ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

৬ষ্ঠ পর্ব

ক্যাপটেন আবদুল্লা বললেন, স্যার, আমি আর ক্যাম্প অফিসের ভিতরে যাব না। স্মৃতিলেখাও বলল, আমি ওখানে গিয়ে কী করব!

অনুজ তখন হেসে বললেন, ক্যাপটেন, মেলার বাকি অংশ আপনার দায়িত্ব আমার বউকে দেখানোর।

স্মৃতিলেখা বলে উঠল, ছিঃ ছিঃ আমি একাই ঘুরতে পারি

হারিয়ে যাবে। তখন অনুসন্ধান কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করতে হবে

স্মৃতিলেখা প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু ক্যাপটেন আবদুল্লা বললেন, ম্যাডাম, আপনাকে মেলা দেখাতে পারলে নিজের খুব শ্লাঘা হবে

স্মৃতিলেখা বলল, বাঃ আপনি খুব ভালো বাংলা জানেন!

শ্লাঘা শব্দটা অনেকেই খুব ভুল ক্ষেত্রে সঠিক অর্থ না জেনে ব্যবহার করে। ম্যাডাম, আমি কিন্তু মুসলিম হলেও বাংলা আমার ফার্স্ট ল্যাঙ্গোয়েজ ছিল।

ক্যাপটেন, আমি কিন্তু অতটা গোঁড়া নই, তবে ছেলেটা

ক্যাপ্টেন বললেন, থাক না, ম্যাডাম, ও সব কথা

প্রচুর আলোকমালার মধ্যেও মেলায় সবচেয়ে চোখে পড়ছে ভিখিরিদের। মেয়ে-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকেই ভিক্ষাপাত্র নিয়ে পুণ্যার্থীদের কাছে এগিয়ে যাচ্ছে। স্মৃতিলেখা হঠাৎ বলল, ক্যাপটেন মুরাদ, ভারতবর্ষে পভার্টি লাইনের ন্যূনতম সীমারেখাটা কী?

মি যতদূর জানি, ২৮ টাকা ১২ পয়সা জনপ্রতি প্রতিদিনের আয়ের সর্বনিম্ন মাত্রা

দীর্ঘশ্বাস পড়ল স্মৃতিলেখার। একজন নুলো মানুষকে স্মৃতিলেখা একশো টাকার একটা নোট দিল। দিয়েই বিপদে পড়ল, অনেকেই ওকে ঘিরে ধরল।

মাতাজি, বেসাহারা ইনসান কো কুছ তো দিজিয়ে!

ক্যাপটেন বললেন, ম্যাডাম আপনাকে সবাই অবাঙালি ধরে নিয়েছে। বাঙালিরা এত টাকা হঠাৎ করে ভিখিরিকে দেয় না

স্মৃতিলেখা কাউকে ফেরাচ্ছিল না। সে প্রত্যেককে কিছু কিছু দিতে থাকল।

ত্যিই অমানবিক কিন্তু আমি তো এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারি না স্মৃতিলেখা বলল।

এই সময় একজন রোগা, ফর্সা, লম্বা, বয়স্ক মানুষকে দেখা গেল। ক্যাপটেন মুরাদ মানুষটিকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন। ভদ্রলোক লজ্জায় সিঁটিয়ে রইলেন। স্মৃতিলেখার খুব অস্বস্তি হচ্ছে। ওঁকে কখনও দেখেছেন বলে মনে পড়ল না। ক্যাপটেন মুরাদই বললেন, ম্যাডাম, প্রাতঃস্মরণীয় মাস্টারমশাই। ননীগোপাল সামন্ত। নন্দীগ্রাম ভূমি বাঁচাও আন্দোলনেও ছিলেন

বিরক্ত হলেন স্মৃতিলেখা, তবে তিনি তো স্বার্থমূল্য মানুষ নন। বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন রয়েছে ননীবাবুর, স্মৃতিলেখার মুখের ভাষা পড়তে পারলেন।

মা, আমার বাবা কুমুদবান্ধব সামন্ত, স্বাধীনতা সংগ্রামে নন্দীগ্রাম বইতে আমার বাবার নাম রয়েছে। বাবার রক্ত আমার মধ্যে সেইভাবে নেই। কিন্তু আমাদের গ্রামবাংলায় একটা চালু প্রবাদ রয়েছে, গোয়ালা আপন গরজে ঢিল বয়। তুমি যদি আমাকে ভাতে মারো, বাঁচার কারণে আমাকে রুখে দাঁড়াতেই হবে

