ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

বৈরাগ্য পাখিরা। কেউ বা বলে বৈরাগী পাখিরা। অনেক কষ্টে ওকে নিয়ে এসেছে মৃগাঙ্ক উকিল। এক্সট্রিম প্রোভোকেশন ছাড়া কুসুম দাসীর পক্ষে বলার তেমন কিছু নেই। বৈরাগ্য পাখিরা একটা বিড়ি চেয়ে নিল। তারপর চোখ বুজে ধোঁয়া ছাড়তে লাগল। একসময় জজ সাহেবের রায় দেওয়ার ভঙ্গিতে কথা শুরু করল।

লায় দাগ হয়তো পড়বে না। এখন তো ফাঁসি হয় না। তবে আমি বহুবার দেখেছি ফাঁসি ডিক্রি বা কনডেমড সেল। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী ঘুমুচ্ছে না জেগে আছে বোঝা যায় না প্রায়ই। অনেক মার্সি পিটিশনও লিখেছি। মহামান্য হাইকোর্টে আপিল খারিজ হয়ে যাওয়ার পর প্রাণভিক্ষা চাওয়া

ফাঁসি দেখেছেন আপনি? মৃগাঙ্ক উকিল বাধ্য ছাত্রের মতন দুঁদে সাক্ষীর কাছে জানতে চাইলেন।

, সে মর্মান্তিক দৃশ্য!

আরেকবার বিড়ি ধরাল বৈরাগ্য পাখিরা।

সামীর হাত দুটো পিছন দিক দিয়ে হাতকড়া দিয়ে বাঁধা। মাথায় চোখ ঢাকা কালো টুপি। ফাঁসির মঞ্চে তোলা হচ্ছে আসামীকে। ওর মাথার ওপরে একটা লোহার আড়ের সঙ্গে ঝুলছে মোটা দড়ির তৈরি ফাঁস।পায়ের নীচে লোহার তক্তা

বৈরাগ্য পাখিরা এমনভাবে বর্ণনা দিছে যেন সে কতবার দেখেছে এই ঘটনা!

সুপারের হাতে ওয়ারেন্ট। জজের আদেশের বাংলা, হিন্দি তর্জমা শোনালেন রিলিজ দপ্তরের ডেপুটি জেলার। রিজার্ভ চিফ হেড ওয়ার্ডার বললেন, প্রেজেন্ট আর্মস। বেয়নেট উঁচু করে শ্রদ্ধা জানানো হল। তারপর মোটা দড়ি শুধু ঝুলে থাকবে। একটুখানি কেঁপে উঠবে, তারপর সব স্থির, নিস্পন্দ

কুসুম বলে এই মেয়েটি মামলা লড়তে চাইছে না

মানে সবটাই আপনার পকেট থেকে যাবে? হাসল বৈরাগ্য পাখিরা।

সামান্য কিছু দিচ্ছে এক বাউল

অন্য গন্ধ পেল যেন বৈরাগ্য পাখিরা।

দুজনে মিলে খুনটা করেনি তো?

সারা রাত লাশ পাহারা দিয়েছে দুজনে। কিন্তু খুনের দায় নিয়েছে মেয়েটি। অন্তর্লীন যদি কিছু থাকে, খুব লাভ হবে কি জেনে?

মৃগাঙ্ক উকিলের কথার উত্তরে নিশ্চুপ রইল বৈরাগ্য পাখিরা। তারপর বলল, মোটাদার হোটেলে পাবদা মাছের ঝাল ভাত খাব

মৃগাঙ্ক বললেন, জ পোনা মাছের ঝাল খান। ক্লায়েন্ট তো বুঝতে পারতাছেন, ভিখিরি কওন যায়

 

অর্কদীপ্তকে দেখে চমকে উঠল অনুজ। একমুখ দাড়ি, লম্বা চুল, চোখের তলায় কালি। নির্বাচনের তুমুল কাজের মধ্যে ছেলেকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন অনুজ।

তু?

