ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

বৈরাগ্য পাখিরার মতন মানুষও কুসুমের মুখ দিয়ে কোনো কথা বলাতে পারল না। সে যেন নিশ্চল, প্রস্তরবৎ হয়ে গিয়েছে। দুটো হিয়ারিং হয়ে গিয়েছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো চেষ্টাই কুসুম করেনি। প্রায় বিনেপয়সায় আর্জি লিখেছেন মৃগাংক উকিল। বাউল ছেলেটা এখনও অবধি মাত্র পাঁচশ টাকা দিতে পেরেছে। বৈরাগ্য পাখিরাকে হোটেলে খাওয়াতে দু-দিনে আড়াইশো টাকা গরচা গিয়েছে। মিডিয়ার শোরগোলও তেমন কিছু হয়নি। কোনো সাংবাদিক এখনও অবধি ফোন করেনি। শুধুমাত্র স্থানীয় পাক্ষিক কাগজ ছোটো করে একটা নিউজ করেছিল। তবুও মৃগাংক উকিলের কেমন যেন একটা নেশা পেয়ে বসেছে। ভাঙা টাইপ রাইটারে বসে সে বারবার বদল করেছে ডব্লুউএস, যাকে বলে রিট স্টেটমেন্ট। কোর্টের পর মৃগাংক উকিল এসিজেএম সাহেবের চেম্বারে এলেন। তিনি এই সময় হাভানা চুরুট খান। অন্য কোনো কোম্পানির চুরুট তাঁর চলে না। যেমন আদি, অকৃত্রিম সুরভিত, অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম বোরোলিন, তেমনি এই হাভানা চুরুট। ওঁর প্রিয়।

চোখ বুজে চুরুট টানতে টানতে এসিজেএম সাহেব বললেন, মেয়েটি তো কিছুই বলছে না। বেশ কড়া শাস্তি হবে

স্যা, আপনি কিছু করুন

সামান্য দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়ল এসিজেএম সাহেবের। তারপর বললেন, মরা এভিডেন্স অ্যাক্টের বেড়া দিয়ে ঘেরা। ইন্ডিয়ান পেনাল কোড, সেখানে হৃদয়বৃত্তির কোনো জায়গা নেই। আমাদের বিচার্য বিষয় কৃতকর্মের লঘুত্ব বা গুরুত্ব যাচাই করা। ব্যক্তির সম্পর্কে জানাবে সাক্ষী, উকিল এবং কাঠগড়ায় যে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি কোনো উত্তর দিচ্ছে না, প্রসিডিং-এ সহযোগিতা করছে না বলেই বললাম

থানায় কুসুমকে তেমন কেউ বিরক্ত করে না। শরীর একদম ভেঙে গিয়েছে কুসুমের। চোখের তলায় কালি পড়েছে। একদিন টের পেল থুতুর সঙ্গে রক্ত উঠে আসছে। খুসখুসে কাশি অনেকদিন ধরেই সারছে না। আদালতে বারবার ডেট পড়ছে। উকিলবাবু কয়েকবার এসেছেন। বিশ্বজিৎ বাউল কি গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছে? তবে ছেলে-মেয়ে দুটোকে সে যত্ন করে। তাদের প্রায় নিয়ে আসে। প্রথম প্রথম বাবু কাঁদত, যেতে চাইত না। এখন জানে মায়ের বাড়ি যাওয়ার উপায় নেই। বাবার কথা জিজ্ঞেস করেছে কয়েকদিন।

মা, বাবারে ভ্যানে কইর‍্যা লইয়া গেল। আমারে কাছা পড়াইল বাউল কাকা। কইল, তোর বাপ আর ফিরব না। মায়ে আসব মা, তুমি কবে বড়ি যাবা?

বিশ্বজিৎ বাউল আশা ছাড়ে না। তার খুব ভগবানে বিশ্বাস। কুসুমের বাবা বৈষ্ণব ছিলেন। এখন তাঁর কথা মনে পড়ে খুব। বাংলাদেশ থেকে মা যদি জানে স্বামীরে কাইট্যা কুসুম ইন্ডিয়ার হাজতে আছে, মা খুব কাঁদব। তারপর মায়াডারে অভিসম্পাত দিব। শ্রীনিবাস কাকা বলে কুসুমের বড়ো জোর দশ বছর জেল হবে। জেল থেকে বার হইয়া সে করবেটা কী? কেউ তো তারে কামে রাখব না। ঘরখান হয়তো এতদিনে পুড়াইয়া দিছে। গোবিন্দ দাশ শোলমাছ আনত খুব। সে ছিল ট্রলারের পূজারি মাঝি। রাধনের কামটা গোবিন্দের আছিল। মদ না খাইলে সে তার সোহাগ করত। মাথা টিপা দিত। পাউ পর্যন্ত সে টিপছে। ভালো থাকলে তার সোহাগের অন্ত নাই। একবার পূজায় জামদানি শাড়ি দিছিল। এসব ভাবে আর কান্না পায় কুসুমের। শেষে সে পতিঘাতিনী হল!

বাবু বলেছে তাকে কে বলেছে, তোর নিজের মা আর মা নেই, তোর মা এখন ভারত কুসুম নরম স্বরে বলেছে ছেলেকে, বাবু, আমাগো মা পদ্মা। এই গঙ্গা নদী, ভারত—আমাগো কেউ না

শঙ্কর মাঝির বাড়ি পশ্চিম পুকুরবেড়িয়া। তার একটা গোয়ালও রয়েছে। গরু, মুরগি, সব আছে তার। কখনও কখনও দয়া সে করে কুসুমকে দু-পোয়া দুধ দিত। তার মতন জালও আর কারুর নেই। তার কাছে আছে বিন্তি জাল। গোবিন্দ তার ট্রলারে পূজারি মাঝির কাজ করেছে। শঙ্কর মাঝির মনে গরিব মানুষের প্রতি দরদ আছে, এমনই বলত স্বামী গোবিন্দ দাশ। 

খোশমেজাজে থাকলে সে গোবিন্দকে বলত, গাইয়া বও, পূজারি মাঝি। তুমার খানাপিনা হইছে?

অনেকদিন জলে কাটানোর পর গোবিন্দের তখন মন কাঁদত বাড়ির জন্য। সেটা বুঝে শঙ্কর মাঝি বলত, মাছগুলান বাড়িতে লইয়া যা। পোলাপানগুলা, তর বউ কুসুমরানি খুশি হইব। আর বিষ্যুদবারের আগে তো ট্রলার ছাড়ুম না। তিন দিন বউয়ের আদর খা এই বলে মিটিমিটি হাসত সে।

(ক্রমশ…)

 
 
top