নেই। ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠছে। হয়ত অর্কদীপ্তর কথাগুলো ওর হৃদয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে, কিন্তু মুমুর শক্তি নেই শব্দ করে উত্তর দেওয়ার। অর্কদীপ্ত কখনও ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেনি। মুমুর যিশু, মায়ের গোপাল, দুজনের কাছে সে মুমুর অন্তত একবছরের আয়ু প্রার্থনা করল। আরেকবার মার্চ মাস, পাতা ঝড়বে। হাওয়ার দেবদারু গাছের গন্ধও মুমুর প্রিয়। মার্চ মাসে ধর্ম অনাবিল রোদ। দুপুরে সামান্য তপ্ততা, তারপর সন্ধ্যের মায়াবি হাওয়া বা মার্চ মাসের একটি ভোর। তাদের চুঁচুড়া শহরে, বিশেষ করে মুমুদের বাড়ির গলিতে, পাঁচিলের গায়ে ফর্সা ভোরের সঙ্গে কোকিলের ডাক শুরু হবে। সায়ন্তন এল একটু রাতে। মি. গোমেজও এলেন। ডাক্তার সঙ্গে করে এনেছেন। একেবারেই রেসপন্ড করছে না মুমুর শরীর। শেষ রাতের দিকে মি. গোমেজ ছাদে উঠে গেলেন। হয়ত মেয়ের জন্য একান্তে কাঁদবেন। অর্কদীপ্ত যেতে চাইলে সায়ন্তন আটকে দিল। একসময় রাতের কালো কাটল। মুমুদের গলিতে ফর্সা ভাব আসছিল। সায়ন্তন গাইতে শুরু করল রাগ চারুকেশি। অর্কদীপ্ত গাইতে পারে না। সে ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছিল।

রোদ যখন এসে পড়ল মুমুর মোম সাদা পায়ে তখন প্রভু যিশু তাকে নিয়ে গেলেন।

ডাক্তারবাবু বললেন, হার্ট ফেল।

প্রভু যিশুকে যে ভালোবাসে সে মরে না, তার মৃত্যু পৃথিবীতে নিরবিচ্ছিন্ন সুরের আধার সৃষ্টি করে বা হয়ত মুমু পাখি হয়ে উরে যাবে আকাশে। সাদাকালো গানওয়ালা পাখি।

মুমুকে কবর দেওয়ার পর অর্কদীপ্ত দেখল পৃথিবীতে কোন পরিবর্তন হয়নি। রাত্রি নামল কিন্তু জ্যোৎস্নার মধ্যে সেই নীল সাদা ভাবটা নেই। অনেকটাই অস্বচ্ছ জ্যোৎস্না। বহু রাত অবধি সে জেগে থাকল। যদি মুমু ফিরে আসে! ফিরল না মুমু। রাত্রির ঝুমঝুম নিস্তব্ধতা প্রগাঢ় হল। পাতার গায়ে নিশির শিশির পড়ল। তবু মুমু ফিরল না।

(ক্রমশ…)

 
 
top