স্মৃতিলেখা বলল, মি রাজনীতি বুঝি না আর আমার ভালোও লাগে না

মা, আমাকে একটু জল দেবে। তেষ্টা পেয়েছে

মেয়েদের মধ্যে মায়ের সত্তা থাকে। স্মৃতিলেখা বোতল থেকে গ্লাসে জল ঢেলে মাস্টারমশাইয়ের হাতে দিলেন। জলপান করে খুব ক্ষীণ বৃদ্ধ মানুষটি আরও সতেজ হলেন। রাখাল মেমোরিয়াল মাঠে মিটিং—কালেকটর সাহেব আসছেন। মাতঙ্গিনী হাজরা। ব্রিটিশ পুলিশকে বললেন, বাবাসকল, গোরাসাহেবরা নাকি রাজপুত্রদের মতো দেখতে হয়, আমার সাধ হয় তাই দেখার

স্মৃতিলেখা খুব মন দিয়ে শুনছিল না, কারণ তার মন পড়েছিল মেলা দেখায়। অনেক পসরা এসেছে, স্মৃতিলেখা লাল-কালো পাথরের একটা হার পছন্দ করে এসেছিল। তা না কেনা অবধি মনে প্রফুল্লতা ফিরে আসবে না। স্মৃতিলেখার বয়স ধরা যায় না। চুলে পাক ধরেনি, মুখে ভাঁজ পড়েনি, যদিও সে আলাদা করে ত্বকের চর্চা তেমন একটা করে না, ক্যাপটেন আবদুল্লা ম্যাডামের মনের ভাব বুঝতে পেরে বললেন, মাস্টারমশাই, পরে শুনব আপনার নন্দীগ্রামের গল্প ননী সামন্ত হাসছিলেন, দেশের কথা ভাবার মানুষের সংখ্যা কমেছে।

ডক্টর সায়ন দাশ রবীন্দ্রসংগীতের খুব ভক্ত। নিজেও কখনও কখনও গুনগুন করেন। নিজের অস্থায়ী চেম্বারে বসে ডাক্তারবাবু গাইছিলেন,

বিরস দিন, বিরল কাজ, প্রবল বিদ্রোহে

এসেছ প্রেম, এসেছ আজ কী মহা সমারোহে

তমালিকা এসে বলল, স্যা, মেয়েটি আর থাকবে না, চলে যাবে বলছে

চোখ বন্ধ করে গাইছিলেন ডাক্তারবাবু, গাইতে গাইতে উত্তর দিলেন, র সঙ্গে যাওয়ার মতন কেউ আছে?

বাউল ছেলেটা আছে। তমালিকা বলল। ওর সঙ্গে ফিরলে আবার না মার খায়

দরজার কোনায় এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে কুসুম। ডাক্তারবাবু একবার দেখলেন ওকে। নে হচ্ছে অনেকটা সুস্থ হয়েছ। এরকম অস্থায়ী হাসপাতালে তোমাকে আটকে রেখে লাভও নেই। কয়েকটা ভিটামিন লিখে দিচ্ছি খেয়ে নেবে

ষুধ আর পারুম না কিনতে। ওর ওষুধের খরচা জুগাইতে প্রাণ ওষ্ঠাগত

ডক্টর দাশ তমালিকাকে বললেন, স্টক থেকে দু-পাতা ভিটামিন দিয়ে দাও।

তমালিকা বলল, ত মার খাও তবুও স্বামীকে ভালোবাস?

দ খাইলে সে আমারে মারে কিন্তু অন্য সময় সোহাগ করে খুবই বলে লজ্জা পেয়ে যায় কুসুম। মুখটা বিকৃত করে একরকমের ভেংচি কাটে তমালিকা। ডাক্তারবাবুকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে কুসুম। ডক্টর সায়ন দাশ বয়সে একদম প্রবীণ, বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন কিন্তু পারেন না। দীর্ঘশ্বাস পড়ে সায়নের, কেন জানি ভয় হয় মেয়েটিকে নিয়ে। চলে যেতে গিয়েও কুসুম একবার থমকে দাঁড়ায়। সাহেব, একখান কথা জিগামু!