বাবা, তোমার কাছে থাকব কয়েকদিন

ওর কণ্ঠস্বরে মন ভিজে উঠল অনুজের। বাইরের জমাট বাঁধা বরফ যেন গলতে শুরু করেছে।

খুব কষ্ট হবে তোর। এখন তো দিন-রাত সব একাকার হয়ে গিয়েছে

ষ্ট হবে না। বাবা, তুমি জানো?

কী?

অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন অনুজ।

মুমু মারা গিয়েছে। আর এখানে আসার আগেই তোমার পড়ার টেবিলে পেয়েছি এই বইটা

অর্কদীপ্তের ভাসা ভাসা চোখে জল ভরে উঠেছে। অনুজের চোখও জলে ভরে উঠল। বইটা হাত বাড়িয়ে নিলেন অনুজ। গার্সিয়া মার্কেজের ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড। স্প্যানিশ ভাষায় প্রথম প্রকাশ সন ১৯৬৭।

অর্কদীপ্ত বাবাকে জিজ্ঞেস করল, কিন্তু তুমি ইংরেজি অনুবাদ কিনেছিলে কবে?

৯৮২। কিন্তু ওঁর নোবেল পাওয়ার আগে। গোলদিঘির উলটো দিকে একটা ফুটপাতে, মাত্র দশ টাকায়

ছেলে এলে এ সব গল্প হয়। নির্বাচনের কাজের মধ্যে ওর আসা। কিন্তু মরুভূমির মধ্যে যে ব্যথা তার কথা তো জানা হল না। মুমু মারা গিয়েছে। এই মৃত্যুর ব্যথা ওর মধ্যে সারা জীবন বেঁচে থাকবে। এটুকু বিস্মৃত হওয়া ঠিক নয়।

বাবা, মার্কেজ বলতেন উনি বাস্তবের কথা বলেন। বলেও গিয়েছেন বারবার, কিন্তু পরাবাস্তবের ঢঙে

তুই তো কয়েকদিন আগে আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলি

হ্যাঁ, বাবা। ওটা বাস্তব। আর পরাবাস্তব আমার অনুভূতি। পরিত্যক্ত বাড়িটায় সব মৃত মানুষেরা কথা বলছিল। দাদু, ঠাকুরমা, আতা - সকলেই

আতা মানে অনুজের মানসিক ভারসাম্যহীন পিসিমা যিনি মায়ের মৃত্যুর এক বছর আগে মারা গিয়েছিলেন। অবাক হয়ে গেলেন অনুজ। লেখক অনেকেই হতে পারে, কিন্তু পাঠক হওয়া আরো কঠিন। ভেবে খানিকটা হেসেও নিলেন কারণ অনুজ নিজে তেমন লেখেননি। লেখার কথা ভাবলেও লেখা আর হয়ে ওঠেনি। ফলে নিজের অক্ষমতা নিয়ে খানিকটা গর্বও করা হয়ে গেল।

বাবা হাসছ কেন?

অর্কদীপ্ত জিজ্ঞেস করল। অন্য কথা বললেন অনুজ।

মার্কেজ বলেছিলেন, আপনি যদি লেখেন একটা হাতি আকাশে উড়ে যাচ্ছে, কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আপনি যদি লেখেন তিনশো পঁয়তাল্লিশটা  হাতি আকাশে উড়ে গেল, অনেকেই বিশ্বাস করবেন। আমার ঠাকুরমা এইভাবে বলতেন যেন তিনি দেখতে পাচ্ছেন। দাদু, ঠাকুরমা, আতা, মুমু -  কেউ বেঁচে নেই। কিন্তু আমরা আছি। কোনটা বাস্তব, কোনটা পরাবাস্তব বাবা?

ম্লান হাসলেন অনুজ। ছেলের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেন না। বাবাকে বাঁচানোর কতো চেষ্টা মা আর অনুজ সারা জীবন করেছেন। বাবার তিনবার যক্ষা হয়েছিল। গলা থেকে রক্ত পড়ছে আর মা মুছে চলেছেন মেঝে বরাবর। হাত সাদা হয়ে উঠেছে মায়ের। বাবা যেদিন সত্যিই মারা গেলেন, মায়ের সমস্ত স্মৃতি লুপ্ত হয়ে গেছে। অনেক কথা মা বলতেন, পরাবাস্তবের মতন লাগত। আবার কখনও মনে হত্মায়ের পৃথিবী সত্যি।খুব সূক্ষ এই পার্থক্য।

অনুজ বললেন, খিদে পেয়েছে তোর?

