ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

স্যা, দখিনা বাতাস ভালো কিন্তু দখিনের মানুষ ভালো নয়

মেলা অফিসে ঢুকতে গিয়ে ফিরে তাকালেন অনুজ।

স্যা, মনে পড়ছে আমায়? অনারেবেল হাইকোর্ট, কলকাতা

অনুজ চিনতে পারলেন। রে, শচীনবাবু, শচীন সামন্ত

শচীন সামন্ত হাইকোর্টে অ্যাডভোকেটদের বাবু হিসেবে কাজ করছেন পঁয়তাল্লিশ বছর হয়ে গেল। ব্রিটিশ আমলের ব্যারিস্টারদের বাবুগিরিও করেছেন তিনি।

 

দেখেছেন, মজা করে নিজের সম্পর্কে বলেন, দ্য মোস্ট ইম্পরট্যান্ট ম্যান ইন দ্য অনারেবেল হাইকোর্ট অ্যান্ড দ্য টলেস্ট পরেরটা অবশ্য মজা করে বলা কারণ শচীনবাবুকে বামনই বলা যায়। একসময় রঙমহলে অমর কণ্টক নাটকে টানা অভিনয় করেছেন।

অনুজ একটু হেসে আবার বললেন, চীনবাবু, আমি তবে খারাপ লোক

নো, স্যার। আপনার বাড়ি তো চুঁচড়ো শহরে। আমি তো এখানকার মানুষদের কথা বলছি

বে এসেছেন মেলায়?

শচীনবাবু বললেন, য়েকদিন হল। প্রতিবারেই আসি। বাবা কপিলকে প্রণাম করে যাই

খানকার মানুষদের কি আপনার খারাপ লাগে?

বাইরে থেকে কি কিছু বোঝা যায়, বিডিও সাহেব? মেলায় একটা খুন হয়েছে, আপনি জানেন?

তীর্থযাত্রীদের মধ্যে কেউ? অনুজ ভিতরে ভিতরে আশঙ্কিত হয়ে উঠলেন।

তা জানি না। তবে একটি বাঙাল মেয়ে স্বামীকে গলা কেটে খুন করেছে

মোটিভ কিছু জেনেছেন?

রকীয়ার বিষময় ফল শচীন সামন্ত হেসে বলল।

অনুজ জেনে একটু শান্তি পেলেন।  মেলার সঙ্গে এই খুনের কোনো সম্পর্ক নেই।

মোটিভ পরকীয়া প্রেমের বলি। বাউলের সঙ্গে অবৈধ কিছু ছিল, স্যার। বাঙাল মেয়েরা সাংঘাতিক হয়। দক্ষিণ মানে বাঙাল থেকে আসা অনুপ্রবেশকারী আর কিছু মেদিনীপুরের মানুষ। ওঃ, নৃশংস খুন! মানবতার অপমান

বেশ নাটকীয় উপস্থাপনা করলেন শচীন সামন্ত।

 

পুণ্যার্থীরা ফিরে চলেছেন। সকলের যাওয়ার তাড়া, তবুও কেউ কেউ ফিরে তাকিয়ে দেখছে কুসুমকে। হাতকড়া পড়িয়ে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কুসুমকে। অবিন্যস্ত, বিশ্রান্ত কুসুমের পেছনে একদল মানুষও চলেছে পুলিশের সঙ্গে। তারা সব অশ্রাব্য খিস্তি করছে কুসুমকে। অতিরিক্ত উৎসাহী জনতার কেউ কেউ থুতু ছিটিয়ে দিচ্ছে ওর গায়ে, মুখে। সবকিছুতেই অসম্ভব নিরুত্তাপ কুসুম। কোনো গালমন্দ, ধিক্কার তাকে আর স্পর্শ করছে না। বিশ্বজিৎ বাউলকেও অ্যারেস্ট করেছিল পুলিশ। তবে খুনের যাবতীয় দায়ভার গ্রহণ করেছে কুসুম নিজে। সে থানার বড়োবাবুকে সবটা খুলে বলবে। বিশ্বজিৎ বাউল বোকার মতন রয়ে গেল। ছেলেমেয়ে দুটোকে বাউল-ভাই একটু দেখে এসে খবর দিতে পারত! বৃদ্ধ কনস্টেবেলের কেন জানি মনে হচ্ছে মেয়েটি খুব অসহায়। ভয়ঙ্কর পাপ করলেও কেমন একটা সরলতা ফুটে রয়েছে মুখে। শ্রীনিবাস কনস্টেবল বললেন, মা, তুমি জল খাবে? মুখটা শুকিয়ে গেছে খুব