তমালিকা এবার হিংস্রতা এনে বলে, যাও এখন

ডক্টর সায়ন দাশ তমালিকাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, হ্যাঁ বলো। বেশি সময় নেই আমার হাতে আজকে তেমন ঠান্ডা নেই, রোদ্দুরের তাত বাড়ছে। খেস্টানেরা কি খুব নীচু জাত!

মানে? অবাক হয়ে তাকান ডক্টর সায়ন দাশ।

মাগো পাড়ার লোকেরা কয় অরা নাকি মোল্লাগো চাইতে খারাব

খারাপ আর নীচু জাত—দুটো তো এক নয় সায়ন বলেন।

মরা হিন্দুরা সব্বাইয়ের উপরে আছি, তারপর মোল্লারা—আমাগো দুইজনার মধ্যিখানে খেস্টানেরা নাকি ভাইস্যা আছে!

তমালিকা এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার সে বলল, তা তুমি খ্রিস্টানদের নিয়ে পড়লে কেন!

মারে একজন কইছিল খেস্টান হইতে। তা হইলে আমার কুনো অভাব থাইকব না

লেই পারতে তমালিকা বলল।

দু-দিন গেছিলাম। দু-খান মিষ্টির প্যাকেটও পাইছিলাম

ডক্টর সায়ন দাশ মুচকি হেসে বললেন, তারপর?

ন থেকে সায় দিলা না, সাহেব। আমাদের এহানে একজন হইছে। আমার স্বামীর বন্ধু। সে ভ্যান চালায়। তার বউ খেস্টান হইছে। শাঁখা সিন্দুর কিছু নাই অহন

শোনো, খ্রিস্টানরা এখন পৃথিবী শাসন করছেন। ২০০ বছর আগে ওঁরা আমাদের রাজা ছিলেন। অত্যাচারও করেছেন, আবার ওঁদের কাছ থেকে আমরা শিখেছি অনেক কিছু

ফাজলামির হাসি হাসল কুসুম। তমালিকার রাগ হচ্ছে। এরকমটা ডাক্তারবাবু করেন না। খুব কাজের মানুষ। বাঙাল ঘরের বউ তো স্বভাবটা গায়ে পড়া। তমালিকা কঠোর স্বরে বলল, বার যাও তুমি!

খেস্টানরা আমার স্বামীর মতন না-গো, ডাক্তারবাবু! মাইরও দ্যায়, সোহাগও করে

ডক্টর সায়ন দাশ এবার এবার জোরে না হেসে পারলেন না। বিশ্বজিৎ বাউল এসে দাঁড়িয়েছে। তমালিকা বোধ হয় খবর দিয়েছিল। সাবধানে নিয়ে যেও ওকে। আর একটা কথা

বিশ্বজিৎ হাতজোড় করে বলল, লেন ডাক্তারবাবু

কুসুমের তাঁবু অবধি তুমি যেও না। একটু আগে ছেড়ে দিয়ো

বিশ্বজিৎ বাউল ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।

পথে যেতে যেতে কুসুম বলল, কোনখানটায় আমায় ছাইড়্যা যাবা!

বিশ্বজিৎ হেসে বলল, তুমি কও রাধে

তুমি আমার কালা নও! তুমার গাইনে আমি ভুলি না

বিশ্বজিৎ বাউল বলল, কুসুমদি, আমি জানি তা। তুমি এত সুষ্ঠু করে না বললে পারতে

ব্যথা দিলাম তুমারে

বিশ্বজিৎ বাউল চুপ করে রইল। মনে পড়ল ওর দেহটা রক্তাক্ত ও অচৈতন্য অবস্থায় যখন পড়েছিল, খুব ঘৃণা হয়েছিল কুসুমদির স্বামীর উপর। এরপরেও কুসুমের ব্যবহার অবাক করছে ওকে।

