ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

৪র্থ পর্ব

ক্যাপ্টেন আবদুল্লা মৌনিবাবার কাছে আবার এগিয়ে গেলেন। প্রশ্ন করলেন, ‘মানুষ মরে গেলে বা ইন্তেকাল হলে কোথায় যায়?’

পাশের ভদ্রমহিলা বললেন, ‘এ সব প্রশ্নের উত্তর বাবা এখন দেবেন না। বিকেল চারটের পর দেবেন।

মৌনিবাবা কিছুক্ষণ দেখলেন ক্যাপ্টেন আবদুল্লাকে। তারপর স্লেটে লিখলেন, ‘e = mc2

অনুজ এবার না বলে পারলেন না, ‘মরে গেলে মানুষ আলোর গতিবেগ প্রাপ্ত হয়!’

মৌনিবাবা স্মিত হেসে লিখলেন, ‘মানুষও তো ম্যাটার, সপ্রাণ বস্তু, ফলে এই জীবদেহ শক্তিতে রূপান্তরিত হবে, এটাই স্বাভাবিক।

স্মৃতিলেখা এবার দেখতে পেয়েছে অনুজকে। সে কাছে এসে বসল। ক্যাপ্টেন আবদুল্লা হাত তুলে নমস্কার করলেন স্মৃতিলেখাকে।

 

 

মধ্যদুপুরে রোদের তেজ বেশ রয়েছে। কুসুম আর বিশ্বজিৎ বাউল ফিরে চলেছে তাঁবুর দিকে। এখনও অনেকটাই পথ। কপিলমুনির আশ্রমের কাছে ওদের তাঁবু। অসময়ের কোকিল ডেকে উঠল। ওরা দু-জনেই খুব হেসে উঠল। কুসুম দুষ্টুমি করে কোকিলের ডাক নকল করে সাড়া দিল। তখন সেই পুরুষ কোকিল আবার ডেকে উঠল

কুসুম, তোমার বাড়ি যাব একদিন।

বাউলরা তো পক্ষী হয়, তাদের যাইতে তো মানা নাই।

তোমার বাড়ি বাঁধা শেষ হোক, তখন যাব।

ঠিক কইছেন, কর্তা।’ বলেই খিলখিল করে হেসে উঠল কুসুম।

‘এতো হাসি ভালো নয়,’ বিশ্বজিৎ বলল।

কুসুম বলল, ‘আমার কপালে আইজ মাইর আছে। সে বইয়া বইয়া রাগে ফুঁসতাছে।

 

স্মৃতিলেখা হঠাৎ ক্যাপ্টেন আবদুল্লাকে বলল, ‘আপনার মেয়ে যদি কোনও হিন্দু বা খ্রিস্টান ছেলেকে বিয়ে করতে চায়—আপনি মেনে নেবেন?

ওদের তো আমরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকার দিয়েছি।

কিন্তু নিজেদের সবটা ভালো ওরা কি বোঝে?

আমি কিন্তু আপত্তি করব না। আমার সমাজ, ম্যাডাম, আপনাদের চেয়েও কঠিন। শরিয়ত যেন একটা অনড় পাথর।

পাথরের কথা বলতেই অনুজের মনে পড়ল ছেলের সেই কথাগুলি। বলে দিলেই হল এই পাথরের কোনো তল নেই, ভগবান বিষ্ণু রয়েছেন এই পাথরে। কেউ খুঁজতে চাইবে না, কারণ ঈশ্বর রুষ্ট হবেন।

মন্দির হচ্ছে সবচেয়ে প্রফিটেবেল বিজনেস,‘ অর্কদীপ্ত বলল।

চার্চ ব্যাবসা করে না। ওদের মধ্যে সুপার নেই।

স্মৃতিলেখা কিছু বলতে পারল না এবার।

অনুজ রেগে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ঈশ্বরের ইচ্ছে হল পৃথিবী সৃষ্টি করার অমনি পৃথিবী সৃষ্টি হল। বাইবেলে এরকমটা রয়েছে।

অর্কদীপ্ত বলল, ‘আমি খ্রিস্টধর্মকে সমর্থন করছি না। আমার কাজ হয়ে গেলে ছেড়ে দেব। ধর্মও তো হায়ার অ্যান্ড ফায়ার