চোখে জল চলে এলো কুসুমের। সে প্রণাম করল শ্রীনিবাস কনস্টেবেলকে।

হাতের লাঠিটা উঁচিয়ে পিছনে আসা মানুষগুলিকে তাড়া দেওয়ার ভঙ্গি করলেন শ্রীনিবাস। একদম মন গলে গেছে ওঁর। মানুষ কত কারণে পাপ করে ফেলে! ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের ভক্ত শ্রীনিবাস কনস্টেবল। ঠাকুর বলতেন, পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়। নিজের বোতল থেকে কুসুমের গলায় জল ঢেলে দিলেন শ্রীনিবাস কনস্টেবল।

এই দৃশ্য দেখে ক্ষিপ্ত জনতার মধ্যে থেকে কেউ বলে উঠল, খুন করলেও মেয়েটার কিছু বলার থাকে পারে

আরও একজন বলল, মেয়েটা তো আত্মরক্ষার কারণেও খুন করতে পারে

শ্রীনিবাস কনস্টেবল বললেন, ভাগো সব। জজ সাহেব এয়েছেন

 

শ্রীনিবাস কনস্টেবল কলকাতা শহরের মানুষ। কয়েক পুরুষ ধরে ওঁরা উত্তর কলকাতার বাসিন্দা। পশ্চিমবঙ্গের মানুষদের বাঙালরা বলে ঘটি। কেউ ব্যঙ্গ করে বলে ফুটো ঘটি। শ্রীনিবাসের বউ বাঙাল। বরিশাল জেলার মেয়ে। খল, মুখরা, কিন্তু রান্নার হাত চমৎকার। রাগলে বউয়ের মাত্রাজ্ঞান থাকে না। পুলিশের চাকরি করলেও শ্রীনিবাস কনস্টেবল ঘুষ খান না। মদ, বিড়ি, সিগারেট, খৈনি কোনো নেশা নেই। মেয়েটির কথায় বরিশালের টান রয়েছে। যতটুকু জেনেছেন শ্রীনিবাস, ওর স্বামী নেশা করত। ভিড় পাতলা হলে শ্রীনিবাস বললেন, মা, এমনটা করলি কেন? তোর মুখ দেখে তো মনে হয় স্বামীকে ভালবাসতি

কুসুম তাকাল শ্রীনিবাস কনস্টেবেলর দিকে। ওর মৃত বাবার মতো দেখতে। মাথায় বড়ো টাক, মোটা গোঁফ। বাবার গলায় সুর ছিল। বৈষ্ণব ছিলেন তিনি। বাড়ি বাড়ি ঘুরে কীর্তন আর ভিক্ষা করতেন। যতদিন বেঁচেছিলেন, কুসুমকে বুকে আগলে রেখেছিলেন। শ্রীনিবাস কনস্টেবেলের কাছে মুখ খুলল কুসুম।

দুটো কিডনি খারাপ ছিল উনার আর ভাল করতেই আয়াছিলাম ক্লান্ত কুসুম আবার বলল, হ্যাঁ, আমিই মারছি অরে। বাবা, সুযোগ পাইলে তুমারে পরে কইম আঁই

আবার চোখে জল এল শ্রীনিবাস কনস্টেবেলের। এই মেয়ে পাপী হতেই পারে না। তিনি ঠাকুরকে স্মরণ করলেন। একমাত্র ঠাকুরই পারেন কুসুমকে রক্ষা করতে।

(ক্রমশ…)

 
 
top