এইভাবে বলল বটে বিশ্বজিৎ বাউলকে তবুও ভিতরে ভিতরে অজানা আশংকায় কেঁপে উঠল। বিশ্বজিৎ বাউল খানিকটা গিয়ে ওকে একা ছেড়ে দিয়েছে। খুব দ্রুত পায়ে হেঁটে নিজের তাঁবুর কাছে চলে এল কুসুম। প্রচুর মদ খেয়েছে গোবিন্দ। মুখ দিয়ে লোল গড়াচ্ছে, প্যান্টে পেচ্ছাপ করে দিয়েছে। কোনো হুঁশ ছিল না ওর, কিন্তু কুসুম ঘরে ঢুকতেই ওর যাবতীয় হুঁশ ফিরে এল। মাগি, কোথায় গেছিলি! আমার খিদে পেয়েছে। ভাত দে

স্বামীর প্রতি সমস্ত প্রেম উবে গেল কুসুমের। হাসপাতাল থিকা আইতাছি। মাইরা ফেলাইছিলা, প্যাটের টারে মারছে। অহন খাওন চাও! খুনি, বদমাইশ কুথাকার

এবার গোবিন্দের যেন নেশার চটকা কেটে গেছে। সে বলল, প্যাটের ভিতর তোর বাচ্চা আইল কি কইরা! শুইছিলি কার সঙ্গে, খানকি মাগি!

তুমি মানুষ না! কান্নায় ভেঙে পড়ল কুসুম।

পাশের তাঁবু থেকে কেউ বলে উঠল, স্তে কথা বলুন, এটা ভাটিখানা নয়, তীর্থক্ষেত্র টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায় গোবিন্দ। ভাত দিবি কিনা ক! না যদি দি-স কাইট্যা ফেলাইবা

কুসুম বলল, ফেলা। তুরে মাইরা আঁই মরুম। কুসুম আসার সময় পোঁটলার মধ্যে বঁটি নিয়ে এসেছিল। নিজের বঁটি ছাড়া সে আনাজ কুটতে পারে না। বঁটি হাতে নিয়ে কুসুম বলল, তুমি কাইটতে জানো আর আমি জানি না! তুমার মতো মানষেরে কাইটলে পুণ্য হইব। পোলা পুলান দুইডা বাড়িতে কি খাইতাছে সে কথা কখনও জিগাও না, শুধা নিজে খাইম খাইম। রাক্কুসের প্যাট হইছে তুমার

হঠাৎ আশ্চর্য পরিবর্তন হল গোবিন্দের, সে কোমল স্বরে বলল, তুই খাইছিস, কুসুম! হাসপাতালে সে কিছু খেয়েছে। গোবিন্দ হয়তো মদ ছাড়া আর কিছু খায়নি। কুসুমের কষ্ট হল খুব। অসুস্থ মানুষ, খিদে একটু বেশি পায়। ভাত আর ডিমের ডালনা করতাছি। রাধনের সময় দিবা কিন্তু।

গোবিন্দ বাধ্য ছেলের মতো বসে রইল। একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ল। নাকও ডাকতে লাগল। অনেক রাতে রান্না হলে কুসুম স্বামীকে ডেকে তুলল। অনেকটা ভাত খেয়ে ফেলল গোবিন্দ। কুসুমের জন্য পড়ে রইল সামান্য ভাত আর ঝোল-আলু। তাই তৃপ্তি করে খেল কুসুম।

 

দীপ্তি আর সায়ন্তন গাইছিল,

জয় মা দুর্গে, দুর্গতিনাশিনী মহিষাসুরমর্দিনী

জয় মা দুর্গে

কথায় কিছু ভুল আছে তবুও দুজন খ্রিস্টান ছেলেমেয়ে খুব আন্তরিকভাবে দেবী দুর্গার বন্দনা করছে। চুঁচুড়ায় কয়েক জায়গায় বাসন্তী পুজো হয়। পঞ্চমী বোধ হয় আজ। তীব্র তাপপ্রবাহ। একটু বেলা হলে রাস্তায় বেরোনো যাচ্ছে না। গঙ্গাসাগর মেলা থেকে মা ফিরে এসেছে। মুখ ভার। অর্কদীপ্তের সঙ্গে কথা বলছে না। দীপ্তির শরীর এখন খানিকটা ভালো। আগে একদম খেতে পাচ্ছিল না। মুমু, আয় তোর চুল বেঁধে দেব, মা, ও রকম করে ছুটিস না! আমার শরীর খারাপ। এই যে, মা, আমি এখানে। খোঁজো, খোঁজো—একটুখানি দেখ আমায়। পাচ্ছি না তোকে। আর কত খুঁজব!

