ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

চুপ করে রইলেন অনুজ। বিডিও সাহেব তাপস মণ্ডলের বয়সটা অনেক কম। একজন চমৎকার পাঠক আর দক্ষ প্রশাসক। তিনি বলেছিলেন, গোরা অসাধারণ, যে কোন সমসাময়িক লেখাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। অর্কদীপ্ত হয়ত সেই স্থানিক বিন্দুকে স্পর্শ করতে পারেনি। হয়, এ রকম হয়ে থাকে। সৎ পাঠকও মহত লেখা ধরতে পারে না।

ছায়াময় সেই অঞ্চলে আসলে কাছাকাছি কোন পুকুর আছে। তাপদগ্ধ এই পৃথিবীতে বাবা-ছেলে দুজনেই তাকিয়ে ছিল সেই ছায়াময় অঞ্চলের দিকে। বাবা-ছেলে, দুজনেই ছায়া খুঁজছে। বয়স তাদের প্রার্থিত ছায়ায় প্রকারভেদ করে দিয়েছে। অর্কদীপ্ত মুমুর ছায়ায় বাস করতে চাইছে। তবে সে এখনও জানে না শীতকালে উনুনের ধোঁয়া আর কুয়াশার অন্তর কখনও কখনও দুর্ভেদ্য মনে হয়, শুধু আঁচ আর গন্ধে তাদের আলাদা করা যায়। বিভ্রম ভেঙে যায়। মুমুর স্মৃতিও তাই। অর্কদীপ্ত ছায়া খুঁজলেও কোথাও সত্যিকারের ছায়া নেই। অনুজও তাঁর বয়সে এসে ছায়া খুঁজছেন। চাকরি তাঁর কাছে জেলখানার মতন। পঁচিশ ছাব্বিশ বছর অর্থহীন বেঁচে থাকার মধ্যেও যেটুকু রস অবশিষ্ট থাকে তা ও কেড়ে নিয়েছে। তিনি এখন সরকারী ফাইল ছাড়া পড়তে পারেন না। খবরের কাগজ, নিউজ চ্যানেল ছাড়া তাঁর কোন বিনোদন নেই। অনেকদিন পর অর্কদীপ্ত বয়ে এনেছে গার্সিয়া মার্কেজ। লাতিন আমেরিকার পাবলো নেরুদার কথা মার্কেজ বলেছিলেন তাঁর নোবেল প্রাপ্তির অভিভাষণে। সেই সব দুনিয়া এখন অনেক দূরে। চাকরি অনুজের পড়ার শক্তি কেড়ে নিয়েছে। তা ছাড়াও অনুজ এখন খুব বেশি ভাবতে পারেন না। ভাবলেও এক মৃত ছবি তিনি দেখতে পান, যেখানে শুধু সরকারী ফাইল।

জীবনানন্দ বলেছিলেন উটের গ্রীবার মত অন্ধকার। ফাইলগুলোই উটের গ্রীবা আর তার অন্ধকার। এ ছাড়াও প্রচুর অর্ডার, সার্কুলার, উচ্চ পদস্থ আমলাদের চোখ রাঙানি—সব মিলেমিশে এমন এক পৃথিবী যেখানে কালো ছাড়া কোন রঙ নেই। গঙ্গাসাগর মেলা কেটে গিয়েছে বহুদিন। এখন নির্বাচনের মেলা। ধর্ম আর রাজনীতি-মুদ্রার এ পিঠ আর ও পিঠ। দুজনেরই ক্ষমতা প্রবল, কাল থেকে কালান্তরে বা সভ্যতার আদিপর্ব বাদ দিলে ধর্ম আর জিরাফ পাশাপাশি চলছে।

অনুজ হারিয়ে গিয়েছিলেন অর্থহীন চিন্তার স্রোতে। অর্কদীপ্তের কথায় কিছুটা ফিরে এলেন নিজের বেঁচে থাকায়।

বাবা, কতদিন পঁচিশে বৈশাখে জোড়াসাঁকো যাইনি!

ম্লান হাসলেন অনুজ। নিজের চেয়ারের ওপর দেওয়ালে রাখা রবি ঠাকুরের ছবিতে যে মালা তার বহুদিন আগেকার ফুলগুলি শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে। আমরা কথার অধীন, প্রথার অধীন, প্রবৃত্তির অধীন। এই শব্দগুলিও লেখা ছিল বিবর্ণ মালার আড়ালে। অনুজ বললেন, ভারতীয় গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রতিবারই পঁচিশে বৈশাখ হারিয়ে যায়। এটা তুচ্ছ ঘটনা

অর্কদীপ্ত বার দুয়েক বলেছে, বাবা আসছি

অনুজ শুনতে পাননি। ভয়ঙ্কর শূন্যতা তাঁকে গ্রাস করেছে। অনেকদিন পর, অনেক বছর পর তাঁর মনে হল এই মনুষ্য জীবন লইয়া কী করিব?