অত সোজা না। আমাদের বাঙালিদের কাছে ধর্ম অনেক ফ্লেক্সিবেল। তুমিও জান, সারা ভারতবর্ষের ছবি অন্যরকম। খ্রিস্টান হলে তোমাকে প্রার্থনায় যেতে হবে সপ্তাহে অন্তত একদিন। ছেড়ে আসাও সহজ হবে না। গ্যালিলিওকে মানতে ওদের কয়েকশো বছর লেগেছে। সনাতন হিন্দু ধর্ম এদিকে থেকে খুব পশ্চাদবর্তী ছিল না।’

তোমার কাছ থেকেই পায়াস হিন্দু পর্যবেক্ষকদের কথা শুনেছি। একজন অবজার্ভার এসেছিলেন। ওঁর নাকি কেজি কেজি দুধ লাগত শিব আর নারায়ণ শিলা স্নান করাতে। আমি সেরকম কিছু হব না।

গঙ্গাসাগর মেলা মিটে গেলেই লোকসভা নির্বাচন। এ দেশে বিপ্লব আর হবে না। ফলে নির্বাচনই হচ্ছে বসন্তের অকাল নির্ঘোষ। আর অবজার্ভার হচ্ছেন শ্বেত হস্তী। হস্তীর গমন, হস্তীর চলনে প্রচুর ব্যয়। কেউ পেঁপে খেতে চাইবেন, কেউ চাইবেন জিম বা সুইমিং পুল। কেউ চাইবেন মাঝরাতে গলদা চিংড়ি, কেউ বা কয়েক মণ দুধ।

স্টেট ক্যাডারের নীচের তলার এক্সিকিউটিভরা অনেকটা মরুভূমির ভারবহনকারী উটের মতন। বিশেষ করে, ব্লকস্তরের উন্নয়নের জন্য দায়বদ্ধ আধিকারিকেরা বোঝা বহন করার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। যাঁরা যৌবনে এইসব চাকরি শুরু থেকেই করেন, তাঁরা মজা করে বলেন ‘ক্যামেল সার্ভিস’।

স্মৃতিলেখা অর্কদীপ্তের কথা জানতেই এসেছে। ছেলে লন্ডন থেকে কয়েকবার ফোন করেছে, স্মৃতিলেখা ধরেনি। অনেকবার বুঝিয়েছে অনুজ। এই গতির শতাব্দীতে একটি ছেলের খ্রিস্টান হয়ে যাওয়া কোনও ঘটনা নয়। রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন ঘোষ, ডিরোজিও সাহেবের ইয়ং বেঙ্গল, মাইকেল মধুসূদন দত্ত—খ্রিস্টান হয়ে কেউ খারাপ হয়ে যাননি। স্মৃতিলেখা কিছুতেই বুঝতে চাইছে না।

ম্যাডাম খুব ভেঙে পড়েছেন,অমায়িক গলায় বললেন ক্যাপ্টেন আবদুল্লা। তারপর বললেন, ‘আমার বিবিও গোঁড়া ছিলেন। শরিয়ত মানতেন। মেয়েরা ধর্মভীরু হয়। ধর্মের পীড়ন ওদের ওপর সেই কারণে বেশি হয়। কিন্তু এই প্রজন্ম আলাদা, স্যার।

আমরা ধর্মেও ছিলাম জিরাফেও ছিলাম,’ আনুজ হাসলেন।

 

অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে

তোমার মুখ অশ্রু ঝলোমলো।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লাইন দুটো বলতে বলতে টালমাটাল পায়ে মৌনিবাবার তাঁবুতে ঢুকলেন সুব্রতরঞ্জন কর, অনুজের বাস্তুকার। প্যারাডাইস লস্ট- রয়েছে বেলজিবাবের কথা। ঈশ্বর লুসিফারকে নরকে নিক্ষেপ করার পর নরকেও মাধুর্য এনেছিলেন বেলজিবাব।

স্যার, এরা আমাকে ঢুকতে দিচ্ছিলেন না। বললাম, আমার সাগরদ্বীপে বাড়ি। আমি বায়সদ্বীপের বাস্তুকার।

মুখ থেকে অ্যালকোহলের গন্ধ বেরুচ্ছে। নাকে রুমাল চাপা দিলেন অনুজ। পকেট থেকে রুমালের মধ্যে বেঁধে রাখা অসাধারণ দেখতে ও চমৎকার গন্ধের একটা ফুল বের করলেন সুব্রত কর।