মুমু নামে দীপ্তি, চোখ খুলে দেখল বেলা আটটা বাজে। ডোরবেল টিপে কাগজওয়ালা খবরের কাগজ দিয়ে গেছে। দুধের লোকে দুধ দিয়ে গেছে—সে উঠতে পারেনি। মাকে স্বপ্নে দেখছিল মুমু। ওর মতনই ব্লাড ক্যানসার হয়েছিল মায়ের। ফর্সা মা আরও ফর্সা হয়ে উঠেছিল। জানি না ফুরাবে কবে এই পথ চাওয়া। মা গাইত। মুমুও না বুঝে গলা মেলাত। এই পথ চাওয়া মানে কি মায়ের স্বল্পকালের এই পৃথিবীতে স্থিতি? মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে মা বলত, জেসাস তোমায় অনেক অনেক আয়ু দিক

য়ু মানে কী, মা? মুমু জিগ্যেস করত।

লং লিভ মাই লিটল,মুম! বলেই মা খুব কাঁদত। মুমুরও খুব কান্না পেত তখন।

সায়ন্তন আর অর্কদীপ্ত দুজনে মিলে কাল রাতে ভ্যাট সিক্সটি নাইন খেয়েছে। বাবার ফেলে যাওয়া মদের বোতল। আজকে দুজনের কেউ আসতে পারেনি। অর্কদীপ্তের অভ্যাস নেই, সায়ন্তন ওকে জোর করে খাইয়েছে। নতুন খেলে হ্যাং-ওভার সহজে কাটে না। মুমু বাধা দিচ্ছিল। তখন সায়ন্তন বলল, জেসাস তাঁর অন্তিম ভোজনে শিষ্যদের নিজের হাতে মদ পরিবেশন করেছিলেন মুমু কিছু বলতে পারেনি তারপর। ওরা ধরেই নিয়েছে মুমু আর বেশিদিন নেই। তাই এ সব অন্তিম পানাহার।

অনেক কষ্টে চা করেছে। ডিমের পোচ করল। আজকে বেশ খিদে পেয়েছে। ডিমের পোচ নিয়ে মা মুমুকে খুঁজে পেত না।

কোথায় গেলি,মা? আয়!

বাইরে থেকে দৌড়ে এসে মুমু বলত, মা, অঞ্জলি দিয়ে এলাম

কোথায়!

পাড়ার প্যান্ডেলে

র্ক দিচ্ছিল, আমরা খ্রিস্টান, ওরা হিন্দু। কেউ দেখলে রাগ করত। অনেকেই দেখেছেন, কেউ কিছু বলেননি। গডেস দুর্গা। আজ আমি শাড়ি পরব,মা