স্মৃতিলেখা যাওয়ার দিন বলেছিল, তুমি তো বলতে এখানে তোমাত অনেক সম্মান, মানুষ তোমায় ভালোবাসে

বালির পাহাড়। সমুদ্রের জোয়ারে নিমেষে ভেসে যাবে

স্মৃতিলেখা অর্কদীপ্তকে গিয়ে বলেছিল অনুজের কথাগুলো। সে তখন ঠাট্টা করে বলেছিল, মা, তুমি তো বাবাকে পথের পাঁচালি থেকে বলতে পারতে। রানীদি যে অপুকে বলেছিল, তুই যে বলতি নিশ্চিন্দপুর আমাদের বড় ভালো গাঁ। এখান থেকে তুই কোথাও যাবি না

অর্কদীপ্ত আরও একটা কথা বলেছিল মাকে, মা বাবাকে এবার আমাদের অবসর নিতে বলা উচিৎ। স্রোতের বিরুদ্ধে এই সাঁতার বাবা আর পারছে না

স্মৃতিলেখা বলেছিল, তুই তো চাকরি ছেড়ে দিয়েছিস। এবার তোর বাবাও ছেড়ে দিলে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে রাস্তায় নামতে হবে

মি তো চাকরি পেয়ে যাব

স্মৃতিলেখার মুখ কঠিন হয়ে উঠেছিল। এক সময় চোখে জলও চলে এসেছিল। স্মৃতিলেখা আবার কোন কথা গোপন করতে পারে না। সেই অনুজকে ফোনে সবটা বলেছে।

অনেক রাতে ফিরলেন অনুজ। অর্কদীপ্ত নিজে বাজার করে রান্না করেছে। সে রাতের খাবার একা খায়নি, বাবার জন্য বসে আছে। খাওয়ার পর, শোয়ার আগে সে প্রণাম করল অনুজকে। অনুজ অবাক হয়ে গেলেন।

কী রেকোথাও পালিয়ে যাচ্ছিস না তো!

অর্কদীপ্ত উত্তর দিল না সরাসরি। শুধু বলল, বাবা, আমি কিন্তু কাল ভোরে চলে যাব

কে, এত তাড়া কিসের!

ছেলে মাত্র একরাত থেকে চলে যাবে, অনুজ মানতে পারছিলেন না। মনটা যেন হঠাৎ হু হু করে উঠল।

অর্কদীপ্ত মাথা নিচু করে উত্তর দিল, নেক কাজ আছে বাবা

অনুজ প্রশ্ন করলেন না। এটা তাঁর চরিত্রের একটা দিক। তিনি কখনও স্মৃতিলেখার কাছ থেকে ওঁর একান্ত ব্যক্তিগত কিছু জানতে চাননি।

কাজ থাকলে তো যেতেই হবে

অর্কদীপ্ত এবার ছেলে মানুষের মতো বলল, বাবা, ছাদে যাবে? ব্যাগ থেকে সদ্য কেনা টেলিস্কোপ বের করল অর্কদীপ্ত।

কাশ দেখব বাবা, ছেলে দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল।

তারপর অনেক রাত অবধি তারা আকাশ দেখল। অরুন্ধতি, লুব্ধক, কালপুরুষ—এর বেশি তো তাদের জানা নেই। তবু তারা খুঁজল রাতভর। মহামণ্ডলের এই একান্ত ব্যক্তিগত অন্বেষণ না ধর্ম, না জিরাফ, কেউ খোঁজ রাখল না। তারাও কিছু মনে করল না। শুধু খোঁজার আনন্দে বিভোর হয়ে রইল।

ভোরে উঠে অনুজ একটা মেসেজ পেলেন অর্কদীপ্তর কাছ থেকে, গুড মর্নিং বাবা

অনুজ পাঠালেন, সু-প্রভাত 

অনেক রাতে ঘুমানোর ফলে শরীর বেশ আলস্য জড়িত। সময় নিলেন অনুজ ব্রাশ করে, হাতমুখ ধুয়ে ছেলের ঘরে যেতে।

শূন্য বিছানা। বাইরের সকালে মেঘের নীল রঙ। কেমন জানি শূন্যতা গ্রাশ করল অনুজকে। ধর্ম বদলানোর জন্য যেদিন অর্কদীপ্ত বলেছিল, এত বেদনা তিনি অনুভব করেননি। আজ বেদনা অনেক প্রগাঢ়, বুকটা বেশ চিনচিন করছে। আবার মেসেজ এসেছে অর্কদীপ্তর। এতক্ষণ খেয়াল করেননি তিনি। এবার খুলে দেখলেন।

বাবা, আমি চললাম। প্রথম দিল্লী, সেখান থেকে লাতিন আমেরিকা। পেরু, উরুগুয়ে এবং একদম শেষ অ্যসাইনমেন্ট গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কলম্বিয়া। প্রযুক্তির কাজ করতে করতে জানব সেই ভূখণ্ডকে। আমার দেশের সমান দারিদ্র, খিদে, অনাহার, লাঞ্ছনা কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর গৃহযুদ্ধ বা সিভিল ওয়্যার। মা কষ্ট পাবে, কাঁদবে। তুমি তো রইলে মায়ের জন্য। আমি ফিরে আসব বাবা। ইতি, অর্কদীপ্ত।

অনুজ ধর্মের কাছে, জিরাফের কাছে স্মৃতিলেখার জন্য, নিজের জন্য প্রার্থনা করলেন, ল্লাহ, অর্কদীপ্ত যেন বেঁচে থাকে

(ক্রমশ…)

 

 
 
top