স্যার, একে বলে নাগলিঙ্গম। এর কারণে সারা রাত আমার ঘুম হয়নি।

না হেসে পারলেন না অনুজ।

ক্যাপ্টেন মুরাদ বললেন, ‘সুব্রতদা, এই ফুলের তো চমৎকার গন্ধ।

ওটাই তো জ্বালা হয়েছে। বসন্তের শুরু বললেই তো হয়। সারারাত কোকিল ডাকছিল। ফুলের সৌরভে পুরুষ কোকিলেরা খেপে উঠেছিল,অনুজ বললেন।

সুব্রতবাবু মৃদু হাসলেন। মাতালের হাসির এক সহজ সৌন্দর্য রয়েছে। অনেকেই তাকিয়ে রয়েছেন সুব্রতবাবুর দিকে।

কালকে তবে বাড়িতেই ছিলেন?

না। এক বন্ধুর বাড়িতে ছিলাম। সাগরদ্বীপের দুটো বাড়িতে নাগলিঙ্গঁম রয়েছে—এক, আমার এই বন্ধু। দুই, রামকৃষ্ণ মিশন। এই ফুল আমাদের মাটিতে হয়। সচরাচর হয় না। আন্দামানে পাওয়া যায়।

ক্যাপ্টেন মুরাদ আবদুল্লা সুব্রতবাবুর বোহেমিয়ান জীবনের কথা জানেন। কয়েক বছর ধরে লট এইটের গঙ্গাসাগর মেলা মানেই সুব্রতবাবু। পুলিশের শ্রীনিবাসবাবু সুব্রতবাবুর পিছন পিছন থাকেন। ‘এ’ টাইপ হোগলা শেড। ট্রেনি আইপিএস অফিসারদের জন্য সবটার হোতা সুব্রতবাবু। টয়লেট, হোগলা শেড, হাসপাতাল, ভিআইপি শেড, যাত্রী শেড, নিরুদিষ্টদের জন্য বজরং পরিষদের হোগলা ঘর—যত রাত বাড়ে, মদ্যপানের মাত্রা বাড়ে আর সুব্রতবাবু ছুটতে থাকেন মেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ঘরে ফেরা হয় না মাসের পর মাস, রাতের পর রাত।

বহুবার হারিয়েছে বলে আজ কেউ লোকটিকে খোঁজে না আর। সুতো ছাড়তে থাকে

সুব্রতরঞ্জন কর বিড়বিড় করে বলতে থাকেন। তারপর আবার হঠাৎ বলে ওঠেন, ‘স্যার, মদ খেয়েছি বলে কি মানুষ নই! গিরিশ ঘোষও তো যেতেন ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের কাছে। তিনি কখনও তাচ্ছিল্য করেননি।

সুব্রতবাবুর পানের মাত্রা আজ যে বেশি হয়েছে, বোঝা যাচ্ছে। মৌনিবাবা সব শুনছেন, হাত দিয়ে ডাকলেন সুব্রতবাবুকে। সুব্রতবাবু প্রণাম করলেন, হাতে পেলেন একমুখী রুদ্রাক্ষ। তারপর যেমন হঠাৎ এসেছিলেন, ধাঁ করে উধাও হয়ে গেলেন।

সুব্রতবাবু চলে যাওয়ার পর ক্যাপ্টেন মুরাদ অনুজকে বললেন, ‘সুব্রতবাবুর শ্বশুর এই তল্লাটের জমিদার ছিলেন। হায়দার আলি। বনেদি বংশ।

অনুজ বললেন, ‘ওঁর বউ গান করেন চমৎকার। পাপিয়া কর। শুনেছি ভালোবেসে বিয়ে করেছেন।

স্মৃতিলেখা বলল, ‘অন্য ধর্মে বিয়ে করলে এরকমটা হয়। আমাদের ছেলেরও কি ভালো হবে!’