ফিঙে পাখিগুলি এমনভাবে ডাকে মনে হয় যেন ডোরবেল বাজছে, ভোর থেকে এ রকম হয়। মায়ের মৃত্যুর পরও মুমুও ভাবত সে একা একা কী করে থাকবে। বাবার বিয়ের দিন সে খুব কেঁদেছিল। ফাদার নব-দম্পতিকে আশীর্বাদ করেছিলেন। সেই একই উচ্চারণ: এই বিয়ে হেভেন থেকে মঞ্জুর হল। পরস্পরকে ওরা চুমু দিল। ওয়েডিং রিং পরিয়ে দিলেন মি. গোমেজ। সেদিন থেকে মুমুর কাছে উনি বাবা নন, মি. গোমেজ। বারবার মনে হচ্ছে অর্কদীপ্ত আসবে। সে তো জানে মুমু কত একা। একা পৃথিবীতে বাঁচতে মুমুর কত ভয়। দারুণ গরম পড়েছে। আগামী মে মাসে লোকসভা নির্বাচন। দেওয়াল লিখন, মাইকে উত্তপ্ত বক্তৃতা। রাজনীতি যাঁরা করেন, তাঁরা ভালোবাসেন ক্ষমতা। অর্ক খুব একটা খবরের কাগজ পড়ে না। মুমু কিন্তু খুব মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ে। অর্ক সিনেমা বানাতে চায়। শর্ট ফিল্ম সে কয়েকটা করেছে। ডিজিট্যাল ক্যামেরা দিয়ে সে বানিয়েছে ও সব ছবি। পর্দা টাঙিয়ে তাদের বাড়িতে অনেকবার দেখিয়েছে। সব গল্পের নায়িকা মুমু। গায়ক সায়ন্তন। এই দুজনকে বাদ দিয়ে সে কিছু করবে না। এখনও জেদ দিয়ে ‘ও’ পারবে সবকিছু ঢেকে দিতে। জেদ করছে খুব। তখন মুমু বলেছে তবে নায়িকার ব্লাড ক্যানসার দেখাতে হবে। কেমো নেওয়া দেখাতে হবে। আর অংকোলজিস্ট হবে অর্কদীপ্ত। মনে মনে বলেছে, অর্কদীপ্তের ভালোবাসা যতদিন থাকবে, মুমুও এই পৃথিবী ছেড়ে কোথাও যাবে না। অর্কদীপ্তের একটা বিশেষ অহংকার ছিল মুমুকে নিয়ে। মুমুরা খ্রিস্টান। সাইকেল চাপিয়ে সারা চুঁচুড়া শহর ঘুরলে আলাদা তৃপ্তি হত। তবে মুমু অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়েদের মতন চটকদার ইংরেজি ভাষায় কথা বলত না। সে গাউন পরত বটে, কিন্তু তার টান ছিল শাড়ির দিকে। তবুও বন্ধুরা ঈর্ষার চোখে দেখত। কেউ কেউ বলত, র্ক,দারুণ একটা মাল বাগিয়েছিস! অর্কের প্রচণ্ড রাগ হত। প্রায় সময়ই হাতাহাতি লেগে যেত। তবে যেহেতু সে ডাকাবুকো গোছের এবং গায়ে প্রচণ্ড শক্তি, কেউ এর চেয়ে বেশি এগোনোর সাহস পেত না।

স্মৃতিলেখার প্রথম থেকে আপত্তি ছিল। বলা যায় মুমুর সঙ্গে মেলামেশায় প্রবল আপত্তি ছিল অর্কদীপ্তের মায়ের। মা প্রায়ই বারণ করত। মিস্টার গোমেজের বাড়িও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়া অন্যদের জন্য তেমন একটা উন্মুক্ত ছিল না। কিন্তু মিস্টার গোমেজ বরাবরই অর্কদীপ্তকে স্নেহ করতেন। পরে মিস্টার গোমেজের ফার্মে অর্কদীপ্ত তার চাকরিজীবন শুরু করল এবং তখন বোঝা গেল তিনিও বেশ গোঁড়া খ্রিস্টান। মুমুর মা ছিলেন অসাধারণ মানুষ। তাঁর স্নেহের স্মৃতি জীবনের এক তুলনাহীন সম্পদ। মুমুদের বাড়িতেই প্রথম পিৎজা খেয়েছিল অর্কদীপ্ত আর সে দিন প্রথম সন্ধ্যায় অন্ধকারে গঙ্গায় যখন সবুজ বয়া ভাসছে মুমুকে চুমু দিয়েছিল। অর্কদীপ্তের প্রজন্মের যুবক-যুবতীরা চুমুকে কিস বলে কিন্তু মুমু বলত কিস করবে বললে আমি পালিয়ে যাব বা একেবারের মতন হারিয়ে যাব। কিস শব্দটার প্রতি বীতস্পৃহ মনোভাব জন্মায়।

পিৎজা খাওয়ানোর পর একদিন মাসিমা নারকেল, মুড়ি খাওয়ালেন। মাসিমা তখন বেশ অসুস্থ। একই রোগ, ব্লাড ক্যানসার। একে খুব ফর্সা ছিলেন মাসিমা, রোগের কারণে ক্রমশ ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছিলেন। বাসন্তী পুজোর ষষ্ঠীর সকালে মুমুর মা মারা গেছিলেন। স্মৃতিলেখা আসতে দেননি। কবরে যাওয়া মায়ের পছন্দ ছিল না। তখনও মুমু বাল্যবয়সের সখি।