ছেলে হেসে বলল, টা বাস্তব, তাই না বাবা?

রাবাস্তবও হতে পারে, অনুজ সজোরে হেসে বললেন।

মহকুমা শাসকের ফোন এসেছে। অনুজ ফোন ধরার আগে অর্কদীপ্তকে কোয়ার্টারের চাবি দিয়ে দিলেন। ফোনে সংক্ষিপ্ত সংলাপ সেরে আবার ছেলের দিকে তাকালেন।

কিছু বলবি? তোর কি টাকার দরকার?

স্মৃতিলেখা জানিয়েছে বাঙ্গালোরে অর্কদীপ্ত আর যাবে না। মি. গোমেজের চাকরি সে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অনুজও যদি পারতেন এইভাবে চাকরি ছেড়ে দিতে! অনুজ পারেননি, কিন্তু অর্কদীপ্ত পারুক। সে প্রচুর পড়ুক আর গভীরভাবে জানুক মানুষ আর বিশ্বকে।

বাবা, মার্কেজ বারবার বলেছেন যে, তাঁর লেখা বাস্তবতার অভিব্যক্তি। নির্যাতন, লাঞ্ছনা আর অগুণতি মৃত্যুতে ভরা তাঁর দেশ। সেই বাস্তবতার কুহকে তাঁকে কিছু কল্পনা করতে হয়নি

খুব ভাল লাগছে শুনতে। হঠাত মজা করে বললেন অনুজ, হিন্দু ধর্মে তবে রয়ে গেলি?

অর্কদীপ্ত বলল, বাবা, যদি বিদেশে যাই তুমি টাকা দেবে?

পালিয়ে যেতে চাইছিস? কোনও লাভ নেই। মুমুর স্মৃতি আরও তোকে আঁকড়ে ধরবে। আর, টাইম ইজ দ্য বেস্ট হিলার

খানে কোন ভবিষ্যত নেই

মার্কেজের কথা বেশি বলা হচ্ছে। তবু বলি, এর মধ্যে জীবনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে চাই নতুন কৃৎকৌশল

বুঝলাম না বাবা

মাদের দেশ হয়ত কলম্বিয়া নয়। কিন্তু ভাল কিছুও নয়। গণতন্ত্র আছে কিন্তু যেন এক গুঁতিয়ে চলা গণতন্ত্র। মানুষের দুঃখ-কষ্টের লাঘব হয় না। দুর্নীতিবাজের গলার জোর, পেশীশক্তি সব কিছুই বেশি। এই জঙ্গলের বাসভূমিতে গণতন্ত্র একটা অভয়ারণ্য সৃষ্টির কথা বলে

মে মাসের প্রবল তাপ। আগুনের হলকা যেন মিশে রয়েছে বাতাসে।

ফ্রিজে ভাত, ডাল, মাছ আছে। খেয়ে নিস

তুমি কখন ফিরবে? অর্কদীপ্ত জানতে চাইল।

বজার্ভার এসেছেন। আমার ফেরার ঠিক নেই। তুই সব গরম করে নিতে পারবি তো?

হাসল অর্কদীপ্ত। হাসলে খুব সুন্দর দেখায় মানুষকে। অর্কদীপ্তকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। বয়সের নবীনতা একটা আলগা মাধুর্য যোগ করেছে ওর হাসিতে।

মুমু খুব রবীন্দ্রনাথ পড়ত। গোরা ছিল ওর খুব প্রিয় উপন্যাস

মি এখনও গোরা পড়িনি। তুই পড়েছিস?

অর্কদীপ্ত বলল, ড়তে শুরু করেছিলাম। শক্ত লাগছিল আর মনে হয়েছে সমকাল থেকে অনেক দূরে

চুপ করে রইলেন অনুজ। বিডিও সাহেব তাপস মণ্ডলের বয়সটা অনেক কম। একজন চমৎকার পাঠক আর দক্ষ প্রশাসক।

(ক্রমশ…)

 
 
top