ক্যাপ্টেন মুরাদ স্মিত হেসে বললেন, ‘ম্যাডাম, মানুষ ধর্মের চেয়ে অনেক বড়ো। ধর্ম শুধু সংস্কার আর এই কারণে আল্লাহকে আমরা ডরাই কিন্তু মহব্বত করি না।

 

 

দীপ্তির চুলগুলো অনেকটাই উঠে গেছে। দুটো কেমো নেওয়ার পর ওর গলার সেই সুরেলা ঝংকারটাও নেই। অর্কদীপ্তের দেখে খুব কষ্ট হল। ব্লাড ক্যানসার এখন তো ভালো হচ্ছে।

অর্ক অবশ্য মুখে-চোখে স্মার্টনেস এনে বলল, ‘দীপ্তি, আমি খ্রিস্টান হচ্ছি। মা-বাবাকে বলে দিয়েছি।

চুঁচুড়া শহরে একটাই ছোটো গির্জা রয়েছে। দীপ্তিরা খ্রিস্টান, তবে বাংলা ওদের মাতৃভাষা হয়ে গিয়েছে। ওদের পূর্বপুরুষরা ছিল পর্তুগিজ। দীপ্তি জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখছিল। অনুপম পৃথিবীর ছবি। শুকনো ঝরা পাতা আর সংকীর্ণ গলির পাঁচিলে কোকিলের ডাক একটা ঋতুর আবির্ভাব ঘোষণা করছে। দীপ্তির খুব প্রিয় ঋতু।

সে বলে, অবিশ্বাস্য মার্চ মাস। সে যখন মারা যাবে তখন যেন মার্চ মাস থাকে। তাকে অবিশ্বাস্য মার্চ মাসে যখন কবর দেওয়া হবে, প্রচুর শুকনো পাতা সেই কবর ঢেকে দেবে।

অর্ক আবার বলল, ‘আমি খ্রিস্টান হচ্ছি।

ধর্ম পরিবর্তন করবে কেন?‘ কোমল স্বরে বলল দীপ্তি। তবে চোখে জল চলে আসছিল। খুব কষ্টে আটকাল। সে জানে, অর্ক ওর কারণে ধর্ম পরিবর্তন করছে।

যিশুকে ভালোবাসতে শিখলে তুমি ভালো হয়ে উঠবে।

ম্লান হাসল দীপ্তি, প্রভু যিশু বলতে হয়। তুমি তো ওঁকে ভালোবাস। এই জন্য খ্রিস্টান হওয়ার কী দরকার?’

আমি তো কনফেসন করতে পারি না। প্রার্থনাও করি না।

দীপ্তি অনেকবার কনফেসন করেছে। তার যাবতীয় পাপের কথা প্রভুর কাছে বলেছে। ফাদার বলেছেন, ‘তোমার কোনো পাপ নেই, দীপ্তি। অ্যান্ড লর্ড ইজ সো কাইন্ড।

কনফেসন তো আমি করি। পাপের তো কোন দায় নেওয়া যায় না।

তর্কে পারল না অর্কদীপ্ত। ধর্ম সম্পর্কে দীপ্তি অনেক কিছু জানে আর প্রভু যিশুর প্রতি ওর বিশ্বাস অবিচল।

দু-জনের প্রার্থনা প্রভু ফেরাবেন না,‘ দীপ্তি হাসল। মৃত্যুর আগে এটুকুই বোধহয় প্রাপ্তি। অর্কদীপ্তের এমন অমলিন ভালোবাসা কনভেন্ট স্কুলের সতীর্থ হিসেবে পাওয়া কঠিন ছিল।

মা-বাবাকে বললে?’

হ্যাঁ, বলেছি।

ওঁরা কী বললেন?’

মা তীব্র আপত্তি করেছেন।

খুব কষ্ট হল বলতে দীপ্তির, ‘তবু সবকিছু জেনে এ সব করছ!’

হ্যাঁ, সব। আমি তো তোমার শরীরকে ভালোবাসিনি, বেসেছি তোমাকে।

কু-রূপা আমারও তো একটা মন আছে, তার কথা তুমি জান?

অবাক হয়ে গেল অর্কদীপ্ত। দীপ্তিকে সে যে ভালোবাসে, এই ব্যাপারে তার কোনও সংশয় নেই। আবার দীপ্তিও যে তাকে ভালোবাসে, এই বিষয়েও সে নিঃসংশয়।

তার মানে!’