প্রন ফ্রাই আর ভ্যাট-সিক্সটি নাইন খাওয়া হয়েছে। এখনও হ্যাং-ওভার হয়েছে। কখন এসে বিছানায় শুয়ে পড়েছে, হুঁশ ছিল না। স্মৃতিলেখা ছেলের ঘরে এসে জানলার পর্দাগুলি সরিয়ে দিতে অর্কদীপ্ত বুঝল অনেকটা বেলা হয়েছে। বাইরে রোদ্দুরের প্রবল প্রতাপ। মনে পড়ল মুমুর কথা। কথা ছিল ব্যাঙ্গালোরে চলে যাওয়ার আগে প্রতিদিন ভোরে কথা শুনলে প্রবল অশান্তির মধ্যে পড়তে হবে। ছেলের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বললেন স্মৃতিলেখা। গলায় ব্যাপক অভিমানের বাষ্প জমা রয়েছে। মার কাছে অনেক কিছু লুকোচ্ছিস আজকাল!

অর্কদীপ্ত মায়ের অভিমানী কণ্ঠস্বর টের পেল। তোমার জন্য একটা সুখবর আছে চেনা রোদের তীব্রতার সঙ্গে সামান্য হাওয়াও রয়েছে। বাগানের রজনীগন্ধার সুগন্ধ হাওয়ায় ভর করে ভেসে এল।

কী সুখবরগলায় গাম্ভীর্য রেখে বললেন স্মৃতিলেখা।

মি আর খ্রিস্টান হচ্ছি না

আনন্দের কান্নায় ভেঙে পড়ল স্মৃতিলেখা। সে যে খুব ঈশ্বরে বিশ্বাস করে তেমনটা নয় কিন্তু একধরনের লোকলজ্জার ভয়ে খুব সংকুচিত ছিল ভিতরে ভিতরে। ছেলেকে এসে জড়িয়ে ধরল স্মৃতিলেখা।

তুমি খুব খুশি হয়েছ, মা?

হ্যাঁ সোনা। বলেছিলাম না তোকে ধর্ম-পরিবর্তন এত সোজা বিষয় নয়। শেষ পর্যন্ত বুঝলি তো!

মার কাছে কিন্তু এখনও খুব সহজ ব্যাপার

কঠিন হল স্মৃতিলেখার গলা। বে কার কথায় হিন্দুধর্মকে দয়া করলি!

মুমু আমায় শপথ করাল যে আমি যেন কোনোভাবেই ধর্ম পরিবর্তন না করি

স্মৃতিলেখা অসম্ভব অপমানিত বোধ করল। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় অর্কদীপ্ত মাকে জড়িয়ে ধরল। মা, মুমু বেশিদিন বাঁচবে না

কে, তুই কি আজকাল জ্যোতিষ বিদ্যা শিখছিস!

র ব্লাড ক্যানসার। দুটো কেমো হয়ে গেছে

স্তব্ধ হয়ে গেল স্মৃতিলেখা। মুমুর মা-ও মারা গেছিল ব্লাড ক্যানসারে। খ্রিস্টান না হলে ওদের সঙ্গে কোনো বিরোধ ছিল না স্মৃতিলেখার। মুমু মেয়েটাকে খারাপ লাগে না স্মৃতিলেখার। খুব নরম আর আদুরে। প্রতিবন্ধকতা অর্কদীপ্তের ভালোবাসা আর ওদের ধর্ম। তবু দীর্ঘশ্বাস পড়ল স্মৃতিলেখার। মেয়েটির প্রতি নরম মনোভাব ছেলের সামনে দেখানো যাবে না।

ক্যানসার—এখন চিকিৎসাকরণে সেরে যাচ্ছে মায়ের এই অদ্ভুত, নিরুত্তাপ কণ্ঠস্বর খুব আঘাত করল অর্কদীপ্তকে। চুপ করে রইল সে। মা বোধ হয় মৃতা মুমুকেও মেনে নিতে পারবে না।

র্মের কাছে মানুষের জীবনের মূল্যও কিছু নেইঅর্কদীপ্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল। 

স্মৃতিলেখা বুঝল একটা অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি হয়ে গেল সন্তানের হৃদয়ের অভ্যন্তরে। কিন্তু স্মৃতিলেখা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা একটি খ্রিস্টান মেয়েকে কিছুতেই অন্তর থেকে মেনে নিতে পারল না।

(ক্রমশ…)

 
 
top