আমার বাবা ঋতেশ গোমেজ তোমার কোম্পানির মালিক। তুমি কর্মচারী কারণ ইঞ্জিনিয়ারকেও কর্মচারীই বলে।

পৃথিবীটা অন্যরকম লাগছে অর্কদীপ্তের। হিন্দু ধর্ম ছেড়ে দেওয়ার জন্য সে অনেকটা এগিয়ে গেছে। মিস্টার গোমেজ চান, সে খ্রিস্টান হোক আর খ্রিস্টধর্মের কৃতি মানুষকেই তিনি বিদেশে পাঠাবেন কিন্তু অর্কদীপ্তের কাছে এর চেয়ে বড়ো ছিল দীপ্তির ভালোবাসা।

আর্মেনিয়ান চার্চে ঘণ্টা বাজছিল। বিষণ্ণ বিকেলে সেই ঘণ্টার ধ্বনি খুব বাজল অর্কদীপ্তের বুকে। নিজের ধমের্র কাছে তাকে মাথা নীচু করে ফিরতে হবে। তবে এখনও সে খ্রিস্টান হয়নি। রাতটা খুব খারাপ কাটল অর্কদীপ্তর। মাও রাগ করে বাবার কাছে চলে গেছে, না-হলে সে মাকে বলত মাছের কালিয়া রাঁধতে। কতোদিন সে পাঁচমিশেলি সেই তরকারি খায়নি। চৈত্র মাসের শেষদিন ঠাকুরমা রান্না করত। কখনও কখনও তার মনে হল দীপ্তি বানিয়ে বলছে। সে আসল কথা মনের গোপনে লুকিয়ে রেখেছে। অর্কদীপ্তের সমাজ আর বাকি জীবনের কথা ভেবেই সে এ রকমটা বলেছে। রাতে ঘুম এলো না একদম। রাত যত বাড়ল, অস্থিরতাও বাড়ল। বিছানায় ছটফট করতে থাকল অব্যক্ত এক যন্ত্রণায়। আকাশে গোল হয়ে ছিল পূর্ণিমার চাঁদ। আর রাতকে দিন ভেবে ডাকছিল কোকিল। হিন্দু ধর্মের জন্য তার মন হঠাৎ ভিজে উঠল। এই ধর্মের সবটাই কি খারাপ! আসলে ধর্ম নয়—মা-বাবা, যাবতীয় পরিমণ্ডল থেকে বিচ্ছিন্নতা ওকে বিপন্ন করে তুলেছে। সেই বিপন্নতা থেকে ওকে একমাত্র বাঁচাতে পারত দীপ্তির ভালোবাসা। সেখানেও প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে রইল। যিশু খ্রিস্টের কাছে যাওয়ার একমাত্র কারণ ছিল দীপ্তি। দীপ্তির আরোগ্যলাভের জন্য অর্ক প্রার্থনা করত। অনেক রাতে চোখ যখন ধরে এসেছে, তন্দ্রার গভীর থেকে সে ডাকল, ‘মা, মা।

স্মৃতিলেখা কোনও সাড়া দিল না বা শুনতে পেল না। ভোরে ঘুম ভাঙতেই রাস্তায় নেমে পড়ল অর্কদীপ্ত।

নগর সংকীর্তনে বেরিয়েছে একদল মানুষ। তাদের কাছে রয়েছে মৃদঙ্গঁ, ঢোল, খঞ্জনি। ওঁরা নেচে নেচে গাইছিল:

 

এখনও সে ব্রজবালা

বাঁশি শুনে হয় উতলা

সেই ছলনায় কদমতলায়

কৃষ্ণ আছে কয়

এখনও সে রাধারানি

বাঁশি শুনে পাগলিনী

অষ্ট সখির শিরোমনি

রাখাল রাজা রে

এখনও সেই বৃন্দাবনে

বাঁশি বাজে রে…

 

দলের মধ্যে একটা লোক সত্যি সত্যি বাঁশিতে ফুঁ দিল।

 

বাঁশির সুর বনে বনে

ময়ূর নাচে রে

হরে কৃষ্ণ হরে হরে

কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে

হরে রাম হরে হরে

রাম রাম হরে হরে

 

অর্কদীপ্ত ওদের দলে মিশে গেল। বৈষ্ণব হলেও মন্দ কী! হিন্দু, খ্রিস্টান দু-ধর্মকেই সে মনে মনে পরিত্যাগ করল।

(ক্রমশ…)

 
 
top